মাসুদুল হক
(পূর্ব প্রকাশের পর)
১০. পরবর্তী আন্দোলন: ১৯৩০-এর দশকের পর ইংরেজি কাব্যধারায় যে বিচিত্র আন্দোলন ও কাব্যপ্রবণতা আত্মপ্রকাশ করে, তা আধুনিকতার বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক রূপকে নতুনতর দৃষ্টিকোণে উপস্থাপন করে। এ সময়ের সাহিত্যিক চর্চা পূর্ববর্তী আধুনিকতাবাদের কাঠামোকে প্রশ্ন করে কখনো তা থেকে সরে এসে, কখনো তা গভীরতর করে ব্যতিক্রমী কাব্যভাষা, আত্মঅন্বেষণ ও বাস্তবতার প্রতি নতুন সংবেদনশীলতার পথ তৈরি করে। এই সময়ের তিনটি উল্লেখযোগ্য কাব্যধারা- ‘Pure Poetry’, ‘The Movement’ এবং ‘Confessional Poetry’-আধুনিকতার ভিন্নতর পরিসর ও কাব্যিক অভিযাত্রাকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
‘Pure Poetry’ মূলত একটি নান্দনিক ও শৈল্পিক মনোভাবকে কেন্দ্র করে গঠিত, যার লক্ষ্য ছিল কবিতাকে রাজনৈতিক বা সামাজিক দায়মুক্ত এক বিশুদ্ধ শৈল্পিক অভিব্যক্তিতে রূপ দেওয়া। এই প্রবণতায় কাব্যিক ভাষা হয়ে ওঠে সংগীতের মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ ও অভ্যন্তরীণ ছন্দে আবিষ্ট। Stéphane Mallarmé I Paul Valéry-এর ফরাসি প্রতীকীবাদী ধারা এ প্রবণতায় গভীর প্রভাব ফেলে। কবিতা এখানে ভাবনাকে নয়, বরং অনুভব ও সৌন্দর্যকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে, যা আধুনিক কবিতার বিমূর্ত রূপ ও ভাষার সংহতিকে জোর দেয়।
‘The Movement’ ১৯৫০-এর দশকে ব্রিটেনে আত্মপ্রকাশ করে এক ধরনের প্রতিক্রিয়াশীল প্রবণতা হিসেবে, যা পূর্ববর্তী আধুনিকতার অতিরঞ্জন, বিমূর্ততা ও কৃত্রিমতার বিরুদ্ধে সরব হয়। Philip Larkin, Kingsley Amis, Donald Davie প্রমুখ কবি এই ধারার প্রধান মুখ। তাঁদের কাব্যে রয়েছে দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা, সংযত আবেগ, প্রাঞ্জল ভাষা এবং ব্যক্তিক ও সামাজিক অভিজ্ঞতার প্রতি একপ্রকার নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গি। লারকিনের কবিতায় যেমন নাগরিক বিষণ্ণতা ও ব্যক্তিমানুষের ক্ষুদ্র আনন্দ-বেদনার সংবেদনশীল চিত্রণ দেখা যায়, তেমনি আমিসের লেখায় রয়েছে স্বভাবিকতা ও বাকচাতুর্যের এক সহজ অথচ প্রখর প্রকাশ। ‘The Movement’ আধুনিকতাকে একধরনের বাস্তবধর্মী মানবতাবাদী চেতনার মধ্যে স্থিত করে।
অন্যদিকে, আমেরিকায় ‘Confessional Poetry’ নামে যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে, তা ছিল আধুনিকতার আত্মবীক্ষণধর্মী রূপের এক সাহসী ও তীব্র প্রকাশ। ১৯৫০ ও ’৬০-এর দশকে Robert Lowell, Sylvia Plath, Anne Sexton, John Berryman প্রমুখ কবি এই ধারার প্রবর্তক ও ধারক। এই কবিতায় আত্মজৈবনিক উপাদান, মানসিক অসুস্থতা, পারিবারিক সংকট, বিষণ্নতা, যৌনতা ও আত্মহত্যার মতো ব্যক্তিগত বিষয় নির্মম সততায় উঠে আসে। Plath-এর Ariel কাব্যগ্রন্থ কিংবা Lowell-এর Life Studies এই ধারার শ্রেষ্ঠ নিদর্শন, যেখানে কবিতার অন্তরঙ্গতা পাঠককে একপ্রকার নৈকট্যের অভিজ্ঞতা দেয়। এই ধারা আধুনিকতার অভ্যন্তরীণ সংকট, আত্মপরিচয়ের টানাপড়েন ও মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণকে প্রকাশ করার এক সাহসী ভাষা তৈরি করে।
