image
সাদ কামালী

গণিকাদের স্মৃতি রহু চণ্ডাল অথবা জয়েস সুবিমলের অরিজিনালিটি

সাদ কামালীর ‘নির্বাচিত উপন্যাসের নতুন পাঠ’-অনুধ্যান

আনোয়ার মল্লিক

কোনো একক পরিচয়ে সাদ কামালীকে শনাক্ত করতে হলে তাঁর কথাসাহিত্যিক পরিচয়ই সম্ভবত মুখ্য হয়ে উঠবে। তবে কথাসাহিত্যিক বললেও তাঁর পরিচয়ের অস্পষ্টতা দূর হয় না। কথাসাহিত্যের দুই বাহু- উপন্যাস এবং ছোটগল্প; সাদ কামালীর উভয় বাহুই প্রায় সমান। এরকম ক্ষেত্রে লেখকের যে কোনো একটা পরিচয় প্রধান হয়ে ওঠে। সেক্ষেত্রে সাদ কামালীর ‘গল্পকার’ পরিচিতির পাল্লাটাই অধিকতর ভারি। তাঁর কাজের আরেকটি জগৎ রবীন্দ্র-গবেষণা। রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে তাঁর গবেষণার যে মান এবং পরিমাণ, সন্দেহাতীতভাবে তিনি একজন বরেণ্য রবীন্দ্র গবেষকের আসন পেতে পারেন। তাঁর কাজের বৈচিত্র্যের আরেকটি উদাহরণ হলো, কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়েও তিনি গবেষণামূলক পুস্তক রচনা করেছেন।

সাদ কামালীর পড়াশোনার ব্যাপ্তি সাহিত্যের বহু বিচিত্র আঙিনাজুড়ে বিস্তৃত। এবং তাঁর লেখায় ছড়িয়ে থাকে বিচিত্র পাঠের অমীয় নির্যাস। তাঁর পঠনের পরিম-ল শুধু বাংলা সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বসাহিতের গভীরে ডুব দিয়ে তিনি ডুবুরির মতো তুলে আনেন মূল্যবান সব মণিমাণিক্য। আমাদের আলোচ্য গ্রন্থ সাদ কামালীর “গণিকাদের স্মৃতি রহু চ-াল অথবা জয়েস সুবিমলের অরিজিনালিটি : নির্বাচিত উপন্যাসের নতুন পাঠ”। বইটি ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ থেকে প্রকাশিত হয়।

এই পুস্তকে সাদ কামালীর দশটি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। প্রবন্ধগুলোর মধ্যে আটটি হলো বাংলা এবং বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী আটজন কথাসাহিত্যিকের নির্বাচিত গল্প-উপন্যাসের পাঠ পর্যালোচনা। তবে সাদ কামালী গতানুগতিক কোনো পাঠ প্রতিক্রিয়া লেখেননি। প্রত্যেক উপন্যাসের একেবারে গভীরে ঢুকে ভিন্নতর দৃষ্টির তির্যক আলো ফেলে তারপর তিনি উপন্যাসের চরিত্র এবং ঘটনা প্রবাহ ব্যাখ্যা করেন। অবশিষ্ট দুইটি প্রবন্ধের একটি অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেনের ‘রবীন্দ্রনাথের উপন্যাস চেতনালোক ও শিল্পলোক’ গ্রন্থের প্রথম পর্বে উল্লিখিত তিনটি উপন্যাস (করুণা, বউ-ঠাকুরাণীর হাট ও রাজর্ষী)। সাদ কামালী প্রাবন্ধিকের আলোচনার ওপর নিজের বক্তব্য তুলে ধরেছেন। এই গ্রন্থের সর্বশেষ প্রবন্ধের শিরোনাম ‘সুবিমলের অরিজিনালিটি’- কথাসাহিত্যিক সুবিমল মিশ্রের ‘হারান মাঝির বিধবা বৌয়ের মড়া বা সোনার গান্ধীমূর্তি’ গল্পের একটি পাঠ বিশ্লেষণ। বিশ্বসাহিত্যের যে দু’টি উপন্যাস নিয়ে এই গ্রন্থে বিশ্লেষণ করা হয়েছে, তার একটি গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একেবারে শেষ জীবনের লেখা, ‘আমার স্মৃতির দুঃখী গণিকারা’ (২০০৭) এবং আরেকটি ওয়ার্ল্ড ক্ল্যাসিক হিসেবে বিশ্বে বিপুলভাবে সমাদৃত, জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’। আলোচ্য গ্রন্থে সাদ কামালীর অনুপম গদ্যশৈলীর পরিচয় পাওয়া যায়।

