ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৪
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের উপন্যাস ‘দি সান অলসো রাইজেস’ আমাকে প্রথম পরিচিত করায়‘লা করিদা’ শব্দটির সাথে। এ নিয়ে আরো জানতে পারি লোরকা ও পিকাসোর কাছ থেকে- একজন বলেছেন কবিতার শব্দে, আরেকজন এঁকেছেন রঙ-রেখায়।
স্পেনের ‘লা করিদা’ দেখার জন্য দ্বিতীয়বার দেশটিতে আসা। স্পেনের কবিতায়, চিত্রকর্মে, লোককাহিনিতে, গানে, নাচে, ছায়াছবি এবং এমনকি রাজনীতিতেও লা করিদা- স্পেনীয় সত্তার এক অংশ। তাহলে এখন দেখা যাক ‘লা করিদা’কী।
‘করিদা’ মানে দৌঁড়, ষাঁড়ের লড়াইকে এখানে সংক্ষেপে বলে ‘লা করিদা’, আর পুরোটা হল ‘করিদা দে থরোস’, বা ষাঁড়ের দৌড়। সত্যি বলতে কি ‘ষাঁড়ের লড়াই’ এর কোন প্রতিশব্দ স্পেনীয় ভাষায় নেই। ব্যাপারটি বেশ মজার মনে হলো।
আর্নেস্ট হেমিংওয়ের কাছ থেকে ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে এতো গল্প শুনেছি যে তা দেখার জন্য ভীষণ আগ্রহ ছিল। স্পেন আসার এ ছিল এক বড় কারণ। পঁচিশের শুরুতে যখন স্পেন আসি, ভাবলাম ষাঁড়ের লড়াই দেখব। কথাটি বলতেই নাবিল ও নাতাশা দুজনেই আপত্তি তুলে বলল, ‘এটি ক্রুয়েল ও আনফেয়ার’। বললাম, ‘হ্যাঁ, আমিও তাই মনে করি। তবে স্পেনীয় ঐতিহ্যের এক বড় নিদর্শন হিসেবে আমি এটি দেখতে চাই। কারণ এটি দেখা ছাড়া স্পেনকে জানা অসম্পূর্ণ থাকবে।’ ব্যাপারটি আর এগোয়নি, কারণ তখন বুল ফাইটিং সিজন ছিল না। ‘লা থেমপোরাদা’ নামে পরিচিত এ সিজনটির সময়কাল এপ্রিল থেকে অক্টোবর। তাই আবার স্পেন আসলাম জুলাইয়ের শেষের দিকে। ভাবলাম এতদিনে নাবিল ও নাতাশার মনোভাবের পরিবর্তন হবে। দেখি তা আগের মতই রয়ে গেছে। বললাম, ‘তোমাদের ষাঁড়ের লড়াই দেখা লাগবে না। তবে আমি দেখলে আশা করি তোমরা আপত্তি করবে না। ষাঁড়ের লড়াইকে আমিও সমর্থন করিনা, তবে তা দেখতে চাই স্পেনীয় সংস্কৃতির এক বড় অংশ হিসেবে।’ তারা সম্মতি দিতেই আমি অনলাইনে টিকিট কেটে নিলাম। বার্সেলোনা থেকে মাদ্রিদ আসতে হলো, কারণ সে শহরে, ও পুরো কাতালুনিয়ায় ষাঁড়ের লড়াই নিষিদ্ধ করা হয়েছে- সেপ্টেম্বর ২০১১ সালে হয়েছে শেষ লড়াই।
