কামরুল ইসলাম
আমেরিকান নাট্যজগতের প্রবাদ পুরুষ ইউজিন ও’নিল জীবনবোধের বিচিত্র অভিজ্ঞতার রসায়নে শিল্পের আমূল পরিবর্তনে সারা জীবনই এক রক্তাক্ত নিরীক্ষায় অন্বিষ্ট ছিলেন। বিশ শতকের আগ পর্যন্ত আমেরিকান নাটক ইউরোপীয় কিংবা ইংরেজি নাটকের অনুকরণ ছিল বলতে গেলে। নাট্যশালাগুলোতে ইংল্যান্ডের অথবা ইউরোপীয় কোনো নাটকের অনুবাদই মঞ্চায়িত হতো তখন। সে সময়ে আমেরিকানরা ইউরোপিয়ান অভিনেতা-অভিনেত্রীদের দেখার জন্য ভিড় জমাতো, বিশেষ করে যখন তারা যুক্তরাষ্ট্রে অভিনয়ের জন্য আসতো। বলতে গেলে তারা মদ আমদানির মতো নাটকও আমদানি করতো মনোরঞ্জনের জন্য।
উনিশ শতকে মেলোড্রামা এবং চরিত্রায়নে গুড ও ইভিল-এর বৈপরীত্য দেখানোটা ছিল সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যাপার। সে সময়ে সামাজিক সমস্যা-সম্বলিত নাটকও বেশ দর্শকনন্দিত হয়েছে বলা যায়। কখনো কখনো এ ধরনের নাটক কোনো জনপ্রিয় উপন্যাস (যেমন আঙ্কেল’স টমস কেবিন) থেকে কাহিনি নিয়ে লেখা হতো। সিরিয়াস শিল্পনন্দন নাটক বলতে যা বোঝায়, বিশ শতকের আগে আমেরিকায় লিখিত হয়নি। আমেরিকার নাট্যশিল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে ইউজিন ও’নিল-এর নামই সর্বাগ্রে আসে। কারণ, আধুনিক সিরিয়াস নাটকের তিনিই প্রথম সার্থক রূপকার। তিনি আমেরিকান নাটককে গৌরবান্বিত করেছেন, পূর্ণতা দিয়েছেন। আধুনিক বিশ্বনাটকের ক্ষেত্রেও তাঁর অবদান অসামান্য। আর এ জন্য ১৯৩৬ সালে তাঁকে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়। এই ক্ষণজন্মা নাট্যব্যক্তিত্ব নিউইয়র্কের এক হোটেলে জন্মগ্রহণ করেন ১৮৮৮ সালের ১৬ অক্টোবর। ক্ষতবিক্ষত দ্বন্দ¦-সংঘাতময় জীবনের প্রতি বিন্দু স্বেদ ও প্রত্যয়ে তিনি গড়ে তোলেন তাঁর অনেকগুলো অভিনব কালোত্তীর্ণ নাটক, যা তাঁকে চিরদিন বাঁচিয়ে রাখবে। শুধু আমেরিকায়-ই নয়, সারা পৃথিবীতেই। ইউরোপসহ সারা পৃথিবীর নাট্যশিল্পকে তিনি প্রভাবিত করেছেন তাঁর সৃষ্টিকর্মের ভিন্ন বৈশিষ্ট্যে।
ও’নিল-এর যেমন জন্ম হয়েছে হোটেলে তেমনি তাঁর মৃত্যুও হয় হোটেলেই। মহান এই নাট্যশিল্পী চিরজীবন ছিলেন বোহেমিয়ান। পিতার ছিল একটি নাট্যকোম্পানি এবং তাঁর পিতা জেমস ও’নিল নিজেও ছিলেন দর্শকনন্দিত অভিনেতা। বাল্যকালে ও’নিল পিতার সাথে ঘুরেছেন নানা জায়গায়, থেকেছ্নে, ঘুমিয়েছেন, পোশাক পরেছেন কখনো হোটেলে, আবার কখনো ট্রেনের কামরায়। এভাবে জন্মের পর সাতটি বছর তাঁর স্থানান্তরে কেটে যায় আর তখন থেকেই তাঁর মনন ও অস্থিমজ্জায় জড়িয়ে যায় নাটক, চিরকালের সঙ্গী হিসেবে।
