image

ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৫

লোরকার দেশে

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

ষাঁড়ের লড়াই ‘লা করিদা’ গতকাল আমাদের আলাদা করে রেখেছিল দিনের বেশিরভাগ সময়। আজ ঠিক করলাম সবাই একসাথে থাকব, একসাথে দেখব। কোথায় যাওয়া যায় জিজ্ঞেস করতেই নাতাশা বলল,‘আজ আমরা এক মিউজিয়ামে যাব।’ একটু অবাক হলাম, কারণ সেখানে তারা যেতে চায় না। বললাম,‘খুশি হলাম শুনে তোমরা মিউজিয়ামে যেতে চাও। তবে কোনটিতে যাবে? প্যারিসের মতো এত বেশি না হলেও মাদ্রিদে মিউজিয়ামের ছড়াছড়ি।’

যে নামটি শুনলাম‘‘মুসেও দেল প্রাদো’‘ মনে মনে তাই আশা করছিলাম। নাবিল ও নাতাশা দুজনেই আর্ট খুব পছন্দ করে। তাই স্পেনের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত মিউজিয়ামকে যে তারা বেছে নেবে, এ ছিল প্রত্যাশিত।

মিয়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ডের সীমান্তে অবস্থিত গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকাটি আফিমের রাজধানী হিসেবে পরিচিত। তবে মাদ্রিদের গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলটি তার বিপরীত। এখানকার‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অফ আর্ট’ এলাকায় রয়েছে শিল্পকলার ৩টি বিখ্যাত মিউজিয়াম‘ ‘মুসেও দেল প্রাদো, মুসেও দে রেইনা সোফিয়া ও মুসেও থাইসেন-বর্নেমিছা’ এক ত্রিভুজের তিন মাথায়, মাদ্রিদের সবচেয়ে পুরনো বুলভার্ড ‘পাসেও দেল প্রাদো’-র ওপর কাছাকাছি জায়গায় অবস্থিত। সারি সারি গাছের নিবিড় সবুজ, তার সাথে আলো-ছায়া মিলে সেখানে সৃষ্টি হয়েছে সুন্দর এক ক্যানভাস। আর্ট মিউজিয়ামের জন্য এর চেয়ে শৈল্পিক জায়গা আর হয় না।

‘মুসেও দেল প্রাদো’ এর প্রধান প্রবেশ পথ ‘পুয়ের্থা দে ভ্যালাস্কেস’, সেখানে স্থাপিত শিল্পী ‘দিয়েগো দে ভ্যালাস্কেস’-এর মনুমেন্ট। স্পেনের এ মহান শিল্পীকে শ্রদ্ধা জানিয়ে ও তাঁর সাথে ছবি তুলে আমরা মিউজিয়ামে প্রবেশ করলাম।

প্রাদো-র সংগ্রহ বিশাল, সমৃদ্ধ ও বিচিত্র! স্পেনের সেরা ৩ জন শিল্পী‘‘এল গ্রেকো, ভ্যালাস্কেস, গয়া’‘ যাদেরকে বলা হয় ‘হলি ট্রিনিটি অফ স্পেনিস পেইন্টারস’, তাঁদের বিপুল সংগ্রহ রয়েছে ‘মুসেও দেল প্রাদো’তে। আরো রয়েছে ইতালীয় রেনেসাঁর দুই দিকপাল‘ রাফায়েল ও তিতিয়ান‘ এর আঁকা বহু ছবি। তাছাড়া আছে নর্দার্ন আর্ট‘ রুবেনস, দূরের, বস-এর শিল্পকর্ম।

নাবিল ও নাতাশা বেশ কিছু ছবি এর মধ্যে দেখে ফেলেছে। তাদের ধারণা হলো, ‘এখানে পেইন্টিং আছে রিলিজিয়ন, কিং, ওয়ার‘ শুধু এ ৩টি বিষয়ের।’ বললাম, ‘যে সময়ের পেইন্টিং সেখানে এ বিষয়গুলিই প্রধান ছিলো। চিত্রকলায় তো তার সময়ের প্রতিফলন থাকবেই। তাছাড়া স্পেনের রাজা রানিদের ব্যক্তিগত সংগ্রহ দিয়ে এ মিউজিয়মের শুরু‘ তাঁদের পছন্দ অপছন্দ তো এখানে প্রধান।’