এই তিনটি প্রবণতা- ‘Pure Poetry’র বিমূর্ত নান্দনিকতা, ‘The Movement’-এর বাস্তববাদী সংযম ও ‘Confessional Poetry’র ব্যক্তিগত আত্মনির্মমতা- আধুনিক কবিতার জগতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে। তারা প্রত্যেকেই আধুনিকতার মূল আত্মসন্ধানী চেতনার ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরেছে এবং ২০শ শতকের কবিতাকে দিয়েছে এক বহুবর্ণ, বহুধাবিচারী, অথচ গভীরভাবে সংবেদনশীল রূপ। এই বিচিত্র ধারাগুলি মিলে গড়ে তোলে এক জটিল, বহুস্বরিক আধুনিকতা, যেখানে কাব্যিক রূপ, ভাষা ও চিন্তার পরিসর একাধারে প্রসারিত ও নিবিষ্ট হয়।
১১. লিটল ম্যাগাজিন-এর ভূমিকা: লিটল ম্যাগাজিনের ভূমিকা সাহিত্যের ইতিহাসে এক গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত। এগুলো মূলধারার বাইরের সাহিত্যধারাকে জায়গা করে দেওয়ার মধ্য দিয়ে সাহিত্যজগতে এক নবতর দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তি সঞ্চার করেছে। ২০ শতকের সূচনায় বিশেষত ইংরেজি সাহিত্যভুবনে যে ‘লিটল ম্যাগাজিনসের স্বর্ণযুগ’ সূচিত হয়েছিল, তা কেবল একধরনের প্রকাশনার উত্থান ছিল না, বরং এক সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক বিপ্লবের সূচনা ছিল। ‘Poetry’ (শিকাগো, ১৯১২), ‘The Dial’, ‘The Criterion’ (সম্পাদক টি. এস. এলিয়ট), এবং ‘BLAST’ (সম্পাদক উইন্ডহ্যাম লুইস)- এই সাময়িকীগুলো নতুন সাহিত্যিক চিন্তা, শৈলী এবং নন্দনবোধকে কেন্দ্রে এনে সাহিত্যের গতিপথ আমূল পাল্টে দিয়েছিল।
‘Poetry’ ম্যাগাজিনে প্রথম প্রকাশ পায় এজরা পাউন্ড, টি. এস. এলিয়ট, হিল্ডা ডুলিটল (H.D) ও কার্ল স্যান্ডবার্গের মতো কবিদের লেখা। এটি মূলধারার বাইরের আধুনিক কবিদের জন্য একটি মুক্তমঞ্চ হিসেবে কাজ করেছিল। ‘The Dial’ ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয় মার্সেল প্রুস্ত, জেমস জয়েস, গারট্রুড স্টাইন প্রমুখের রচনাবলি, যেগুলো প্রচলিত সাহিত্যরীতিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে এক নতুন ব্যতিক্রমী শিল্প-অভিমুখ নির্দেশ করেছিল। টি. এস. এলিয়ট সম্পাদিত ‘The Criterion’ কেবল সাহিত্য নয়, বরং সংস্কৃতি, রাজনীতি ও ধর্মের অন্তর্নিহিত সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা করত। এখানে এলিয়টের বিখ্যাত কবিতা The Waste Land প্রথম প্রকাশিত হয়, যা আধুনিকতাবাদী কবিতার এক মাইলফলক।
অন্যদিকে, ‘BLAST’ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন এক রূপ- এটি ভরটিসিজম আন্দোলনের মুখপত্র। এর বাণী ছিল সাহসী, চড়া ও চ্যালেঞ্জিং। এতে জেমস জয়েস, গাউন্ট, এবং লুইস নিজেও লিখেছেন। BLAST-এর ভিজ্যুয়াল নকশা, টাইপোগ্রাফি এবং ব্যতিক্রমী গঠন ছিল প্রচলিত সাহিত্য-সাময়িকীর নিয়ম ভাঙার এক কৃতিত্বপূর্ণ উদাহরণ।
এই লিটল ম্যাগাজিনগুলোর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য ছিল- সেগুলো ছিল সম্পূর্ণ স্বাধীন চিন্তার বাহক। বড় প্রকাশনা সংস্থা বা বাজারের চাহিদার মুখাপেক্ষী না হয়ে, সেগুলো সাহিত্যের মৌলিকত্ব ও শিল্পমানকে সর্বাগ্রে স্থান দিয়েছিল। ফলে নতুন, তরুণ ও পরীক্ষামূলক লেখকেরা পেয়েছিলেন নির্ভীকভাবে নিজেদের প্রকাশ করার একটি পলিটিক্যালি এবং আর্টিস্টিক্যালি মুক্ত ক্ষেত্র।