জীবনের প্রতি বিতৃষ্ণ তাঁর মাতা ম্যারি এলেন ও’নিল ছিলেন ড্রাগাসক্ত। তিনি দীর্ঘদিন মরফিনে নেশা করেছেন। ও’নিল-এর জন্মের সময় থেকেই এই ড্রাগ নেওয়া শুরু। তিনি অত্যন্ত অসুস্থ ও দুর্বল ছিলেন। ফলে, সারা স্যান্ডি নামের এক সেবিকার কাছে ইউজিন বড়ো হয়েছেন। এসময়ে উক্ত সেবিকা তাঁকে ভয়ঙ্কর গল্প শোনাতেন আর ও’নিল ঘুমের মধ্যে দুঃস্বপ্নে জেগে উঠতেন প্রায়শ। সাত বছর বয়সে ক্যাথলিক বোর্ডিং স্কুলে পাঠানো হলে সেখানকার কড়া নিয়মকানুনের মধ্যে তিনি একাকী ও মনমরা হয়ে পড়েন। মা ছিলেন খুবই ধার্মিক। তাঁর জন্মের পর থেকেই তার মায়ের অসুস্থতা বেড়ে যেতে থাকে এবং ড্রাগ ছাড়া তিনি কখনোই স্বস্তি পেতেন না। প্রায়ই যেতে হতো স্যানাটোরিয়ামে। ভাই জেমি ছিল প্রতিভাবান ছাত্র। কিন্তু মানসিক রোগ থেকে বাঁচতে সে-ও বন্য-লাম্পট্যের জীবন বেছে নেয় এবং মদ্যাসক্ত হয়ে পড়ে।
বিভিন্ন বোর্ডিং স্কুলের বিতৃষ্ণ সময় পার করে ১৯০২ সাল থেকে পরবর্তী চার বছর তিনি স্ট্যামফোর্ডের বেটস একাডেমিতে অতিবাহিত করেন। তলস্তয় ও দস্তয়েভস্কির লেখার সাথে এখানেই তাঁর পরিচিতি ঘটে। জোসেফ কনরাড এবং জ্যাক লন্ডনের বিখ্যাত সমুদ্রকাহিনীগুলোও তিনি এখানেই আবিষ্কার করেন। গ্রীষ্মকালে, এ সময়, তিনি বিভিন্ন ডকে গিয়ে নাবিকদের সঙ্গে কথাবার্তা বলতেন। সমুদ্রের প্রতি ছিল তার গভীর আকর্ষণ। নিজে খুব ভালো সাতারুও ছিলেন।
ও’নিল বেটস একাডেমি থেকে গ্রাজুয়েশন নিয়ে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন। তার বিশ্ববিদ্যালয়ের জীবন ছিল স্বল্পকালের। এসময় তিনি জার্মান দার্শনিক নীৎসের লেখার সাথে পরিচিত হন। তিনি নীৎসে এবং ফ্রয়েড দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন দারুণভাবে- যা তাঁর কিছু মনস্তাত্ত্বিক নাটক থেকে সহজে বোঝা যায়। ১৯০৯ সালে ও’নিল ক্যাথলিন জেনকিনসকে বিয়ে করেন এবং পরের বছরই ও’নিল জুনিয়রের জন্ম হয়। এই ছেলে পরবর্তীতে ইয়েল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হয়েছিলেন। ও’নিল-এর প্রথম বিয়ে স্বল্পকালেই ভেঙে যায়। কারণ, ক্যাথলিন ছিলেন প্রোটেস্ট্যান্ট এবং ও’নিল-এর পিতা ছিলেন এই বিয়ের ঘোরবিরোধী। তার স্ত্রীর পিতা-মাতা এ বিয়েতে নাখোশ থাকায় তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ খুব সহজেই ত্বরান্বিত হয়।
পরে ও’নিল-এর পিতা তাঁকে সোনার খোঁজে হন্ডুরাসে পাঠালে সে অভিযান ব্যর্থ হয়। হন্ডুরাসের উত্তপ্ত জঙ্গল, অসংখ্য পোকামাকড় আর ভয়ঙ্কর পরিবেশে তিনি অবর্ণনীয় ভোগান্তির শিকার হয়েছিলেন, যে অভিজ্ঞতার প্রকাশ দেখা যায় তাঁর ‘দ্য এমপেরর জনস’ (The Emperor Jones) নাটকে। ১৯১০ সালে স্বর্ণ অভিযান শেষে ফিরে এসে পিতার নাট্য কোম্পানিতে সহকারি ম্যানেজার পদে যোগদান করেন। এই চাকরিতে তাঁর কোনও উৎসাহ ছিল না, তাই ইস্তফা দিয়ে বেরিয়ে পড়েন সমুদ্রযাত্রায়, যা তাঁর শিল্পীজীবনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলেছিল।
