মামুন মুস্তাফা
সাতচল্লিশ-উত্তর দেশভাগের পটভূমিতে বাংলাদেশের আধুনিক কবিতাযাত্রার স্বাক্ষরচিহ্নিত কবি হিশেবে পাঁচের দশকের শেষ পালকটিও ঝরে যায় ২০২৩-এর ২৮ ডিসেম্বর। তিনি হলেন কবি ও কথাকার আবুবকর সিদ্দিক। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর গল্প-কবিতা, গণসংগীতসহ সাহিত্যের বেশকিছু বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে তাঁকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছি; কিন্তু আজ বলবো তাঁর কবিতার প্রেম কীভাবে ব্যক্তি আবুবকর সিদ্দিককে ছুঁয়ে গেল?
কাব্যভাষা, বিষয়-প্রকরণ এবং কবিতার শব্দ বিনির্মাণে পঞ্চাশের বিশিষ্ট কবি আবুবকর সিদ্দিক জীবনের শুরু থেকে পিকিংপন্থী বামরাজনীতির প্রত্যক্ষ কর্মী ছিলেন। ফলে আবুবকর সিদ্দিকের কাব্যের ভেতরটা যদিও জীবনানন্দের অনুসারী অঙ্গভূষণে মোড়ানো তথাপি এর বহিরঙ্গ স্পষ্টতই ছিল বিষ্ণু দে-র মানসলোকে উদ্ভাসিত। সুতরাং বাহ্যত তিনি রুদ্র-বলয়ের বিপ্লবী হয়েও ছিলেন ‘জন্মরোমান্টিক’ কবি। এই পরিচয়ের স্বাক্ষর কবির প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘ধবল দুধের স্বরগ্রাম’(১৯৬৯)-এ আমরা পাই।
আমরা জেনেছি শিক্ষক হিশেবে তাঁর পা-িত্যের কথা। শ্রেণিকক্ষে কবির নাটকীয় বাচনভঙ্গি, শারীরিক অভিনয়শৈলী, পাঠদানের গভীরতা শিক্ষার্থীদের মোহাবিষ্ট করে রাখতো। কি ছেলে, কি মেয়ে- সবাই ছিল কবির অনুরক্ত, কবিতে আসক্ত। প্রেম এভাবেই ধরা দেয় কবির কাছে, কবিতায়। জীবনানন্দ দাশের ‘বনলতা সেন’, অমিয় চক্রবর্তীর ‘অতন্দ্রিলা’ কিংবা অনেক পরে এসে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘নীরা’র মতো আবুবকর সিদ্দিক আবিষ্কার করেন কোনো এক ‘শ্রীমতী’কে। তখন কবি তাঁর জন্মভূমি বাগেরহাটে বাস করছেন, শিক্ষকতায় নিয়োজিত বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র মহাবিদ্যালয়ে।
সেই সময়টি ছিল তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং সর্বোপির সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য রক্ষার লড়াই। ওই ষাটের উত্তাল সামাজিক-রাজনৈতিক ডামাডোলে শ্রীমতী পেরিয়ে যায় রেডক্লিফ রেখা। কবি অনুভব করেন ‘গ্যেটের দোজখ’, ‘ভিয়েতকং বাহিনীর নাকে’ ‘সন্তদের গোস্ত পোড়া’ স্বাদ; তবুও শ্রীমতীর কাছে কবির কামনা- “ঐসব জীর্ণ হাড় ঠুকে তুমি/আলো জ¦ালো আরো একবার।” বলেন:
শ্রীমতী তোমার চোখে
অনিহত বিভা আছে
তুমি জানো নাই যাহা
আমি এক নক্ষত্র জলসারাতে
জেনে চলে গেছি।
[শ্রীমতী তোমার চোখে, ধবল দুধের স্বরগ্রাম]
এই ‘শ্রীমতী’ এক ধরনের পরাবাস্তব কুহকী মোহে ধরা দেয় আরও পরে এসে ‘মানুষ তোমার বিক্ষত দিন’ (১৯৮৬) কাব্যে। অধরা কবির রোমান্স ছলকে ওঠে আবুবকর সিদ্দিকের এই কবিতাগ্রন্থে। কাছের লক্ষ্মীকে উৎসর্গ করা এই কাব্যে তারই ভেতরে যেন কবি অধরা মানসপ্রতিমাকে খুঁজে ফিরেছেন! ‘আহা, আমি যদি তোমার কানের কাছে মুখ নিয়ে/সুবিনয় রায়ের মতো বলতে পারতুম, “নব আনন্দে জাগো!”’ (লিয়েন); এটিই এ কাব্যের ‘কোথায় আছো’ কবিতায় মূর্ত হয়ে ওঠে, ‘কোথায় আছো? ঘোরানো সিঁড়ি বেয়ে উঠে যাই,/যেতে যেতে বাতাস ফুরিয়ে যায়। দিনে দিনে/শুকোয় জিরাফ। কোথায় আছো?.../...এই যে বারোমাসী খাটাল, এখানে ছিলে তো,/ কোথায় আছো? এ তো অন্ধ সহবাস!’ এভাবেই নেবুপাতা, ভবিতব্য, অদ্যাখা, তুমি এসো, আমলকী ভয় পায়, ধুলট, আবার যদি দ্যাখা হতো প্রভৃতি কবিতায় ‘শ্রীমতী’র অনিহত বিভাময় চোখ খুঁজে ফেরেন কবি। অবশেষে সেই ‘মোহিনী ঠিকানা’ হারিয়ে কবির দীর্ঘশ^াস কথা কয়:
তুমি বুঝি থাকো ওই ওখানে কুয়াশা
ঘিরে থাকা সকালের নদীর শরীরে!