প্রবন্ধ পর্যালোচনার প্রচলিত ফরম্যাটের বাইরে গিয়ে ব্যতিক্রমী এবং বলা যায় নিজস্ব এক ঢংয়ে তাঁর বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন। এক সাক্ষাৎকারে নতুন এই ফরম্যাটকে তিনি বলেছেন গল্প-প্রবন্ধ, এবং বলা যায় অনেকটা তাঁর হাতেই সাহিত্য আলোচনার নতুন এই ধারাটি পরিপুষ্ট হয়েছে। এই গ্রন্থে তাঁর প্রবহমান গদ্যভঙ্গির একটা বৈশিষ্ট্য হলো- তাঁর পাঠ ভাবনার পরিপূর্ণ নির্যাস পেতে লেখাটা আদ্যোপান্ত পড়ে যেতে হয়। পাঠ শেষে পাঠক নতুন এক ভাবনায় তাড়িত হন।

গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের নাম ‘বাজিকর গোষ্ঠীর পর্যটন অথবা শাশ্বত মানবের যাত্রা রহু চ-ালের হাড় উপন্যাসের পাঠ।’ বেদে জনগোষ্ঠীর একটি প্রধান উপশাখা বাজিকরদের জীবন নিয়ে ঔপন্যাসিক অভিজিৎ সেন ১৯৮৫ সালে ‘রহু চ-ালের হাড়’ উপন্যাসটি রচনা করেন। প্রাবন্ধিক সাদ কামালী একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার দুইজন গবেষকের কথোপকথনের ভাষ্যে উপন্যাসের বিষয়বস্তু, ঘটনা প্রবাহ ব্যাখ্যা করেছেন। বাজিকর জনগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কোনো আবাস নেই। ঠিকানা এবং জীবিকার খোঁজে এই যাযাবর গোষ্ঠী পথে পথে, নিজ পরগনা, শহর দেশ ছেড়ে দেশান্তরে ঘুরে বেড়ায়। প্রাবন্ধিক সাদ কামালী আমাদের জানাচ্ছেন, রহু চ-ালের হাড় উপন্যাস উত্তরবঙ্গের যাযাবর বাজিকর গোষ্ঠীর জীবন যাপনের কোনো প্রামাণ্য ইতিহাস চিত্র নয়, বরং এই উপন্যাসে উন্মোচিত জীবন কাহিনিতে মানব সমাজ ও সভ্যতার রূপ রূপান্তরের রূপক কাহিনি হয়ে উঠেছে। তিনি যথার্থই বলেছেন, যাযাবর বাজিকর গোষ্ঠীর মহাকাব্যিক পর্যটন শেষ পর্যন্ত মানব গোষ্ঠীরই শাশ্বত পরিভ্রমণ। প্রবন্ধকার ভিন্নতর দৃষ্টি ফেলে উপন্যাসটিকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন। আলোচনা শেষে তিনি এই উপসংহারে এসেছেন, ‘অভিজিৎ সেনের রহু চ-ালের হাড় উপন্যাস সেই কাক্সিক্ষত উপন্যাসের নমুনা যেখানে জীবনের সমগ্রতা প্রতিফলিত হয়; দর্পণে যেমন মানুষের মুখ ভেসে ওঠে আলো ছায়া দাগ গর্ত ও সৌন্দর্য নিয়ে।’

গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধ ‘জনৈক নৈশপ্রহরীর ইউলিসিস অথবা জয়েসীয় ঘোর’। আইরিশ লেখক জেমস জয়েসের লেখার পরিমাণ খুব বেশি নয়। তবে ১৯২২ সালে প্রকাশিত ৭০০ পৃষ্ঠার ‘ইউলিসিস’কে বিবেচনা করা হয়েছে বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠতম উপন্যাস হিসেবে। ইউলিসিস নামটি নেওয়া হয়েছে হোমারের মহাকাব্য ওডিসির প্রধান চরিত্র গ্রিক বীর ইউলিসিস-এর নাম অনুসারে। কিন্তু জেমস জয়েসের ইউলিসিস উপন্যাসের নায়ক লিওপোল্ড ব্লুম কোনো যুদ্ধজয়ী বীর নয়। তিনি অতি সাধারণ এক কর্মচারী যাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। ইহুদি হওয়ার কারণে ক্যাথলিক সমাজে উপেক্ষার স্বীকার হন তিনি। কিন্তু সেই তিনিই স্বপ্ন দেখেন একটি সুন্দর, হাসিখুশি জীবনের। সুন্দর জীবনের স্বপ্ন, কল্পনা এবং লড়াকু আশাবাদই জেমস জয়েসের ‘ইউলিসিস’ উপন্যাসের উপজীব্য। আলোচ্য প্রবন্ধ থেকে আমরা জানতে পারি, জয়েসের একমাত্র গল্পের বই ‘ডাবলিনার্স’ প্রকাশের পরপরই অশ্লীলতার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়। এবং একমাত্র নাটক ‘এক্সাইল’ অশ্লীল এবং জটিলতার কারণে মঞ্চায়নের ক্ষেত্রে বাধাপ্রাপ্ত হয়। জয়েস ডাবলিনে তাঁর সাহিত্য পাঠ ও রচনা রীতির কোনো সমাদর পাননি। ইবসেনের নাটকের ওপর তাঁর লেখা প্রবন্ধ পত্রিকা থেকে প্রত্যাখ্যাত হয়। এভাবে তিনি একা ও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেও কখনো আপোস করেননি। ডাবলিন ছেড়ে ইউরোপের বড় শহরে বসে স্বতন্ত্র আঙ্গিকে সাহিত্যচর্চা করে গেছেন। প্রবন্ধকার যথার্থই বলেছেন, ‘প্রায় শত বছরের পরিক্রমায় তেমন অজান্তেই কখন কবে থেকে জয়েসীয় সাহিত্যের বিভিন্ন কৌশল-রীতি নতুন সাহিত্যিকদের প্রকাশ রীতি আর সাধনা হয়ে উঠেছে কে তার খোঁজ করে।’

