image
অদ্বৈত মল্লবর্মণ : প্রতিকৃতি : মসুক হেলাল

অদ্বৈত মল্লবর্মণ

দারিদ্র্য যাঁকে করেছে মহান

হোসেন আবদুল মান্নান

মাত্র ৩৭ বছর বয়সে জীবনাবসানেরপাঁচ বছর পর প্রকাশিত উপন্যাস ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ তাঁকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসে।কলকাতার মাসিক মোহাম্মদীতে প্রথম ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় ‘তিতাস একটি নদীর নাম’। লেখকের অকাল প্রয়াণের পর ১৯৫৬ সালে পুঁথিঘর থেকে উপন্যাস আকারে প্রকাশিত হয়। আয়ুষ্কালে জনপ্রিয়তা অর্জন করা হয়নি। অন্তত যতটুকু গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল তাঁর তা-ও তিনি পাননি। অবশ্য এর জন্য তাঁর ব্যক্তিগত প্রবণতাকেই দায়ী করেছে অনেক বিশ্লেষক ও সমালোচক। কারণ তিনি নিজে ছিলেন আত্মমগ্ন, মিতভাষী, স্বেচ্ছানির্বাসিত প্রায় আড়ালে থাকা এক মহৎপ্রাণ নিভৃতচারী।

উপন্যাসটি পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার আগে একাধিক প্রকাশকের দ্বারস্থ হতে হয়েছিল অদ্বৈতকে। মৃত্যুর পূর্বে তিতাসের পা-ুলিপি তুলে দিয়েছিলেন পুঁথিঘরের কর্ণধার শ্রী সুবোধ চৌধুরীর হাতে। পা-ুলিপি হাতে নিয়ে সুবোধ বাবু বলেছিলেন, “মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখেছেন, ‘পদ্মা নদীর মাঝি’, মানুষ কি তোমার বই পড়বে?” তার উত্তরে অদ্বৈত বলেছিলেন, “সুবোধদা, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বড় আর্টিস্ট, মাস্টার আর্টিস্ট, কিন্তু বাউনের পোলা রোমান্টিক। আর আমি তো জাওলার পোলা।” (‘খাঁটি সোনা তাই ভেঙে গেল’, সুবোধ চৌধুরী, চতুর্থ দুনিয়া, ১৯৯৪)।

দুই.

উপন্যাসটি প্রকাশের পরের এক দশক বলা চলে, পাঠক মহলে তেমন উল্লখযোগ্য সাড়া পাওয়া যায়নি। ১৯৬৩ সালে বিখ্যাত বাঙালি নাট্যজন ও অভিনেতা উৎপল দত্তই একে প্রথম মঞ্চে নিয়ে আসেন। কলকাতার মিনার্ভা থিয়েটারে এর শতরজনী মঞ্চস্থ হলে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে এই কালজয়ী উপন্যাস এবং এর লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মণ। তারও এক দশক পরে ১৯৭৩ সালে স্বনামধন্য চলচ্চিত্রকার ঋত্বিক ঘটক কর্তৃক এর চলচিত্রায়নের মাধ্যমে অদ্বৈত ব্যাপক আলোচিত হতে থাকেন। সে সময় থেকে দুই বাংলায় শুধু নয়, বাংলাভাষী মানুষ এবং বিশ্বব্যাপী এই লেখক তথা উপন্যাসের কাহিনির প্রতি আকৃষ্ট হতে থাকে। অতি সাধারণের জীবনাচারকে অসাধারণভাবে ফুটিয়ে তোলেন লেখক তাঁর নিজের জীবন থেকে নেওয়া নানা তিক্ত অভিজ্ঞতার নিপুণ তুলিতে। জীবনের বাস্তব চিত্রনাট্য রচনায় যে কোনো শিল্পীর কল্পনাকেও হার মানাতে পারে, তিতাস-কাহিনি এর জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। তাই উপন্যাসটি বাংলা সাহিত্যে শুধু নয়, বিশ্বসাহিত্যে স্থান পাওয়ার উপযোগী এক অনবদ্য রচনা। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক কল্পনা বর্ধনের ইংরেজি অনুবাদ করেন ‘A River Called Titas’ নামে। পেঙ্গুইন এটি প্রকাশ করেছিল ১৯৯২ সালে। উপন্যাসটি পৃথিবীর অন্যান্য ভাষায়ও অনূদিত হয়েছে। বলা যায়, বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যে রচিত নদীকেন্দ্রিক উপন্যাসগুলোর মধ্যে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসেই সবচেয়ে প্রামাণিকভাবে এবং সার্থকভাবে ফুটে উঠেছে নদী আশ্রিত মানুষের জীবন-মরণ ও তাদের পূর্বপুরুষের অবিকল সংস্কৃতি। নিজের যথার্থ পরিচয় দেওয়ার অসাধারণ সক্ষমতাই এই উপন্যাসের মূল ভিত এবং সত্য কাহিনির প্রধান চালিকাশক্তি।