লড়াইয়ের দিন বিকেলে এসে পৌঁছলাম মাদ্রিদে। ৪ ঘণ্টা পর রাত রাত ৯টায় শুরু হবে ষাঁড়ের লড়াই। হোটেলে চেক ইন করে নিচের এক রেস্তোরাঁয় ডিনার সেরে নিলাম। এরপর সবাই ঠিক করল ‘পুয়ের্থা দে সল’ যাবে। আমি তাদের সাথে একটু ঘুরে যাব শহরের পূর্ব প্রান্তে বুল ফাইটিং-এর এরেনা ‘লাস ভেনথাস’-এ।
‘পুয়ের্থা দে সল’মাদ্রিদের প্রাণকেন্দ্র। এখানেই অনুভব করা যায় পুরো স্পেনকে। এতদিন ঘুরেছি আন্দালুসিয়া ও কাতালুনিয়া, যদিও এগুলো স্পেনের ভেতরেই, এবারই প্রথম মনে হলো স্পেনে আসলাম। বিকেলের এ সময়টিতে পুরো এলাকা ঢেকে আছে এক জনসমুদ্রে। আন্দালুসিয়ার ফ্ল্যামেনকো নাচ, কাতালুনিয়ার সারদানা নাচ, গিটার-ভায়োলিন-ড্রাম বাজনা, নাচ ও গানের দৃশ্য-শব্দ, আশেপাশে ভাস্কর্য-মনুমেন্ট-ফোয়ারা। আর ছড়ানো আছে অগণিত স্টল, বিক্রি হচ্ছে- পুরনো শিল্পকর্ম, বিভিন্ন দেশ ও সময়ের মুদ্রা, কারুপণ্য, বই, গানের রেকর্ড, ফুল-ফল-খাবার দাবার-পানীয়। মনে হচ্ছে চলছে এক উৎসব।
মেট্রোতেলাস ভেনথাস যেতে লাগবে ২৫ মিনিট। তাই আমি এ উৎসবে সবাইকে রেখে চললাম সেখানে, ষাঁড়ের লড়াই দেখতে।
‘লাস ভেনথাস’কে বলা হয় বুল ফাইটিং ক্যাথেড্রাল, এটি স্পেনে ষাঁড়ের লড়াইয়ের সবচেয়ে বড় এরেনা। এখানে পৌঁছে দেখি আরেক উৎসব- তাতে আরো উত্তেজনা, আরো প্রাণ, আরো আনন্দ। ঢুকতেই স্বাগত জানালো সুন্দর এক মনুমেন্ট। এর আগে আন্দালুসিয়ায় দেখেছি মুদেহার স্থাপত্যের ছড়াছড়ি। ১৯২৯ সালে নির্মিত ‘লাস ভেনথাস’-এর শৈলীতেও রয়েছে এর স্পষ্ট ছাপ।
ভেতরের চওড়া করিডরে ঢুকে দেখি অনেক লোকের আনাগোনা, যদিও ষাঁড়ের লড়াই শুরু হতে এখনো তিন ঘণ্টার মতো বাকি। করিডরের দুই পাশের দেয়ালে বড় বড় ছবি- ম্যাতাদোর ও তাদের প্রিয় ষাঁড়দের, নিচে লেখা তাদের নাম ও লড়াইয়ের সন-তারিখ। ঘুরে ঘুরে দেখতে লাগলাম, মনে হলো ষাঁড়ের লড়াইয়ের এক জাদুঘর। অবশ্য এ বুল রিঙ-এর পেছনেই আছে ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে আলাদা এক জাদুঘর-‘মুজেও থাউরিনো’। ভাবলাম, অনেক সময় আছে, স্পেনীয় কারো সাথে আড্ডা জমাই। স্থানীয় সংস্কৃতি নিয়ে জানার বড় উপায় হলো এখানকার লোকদের সাথে কথা বলা। আর কথা বলা, আড্ডা দেয়ার বড় জায়গা হলো ক্যাফে বা বার।