সমুদ্রযাত্রায় পরিশেষে বুয়েন্স আইরেস-এ এলে নানা ধরনের খ-কালীন চাকরি করেন। এখানে তাঁর নানা রকম মানুষের সাথে মেলামেশার সুযোগ হয় এবং নাবিকদের সাথেই মূলত তার অন্তরঙ্গতা গড়ে ওঠে। সমুদ্র যাত্রা শেষে ও’নিল ১৯১১ সালে নিউইয়র্কে ফিরে আসেন। তার সমুদ্রযাত্রায় দেখা পাওয়া অনেক নাবিকই তাঁর সমুদ্রবিষয়ক নাটকে পাত্র-পাত্রী হিসেবে স্থান পায়। পরে তিনি সাউথাম্পটনে আরেকবার সমুদ্রভ্রমণে বের হন এবং সুদক্ষ নাবিক হয়ে ফিরে আসেন। নাছোড়বান্দা পিতার বন্দোবস্তে এ সময়েই ক্যাথলিনের সঙ্গে তার ছাড়াছাড়ি চূড়ান্ত হয়ে যায়। তালাকের পর ক্যাথলিন ছেলেকে মানুষ করেন। এ সময় থেকেই পিতার প্রতি বিতৃষ্ণ ও’নিল পিতার নিকট থেকে মুক্তিপ্রত্যাশী হয়ে ওঠেন। জেমির বয়স ৩৪ তখন এবং সে পুরোপুরি অ্যালকোহলিক হয়ে পড়ায় পরিশেষে সংসার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সবাই।
পারিবারিক ঐক্যসূত্র বিনষ্ট হয়ে গেলে ১৯১২ সালে ও’নিল টেলিগ্রাফ পত্রিকায় রিপোর্টারের কাজ নেন; এই চাকরি বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। একটি বিশেষ অবস্থায় এই বিচ্ছিন্ন পরিবারের সদস্যগণ ১৯১২ সালের এক গ্রীষ্মে স্বাভাবিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা চালিয়ে ব্যর্থ হন। গ্রীষ্মের সেই উল্লেখযোগ্য ২৪ ঘণ্টার কাহিনি তিনি পরবর্তীতে তুলে ধরেন তাঁর বিখ্যাত নাটক ‘লং ডেস জার্নি ইনটু নাইট’ (Long Days Journey Into Night)-এ যা ছিল তাঁর পারিবারিক দুর্দশার ট্র্যাজিক ইতিহাস। ক্রমাগত অনিশ্চিত দুর্বিষহ জীবনযাপন, সংসার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং বিবাহভঙ্গসহ নানাবিধ মানসিক পীড়নে তাঁর স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়ে। এই সময়ে কানেকটিকাটের স্যানাটোরিয়ামে বেশ কিছুদিন তাকে বিশ্রাম নিতে হয়েছ্লি। এই স্যানাটোরিয়ামেই তিনি নাট্যকার হবার দৃঢ় প্রত্যেয়ে অন্বিষ্ট হন; এখানেই নির্ধারিত হয়ে যায় তাঁর জীবনসত্যের বিরল অভিজ্ঞতাসমূহ তিনি লিখে প্রকাশ করবেন।
তার নাট্যজীবনের শুরুতেই তিনি আমেরিকান অতীত নাটকের প্রাকরণিক ও বিষয়গত প্রচলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ দেখান। স্যানাটোরিয়াম থেকে ফিরে আসার পর (তিনি যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন) ১৫ মাসে ও’নিল এগারোটা একাঙ্কিকা, দুটো বড় নাটক এবং বেশ কিছু কবিতা লিখে ফেলেন। পরে যখন অনুভূত হয় যে নাট্যরচনা গঠনশৈলী বিষয়ক বাস্তব শিক্ষা থাকা আবশ্যক, তখন তিনি পিতার সহায়তায় হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিতে ভর্তি হন। এখানে জর্জ পিয়ার্স বেকার তাঁকে নাট্যবিষয়ে নানাবিধ অভিজ্ঞতায় পুষ্ট করে তুলেছিলেন এবং অপরিমেয় উৎসাহ যুগিয়েছেন। উল্লেখ্য, যাদের দ্বারা তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন তারা হলেন গ্রিক নাট্যকার ইবসেন এবং স্ক্যান্ডিনেভিয়ান নাট্যকার স্ট্রিন্ডবার্গ।