... ... ...
একটি প্রজন্ম গ্যালো ব্যথাতুর শীতে
তন্ন তন্ন খুঁজে মোহিনী ঠিকানা।
[মোহিনী ঠিকানা, মানুষ তোমার বিক্ষত দিন]
এভাবেই‘মানুষ তোমার বিক্ষত দিন’-এ অধরা বিমূর্ত প্রেম জন্ম দেয় একজন জন্মরোমান্টিক কবির।
বাগেরহাটের প্রথম যৌবনের শিক্ষকতায় এমন মোহিনী ঠিকানা হারিয়ে ফেলেছেন কবি কবিতার পরবাসে। যা আরও গাঢ় হয়ে ধরা দেয় ‘হেমন্তের সোনালতা’ (১৯৮৮) কাব্যে। আয়ুষ্কাল, নিরবধি ও অবিভাজ্য কালবোধ, অস্তিত্বের অনস্বীকার্যতা-অসহায়তা, অবিদীর্ণ ব্রহ্মা- নিখিল বিস্ময়, এই সব মননজটিল রহস্যপ্রাণতার দার্শনিকতায় আচ্ছন্ন হন একজন অন্তর্মনস্ক কবি। তারই সূত্রপাত ‘হেমন্তের সোনালতা’য়। সংসার নামক নাট্যমঞ্চে কবিও তখন পড়ন্ত বেলায় উপনীত। যাপিত জীবনের খোলনলচে পালটে গেছে। সামনে ধূসর শাদা। ওই না পাওয়া সখাই তখন যেন মূর্ত হঠে প্রতিটি মানুষের জীবনে- ‘তোমরা ভুলেই গেছ মল্লিকাদির নাম’-এর মতো:
জন্মজন্মান্তর ভেসে চলে যায় নদী বেঁকে যায়।
পৃথিবীতে ভিন্ন সংসার এসে পড়ে
ভিন্নতর বাসনকোসন,
অন্য নারী শুয়ে থাকে সেগুনপালংকে,
পরপুরুষ পান নেয় হাত বাড়িয়ে।
পাললিক স্তন হতে দুধ পায় শংকরসন্তান,
[ছেদ : হেমন্তের সোনালতা]
কবি এখানে সম্পূর্ণ নিজস্ব চিত্রভাষা তৈরি করেছেন ‘পরপুরুষ পান নেয় হাত বাড়িয়ে’ এই প্রতীক-উপমা ব্যবহারে। এর মাধ্যমে কবি মানুষের বংশবিস্তারের কথাই বলেছেন। দিন বদলের সাথে সাথে পৃথিবীর চেনাজানা অনেক কিছুই লুপ্ত হয়। কিন্তু মানুষের সংসারজীবন রয়ে যায়। সেখানে নতুন অতিথি আসে। পূর্বপুরুষের সেগুনপালংকে এখন ভিন্ন কোনো নারী। লোকায়ত বিশ্বাসে সেও পান দেয়, সে পান হাত বাড়িয়ে পৃথিবীরই উত্তরসন্তান গ্রহণ করে। কবি এই কবিতার ভিতরেই মানুষের আয়ুষ্কাল এবং অবিভাজ্য কালবোধকেই আবিষ্কার করেন, “কদমে কেশর ফুটে গ্যাছে, দেহ নেই, দোলনায়/দোলা লেগে আছে, ভালোলাগা কোথায় হারালো? এই/বাংলার কমলায়ও এরকম রস লেগে ছিলো;/সবারি সময় আসে, দোলনায় লেগে গ্যাছে দোলা।/জলপাইজামবনে জমাতে জমাতে পথখর্চা/কালবায়ু হানা দ্যায়, দোলনার দড়ি কেঁপে ওঠে।”[এ দড়িতে হবে না মসৃণ, হেমন্তের সোনালতা]
