রাস্কিন বন্ড-এর গল্প
অনুবাদ : ভার্গব বন্দ্যোপাধ্যায়
আজও ডেরায় আমাদের গাছগুলো আছে। পৃথিবীর এই জায়গাটা অদ্ভুত। এখানে গাছ হচ্ছে মানুষের সাথে খাপ খাওয়ানো। হয়তো এখানের একটা পিপুল গাছ কেটে ফেলা হলো, কারণ সেখানে গড়ে উঠবে একটা অট্টালিকা। আর তখনই ঐ বাড়িটির দেয়াল ফুঁড়ে গজিয়ে উঠবে দু’টি পিপুল গাছ। ডেরার বাতাস আর্দ্র, বীজেরা পায় অনুকূল সাহচর্য, শেকড়েরা বাড়তে পারে সচ্ছন্দে। ডেরাডুন উপত্যাকাটি দু’টি পাহাড় শ্রেণির মাঝখানে অবস্থিত। তার একটি উত্তুঙ্গ হিমালয়, আর অপরটি বয়সে প্রবীণ হলেও অপেক্ষাকৃত কম উঁচু শিবালিক পর্বতমালা। কিন্তু ডেরাডুন একটি অতি পুরনো শহর। তাও এটি কখনও রাজপুত বা মোগল স¤্রাটদের অধীনস্ত ছিল না। শহরটি নিজে নিজেই গড়ে উঠেছিল। তবে যখন থেকে এ্যাংলো-ইন্ডিয়ান আর বৃটিশরা এসে এখানে বসবাস করতে শুরু করলো তখন থেকেই শুরু হলো শহরটির উত্তরোত্তর শ্রীবৃদ্ধি। বৃটিশদের গাছের প্রতি একটা বিশেষ প্রীতি আছে। ডেরার পাহাড়শ্রেণি ছিল সাপখোপ আর মশামাছির বসতি। তা সত্ত্বেও তারা কিছুটা হলেও ডেরার মধ্যে ইংল্যান্ডের সবুজ সুন্দর ভূমির সাথে মিল খুঁজে পেল।
উত্তরে নিরাভরণ এবং প্রতিকূল পর্বতশ্রেণি আর তার দক্ষিণে সমতল সমভূমি, শুষ্ক আর ধূলিময়, কিন্তু ডেরা সবুজ শ্যামল। সকালে চলন্ত ট্রেনের জানলা থেকে বাইরে তাকিয়ে দেখি দ্রুত পিছন দিকে ছুটে চলেছে শাল আর শিশু গাছের দল। তাদের সে ছোটার ভঙ্গী রাজকীয়, তাদের পিছনে পিছনে দুলছে লতাগুল্ম আর বাঁশঝাড়, আন্দোলিত হচ্ছে আরণ্যক বনরাজি। সমস্ত বনকে তারা করে তুলেছে তমসাচ্ছন্ন, রহস্যময়। ঐ বনে তখনও জীবিত আছে কিছু সংখ্যক বাঘ, তারা সংখ্যায় নগণ্য। তারা সম্ভবত বেঁচে থাকবে এ বনের চিতল হরিণদের পিছু নিয়ে আর বনের পুকুরের জল পান করে।
আমি বড় হয়ে উঠেছি ডেরাতে। আমার পিতামহ শতাব্দীর প্রান্তে এসে শহরের সীমানার কাছে একটা বাড়ি নির্মাণ করেন। স্বাধীনতার কয়েক বছর পরেই বাড়িটা বিক্রি হয়ে যায়। এখন আমাকে ডেরার কোনো মানুষই চেনে না। কারণ, কুড়ি বছর হ’তে চলল আমি এখানে আসিনা। ছোটবেলার বন্ধুরা সব কোথায় চলে গেছে তার খবরত রাখি না। কিমের সেই ভারতবর্ষ অনেক পাল্টে গেছে। সেই সময়কার শ্লথ গতির ঘোড়া আর উটের গাড়ির চলন্ত সারির পরিবর্তে গ্রান্ড ট্যাঙ্ক রোড এখন হয়েছে শত শত ট্রাকের বিরতিবিহীন মিছিল। ভারত এখনও এমন একটা দেশ যেখানে যেকোনো মানুষ সহজেই হারিয়ে যায়, মুছে যায় সবার স্মৃতি থেকে।