১৯১৬ সালে তার একাঙ্কিকা ‘বাউন্ড ইস্ট ফর ক্যাটিফ’(Bound East for Cadiff) মঞ্চসফল নাটক হিসেবে প্রশংসা পেলে তারপর তাঁর আরও দুটি নাটক ‘দ্য লং ভয়েজেস’(The Long Voyage, ১৯১৭) এবং ‘দ্য মুন অভ দ্য ক্যারিবিস’ (The Moon of the Caribbees, ১৯১৮) সাফল্য অর্জন করে। ১৯১৮ সালে তার দ্বিতীয় বিয়ে হয় একজন গল্প লেখিকার সাথে। দুই সন্তানের জন্মের পর এই দ্বিতীয় বিয়েও ভেঙে যায়। ১৯২০ সালে তিনি ‘বিয়ন্ড দ্য হরাইজন’ (Beyond the Horizon) নাটকের জন্য প্রথমবার পুলিৎজার পুরস্কার পান। ১৯২২ সালে তিনি দ্বিতীয়বার এই পুরস্কার পান ‘অ্যানা ক্রিস্টি’ (Anna Christie)নাটকের জন্য এবং পুনরায় একই পুরস্কার অর্জন করেন ১৯২৮ সালে তাঁর বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক নাটক ‘স্ট্রেঞ্জ ইন্টারলুড’(Strange Interlude)-এর জন্য। চতুর্থবার তার মৃত্যুর পর ‘লং ডেস জার্নি ইনটু নাইট’-এর জন্য তিনি ওই পুরস্কার পেয়েছিলেন।
একের পর এক সাফল্য তাঁকে খ্যাতির শীর্ষে উঠিয়েছিল। তাঁর প্রাচুর্যময় অবস্থায় বিলাসব্যসনের অবারিত সুযোগ তিনি পরিত্যাগ করেছিলেন। সারা জীবনই ছিলেন গৃহহীন। অনেকগুলো মনোরম নিজস্ব আবাস থাকা সত্ত্বেও পথের প্রাচুর্যই ছিল তাঁর জীবনের অমেয়, যেখান থেকে তুলে নিয়েছেন অজস্র অভিজ্ঞতার মণিমুক্তো, যা তাঁকে সমৃদ্ধ করেছে শিল্পীজীবনের গোড়াপত্তনে। ১৯২৮ সালে অভিনেত্রী কার্লোটাকে বিয়ে করে সুখী হয়েছিলেন। এই কার্লোটার সাহায্যেই ডাক্তারের সাইকোথেরাপিতে তিনি ক্রনিক অ্যালকোহলিজম থেকে রেহাই পান। তিনি এসময় তার বিখ্যাত মনস্তাত্ত্বিক নাটক ‘স্ট্রেঞ্জ ইন্টারলুড’(১৯২৮) লিখে ফেলেন। এই নাটকে আমরা দেখি একজন আধুনিক মহিলার ত্রিভুজ প্রেমের গল্প। জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত এই কার্লোটা তাঁর সাথে ছিলেন এবং তাঁকে সাবলীল সখ্য দিয়ে উজ্জীবিত রেখেছিলেন। ও’নিল মনে করতেন এই কার্লোটার জন্যই তিনি তার সৃষ্টিশীল ক্ষমতা এখনও ধরে আছেন। তাঁর জন্যই তিনি ১৯৩০ সালে গ্রিক ইলেক্ট্রা মিথ ব্যবহার করে লিখেন তিন অঙ্কের ট্রিলজি Morning Becomes Electra । এস্কাইলাস-এর ‘ওরেস্তিয়া’ সফোক্লিসের ট্রিলজি ‘ইদিপাস’কে মডেল করে তিনি এই নাটক লিখেছিলেন।