পৃথিবী পরে মানুষ তার ধুলোছাপ রেখে যায়। সংসারজীবনে ওটুকুই বুঝি মায়ার বাঁধন। আর ওই মায়ার বাাঁধনই খুঁজতে পড়ন্ত বেলায় কবি হাজির হন দ্বিতীয়বার পশ্চিমবঙ্গ সফরে ১৯৮৮-তে কলকাতা থেকে হুগলী হয়ে বর্ধমান। কী এক অজানা ভীতকর রহস্যে ছুঁয়ে দেখা হয়নি মুরারুই। ‘শ্যামল যাযাবর’ (১৯৯৮) কাব্য তারই কথামালা:
চল্লিশ বছর পর কৈশোরের বর্ধমানে গিয়ে
জানা গেল দুর্গা নেই দুর্গা নেই দুর্গা
নেই আর বর্ধমানে তেঁতুলতলা রোডে।...
... ... ...
অস্থিময়ী কে এক নারী, দুটি চোখে ভূতুড়ে ছায়া;
কেঁপে বলে, দুগ্্গাপিসি? উয়ো তো রহ্তি মুরারাই।
ঝাঁকড়া দানোর মত থাবা গাড়ে সন্ধে। ধামসায়
হেঁড়ে স্বরে : মুরারই...
মুরারই... মুরা...
[মুরারই, শ্যামল যাযাবর]
আমরা ধারণা করতে পারি এই ‘দুর্গা’ই যেন অবশেষে হয়ে ওঠে কবির প্রথম জীবনের ‘শ্রীমতী’। সহযাত্রী সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো এক ‘নীরা’তে নয়; বরং আবুবকর সিদ্দিক ষাটের দশকে হারিয়ে ফেলা তার প্রেমমুরতিকে প্রথম জীবনে ‘শ্রীমতী’, জীবনের মধ্যভাগে এসে দুর্গা এবং পড়ন্ত বেলায় তাকে খুঁজে ফেরেন ‘রাভী’ নামক এক স্রোতস্বিনীর ভেতরে। ‘কবিগণ আজীবন প্রণয়প্রবণ’- সেই প্রেমসত্তার নব আবিষ্কারের নাম রাভী (২০০৮)। বৈশ্বিক মনস্তত্ত্ব যেখানে মানুষের সকল ইন্দ্রিয়কে পণ্যে রূপান্তরিত করেছে; এমনকি বিশ্বব্যাপী পুঁজির আগ্রাসন ও কায়েমী শক্তির ক্ষাত্রদাপটে ক্ষয়িত ব্যক্তিমানস- তখন কবি তাঁর প্রেমমুরতির কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন নবরূপে; তাকে নির্মাণ করেন রতিরমণ প্রাণনার অন্য সংজ্ঞার্থে, কার্যকর যেন এক মধুক্ষরা পরিবেশে। কবির প্রেমপ্রার্থনাও তখন অন্য মন্ত্রে পর্যবসিত:
সূচনার আগেই আমার এ প্রস্থান,
দোষ দিয়ো না। পরিণাম যে পৃথিবীর বাইরে।
নিশিশয্যায় ফিরে এসে দেখবে আমি নেই,
এলোখোঁপা ধরে রেখে তুমি কি খুঁজবে আমায়?
... ... ...