স্টেশন থেকে আমি একটা টোঙ্গা ভাড়া করলাম। আমি একটা ট্যাক্সি বা একটা দ্রুতগামী অটোরিক্সাও নিতে পারতাম (১৯৫০ সালের পূর্বে এর কোনোটাই চলতো না ডেরায়) কিন্তু আমি যেহেতু তীর্থযাত্রীর বেশে এসেছি এখানে তাই একটা টোঙ্গাই ভাড়া করলাম। টোঙ্গাটাকে টানছিল শীর্ণ, হাড় জিরজিরে একটা টাট্টু ঘোড়া, আর সেটা চালাচ্ছিল একজন বৃদ্ধ, ক্ষয়রোগাক্রান্ত মুসলমান। তার পরণে ছিল একটা পুরনো, রংজ¦লা, বিবর্ণ ফতুয়া। স্টেশনের বাইরে তখনও দাঁড়িয়ে ছিল আরও দুটো কিংবা তিনটে টোঙ্গা। চল্লিশের দশকে এখানেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছি কুড়ি থেকে তিরিশটা টোঙ্গা। তখন আমি বোর্ডিং স্কুল থেকে ফিরে এখানেই মিলিত হতাম আমার পিতামহের সাথে। টোঙ্গার যুগ প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। অনেক দিক থেকে এটাকে ভালই বলা যায়। কারণ টাট্টু ঘোড়াগুলোকে প্রচুর খাটানো হয় আর সেই অনুপাতে তাদের যথেষ্ট খাবার দেওয়া হয় না। এর চাকাগুলো তেল দেয়ার অভাবে কিচ্ কিচ্ শব্দ করছে আর সিট থেকে বারবার সরে নিচের দিকে চলে যাচ্ছি আমি। টোঙ্গা আমাকে নিয়ে চলেছিল ডেরার বাজারের ভিতর দিয়ে। এভাবে আস্তে আস্তে, ঠিক যেন চলেছি শামুক গতিতে, আমার ধৈর্যের বাঁধ ভাঙ্গার উপক্রম হয়েছিল। পা দিয়ে নিচের দিকে পতন ঠেকাতে ঠেকাতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলাম। তাই আমি ছোট দিলারাম বাজার আসতেই টোঙ্গাকে ছেড়ে দিলাম।
ঐ জায়গা থেকে হাঁটা শুরু করলাম।
খুব একটা পরিবর্তন হয়নি দিলারাম বাজারের। দোকানগুলো চালাচ্ছে নতুন প্রজন্মের রুটি বিস্কুট প্রস্তুতকারীরা। পুরনো দোকানে এসেছে নতুন নাপিত, নতুন মুদি। কিন্তু দোকানগুলোর চরিত্র বদলায়নি। মুচিরা আগের মতোই আছে অন্ত্যজ, রুটি বানায় মুসলমানেরা আর দর্জিরা সব শিখ সম্প্রদায়ের। ছেলেরা আজও ছাদ থেকে ঘুড়ি ওড়ায়, খালের সিঁড়িতে বসে কাপড় কাচে মেয়েরা। খালটা নেমে এসেছে রাজপুর থেকে তারপর এখানে এসে প্রবেশ করেছে মাটির গভীরে, আবার এক মাইল দূরে গিয়ে উঠে এসেছে উপরে।