তিন.

সাঁইত্রিশ বছরের কঠোর দারিদ্র্যপীড়িতজীবন পেয়েছিলেন অদ্বৈত। তাঁর মাথার ওপর ছিল সবসময় নিঃস্ব, অসহায় আত্মীয়-স্বজনের চাওয়া-পাওয়ার প্রবল চাপ। সমাজের প্রান্তিকতম অবস্থানে থেকেই চির-লাঞ্ছিত, চিরবঞ্চিত মানুষের যাপিত জীবন নিয়ে রচনা করেছেন এক কালজয়ী কাহিনি। তাঁর তিতাস কাহিনিকে বলা হয় ব্রাত্যজীবনেরএক নিখুঁত মহাকাব্য। দারিদ্র্যের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে অকালে জীবন দান করে যাওয়া এক অপরাজেয়কথাশিল্পীর নামই অদ্বৈত মল্লবর্মণ। জানা যায়, ‘তিতাস একটি নদীর নাম’-এর পা-ুলিপি রচনার কাজ শেষ করতেই নাকি তাঁকে কলকাতার যক্ষ্মা হাসপাতাল থেকে পালিয়ে আসতে হয়েছিল। পাণ্ডুলিপি তৈরি করতে তাঁকে রাতের পর রাত জেগে থাকতে হয়েছিল। ততদিনে মৃত্যুও তাঁকে গ্রাস করে নিয়ে যায় গহীন অন্ধকারের অদৃশ্য ছায়ায়। বলাবাহুল্য, এই উপন্যাসের জন্যে তৈরি করা প্রথম পা-ুলিপিটি পত্রিকার প্রকাশক হারিয়ে ফেলেছিল। আর বর্তমান উপন্যাসটি অদ্বৈতের দ্বিতীয়বার লেখা পা-ুলিপি থেকে প্রকাশিত হয়।

চার.

ছোট্ট জীবনকালে সাহিত্যের সকল অঙ্গনেই তাঁর বিচরণ ছিল। উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, নিবন্ধ, কবিতা, অনুবাদসাহিত্য, লোকসংগ্রহ ইত্যাদি সকল জায়গায় তাঁর একটি স্বতন্ত্র ও নিজস্ব স্টাইল ছিল। অনাহার, অর্ধাহারকে নিত্যসঙ্গী করে সৃষ্টিশীল কাজে নিজেকে মিমগ্ন করে রাখারও বিরল নজির স্থাপন করে যান অদ্বৈত। জীবনকাল সংক্ষিপ্ত হওয়ার কারণে তাঁর সাহিত্যকীর্তি খুব বেশি না হলেও যতটুকু ছিল তা মানুষের প্রাণের স্পন্দনে পূর্ণ ছিল এবং তাঁর ভাষা ও প্রকাশভঙ্গির মৌলিকতায় বলিষ্ঠরূপে পাঠকচিত্তে সহজেই প্রবেশ করতো। অদ্বৈত ১৯৩৪ সালে বিখ্যাত Irving Stone-এর উপন্যাস Lust for life-এর অনুবাদ করেন ‘জীবন তৃষ্ণা’ নামে। যা কলকাতায় সাড়া ফেলেছিল।

‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসের মূল বিষয় হলো, এই নদীর তীরে বসবাসকারী মালো সম্প্রদায়ের মানুষের জীবনের রোজনামচা। তাদের আছে ঘাটে বাঁধা নৌকা, মাটিতে ছড়ানো জাল, উঠানের কোণে গাবের মটকি, চরকি, সুতা কাটার জিনিস, জাল বোনার সরঞ্জাম ইত্যাদি। এইসব নিয়েই মালোদের সংসার। মালোদের লোকায়ত জীবনের একটি পরিপূর্ণ চিত্রও ফুটে ওঠে অদ্বৈতের অনবদ্য কাহিনিতে। উপন্যাসের ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, চরিত্রগুলোর যেসব নাম তিনি দিয়েছেন সেগুলো মনে হয় যেন তার শৈশবের, তার কৈশোরের আপন বন্ধু-বান্ধব, জ্ঞাতিগোষ্ঠী, যেমনÑ গগন মালো, সুবল, কিশোর, অনন্ত, তিলক মাঝি, বাসন্তী,বনমালী ওরা সবাই তার নিকটজন। সবাই রক্তের বাঁধনে আপনজন ছিল বলেই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠেছিল দলিত মানুষের বেঁচে থাকার করুণ সংগ্রাম নিয়ে, জীবনশিল্পীর তুলির স্পর্শে এমন অনন্য এক উপন্যাস রচনা করা। শৈশব কৈশোরে তাদের কাছে নানাভাবে ঋণী ছিলেন অদ্বৈত।

তাই কোনো দিন এদের ভুলে থাকতে পারেননি। জানা যায়, নিজের চিকিৎসা ব্যয়ের সুযোগ নেই তবু মনিঅর্ডার করে পাঁচটি টাকা পাঠিয়ে সাহায্য করেছেন। বলা হয়, তাঁর দেহটা কলকাতার ‘আজাদ’, ‘নবশক্তি’, ‘মোহাম্মদী’ বা ‘দেশ’ পত্রিকার অফিসে থাকলেও মনের চোখ এবং আত্মা সর্বদাই পড়ে থাকতো গোকর্ণঘাটের মালো পাড়ার মানুষের জীবনাচারের ওপর। অদ্বৈতের অনেক গবেষক মনে করেন, ‘মারাত্মক অতীতচারিতা ভুলে থাকতে পারলে তাঁর অকাল প্রয়াণ হতো না’। গবেষকগণ বলেন, অদ্বৈতকে পাঠ করলে দরিদ্রজীবনের একটি মৌলিক দর্শন পাওয়া যায়, আর সে দর্শন হলো, জীবন এবং মৃত্যুর অমোঘ নিয়তি।

পাঁচ.

তিতাস কাহিনিতে ছড়িয়ে আছে তৎকালীন পূর্ববাংলা তথা ত্রিপুরার লোকসংস্কৃতির নানা উপাদান। ধর্ম-কাহিনি ও কল্পকাহিনি শুনে গ্রামের সাধারণ মানুষ বিমোহিত হতো। কাহিনির মাঝেই রয়েছে নয়াকান্দা গ্রামে কিশোর-সুবল-তিলক এসে রাতে বসে ধর্মকথার আসরে। তারা দেহতত্ত্ব, প্রেমতত্ত্ব, গুরুতত্ত্ব ইত্যাদি শুনতে পছন্দ করে। এমন অসংখ্য ছড়া,ধাঁধা, সংগীত, সুর,পালাগানের লোক উপাদানে ভরপুর অদ্বৈতের এই তিতাস আলেখ্য। এতে রয়েছে পাত্রপাত্রীদেরধাঁধা বলার প্রতিযোগিতা যা নিছক আনন্দের জন্যে এমন কাব্যময় ধাঁধার ব্যবস্হা হতো। এসব ধাঁধাও লোকসাহিত্যের আরেকটি অঙ্গ।