পুলিৎজার পুরস্কার অর্জনকারী নাটকগুলো ছাড়াও তার অনেকগুলো উত্তীর্ণ নাটক রয়েছে। সেগুলির মধ্যে ‘ডিজায়ার আন্ডার দ্য এল্মস’ (Desire Under the Elms, ১৯২৪) নাটকে তিনি নিউ ইংল্যান্ড-এর একটি খামারবাড়ির গল্প বলেছেন ফেড্রা এবং হিপোলিটাস মিথ ব্যবহার করে। বিমাতা ও পুত্রের প্রেমাসক্তি এবং পিতা-পুত্রের দ্বন্দ্বই এ নাটকের মূল বিষয়। ‘দ্য গ্রেট গড বাউন্ড’ (ঞযব মৎবধঃ মড়ফ ইড়ঁহফ, ১৯২৫) নাটকে দেখা যায় একজন ধনী ব্যবসায়ীর অবচেতন মনের উন্মোচন। এটি একটি এক্সপ্রেশনিস্টিক নাটক, যেখানে ও’নিলের নিরীক্ষাধর্মী নাট্যশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়।‘দ্য এমপেরর জনস’(১৯২০) নাটকে আমরা দেখি একজন মানুষ অজানা ভীতির কারণে এবং একধরনের অপরাধ বোধের আড়ালে ক্রমশ নেমে যাচ্ছে মৃত্যুর অতল গহ্বরে। ‘দ্য হেয়ারি এইপ’ The Hairy Ape (১৯২১)-এ ফুটে ওঠে হতাশার নিঃশব্দ ট্র্যাজেডি। ‘ল্যাজারাস লাফ্ড’ (Lazarus Laughed ১৯২৬)-এ জীবন মৃত্যুর দার্শনিক প্রত্যয় ব্যক্ত হয়েছে। ‘দ্য আইসম্যান কামেথ’(রচনা-১৯৩৯, মঞ্চায়ন-১৯৪৬) নাটকে মৃত্যুই মূল বিষয় হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। নাট্যশিল্পী হিসেবে এই নাটকে তাঁর শক্তিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়, যদিও এটি তাঁর একটি পেসিমিস্টিক নাটক। A Moon for the Misbegotten (১৯৪৩) তাঁর অ্যালকোহলিক বিপথগামী ভাই জেমির স্মৃতি নিয়ে রচিত।
Days Without End হলো তাঁর একটি মনস্তাত্ত্বিক মরালিটি নাটক, এ নাটকে ও’নিলের ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ফিরে আসার লক্ষণ রয়েছে। এরপর বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়টাতে তাঁর ভেতরে এক ধরনের নৈরাজ্য ও বন্ধ্যত্ব কাজ করে। এ সময় তাঁর সৃষ্টিশীল কাজকর্ম প্রায়ই বন্ধ থাকে বলতে গেলে। যুদ্ধশেষে অবশ্য তিনি কাজ করার উৎসাহ ফিরে পান এবং উল্লেখযোগ্য নাটকও উপহার দেন। তাঁর শেষ প্রকাশিত নাটক ‘লং ডেস জার্নি ইনটু’মূলত ১৯৪০-৪১ সালে লেখা শেষ হয়। আত্মজৈবনিক এই ট্র্যাজিক নাটক লেখাকালীন বর্ণনা দিয়েছেন কার্লোটা এভাবে: would come out of his study room at the end of a day, gaunt and sometimes weeping. His eyes would be all red and he looked ten years older than when he went in in the morning. কার্লোটা আরো বলেছেন: It nearly killed him to write the play.
নাটকটির লেখার পর পা-ুলিপি একটি মোড়কে ভরে সিলগালা করে ও’নিল এবং বেনেট সার্ফ-এর মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এই মর্মে যে, তার (ও’নিল) মৃত্যুর ২৫ বছর পরে মোড়কটি খোলা হবে। কিন্তু ও’নিলের মৃত্যুর মাত্র দুই বছর পরে কার্লোটা ইয়েল ইউনিভার্সিটি প্রেসকে নাটক প্রকাশের অনুমতি দিয়েছিলেন। স্বামীর ইচ্ছা অমান্য করার পিছনে যুক্তি ছিল যে, এ নাটক যখন প্রকাশিত হচ্ছে তখন এ নাটকের কোনো চরিত্রই আর পৃথিবীতে বেঁচে নেই। নাটকটি ১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সুইডেনে প্রথম মঞ্চস্থ হয়। নাটকটি ও’নিলের মৃত্যুর পর চতুর্থ ও শেষবারের মতো তার জন্য বয়ে এনেছিল পুলিৎজার পুরস্কার। তাঁর জীবনের শেষ কয়েকটি বছর ছিল তাঁর জন্য খুবই কষ্টের। ইউজিন ও’নিল ও তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী অ্যাগনেস বোল্টন (বিয়ে ১৯১৮, বিচ্ছেদ ১৯২৯)-এর কন্যা ওনা ও’নিল (জ.