দাদুর বাড়ি যেতে আমার এখান থেকে হাঁটতে হবে মাত্র এক ফার্লং পথ। রাস্তাটার পাশে সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইউক্যালিপটাস্, জ্যাকারান্ডা আর অমলতাস গাছ। বাড়ির সীমানার মধ্যে দেখা যায় আম, লিচু আর পেঁপে গাছ। বাগানের পাঁচিলের উপর থেকে উঁকি মারে পয়েনসেশিয়ার লাল পাতাগুলো। প্রত্যেক বাড়ির বারান্দা বেয়ে উপরে উঠেছে বাগানবিলাসের লতা, নিচে মাটিতে দেখা যায় গাঁদা ফুলের ঝাড়। কিছু কিছু ভারতীয় গৃহিণীর নাক উঁচু ভাব আছে। তারা আবার বাগানের পরিবর্তে ভিক্টোরীয় যুগের শৌখিনতা দেখাতে টবে করে পাম গাছ লাগায়। ওখানে বাড়ির সংখ্যা কম, তার বদলে আছে বাংলো যেগুলো নির্মাণ করেছিল বৃটিশ সেনাধ্যক্ষরা, তাদের চাকরি থেকে অবসরের পর। তাছাড়া পুলিশ এবং রেল বিভাগের কর্মকর্তারাও বানিয়েছিল তার মধ্যে কিছু কিছু। ঐসব বাড়ির অধিকাংশের মালিক এখন ভারতীয় ব্যবসায়ী এবং সরকারি কর্মকর্তা।
এখন আমি দাঁড়িয়ে আছি আমার দাদুর বাড়ির সামনে। সামনের দেয়ালটি গেঁথে উঁচু করা হয়েছে, আর সেই ছোট দরজাটা উধাও। বাড়ির ভিতরের চেহারাটা কেমন হয়েছে। কিংবা বাগানটারই বা কি অবস্থা কিছুই বোঝার উপায় নেই। সামনের নামফলকটা বলে দেয়, বাড়িটার বর্তমান মালিকের নাম মেজর জেনারেল মাইগল। ১৯৪৯ সালে যখন দাদু বাড়িটি বিক্রি করেন, তার পর থেকে একাধিক মানুষ ভাগাভাগি করে বাস করে আসছিলেন বাড়িতে।
রাস্তার বিপরীতে একটা লিচুর বাগান। এখন লিচু হবার সময় নয়। তাই কাউকেই বাগানে পাহারা দিতে দেখা গেলো না। লিচু বাগানের ভিতর দিয়ে একটা রাস্তা চলে গেছে উঁচুতে। আমি সেই রাস্তা ধরে কিছুটা গিয়ে আমাদের পুরনো বাড়ির ভিতরটা ভালো করে দেখার চেষ্টা করলাম।
দাদু পাহাড়ের পাদদেশ থেকে গ্রানাইট পাথর আনিয়ে তৈরি করেছিলেন বাড়িটি। এখনও বাড়িটিতে কোনো বয়সের ছাপ পড়েনি। উঠোনটার অস্তিত্ব নেই, কিন্তু বারান্দায় ছায়া দিত যে কাঁঠাল গাছটি, সেটি এখনো আছে। এ গাছে চড়েই আমি কাটিয়ে দিতাম আমার দুপুরগুলো, আমার মাথায় ঘুরতো রাজা রাজড়া আর সব দিকপাল মানুষদের কথা, আর আমার মুখ বেয়ে গড়িয়ে পড়তো আঠালো, পাকা আমের রস। ঐ গাছটার কা-ে ছিল একটা গর্ত। সেই গর্তে আমি রাখতাম আমার ছোট ছুরি, লাট্টু, গুলতি আর নানারকম