উল্লেখযোগ্য যে, দেশভাগের পূর্বে অদ্বৈতের জন্মস্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গোকর্ণঘাট গ্রামের লোকসংস্কৃতির যেসকল কবি, সাধক, বাউল ও পৃষ্ঠপোষক ছিল তারা অধিকাংশই ১৯৪৭ সালে পার্শ্ববর্তী ত্রিপুরায় গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিল। সেখানে ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে বর্ণিত লোকজ উপাদান নিয়ে কাজ হচ্ছে। ত্রিপুরায় বামফ্রন্ট সমর্থিত সরকারের আমলে সেখানে অদ্বৈত মেলা, নাটক, সেমিনার স্কুল কলেজ, পাঠাগার নানাবিধ চর্চা হয়েছে বলে জানা যায়। তাঁরা প্রায় প্রতিবছরই গোকর্ণঘাট গ্রাম সফর করেন। তারা অদ্বৈত মল্লবর্মণকে বাঁচিয়ে রাখতে সরকারিভাবেও কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করে থাকে।এদেশেও অদ্বৈতকে সামান্য কিছু কাজ হয়েছে। অধ্যাপক শান্তনু কায়সার অদ্বৈতর জীবনীকার হিসেবে পরিচিত। তিনি একাধিকবার পুরস্কৃত হয়েছেন।তাঁর প্রচেষ্টায় বাংলা একাডেমিসহ অদ্বৈত চর্চার ক্ষেত্রকে প্রসারিত করে চলেছেন।

ছয়.

পরিশেষে বরেণ্য কথাসাহিত্যেক ও ঔপন্যাসিক বিমল মিত্রের অনুভূতি তুলে ধরা যাক। ১৯৫১ সালের ১৪ এপ্রিল কলকাতার নারকেল ডাঙ্গার ষষ্ঠীতলা লেনের চার তলার ক্ষুদ্র এক অস্বাস্থ্যকর চিলেকোঠায় মাত্র ৩৭ বছর বয়সে অদ্বৈত মল্লবর্মণ পরলোকগমন করেন। তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে বাংলাসাহিত্যের প্রখ্যাতঔপন্যাসিক বিমল মিত্র মন্তব্য করেন, “একটা মর্মান্তিক দুঃসংবাদ শুনে আমার নিজের দুর্ভাগ্যও তার কাছে তুচ্ছ হয়ে গেল।শুনলাম অদ্বৈত মল্লবর্মণ আর নেই। সেই ‘তিতাস একটি নদীর নাম’- এর লেখক। অনেক আর্থিক দুর্গতি আর অনুগত গলগ্রহদের বোঝা শেষপর্যন্ত তাঁকে বাঁচতে দেয়নি। বুঝলাম অদ্বৈত বাবু হয়তো গেলেন, কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একটি অক্ষয় স্বাক্ষর তিনি রেখে গেলেন তাঁর ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ উপন্যাসে। সাহিত্যের বিচারে কোনটা গিলটি আর কোনটা খাঁটি সোনা? তা বেশিরভাগ পাঠকের কাছেই লেখকের জীবদ্দশায় ধরা পড়ে না, ধরা পড়ে আখেরে, আজ এতকাল পরে ধরা পড়েছে অদ্বৈত মল্লবর্মণের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’ সত্যিই ছিল খাঁটি সোনা।” (বিমল মিত্র, এক নম্বর বর্মণ স্ট্রিট, দেশ, সাহিত্য সংখ্যা ১৩৮১)।

সম্প্রতি