এই ভাল যোগভ্রষ্ট এই খেলাঘর।
নেপথ্যের আঙুলডগায় খেলে গেছি সুতোর পুতুল।
[সুতোর পুতুল : রাভী]
‘রাভী’ কাব্যের কবিতাগুলোতে ক্ষরিত জীবনের সংবাদটি শিল্পগুণে উত্তীর্ণ। আবার এ উচ্চারণে ব্যক্তিগত প্রেম-ইতিহাস কথা বলে এবং তা সমাজব্যবস্থার সকল অনুষঙ্গ মেনেই। এখানে প্রেমের কোনো ক্ষুদ্র অস্তিত্বের জায়গা নেই বরং ক্ল্যাসিক, কুহক ও এপিক স্বর ধ্বনিত হয়। বস্তুত মানুষের মূলীভূত চেতনার মর্মবাণীই জন্মরোমান্টিক কবির প্রেমযাজ্ঞা। জীবন, সময় ও কালের অবক্ষয়কে তুলে আনেন নিরন্তর এ কবি। মূলত মানবাত্মার স্বরূপকে বিচিত্র সম্ভাব্যতায় আরোপ করেন কবি আবুবকর সিদ্দিক। স্মৃতির মেদুরতা, নিখাদ প্রেম, অনুভাব্য দ্যোতনা নিকষিত হেম আর পরাণকথা চিত্রমালায় সাজানো ‘শ্রীমতী’, ‘দুর্গা’ এবং ‘রাভীর উৎসব-আখ্যান:
কেউ জানুক না জানুক তুমি তো জানতে পারছ
এ সন্ধ্যার দীপালোকে বসে এই কবিতা লেখা
শুধু তোমার উদ্দেশে।
কেউ পড়–ক না পড়–ক তুমি তো বুঝতে পারছ
এ কবিতা একদিন নিজের প্রতিটি হরফ মেলে ধরবে
শুধু তোমারই দৃষ্টিপাতের প্রতীক্ষায়॥
ভেন্নাপাতায় শুক্রক্ষীর জমে ওঠে নিঝ্ঝুম শুক্লাপঞ্চমীতে
শুধু তোমারই ডিম্বাণুনিষেকের আশায়।
... ... ...
রাভী! -রা-ভী-! তোমাকে যে নিরমিল আশমানের রব
এ নিখিল জানে শুধু তুমিই জানলে না॥
(রাভী! শুধু তোমার উদ্দেশে: রাভী)
কবি বলেছিলেন, ‘এই পরিণত বয়সে সংসার করতে বাস্তুঘট থেকে দূরে একাকী সন্ন্যাসবাস এও কবিতারই সেবাধর্ম মেনে’। আর তাই ’৪৭-এর দেশভাগ, আর সামাজিক-রাষ্ট্রিক-অর্থনৈতিক সন্ত্রাসে ক্ষতবিক্ষত কাঁটাতার পেরিয়ে যাওয়া ‘শ্রীমতী’র ছায়া পরবর্তীতে ‘দুর্গা’ হয়ে ‘রাভী’তে এসে পড়ন্ত বেলায় ছুঁয়েছিল কি না জন্মরোমান্টিক কবির কবিতাপ্রাণ, আমরা জানতে পারি না। কিন্তু কবির তুমুল যৌবনে ষাটের দশকে রেডক্লিফ রেখা পেরিয়ে যাওয়া তাঁর হারানো প্রেমকে উদ্দেশ্য করেই কী তবে ‘রাভী’ কাব্যের উৎসর্গপত্রে কবি লেখেন:
এই সব কবিতা তোমার পদনখের অঞ্জলিযোগ্য নয়,
তবু জেনো তোমারই শরণার্থী।
যত দূরে থাকো যেখানেই থাকো নাকো
অপাঙ্গে কৃপাকটাক্ষ করো।
এই শব্দরা তোমারই জরায়ুজাত,
অবধ্য ও চিরবংশবদ।
... ... ...
চেষ্টা কোরো শুনবার এদের নিঃশ^াস।
যত দূরে থাকো যেখানেই থাকো নাকো
এই সব অবধ্য কবিতা
তোমারই পদপ্রার্থী পদাবলি জেনো।
অতএব মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও ধ্বংসের পরিণাম ছাপিয়ে যে অজরামর সত্যসারাৎসার দাঁড়িয়ে থাকে গ্রীবা তুলে, সে এক অবিনশ্বর নারী- নাম তার ‘রাভী’। সমকালস্পর্শী শব্দপুঞ্জে উত্তরিত কবি আবুবকর সিদ্দিক সেই ‘রাভী’র ভেতরে আবিষ্কার করেন পূর্ণায়ু প্রেমের সম্ভার- ‘শ্রীমতী’র চোখ, কিংবা ধামসানো প্রকৃতির বিপন্ন মুরারুইয়ের ‘দুর্গা’। অকথিত সেই প্রেম, কবিতার প্রেম।