ব্যাজ ওগুলো পেতাম বাবার টিউনিক থেকে। তিনি যখন ছুটিতে বাড়ি আসতেন, আমি বাবার রয়্যাল এয়ার ফোর্সের টিউনিক থেকে ঐসব ব্যাজ, বোতাম খুলে নিতাম। তার মধ্যে একটা আয়রন ক্রশও ছিল। সেটা আমার দাদু আমাকে দিয়েছিলেন। উনি ওটা পেয়েছিলেন প্রথম মহাযুদ্ধের স্মৃতি হিসেবে। আমি আয়রন ক্রশটা রেখে দিয়েছিলাম, কিন্তু লাট্টু আর গুলতি দিয়ে কি করতাম? অনেক কিছুই বিস্মৃত হই। ওগুলো হয়তো আজও সেইভাবে পড়ে আছে সেই গর্তের ভিতরে, সেদিনের মতোই। বাবার মৃত্যুর পর এই জায়গা ছেড়ে যাবার সময় সেগুলো সব ভুলে রেখে যাই। হঠাৎ আমার মনের ভিতর একটা ইচ্ছা জন্ম নিল, যেন গেট পার হয়ে ভিতরে ঢুকে কাঁঠাল গাছে উঠে নিয়ে আমার ফেলে যাওয়া জিনিসগুলি। আমি যদি তেমনটি করতে যাই, তাহলে ঐ বাড়ির বর্তমান মালিক মেজর জেনারেল (অবসরপ্রাপ্ত) কি ভাববেন। আমি যদি বিনীতভাবে তার কাছে আমার কুড়ি বছর আগে ফেলে যাওয়া গুলতিটা উদ্ধার করার অনুমতি চাই, তাহলে কি আমাকে অনুমতি দেবেন?
একজন বৃদ্ধকে লিচু বাগানের ভিতরের রাস্তা দিয়ে আসতে দেখলাম। তিনি মোটেই একজন মেজর জেনারেল নন বরং একজন দরিদ্র ফেরিওয়ালা। তার মাথায় একটা ছোট টিনের বাক্সো, আর তাই নিয়ে তিনি হাঁটছেন অতি মন্থর গতিতে। আমাকে দেখে তিনি দাঁড়িয়ে পড়ে জিজ্ঞাসা করলেন, আমি কিছু কিনতে চাই কিনা। আমার কিছুই কেনার কথা মনে পড়ছিল না, কিন্তু বৃদ্ধকে বড়ই ক্লান্ত মনে হচ্ছিল, বড়ই ক্লান্ত। মনে মনে ভয় পাচ্ছিলাম, একটু বিশ্রাম না নিলে হয়তো এখনি তিনি অবসন্ন হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়বেন। তাই আমি তাকে তার বিক্রয় সামগ্রী দেখাতে বললাম। তার নিজের পক্ষে তার মাথার বোঝা মাটিতে নামানো সম্ভব ছিল না, তাই তার সাথে ধরাধরি করে দু’জন মিলে তার মাথার বোঝা মাটিতে নামালাম। তার ইচ্ছে, সে তার বাক্সের সব জিনিস আমাকে খুলে দেখায়, মাটিতে ঘাসের ওপর নামিয়ে দেয়। তার বিক্রয় সামগ্রীর মধ্যে ছিল চুড়ি, চিরুনী, জুতোর ফিতে, সেফ্টিপিন, সস্তা মনিহারি সামগ্রী, বোতাম, পমেড, ইলাস্টিক আর গৃহের নানান প্রয়োজনীয় জিনিস।