ফাঁকা দেখে এক তাপাস বারে উঁকি মারতেই আন্তরিক হাসি দিয়ে স্বাগত জানাল এক চমৎকার তরুণ হোজে সানচেজ। বললাম, ‘তোমাদের আজকের স্পেশাল মেনু কী?’ হোসে বলল,‘সার্দিনাস রেবোছাদাস। এটি গ্রিল করা সার্দিন, সাথে হালকা বাটার। তার সাথে ভাল লাগবে স্পেনীয় তাকিলা।’ বললাম,‘ঠিক আছে, স্পেশাল মেনু, নিশ্চয়ই ভালো হবে।’ মাথা নেড়ে হোসে সায় দিয়ে বলল,‘ইউরোপের বাইরে থেকে এসেছ? এ সময় পৃথিবীর বহু জায়গা থেকে লোকজন আসে বুল ফাইট দেখতে।’ বললাম,‘শুধু বুল ফাইট দেখতে আমেরিকা থেকে মাদ্রিদ আসলাম।’ খুব খুশি হয়ে হোসে বলল,‘ইউরোপের বাইরে সবচেয়ে বেশি লোক আসে আমেরিকা থেকে। এর একটি কারণ হতে পারে আর্নেস্ট হেমিংওয়ে, যিনি তাঁর লেখা দিয়ে বুল ফাইট এবং ‘ফিয়েস্তা দে সান ফেরমিন’ উৎসবকে শুধু আমেরিকা নয়, সারা পৃথিবীর কাছে তুলে ধরেছেন। সেজন্য অনেক বুল রিঙে আর্নেস্ট হেমিংওয়ের ভাস্কর্য রাখা আছে।’ বললাম,‘আর একজন আমেরিকানের ভাস্কর্য দেখে এসেছি গ্রানাদার আলহাম্বরায়। তিনি ওয়াশিংটন আরভিং- তাঁর লেখার মাধ্যমে বিশ্বের মানুষ প্রথম জানতে পারে আলহাম্বরাকে।’ হোসে বলল,‘ব্যাপারটি বেশ মজার। দুজন আমেরিকানই স্পেনের দুইটি আইকনের সাথে পৃথিবীকে পরিচিত করিয়েছেন।’ হোজে এরপর জোরে হেসে যোগ করল,‘আমেরিকানরা মার্কেটিং জিনিয়াস। হয়তো এজন্যই এগুলোর প্রচার হয়েছে।’
এরপর হোজে জিজ্ঞেস করল,‘আজ ৩১ শে জুলাই। এ মাসেই ৬ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই হয়ে গেল ‘ফিয়েস্তা দে সান ফেরমিন’ উৎসব। বুল ফাইট যখন তোমার প্রিয়, তুমি নিশ্চয়ই বিশ্বখ্যাত এ উৎসবে যোগ দিয়েছিলে।’ বললাম, ‘দুঃখিত। ইচ্ছে ছিল, কিন্তু যাওয়া হয়নি। মনে হলো এত মানুষের ভিড়ে পরিবার নিয়ে সেখানে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হবে।’ সে একটু বিস্মিত হয়ে বলল,‘তুমি কি পরিবার নিয়ে মাদ্রিদ এসেছ? তাহলে তারা কোথায়?’
বললাম, ‘হ্যাঁ। তবে আমার ছেলেমেয়েরা বুল ফাইট দেখতে চায় না। তারা বলে এটি নিষ্ঠুর এক খেলা।’ হোসে মাথা নেড়ে সায় দিয়ে বলল,‘এখানেও একই ব্যাপার, নিউ জেনারেশান এর বিরুদ্ধে, হাজার বছরের এ ঐতিহ্য কতদিন টিকে থাকবে বলা মুশকিল। তুমি কি খেয়াল করেছ, প্রবেশ পথে ব্যানার নিয়ে অনেকে বুল ফাইট বন্ধ করার দাবি জানাচ্ছে?’ এ রকম কিছু দেখেছি, তবে ভাষা বুঝতে পারিনি। এখন বুঝলাম ব্যাপারটি কী!