এ এক রাজকীয় মিউজিয়ামই বটে। সবদিকে রাজা রানিদের ছবি। তা থাকা স্বাভাবিক, কারণ সে সময়ের বিখ্যাত সব শিল্পীরা রাজ দরবারের শিল্পী ছিলেন, যাদের প্রধান কাজ ছিল রাজা রানীদের ছবি আঁকা। ১৮১৯ সালে স্পেনের রাজা সপ্তম ফার্দিনান্দ রাজকীয় শিল্প সংগ্রহ জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেন।

সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নিলাম বিখ্যাত ১০টি ছবি দেখব। সব জায়গায় নাবিল ও নাতাশা টপ টেন খুঁজে নেয়, যদিও তা আমি খুব একটা পছন্দ করি না। তবে এখানে তাছাড়া কোনো উপায় নেই। সবকিছু ভাসা ভাসা দেখার বদলে কয়েকটি জিনিস গভীরভাবে দেখা ভালো।

সবগুলো দেখে নাতাশা পছন্দ করল ‘ভ্যালাস্কেস’এর আঁকা ‘লাস মিনিয়াস’, আর নাবিল পছন্দ করল গয়া-র আঁকা ‘মাদ্রিদে ১৮০৮ সালের ৩রা মে’।

আমাকে নিয়ে গেল নাতাশা তার প্রিয় ছবি ‘লাস মিনিয়াস’-এর সামনে। সে বর্ণনা শুরু করল:

‘লা মিনিয়াস’ অর্থ হচ্ছে সহচরী। ছবিটি রাজা ৪র্থ ফিলিপ-এর শাসনকালের এক দৃশ্য ও সময়কে তুলে ধরেছে। এটি ‘ভ্যালাস্কেস’এঁকেছিলেন ১৬৫৬ সালে, সেটি ছিল স্পেনের গোল্ডেন এজ। সেই সময় তিনি ছিলেন রাজা ৪র্থ ফিলিপ এর রাজ দরবারের প্রধান শিল্পী। ছবির স্থানটি হচ্ছে মাদ্রিদের রয়েল আলকাসার রাজপ্রাসাদের একটি কক্ষ। ছবির বাঁয়ে দেখা যাচ্ছে শিল্পী ‘ভ্যালাস্কেস’কে তিনি রাজা চতুর্থ ফিলিপ ও রানি মারিয়ানা-র দিকে তাকিয়ে আঁকছেন তাঁদের ছবি। রাজা-রানিকে সরাসরি দেখা যাচ্ছে না, তবে কক্ষের পেছনের আয়নায় দেখা যাচ্ছে তাঁদের প্রতিবিম্ব। কক্ষের মাঝখানে কিশোরী রাজকুমারী মার্গারেট তেরেসা‘ সে জমকালো পোশাকে সজ্জিতা হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে‘ তার পিতা-মাতার ছবি আঁকা হচ্ছে। সহচরীদের একজন তার জন্য পানীয় নিয়ে এসেছে, অন্যজন নতজানু হয়ে তাকে অভিবাদন করছে। রাজ দরবারের দুজন বামন খেলছে এক কুকুরকে নিয়ে। দূরে আলোকিত দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে এক রাজ কর্মচারী‘ উৎসুক হয়ে দেখছে ভেতরে কী হচ্ছে। ডান পাশের জানালা দিয়ে আলো প্রবেশ করে কক্ষের এক পাশ ও সাথে কয়েকজনকে আলোকিত করেছে।

সত্যিই অনন্য সুন্দর এক ছবি ‘লা মিনিয়াস’। নাতাশার পছন্দের তারিফ করে দেখতে গেলাম নাবিলের পছন্দের ছবি।