লিটল ম্যাগাজিনের গুরুত্ব শুধু কবিদের সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ ছিল না, কবিদের একটি নির্দিষ্ট সময়কালের সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক মনোভাবকে বহন করেছিল। এই লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক কবিরা ছিল বিদ্রোহের প্রতীক, যাঁরা মূলধারার রুচি ও সংজ্ঞার বিপরীতে দাঁড়িয়ে শিল্পের নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করেছেন। একই সঙ্গে তারা সাহিত্যকে আভ্যন্তরীণ চেতনাগত ও কাঠামোগতভাবে পরিবর্তন করেছেন, যার অভিঘাত আজও বর্তমান।
অতএব, ‘লিটল ম্যাগাজিন’ একটি ছোট উদ্যোগ হলেও, তার সাংস্কৃতিক ও সাহিত্যিক অভিঘাত ছিল অসামান্য। এসব সাময়িকী আধুনিকতার অভিঘাত, শিল্পচেতনার নতুন প্রবাহ এবং স্বকীয় সাহিত্যিক কণ্ঠস্বরের উন্মোচন ঘটিয়ে সাহিত্যের ভূগোলকে অনন্তকালীনভাবে রূপান্তর করেছে। সাহিত্যের ইতিহাসে এই কাগজগুলো অপ্রতিদ্বন্দ্বী আলোকস্তম্ভ হয়ে রয়ে গেছে।
১২. উপসংহার: ওয়েটসের কথায়, “All art is… an endeavor to condense … an image of human perfection,” যা শিল্পের মূল উদ্দেশ্য এবং চিরন্তন প্রকৃতি সম্পর্কে গভীর অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করে। শিল্প, বিশেষ করে কবিতা, মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি এবং চেতনার সর্বোত্তম রূপ আবিষ্কারের চেষ্টা হিসেবে বিবেচিত হয়। ১৯৩০ সালের দিকে, যখন Edmund Wilson “Is Verse a Dzing Technique?” প্রশ্ন করেছিলেন, তখন বহু সাহিত্যিক ও পাঠকের মনে কবিতার ভবিষ্যত নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছিল। শিল্পজগতের দ্রুত পরিবর্তন এবং নতুন মাধ্যমের আগমনের ফলে বহুজন ভাবতেন, হয়তো কবিতা তার প্রাসঙ্গিকতা হারাচ্ছে। তবে, এই প্রথাগত ধারার বিপরীতে আধুনিক কবিতা যে শুধু টিকে আছে তা নয়, বরং তা যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ক্রমাগত পরিবর্তিত ও সমৃদ্ধ হচ্ছে। আধুনিক কবিতায় আমরা দেখতে পাই বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বহুমাত্রিক ভাবনা এবং সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের প্রতিফলন, যা তাকে শুধু বৈচিত্র্যময়ই করে না, বরং তাকে অধিক গভীর ও অর্থবহও করে তোলে। ভাষার সীমাবদ্ধতাকে পার করে নতুন রূপ ও অর্থে কবিতা মানুষের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক জটিলতাগুলো প্রকাশে সক্ষম হয়েছে। আধুনিক কবিতার এই বহুমুখী গতি ও বিকাশ প্রমাণ করে যে, শিল্প শুধু একটি মৃতশিল্প নয়, বরং জীবন্ত, শ্বাস-প্রশ্বাস নেওয়া ও প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত এক জগৎ। তাই বলা যায়, কবিতা আজও তার পূর্ণ সম্ভাবনা নিয়ে বিকাশমান এবং এটি ভবিষ্যতের শিল্পচর্চায় এক অনিবার্য ও অপরিহার্য অংশ হয়ে থাকবে, যা মানব জীবনের জটিলতা ও সৌন্দর্যের এক অভূতপূর্ব চিত্র ফুটিয়ে তুলবে।