তাপাস বার থেকে বের হওয়ার সময় হোজে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলল, ‘তোমার সাথে আলাপ করে বেশ ভাল লাগল। আরো ভালো লাগল স্পেনের সংস্কৃতি নিয়ে তোমার আগ্রহ দেখে।’ আমি বিল দিতে গেলে হোসে বলল, ‘তাপাস এর সাথে এমনিতে পানীয় ফ্রী আসে। আমি তাপাসটিও ফ্রী করে দিলাম। হেমিংওয়ে ও আরভিং এর দেশ থেকে তুমি এসেছ। স্পেনের সংস্কৃতির জন্য তাঁদের অবদান স্মরণ করে তোমাকে এটি আমার উপহার।’ বেশ চমৎকার মানুষ হোজে সানচেজ- তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে গ্যালারিতে ঢুকে গেলাম।
২৫,০০০ ধারণ ক্ষমতার বিরাট স্টেডিয়ামটির কলোসিয়াম এর মতো দেখতে গ্যালারিগুলি কানায় কানায় পূর্ণ। দর্শকদের উল্লাসের সাথে বাদ্যযন্ত্রের শব্দ মিলে তৈরি করেছে উৎসবের এক আবহ। এখনো ঘণ্টাখানেকের মতো সময় আছে। তাই পাশের এক তরুণ ফ্রান্সিককো অর্তেগার সাথে আলাপ জমালাম। শুধু ষাঁড়ের লড়াই দেখার জন্য দ্বিতীয় বারের মতো মাদ্রিদ এসেছি জেনে খুব খুশি হলো।
ঘড়ির কাঁটা ৯টা বাজতেই ট্রাম্পপেট ও ড্রাম বাজনার মাঝে আজকের অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করলেন ‘প্রেসিদেন্তে’, যিনি প্রতিযোগিতার প্রধান বিচারক। এরপর শুরু হলো প্যারেড। ৩টি লাইন সারি বেঁধে এগিয়ে আসল। ফ্রান্সিককো বুঝিয়ে বলল,‘প্রতিটি লাইনের সামনে ‘ম্যাতাদোর’, যিনি ষাঁড় লড়াইয়ের মূল যোদ্ধা। তাকে অনুসরণ করছে ৩ জন সহকর্মী, যাদের বলা হয়‘বেনদেরিয়েরো’, এরপর ঘোড়ায় চড়ে বর্শা হাতে আসছে ‘পিকাদোর’ নামের আরো ২ জন সহকর্মী। এই ১৮ জনই ষাঁড়ের লড়াইয়ে অংশ নেবে। ৩ জন ম্যাতাদোর প্রথমে একে একে ৩ টি, এরপর দ্বিতীয় দফায় আরো ৩টি লড়াইয়ে অংশ নেবেন। তাই মোট লড়াই হবে ৬টি। বাকি বিবরণ লড়াই শুরু হলে বলব।’
এর মধ্যে ১৮ জনের প্যারেডটি ব্যান্ডের বাজনার সাথে সাথে পুরো বুল রিঙ ঘুরে গেল। ম্যাতাদোর ও তার সহকর্মীরা দুহাতে রঙিন আচ্ছাদন উঁচিয়ে দর্শকদের করল অভিবাদন। দর্শকরা হাততালি দিয়ে, শিস মেরে, রুমাল ও স্কার্ফ উড়িয়ে দিল তার জবাব।
এরপর শুরু হলো ষাঁড়ের লড়াইয়ের প্রথম পর্ব। একটি গেট খুলে দিতেই কালো রঙের বিশাল কিন্ত খুব সুন্দর এক ষাঁড় দৌঁড়ে প্রবেশ করল। তার মুখোমুখি হয়ে এক ম্যাতাদোর তুলে ধরলেন তাঁর হাতের ‘কাপোতে’- এ এক আচ্ছাদন, যার বাইরে ম্যাজেন্টা ও ভেতরে হলুদ রঙ। তিনি ষাঁড়টির গতিবিধি, সাহস ও মেজাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করতে লাগলেন। ষাঁড়ের চারদিকে ঘুরে ঘুরে, আর হাতের ‘কাপোতে’ নেড়ে নেড়ে কয়েকবার ষাঁড়ের মুখোমুখি হলেন ম্যাতাদোর। ষাঁড়ের লড়াইয়ের উত্তেজনা, আনন্দ ও ফলাফল মূলত নির্ভর করে ম্যাতাদোর এর সাহস, ক্ষিপ্রতা ও কৌশলের ওপর।