যখন আমি বলি, আমার বোতামের কোনো প্রয়োজন নেই, কারণ কে আমার বোতাম সেলাই করে দেবে, তিনি তখন আমাকে দেখান সেফ্পিপিন। আমি বলি না, কিন্তু তিনি আমাকে একটার পর একটা জিনিস দেখিয়ে যান, তার কোনোটারই আমার প্রয়োজন নেই বলায় তিনি হতাশ হয়ে পড়েন। আমি তাই শেষকালে কয়েকটা খাম আর চিঠি লেখার প্যাড (তার প্রত্যেকটা পাতায় নীলের উপর লাল গোলাপ আঁকা) কেনার ইচ্ছা প্রকাশ করলাম। একটা এক টাকা দামের ফাউন্টেন পেন, যা থেকে নিশ্চিতভাবেই কালি চোয়াবে, আর কয়েক গজ ইলাস্টিক দিতে বললাম। আমার ধারণাই ছিল না ঐ ইলাস্টিক দিয়ে আমি কি করবো, কিন্তু তিনি আমাকে বোঝালেন, ওগুলো ছাড়া আমার জীবনই অচল।
যেসব জিনিসের আমার কোনো প্রয়োজনই নেই, সেগুলো বুঝিয়ে সুঝিয়ে আমার কাছে বিক্রি করতে গিয়ে তিনি পরিশ্রান্ত হয়ে পড়ছিলেন। তখন তিনি তার ক্লান্তি দূর করার জন্য একটা লিচু গাছের গুড়িতে হেলান দিয়ে বসলেন। আমার নিজেকে কেমন বিচলিত মনে হচ্ছিল, মুহূর্তের জন্য। তিনি কি এখানে আমার পাশে বসে মারা যাবেন? তিনি তার হাতের উপর মাথা রেখে বাঁকা হয়ে বসলেন। আসলে তিনি কিছু কথা বলতে চান।
তিনি বললেন, “আমি খুব ক্লান্ত হুজুর। কিছু মনে করবেন না, আমি এখানে কিছুক্ষণ বসতে চাই”। আমি বললাম, “আপনার যতক্ষণ ইচ্ছে বিশ্রাম করুন। আপনার মাথার বোঝাটা অত্যন্ত ভারী”।
কথা বলতে পেরে তিনি যেন প্রাণ ফিরে পেলেন। বললেন, “যখন আমার বয়েস কম ছিল, তখন এসব বোঝাকে কোনো পাত্তাই দিতাম না। আমি তখন রাজপুর থেকে মুসৌরী পর্যন্ত সাত মাইল পাকদ-ী পথ ধরে হেঁটে চলে যেতে পারতাম, অনায়াসে! আর এখন, স্টেশন থেকে দিলারাম রাজার পর্যন্ত দূরত্ব দুস্তর মনে হয়”।
“স্বাভাবিক। আপনার অনেক বয়েস হয়েছে”। “আমার সত্তর বছর বয়েস হয়েছে, সাহেব”। আপনাকে দেখে বয়সের তুলনায় অনেক শক্ত সমর্থ মনে হয়”। কথা কয়টি বললাম তাকে সন্তুষ্ট করতে। কার্যতঃ তিনি দেখতে ছিলেন দুর্বল এবং ভঙ্গুর। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, “আপনাকে কেউ সাহায্য করার নেই”?
আমাকে সাহায্য করার জন্য একটা কাজের ছেলে ছিল, কিন্তু গত মাসে সে আমার সব টাকাকড়ি চুরি করে নিয়ে দিল্লি পালিয়েছে। আমার মনে হয়, যদি আমার ছেলে বেঁচে থাকতো তাহলে সে আমাকে এই রকম গাধার মতো খাটতে দিত না, বেঁচে থাকার জন্যে‘ সে সাতচল্লিশের দাঙ্গায় নিহত হয়েছে”। “আপনাকে সাহায্য করার জন্য আপনার কি আর কোনো আত্মীয়স্বজন নেই”?