দেবেশ রায় কোনো প্রথাগত আখ্যানের রচয়িতা নন। তিনি উপন্যাসে সমাজ, রাষ্ট্র এবং ইতিহাস নগ্নভাবে উন্মুক্ত করেছেন। রাষ্ট্র এবং তাঁর নেপথ্যের মানুষদের কূটচাল, শঠতা, নিষ্ঠুরতা সামনে নিয়ে আসেন। এই সব কথাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে ‘দেবেশ রায়ের উপন্যাস : রাষ্ট্রই মুখ্য চরিত্র’ প্রবন্ধে। ‘যযাতি’ দিয়ে দেবেশ রায়ের উপন্যাসের সূচনা। তারপর ‘মানুষ খুন করে কেন’। দেবেশ রায় এই দুটি উপন্যাসে প্রথাবদ্ধ রীতিই অনুসরণ করেছেন। তবে ‘মফস্বলী বৃত্তান্ত’, ‘সময়-অসময়ের বৃত্তান্ত’, ‘উচ্ছিন্ন উচ্চারণ’- এই উপন্যাসগুলোতে আসল দেবেশ রায়কে পাওয়া যায়। প্রতিবেদন নাম দিয়ে তিনি প্রথাসিদ্ধ রীতির বাইরে তিনটি উপন্যাস লিখেছেন। যথা: শিল্পায়নের প্রতিবেদন, খরার প্রতিবেদন, দাঙ্গার প্রতিবেদন। খরার প্রতিবেদন উপন্যাসে কৃষিনীতি সংক্রান্ত ভারত রাষ্ট্রের হটকারী সিদ্ধান্তের ফলে ১৯৯১-৯২ সালে কর্নাটক, রাজস্থান প্রভৃতি রাজ্য যে ভয়ংকর খরার কবলে পড়ে তাই তুলে ধরা হয়েছে। দাঙ্গার প্রতিবেদন উপন্যাস ১৯৯২ সালে উত্তর ভারতের অযোধ্যায় বাবরি মসজিদ ভাঙ্গাকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট দাঙ্গার ঘটনা নিয়ে লেখা। আলোচ্য প্রবন্ধে সাদ কামালী এই ঘৃণ্য ঘটনার অনুপুঙ্খ বর্ণনা দিয়েছেন। এই উপন্যাসে সরকার, মিডিয়া এবং রাষ্ট্রের অন্যান্য প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মুখোশ খুলে পড়েছে। প্রাবন্ধিক সাদ কামালী দেবেশ রায়ের ব্যতিক্রমী এই সব উপন্যাসে বিধৃত বিষয়বস্তু এবং ঘটনার নির্মোহ বিশ্লেষণ করেছেন।

নবারুণ ভট্টাচার্যের হারবার্ট উপন্যাসটি প্রথম প্রকাশ পায় ১৯৯৩ সালে। উপন্যাসটি সত্তরের দশকের নকশাল আন্দোলনের পরবর্তী সময়কে ভিত্তিভূমি ধরে রচিত। নবারুণ ভট্টাচার্য যে হারবার্টকে সৃষ্টি করেছিলেন তাঁর প্রথম উপন্যাসে (হারবার্ট), সেই হারবার্ট এই মরা হারবার্ট নয়, এই হারবার্ট জীবিত হারবার্টের পারলৌকিক রূপ। নবারুণবাবুর হারবার্ট তিনটি বই বা পত্রিকা অংশত পড়েছিলো। ‘পরলোকের কথা’ বইটি হারবার্ট পুরনো বাক্সের মধ্যে পেয়েছিল যা ১৭১ পাতা থেকে রয়েছে। দাদামশায় বিহারীলাল সরকারের সংগ্রহ থেকে হারবার্ট আরও বই পেয়েছিল, নাম ‘পরলোক রহস্য’। তিন নম্বরটি জরাজীর্ণ ‘নাটমন্দির’ পত্রিকা। এই পত্রিকা থেকে শুধু পড়ে ‘সার্কাসে ভূতের উপদ্রব’ লেখাটি। তো পরলোকের কথা, পরলোকের রহস্য আর ভূতের কাহিনী পর্যন্ত আউট বই পড়া হারবার্ট ‘মৃতের সহিত কথোপকথন’ করে বাজারে আলোচিত হয়ে ওঠে। এখন সে নিজেও পরলোকে বিরাজ করতে পারে, এই পরজীবনে এসে নবারুণ ভট্টাচার্যের সৃষ্টি হারবার্টকে ফিরে দেখে। কলকাতার যৌথ পরিবারের ছেলে হারবার্ট শৈশবেই পিতা মাতাকে হারায়। জ্যাঠাতো ভাই কৃষ্ণের মাধ্যমে নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে তার পরিচয় ঘটে। রাষ্ট্রের নির্মমতায় নকশাল আন্দোলনকে আপাত দমন করা গেলেও, এর আদর্শকে নির্মূল করা যায়নি। ফলে এই আন্দোলনের আগুন কোথায় কীভাবে পুনরায় জ্বলে উঠবে কেউ জানে না। সেটা হতে পারে বিনুর মতো কোনো মানুষের মাধ্যমে অথবা হারবার্টের মতো নিরীহ, উপেক্ষিত কোনো উৎস হতে। এর জন্য প্রয়োজন সময়ের সুপ্ত বারুদে একটু টোকা দেওয়া।

গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের একেবারে শেষ জীবনের লেখা উপন্যাস- ‘আমার স্মৃতির দুঃখী গণিকারা’ (২০০৭)। তখন মার্কেসের বয়স ৭৮ বছর। গ্রন্থের পঞ্চম প্রবন্ধ ‘জনৈক দুঃখী কলামিস্টের স্মৃতিকথন’। উপন্যাসের কাহিনিতে দেখা যায়, পত্রিকার এক বৃদ্ধ রিপোর্টার তার নব্বইতম জন্মদিন একজন কিশোরী কুমারী গণিকার সঙ্গে কাটাতে চান। সেই মোতাবেক দেলগাদিনা নামের এক কুমারী গণিকাও ঠিক হয়। বৃদ্ধ যখন কিশোরী মেয়েটির ঘরে ঢোকেন, ক্ষীণকায় মেয়েটি তখন বাঁকা হয়ে পাশ ফিরে ঘুমাচ্ছিলো। তিনি নিজের শরীরের কাপড় খুলে মেয়েটির পাশে শুয়ে পড়েন এবং তার শরীরে হাত বুলিয়ে দেন। আর কিছুই হয় না। এভাবেই রাত কেটে যায়। প্রতি রাতেই এরকম ঘটনা ঘটতে থাকলো। এবং ধীরে ধীরে কিশোরী মেয়েটির প্রতি বৃদ্ধের এক ধরনের মায়া জন্মে যায়। অথবা একে ভালোবাসাও বলা যায়। এ বিষয়ে প্রবন্ধকারের ব্যাখ্যা হলো: “দেলগাদিনার প্রতি তার প্রেম তাকে যৌনকামনায় শারীরিকভাবে গ্রাস করে না। এ তার পৌরুষহীনতা নয়, কারণ দেলগাদিনার কাছে পৌরুষত্বের পরীক্ষা সে দেয় নি। যে ভালবাসা তার মনে জন্ম নিয়েছে সেটিই তার সুখ ও প্রাপ্তি!” উপন্যাসের মার্কেসের প্রৌঢ় পরিণত বয়সের ভাবনায়- জীবন, প্রেম, ভালোবাসা, ব্যর্থতা, অতীত, স্মৃতির উপলব্ধি একজন নব্বই বছরের রিপোর্টারের জীবন কাহিনীর মধ্যে ফুটিয়ে তুললেন। নব্বই বছরের কথক কলামিস্টের গণিকাদের স্মৃতির ভিতর নিজের জীবন স্মৃতির ছবির ক্রমিক স্কেচ হলেও উপন্যাসটি অতীতমুখী নয়। অতীতকে পায়ের নিচে গুঁজে ভবিষ্যৎমুখী এই রচনা।

“মানিক শশী ডাক্তার অথবা পুতুলনাচের মর্মকথা” শীর্ষক প্রবন্ধে সাদ কামালী মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পুতুল নাচের ইতিকথা’ উপন্যাসের একটি মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ হাজির করেছেন। গ্রাম্য পটভূমিতে মানুষের জটিল সামাজিক সম্পর্ক, প্রেম, বিরহ এবং নিয়তির অমোঘ বন্ধন- এসবই উঠে এসেছে উপন্যাসে। এখানে মানুষের নিজের জীবনের ওপর নিজের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই, সে আসলে অদৃশ্য সুতার টানে পুতুলের মতো পরিস্থিতির শিকার। আলোচ্য প্রবন্ধে লেখক শশী ডাক্তার, কুসুম এবং অন্যান্য চরিত্রের মনোজাগতীয় সম্পর্কের বিভিন্ন দিক ব্যখ্যা করেছেন। রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবারের সঙ্গে মানুষের আন্তঃসম্পর্ক, টানাপোড়েন কোথায় তা বোঝার চেষ্টা করেছেন তিনি। এবং উপন্যাসে বর্ণিত ঘটনা এবং পরিস্থিতির আলোকে জীবনের অন্তর্নিহিত সত্যকে উন্মোচন করেছেন।