একটু পরে ঘোড়ায় চড়ে আসে ২ জন কর্মী-‘পিকাদোর’ হাতে তাদের ‘পিকা’, যা এক ধরনের বর্শা। ষাঁড়টি তাদের কাছাকাছি আসতেই তারা বর্শা দিয়ে তার কাঁধের পেশীতে আঘাত করে। দুয়েকটি আঘাতের পর পিকাদোররা চলে যায়। বর্শার আঘাতে ষাঁড়টি কিছুটা দূর্বল হতে থাকে, আর তার মাথা কিছুটা ঝুঁকে যায়।
এরপর শুরু হলো ষাঁড়ের লড়াইয়ের দ্বিতীয় পর্ব। ধীরে ধীরে রিঙ এর দিকে হেঁটে আসল ৩ জন কর্মী,‘বেনদেরিয়েরো’- তাদের হাতে দুটি করে কাঁটাযুক্ত রঙিন লাঠি। তারা খুব সাবধানে একে একে কাঁটাগুলো বিদ্ধ করল ষাঁড়টির কাঁধের পেশীতে, যা তাকে আরো দুর্বল করে তোলে।
তৃতীয় পর্ব ষাঁড়ের লড়াইয়ের শেষ পর্ব-‘মুয়ের্তা’- যা নিয়ে আসে সবচেয়ে উত্তেজনাকর মুহূর্ত। ম্যাতাদোর ডান হাতে ধরে রাখেন এক নকল তলোয়ারের ওপর লাল কাপড়ের আচ্ছাদন-‘মুলেথা’- তা দিয়ে ষাঁড়টিকে উত্তেজিত করতে থাকেন। শরীরের অঙ্গভঙ্গি, হাত-পায়ের কাজ, চোখের চাহনি,‘মুলেথা’-র ঢেউয়ের মতো ওঠা-নামা- সব মিলিয়ে ম্যাতাদোর এ সময়ে ষাঁড়ের লড়াইকে পরিণত করেন এক শিল্প-কর্মে। এভাবে চার পাঁচ বার ষাঁড়ের চারপাশে ঘুরার পর তিনি নকল তরবারী বদল করে স্টিলের সত্যিকার তরবারী হাতে নেন। এসময় মুখোমুখি তারা শুধু দুজন- ম্যাতাদোর ও ষাঁড়। কে জিতবে, কে হারবে!
ফ্রান্সিককো বলল, ‘বলতো, কার জিতার সম্ভাবনা বেশি?’ বললাম, ‘এ তো বলার অপেক্ষা রাখে না। মানুষই জিতবে। তাকে জেতানোর জন্য সব বন্দোবস্ত।’ অর্তেগা মাথা নেড়ে একমত হলো আমার সাথে। বলল, ‘অতীতের লড়াইয়ে জেতার সম্ভাবনা মানুষ ও ষাঁড়ের সমানভাবে ছিল। আগে অনেক মানুষ মারা গেছে ষাঁড়ের লড়াইয়ে। লাস ভেনথাস এ ঢোকার সময় দেখনি ‘হোজে কুবেরো’র মনুমেন্ট?’ বললাম, ‘একটি মনুমেন্ট দেখেছি, তবে এটি কার, কী উদ্দেশ্যে নির্মিত ঠিক বুঝতে পারিনি।’ ফ্রান্সিককো বলল,‘তাই হয়। সবাই শুধু লড়াই দেখতে আসে, এর পেছনের গল্প, কাহিনি, ইতিহাস কেউ শোনেনা, দেখেনা। লড়াই শেষ হবার পর আমি তোমাকে মনুমেন্টটি বুঝিয়ে দেখাব। তোমার তাড়া নাই তো?’ বললাম, ‘ঠিক আছে।’ এখানেও ইতিহাস, ষাঁড়ের বা মানুষের!