“সবাই আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। দীর্ঘ, সুস্থ জীবন লাভের অভিশাপ এটাই। দীর্ঘায়ুদের বন্ধু, ভালোবাসার মানুষে সবাই চলে যায় তার আগে, একা সে পড়ে থাকে। কিন্তু আমিও যাব, সেদিন বেশি দূরে নয়। এখান থেকে বাজারের দূরত্ব দিন দিনই দীর্ঘায়িত হচ্ছে। প্রস্তরখ-গুলি বড়ই কঠিন। গ্রীষ্মে সূর্যের তাপ দিন দিনই প্রখর হচ্ছে আর শীতের বাতাস হচ্ছে তীব্রতর শীতল। এমনকি একসময়ে এখানে যে গাছগুলো ছিল তার মধ্যে অনেকগুলো বুড়ো হ’তে হ’তে মারা গেছে। আমি তাদেরও আয়ুকে ছাপিয়ে আজও আমি বেঁচে আছি”।
তিনি গাছেদের আয়ুকে ছাপিয়ে বেঁচে আছেন। তিনিও গাছেদের মতো বুড়ো হয়েছেন, বাঁকাচোরা মোচড়ানো। আমার মনে হ’তে লাগলো, তিনি যদি এই ফলের বাগানে শুয়ে ঘুমিয়ে পড়েন, তাহলে তার শরীর থেকে শেকড় বেরিয়ে ভূমিতে প্রবিষ্ট হবে আর উপরে গজিয়ে উঠবে ডালপালা। আমি চোখ বুজলে দেখতে পাই, মাটির উপর দাঁড়িয়ে আছে কালো ফতুয়া পরা একটা জীবন্ত কাকতাড়–য়া।
তিনি আবার তার চোখ দুটো বন্ধ করেন, কিন্তু কথা চালিয়ে যান।
বৃটিশ মেমসাহেবরা গাদা গাদা করে ইলাস্টিক কিনতেন। এখন মেয়েরা শুধু হাতের চুরি আর চুলের ফিতে কেনে, আর ছেলেরা শুধু চিরুনী। আমি কিন্তু যথেষ্ট উপার্জন করতে পারিনা। তার কারণ আমি অনেক দূর পর্যন্ত হাঁটতে পারিনা, সেটা নয়। দিনে আমি কয়টি বাড়িতে পৌঁছতে পারি? দশ কিংবা বারো। কিন্তু কুড়ি বছর আগে আমি দিনে পঞ্চাশটিরও বেশি বাড়িতে মাল বিক্রি করতে পারতাম। পার্থক্য সেখানেই।
“আপনি কি জীবনভর এখানেই বসবাস করে আসছেন”?
“জীবনের অধিকাংশ সময়ই আমার এখানে কেটেছে হুজুর। আমি দেখলাম আমার চোখের সামনে মুসোরী যাবার মোটর রাস্তা তৈরি হতে, আমি দেখলাম সাহেবদের নিজস্ব মোটর গাড়ি আর টাট্টু ঘোড়া চড়তে, আর দেখলাম মেমসাহেবদের নিজস্ব রিক্সায় চলাফেরা করতে। এখানে কোনো সিনেমা হল নির্মিত হবার আগে থেকেই আমি এখানে আছি। যখন প্রিন্স অব ওয়েলকাম ডেরাডুন আসেন, তখনও আমি এখানে...। ওহ্, আমি এখানে আছি বহুকাল, হুজুর। ওই বাড়িটা যখন তৈরি হয়েছে তখনও আমি এখানে ছিলাম”, একথা বলে তিনি আমার দাদুর বাড়ির দিকে থুতনি ঘুরিয়ে নির্দেশ করলেন। “সে প্রায় পঞ্চাশ কিংবা ষাট বছর হবে। আমি ঠিক মনে করতে পারি না। সত্তর বছরের তুলনায় দশ বছর কিছুই না। ওই বাড়ি তৈরি করেন দীর্ঘদেহী লাল শ্মশ্রুম-িত এক সাহেব। তার অনেক পোষা জীবজন্তু ছিল। তার মধ্যে একটা ছিল কচ্ছপ। তার একটা ময়াল সাপও ছিল, আর সেটা একদিন আমার বাক্সের মধ্যে ঢুকে যায়। আমি ভীষণ ভয় পেয়েছিলাম। সাহেব প্রায়ই