শহীদুল জহিরের ‘মুখের দিকে দেখি’ উপন্যাসে ব্যবহৃত পুরান ঢাকার ভূতের গলির লোকাল মুখের ভাষা প্রসঙ্গে প্রাবন্ধিক সাদ কামালী ষাটের দশকের কলকাতার হাংরি জেনারেশনের প্রথাবিরোধী ভাষা ও ভাবনার সাযুজ্য সন্ধান করেছেন “হাংরি অথবা চানমিঞার মুখের দিকে দেখি” প্রবন্ধে। ঔপন্যাসিক শহীদুল জহির বাংলা কথাসাহিত্যের প্রচলিত ফর্ম ভেঙ্গেচুরে নতুন ভাষা এবং আঙ্গিক নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এবং তাঁর এই নীরিক্ষা বাংলা সাহিত্যে বিপুলভাবে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে। প্রবন্ধকারেরও নতুন নিরীক্ষা এবং প্রকরণের প্রতি পক্ষপাতিত্ব রয়েছে। সুতরাং এ সংক্রান্ত উদাহরণ তাঁকে স্বাভাবিকভাবেই আকৃষ্ট করেছে। ঔপন্যাসিক দেবেশ রায় পাশ্চাত্যের সাহিত্য রীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার কণ্ঠস্বর। এই আলোচনায় লেখক তাঁকেও উদ্ধৃত করেছেন। তিনি বলেন, “ভাষার আড়াল, নৈতিকতা ও রুচির সীমানা উপড়ে কটকটে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবেই।”

“রাজনীতির জাগরী নয়, আন্তঃসম্পর্কের আত্মকথন” শীর্ষক প্রবন্ধে লেখক সতীনাথ ভাদুড়ীর ‘জাগরী’ উপন্যাসে বিধৃত একটি পরিবারের চারজন সদস্যের আন্তঃসম্পর্ক ও যন্ত্রণার বয়ান তুলে এনেছেন। সতীনাথ ভাদুড়ী এই উপন্যাসে অত্যন্ত সফলভাবে চৈতন্যপ্রবাহ রীতির প্রয়োগ করেছেন। প্রাবন্ধিক যথার্থই মনে করেন, ‘জাগরী’ প্রকাশ আমাদের কথাসাহিত্যে এক আধুনিক, বিশিষ্ট জাগরণ। প্রবন্ধকার অসম্ভব আবেগ এবং শিল্পকুশলতায় ‘জাগরী’ উপন্যাসের ঘটনা প্রবাহ এবং এর অন্তর্নিহিত সত্যের সন্ধান করেছেন।