এ সব আলাপ করতে করতেই দেখি এসে গেল শেষ মুহূর্ত- ম্যাতাদোর হাতে রাখা ‘মুলেথা’-য় ঢেউ তুলল, ষাঁড়টি তা দেখে মুখোমুখি তেড়ে এসে মাথা একটু নিচু করতেই ম্যাতাদোর স্টিলের তরবারি ষাঁড়টির ঘাড়ের মাঝে বিঁধে দিল। ঝিম ধরে রইল ষাঁড়টি, মাত্র ১০ সেকেন্ড দাঁড়াতে পারল, এরপর ঢলে পড়ল। মৃত্যু ত্বরান্বিত করতে একজন একটি ড্যাগার এনে পতিত পশুটির ঘাড়ে ঢুকিয়ে দিল। ষাঁড়টির মৃত্যু নিশ্চিত হতেই ম্যাতাদোর তাঁর তলোয়ার ও মুলেথা উঁচিয়ে ধরে পুরো মাঠ ঘুরল। সাথে সাথে হাজার হাজার মানুষ হাততালি দিয়ে, বাঁশি বাজিয়ে, রুমাল ও স্কার্ফ দুলিয়ে ম্যাতাদোরকে অভিনন্দিত করে, আর প্রকাশ করে তাদের উচ্ছ্বাস। একটি নিরাপরাধ পশুর মৃত্যুতে এত আনন্দ! বুকের কোনায় একটি ব্যথা অনুভব করলাম। বুঝতে পারলাম নাবিল ও নাতাশা কেন ষাঁড়ের লড়াই দেখতে আসেনি।
৩টি ঘোড়া দিয়ে মৃত ষাঁড়টি টেনে নিয়ে যেতেই প্রেসিদেন্তে হাত দিয়ে নির্দেশ দিলেন পরবর্তী লড়াই শুরু করার, সাথে সাথে ট্রাম্পেট বেজে উঠল।
এভাবে পর পর ৬টি লড়াইয়ের পর প্যারেড-ড্রাম-ট্রামপেট-বাঁশি-উল্লাস দিয়ে শেষ হলো আজকের ‘করিদা দে থরোস’।
বাইরে বের হতেই ফ্রান্সিককো নিয়ে গেল এরেনার প্রবেশপথে মনুমেন্টটির সামনে। এর ভিত্তি থেকে অনেক উঁচুতে স্থাপিত ভাস্কর্যটি দেখিয়ে বলল,‘হাতে মুলেতা ধরা মূর্তিটি যার, তার নাম ‘হোসে কুবিরতো সেনছেস’। অনেক সফল ও জনপ্রিয় একজন ম্যাতাদোর ছিলেন, সবাই আদর করে নাম দিয়েছিল ‘এল ইয়েও’। সেদিন ছিল ৩০ আগস্ট ১৯৮৫। কোলমেনার ভিয়েহো শহরের এক বুল রিঙ এ বারলেরো নামের এক ষাঁড়ের সাথে লড়াই করছিলেন এল ইয়েও। মুহূর্তের মধ্যে পেছন থেকে এসে ষাঁড়টি তাঁর হৃৎপি- ফুটো করে দেয়। সাথে সাথে মৃত্যুবরণ করেন এল ইয়েও, মাত্র ২১ বছর বয়সের এক তরুণ। স্পেনের ষাঁড় লড়াইয়ের অনেক ট্র্যাজেডির মধ্যে এটি ছিল একটি। মনুমেন্টে এল ইয়েও এর মূর্তির পেছনেই আছে সে ষাঁড়টির মূর্তি। মনুমেন্টটির পেছনে আছে একটি পাখাওয়ালা মূর্তি, যে কাঁদছে এল ইয়েও এর মৃত্যুতে। সামনে তাঁর মূর্তির নিচে আরো ৩টি ভাস্কর্য- দুজন তাঁকে উৎসাহ দিচ্ছে, পাশে একজন নারী এরেনায় বিক্রি করছে ফুল।’ ফ্রান্সিককোকে জিজ্ঞেস করলাম, “স্পেনের শ্রেষ্ঠ কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার এক বন্ধু ইগনেসিয়াস সাঞ্চেস মেহিয়াস এরকম এক ষাঁড়ের লড়াইয়ে মারা যান। এতে গভীরভাবে ব্যথিত হয়ে কবি লিখেছেন তাঁর ওপর এক কবিতা, কবির সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা- এক অমর শোকগাথা-‘ইগনাসিয়ো সাঞ্চেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপগাথা’। তুমি নিশ্চয়ই পড়েছ।” অর্তেগা ম্লান হেসে বলল,‘কাহিনিটি জানি, তবে কবিতাটি পড়া হয়নি।’ বললাম, ‘তাহলে কবিতাটির কিছু অংশ তোমাকে অনুবাদ করে শোনাই।’
আমি দেখব না!