১৯২৫) পৃথিবী বিখ্যাত অভিনেতা চার্লি চ্যাপলিনের সাথে প্রেম করে বিয়ে করছিলেন ১৯৪৩ সালে। ও’নিল-এর ঘোর আপত্তির কারণে এই বিয়ে নিয়ে বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তখন ওনার বয়স মাত্র ১৮ এবং চ্যাপলিনের বয়স ৫৪ বছর। বয়সের এতোটা ফারাক থাকা সত্ত্বেও তারা বিয়ের ব্যাপারে অনড় ছিলেন। ওনা ও’নিল ছিলেন খুব সুন্দরী এবং হাইলি কোয়ালিফাইড। তাঁর চলাফেরা ছিল অনেক উঁচু মহলে। ওনার শৈশব কাটে তার মায়ের সাথে, কারণ, তাঁর পিতা তখন জীবনের নানা জাটিলতায় যন্ত্রণাবিদ্ধ। এই বিয়েতে ও’নিল এতই কষ্ট পেয়েছিলেন যে, বিয়ের পর মেয়ের সঙ্গে আর কোনোদিন যোগাযোগ রাখেননি। ওনা ও’নিল চ্যাপলিনকে এতোটাই ভালোবাসতেন যে, ১৯৭৭ সালে চ্যাপলিনের মৃত্যু পর্যন্ত তাঁর সাথে ছিলেন এবং তাঁদের ঘরে আটটি সন্তানের জন্ম হয়েছিল। ১৯৫০ সালে ইউজিন ও’নিল জুনিয়র (প্রথম স্ত্রীর সন্তান) আত্মহত্যা করলে তিনি কঠিন আঘাত পেয়েছিলেন। ১৯৫৩ সালের ২৭ নভেম্বর একটি হোটেলে এই বিশ্ববরেণ্য নাট্যকারের জীবনাবসান ঘটে। শেষ কথা ছিল-born in a hotel and goddammit-died in one.
ও’নিলের প্রথমদিকের নাটকগুলোতে দেখা যায় দরিদ্র এবং খেটে খাওয়া মানুষের উপস্থিতি। পরবর্তীতে মন্ময় বাস্তবতার (অবসেশন ও সেক্স) ব্যাপারগুলোই মুখ্য হয়ে ওঠে। মূলত বেশি বেশি ফ্রয়েড পাঠ এবং মৃত বাবা-মা-ভাই এর স্মৃতিমন্থনই এই নাটকগুলো লেখার ক্ষেত্রে অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। ও’নিল অঙ্ক ও দৃশ্যে বিভক্ত গতানুগতিক নাট্যবিন্যাসকে মেনে চলেননি। তার ‘স্ট্রেঞ্জ ইন্টারলুড’-এ রয়েছে ৯টা অঙ্ক এবং ‘মর্নিং বিকাম ইলেক্ট্রা’ Morning Becomes Electra মঞ্চায়নে সময় লাগে ৯ ঘণ্টা। প্রাচীন গ্রিক থিয়েটারের মতোই তার নাটকে মুখোশের ব্যবহার দেখা যায়। এছাড়া শেক্সপিয়রীয় মনোলগ এবং গ্রিক কোরাসের ব্যবহার তাঁর নাট্যশৈলীতে এনেছে অভিনবত্ব। গ্রীক পুরাণকে ব্যবহার করেও ও’নিল তাঁর অনেকগুলো নাটকে আধুনিক যুগ যন্ত্রণাকে মনোবিশ্লেষণী প্রক্রিয়ায় বিধৃত করেছেন। আধুনিক মানুষের মনোজগতের উপস্থাপন, প্রতীক ও আলো-আঁধারির মায়া, তাঁর মৌলিক সৃজনপ্রতিভার স্বরূপকে চিহ্নিত করে। আজ একথা অনস্বীকার্য যে, তিনি আমেরিকান নাটকেই শুধু নয়, বিশ্বনাটকের ক্ষেত্রেও এক বিরল ব্যক্তিত্ব, যিনি চোখের জলে ও বুকের বেদনায় লিখে গেছেন অনেকগুলো কালজয়ী নাটক। তাঁর নাটকের বিয়োাগান্ত পরিণতি তার পিতাকে ভাবিত করেছিল। এক সাক্ষাৎকারে ও’নিল বলেছিলেন- সুখের নাটক অবশ্যই লিখব, যদি কখনও সুখের দেখা পাই।