মালার মতো করে তার গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন সেটাকে। তার স্ত্রী, বৃদ্ধা মেমসাহেব, প্রায়ই আমার কাছ থেকে অনেককিছু কিনতেন‘ তার মধ্যে অনেক ইলাস্টিকও থাকতো। তাদের দু’টো ছেলে ছিল, একজন শিক্ষক, অপরজন চাকরি করতেন রয়্যাল এয়ার ফোর্সে। ঐ বাড়িটা সবসময় ছোট ছোট ছেলেমেয়েতে ভর্তি থাকতো। সুন্দর ফুট্ফুটে সব ছেলেমেয়ে। অনেকদিন হলো তারা কোথায় যে চলে গেছে! কোথাও আর তারা নেই।
আমি তাকে বলিনি, আমিও সেইসব ফুটফুটে ছেলেমেয়েদের একজন; কথাটা হয়তো তিনি বিশ^াস করতেন না। তার স্মৃতিগুলো আর এক জগতের, আর এক কালের, তার সাথে বর্তমানের কোনো শক্ত সেতুবন্ধন নেই।
আমি বললাম, “সে জায়গায় অন্যরা তো এসেছে”। “সত্য, যা হবার তাই হয়েছে। সে ব্যাপারে আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার অভিযোগ হচ্ছে‘ যদি ঈশ^র একথা শোনেন‘আমি শুধু কেন পিছনে প’ড়ে রইলাম”।
তিনি অতি ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে মাটিতে রাখা তার বিবর্ণ টিনের বাক্সের দিকে অবজ্ঞা আর প্রীতি মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাকালেন। আমি তাকে তার মাথার উপর রাখা কাপড়ের বেড়ির উপর বাক্সটাকে রাখতে সাহায্য করলাম। ঐ অবস্থায় শরীর বাঁকিয়ে আমাকে কোনো রকমের অভিবাদন জানাবার সামর্থ্য তার ছিল না। কিন্তু তিনি তার দৃষ্টি দূরের পাহাড়ের দিকে নিবদ্ধ ক’রে কম্পমান পদবিক্ষেপে চলতে লাগলেন, কিন্তু তার চলার অভিমুখ ছিল বিস্ময়করভাবে সোজা।
আমি অবাক বিস্ময়ে ভাবতে লাগলাম, আর কতদিন তিনি বাঁচবেন! হয়তো এক বছর কিংবা দুই, সম্ভবত কয়েক সপ্তাহ বা এক ঘণ্টা। মৃত্যু নয়, এটা হলো একটা জীবনের পরিসমাপ্তি। মৃত্যুর থেকে তিনি অনেক বেশি বৃদ্ধ হয়েছেন, তিনি পারেন শুধু নিদ্রায় নিমগ্ন হতে, তিনি পারেন শুধু ঝরা পাতার মতো বিবর্ণ হয়ে আস্তে আস্তে নেমে আসতে।
আমি ফলের বাগান থেকে বেরিয়ে এলাম। রাস্তার বাঁকে হারিয়ে গেল দাদুর বাড়িটা। আমি আবার পৌঁছে গেলাম খালটার কাছে। ওটা একটা ছোটো কালভার্টের তলা দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। ওখানে ভিড় করে আছে কিছু মেডেনহেয়ার আর সাধারণ ফার্ন। পাহাড়ের উপরের একটি জলধারা থেকে উৎপন্ন হয়ে কুলকুল রবে বয়ে চলেছে। তার সে চলার বেগ হ্রাস পায় যখন সে পাহাড়ের ঢালু ছেড়ে গিয়ে সমতল রাস্তায় পড়ে।
(বাকি অংশ আগামী সংখ্যায় পড়ুন)
অপরাধ ও দুর্নীতি: স্মার্ট ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাই যানজট নিরসনের চাবিকাঠি: আইজিপি