ডাকো, চাঁদ আসুক,
দেখতে চাই না আমি বালির ওপরে
ইগনাসিয়োর রক্তধারা।
আমি দেখব না!
ব্যাপ্ত খোলা চাঁদ।
নিশ্চল মেঘের ঘোড়া, আর
উইলোঝোপের ঘের দেয়া
স্বপ্নের ধুমল ষাঁড়লড়াইয়ের রিঙ
আমি দেখব না!
স্মৃতি ধুঁইয়ে তুলুক আগুন!
অমন নি-িন্ন শুভ্রতার জন্যে
সাবধান করে দাও জুঁইফুলদের!
আমি দেখব না!।২
লাস ভেনথাস-র রিঙে যেন দেখতে পাচ্ছি ইগনাসিয়োর রক্তধারা, সাথে শুনতে পাচ্ছি তাঁর জন্য লোরকারর নীরব কান্না।
Ref:
১. আর্নেস্ট হেমিংওয়েতাঁর ১৯২৬ সালে প্রকাশিত প্রথম উপন্যাস The sun Also Rises’এবং ১৯৩২ সালে ষাঁড়ের লড়াই নিয়ে প্রকাশিত গ্রন্থ Death in the Afternoon’ দিয়ে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে এনেছেন স্পেনের ষাঁড়ের লড়াই। সেই সাথে বিখ্যাত করেছেন ‘ফিয়েস্তা দে সান ফেরমিন’ উৎসব যা অনুষ্ঠিত হয় স্পেনের উত্তরাঞ্চলের ‘প্যামপ্লোনা’ শহরে প্রতি বছরের ৬ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত। ৬ জুলাই সিটি হলে হাজার হাজার মানুষের আনন্দ ও উল্লাসের মাঝে একটি ‘চুপিনাসো’, অর্থাৎ হাউইবাজি উড়িয়ে উৎসবের সূচনা করা হয়। শ্যাম্পেনের কর্ক খোলা ও তা ছড়িয়ে দেয়ার শব্দ ও সুবাসে সবদিক ভরে উঠে। পরদিন সান্তা ফেরমিন এর ১৫ শতাব্দীর মূর্তি নিয়ে হয় এক মিছিল, সাথে থাকেন প্যামপ্লোনার বিশপ ও মেয়র, মাঝে গায়কদল, নৃত্যশিল্পী, বাদ্যদল, আর চারপাশে উৎফুল্ল দর্শকের সারি। সব মিলিয়ে তৈরি হয় পবিত্রতা, ঐতিহ্য, সঙ্গীত ও ঐক্যের এক অপূর্ব পরিবেশ। ৪০০ বছরের পুরনো ‘ফিয়েস্তা দে সান ফেরমিন’-এর সবচেয়ে উত্তেজনাকর অংশ হলো ‘এনসিয়েরা’-ষাঁড়ের দৌড়। লাল-সাদা পোশাক পরা বহু মানুষের ষাঁড়ের সাথে দৌড়ানো, আর তা দেখে হাজার হাজার দর্শকের উত্তেজনা ও উৎফুল্লতা- এ এক অনন্য দৃশ্য, যা দেখতে পুরো পৃথিবী থেকে এখানে জমায়েত হয় ১০ লক্ষের বেশি লোক। উৎসবের ১০ দিনের প্রতিদিন সকাল ৮টায় শুরু হয় ‘এনসিয়েরা’- ষাঁড়ের দৌড়, আর রাতে চলে ‘করিদা দে থরোস-- ষাঁড়ের লড়াই। প্রতি রাতে চলে কনসার্ট ও বিভিন্ন প্রদর্শনী। ১৪ জুলাই মধ্যরাত্রিতে সিটি হলে হাজার হাজার মানুষের যৌথ সঙ্গীত পবরে দে মি এর মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শেষ হয়। এ সময় সবাই তাদের লাল স্কার্ফ খুলে ফেলে। এরপর চলে আতশবাজির উৎসব।
২. La sangre derramada: খুন: অনুবাদ: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।