এই গ্রন্থের শেষ প্রবন্ধের শিরোনাম “সুবিমলের অরিজিন্যালিটি।” প্রথাবিরোধী কথাসাহিত্যিক সুবিমল মিশ্র সমাজের প্রচল বৈষম্য ও অন্তঃসারশূন্যতাকে নগ্নভাবে চিত্রিত করেছেন তাঁর গল্পে এ্যান্টি উপন্যাসে। তিনি শুধু এখানেই থেমে থাকেননি। গল্পের প্রচলিত ফর্মকে ভেঙে অপ্রচলিত নতুন আঙ্গিকে গল্প বলতে চেয়েছেন। এজন্য তার গল্পকে এন্টি বা বিরুদ্ধ গল্পও বলা হয়েছে। প্রাবন্ধিক সাদ কামালী মনে করেন, বড় সাহিত্যের একটা গুণ হচ্ছে অপূর্বতা, অরিজিনালিটি। গ্রামের ঘোড়ানিমগাছে থাকা গায়ে পোশাকহীন দেখন চাচা প্রচ- কলেরায় যখন গ্রাম উজার হয়ে গিয়েছিল, তখন যুবতী গৃহবধূকে সেবা করে বাঁচিয়ে তোলে। অতঃপর সেই যুবতীর সঙ্গে সহবাসের ইচ্ছা পোষণ করলে, গ্রামের মানুষজন এই পাপের জন্য পাথর নিক্ষেপ করে দেখন চাচাকে হত্যা করে। সুবিমল মিশ্র সমাজের এই বিবেকহীন, সনাতন রূপকে নতুন ফর্মে তুলে ধরেন। সুবিমল মিশ্র একেবারেই ভিন্নস্রোতের একজন ভাষ্যকার। তিনি অনেক গল্প লিখেছেন, লিখেছেন এ্যান্টি উপন্যাস, নাটক, বলেছেন প্রচুর কথা।তাঁর সাহিত্যে হাফকন্সাস মধ্যবিত্তের সমালোচনার সাথে সচেতন, মানবিক ও উন্নত চিন্তার মানুষের উপস্থিতি যেমন আছে তেমন সমাজের সেই সব মানুষ যারা সংখ্যায় অধিক হলেও প্রান্তেই যাদের বাস তাদের উপস্থিতি শুধু ব্যাপক নয়, মুখ্যত তারাই ভরকেন্দ্রে। ’৮২ আগস্টে প্রকাশিত এ্যান্টি উপন্যাস ‘ক্যালকাটা ডেডলাইন’-এর শহর, শহরতলী এমনকি গ্রামেও ইমমর‌্যালিটির ব্যাপক গভীরতার ভেতর ‘হাফকনসাস’ নায়ক সোমপ্রকাশ; ভনিতা, কষ্ট, অন্তর্দ্বন্দ্ব তথাকথিত বিবেকের টানাটানি, অভিনয়, পালিয়ে যাওয়া, অপরাধবোধকেও অভিনয় দিয়ে আড়াল করে রাখায় দক্ষ এবং যৌনতাতাড়িত এই সোমপ্রকাশ সুবিমলের ডিসকোর্স। গল্প নাটক সিনেমা যে আঙ্গিকেরই নির্মাণ হোক এই রচনার কেন্দ্রে সুবিমলের কনসাস শিল্প ও জীবন দর্শন প্রকাশ স্বাতন্ত্র্য এবং অরিজিন্যালিটির প্রশ্নে কোনো মরিচা পড়েনি।

সাদ কামালী গতানুগতিক সাহিত্যপথের যাত্রী নন। আলোচনার জন্য নির্বাচিত গ্রন্থগুলো দেখলেই তা সহজে বোঝা যায়। দুই বাংলার এবং বিশ্বসাহিত্যের প্রথাবিরোধী এবং লিজেন্ডারি কয়েকজন লেখকের কালজয়ী কিছু রচনা তিনি বেছে নিয়েছেন। এবং লেখাগুলোর ভরকেন্দ্রে তিনি ফোকাস করেছেন। মানুষের মনন এবং সমাজ-রাষ্ট্রকে নাড়া দেওয়া বক্তব্য ও ঘটনাবলির মর্মভেদী বিশ্লেষণ করেছেন। তবে তার আলোচনার যে স্টাইল, তাতে একটা অসুবিধা হলো, মূল লেখা পড়া না থাকলে পাঠক খেই হারিয়ে ফেলবে। এবং তার আলোচনার রসাস্বাদন করতে পারবে না। এছাড়া কয়েকটি প্রবন্ধের বক্তব্য আরেকটু স্পষ্ট করা যেতো। এক্ষেত্রে কারও কারও মনে হতে পারে, তিনি লেখকদের লেখক। তাঁর সাহিত্যরুচি বৈচিত্র্যময় এবং ভাষার ওপর রয়েছে ঈর্ষণীয় দখল। ফলে এই আলোচনা গ্রন্থটি বাংলা সাহিত্যে একটি মূল্যবান সংযোজন হয়ে থাকবে বলে আমার বিশ্বাস।

সম্প্রতি