নাবিল বলল, “আমার পছন্দের ছবি‘‘মাদ্রিদে ১৮০৮ সালের ৩রা মে’। ছবিটির সাথে সম্পর্ক আছে বার্সেলোনায় আমাদের দেখা মনুমেন্টটির‘‘মনুমেন্ত আলস হিরোস দে লা ইনদিপেনদেনসিয়া’‘ ৫ জন কাতালান দেশপ্রেমিকের উদ্দেশ্যে নির্মিত মনুমেন্ট। বার্সেলোনার এ ৫ জন প্রতিবাদ করেছিলেন মাদ্রিদে ফরাসি সৈন্যদের হত্যাকা-ের। মাদ্রিদের নাগরিকরা ফরাসি দখলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৮০৮ সালের ২রা মে। তা দমন করতে ফরাসি সৈন্যরা শত শত মানুষকে ধরে গুলি করে হত্যা করে ২রা মে সারাদিন ও ৩রা মে ভোরবেলা। ফ্রান্সিককো গয়া এই ছবিটিতে বিদ্রোহ ও হত্যাকা-ের দৃশ্যটি এঁকেছেন এর ৬ বছর পরে, ১৮১৪ সালে।”

ছবিটিতে দেখা যাচ্ছে একদল ভয়ার্ত ও বিক্ষুদ্ধ জনতা, যার নেতৃত্বে আছে সাদা শার্ট ও হলুদ প্যান্ট পরা এক তরুণ- প্রতিবাদের এক প্রতিমূর্তি, যার দু’হাত দুদিকে প্রসারিত। ডানপাশে বন্ধুক তাক করা এক ফায়ারিং স্কোয়াড, যাদের শুধু পেছনের দিকটিই দেখা যাচ্ছে। এক লণ্ঠনের উজ্জ্বল আলো এসে পড়েছে আহত ও নিহত জনতার ওপর। দৃশ্যটির পশ্চাৎপট অন্ধকার হয়ে আছে, যেন বিষাদের এক কালো ছায়া ছড়িয়ে পড়ছে সবদিকে।

নাবিল কি চমৎকারভাবে বার্সেলোনায় দেখা এক মনুমেন্টের সাথে মাদ্রিদের ‘মুসেও দে প্রাদো’তে দেখা এক চিত্রকর্মের সম্পর্ক বের করে ফেলল।

‘মুসেও দেল প্রাদো’ থেকে বের হয়ে দেখি শিল্পের আরেক দিকপালের মনুমেন্ট। তিনি হলেন ‘ফ্রান্সিককো দে গয়া’। তাঁর সাথে ছবি তুলে ও তাঁকে শ্রদ্ধা জানিয়ে বের হয়ে আসলাম ‘পাসেও দেল প্রাদো’সড়কে।

ভাবলাম পাশের ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’ দেখে অন্য কোথাও যাবো। নাবিল ও নাতাশা বলল, তারা আগে ‘প্লাসা মেয়র’-এ যাবে, সেখানে লাঞ্চ সেরে পরে যাবে মিউজিয়ামটিতে। সেটি মেনে নিয়ে সেখানে যাবার জন্য টেক্সি নিলাম। আমাদের কথাবার্তা শুনে ড্রাইভার সালাম দিয়ে বললেন,‘আপনারা কি বাঙালি?’ বললাম,‘হ্যাঁ। আমাদের দুজনের জন্ম বাংলাদেশে, আর ছেলে মেয়েদের জন্ম আমেরিকায়, থাকি সেখানে।’ খুব খুশি হয়ে বললেন,‘আমার নাম জাভেদ পারভেজ। দেশী লোকদের সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগল। লাভাপিয়েস গিয়েছেন?’ বললাম, ‘এটা কী?’ বললেন,‘এটি এখানকার বাংলা টাউন। আপনাদের হাতে সময় থাকলে দেখে আসতে পারেন, ভালো লাগবে। তাছাড়া সেখানে বাঙালি খাওয়াও খুব ভাল, খেতে পারেন।’ নাবিল আবার কাচ্চি বিরিয়ানি খুব পছন্দ করে, বলল, ‘সেখানে কি কাচ্চি বিরিয়ানি পাওয়া যাবে?’ তার ত্বরিৎ জবাব,‘অবশ্যই। সবচেয়ে ভাল রেস্টুরেন্টে আমি নামিয়ে দেব।’

টেক্সি থেকে নেমে দেখি সামনে বাংলায় লেখা সাইন বোর্ড‘‘বাংলার খাবার’। ম্যানেজার মিজান চৌধুরী সিলেটের লোক। খুব আন্তরিকতার সাথে ভেতরে নিয়ে বসালেন, হাতে দিলেন মেনু‘ অনেকদিন পর দেখলাম একটি মেনু পুরো বাংলায়‘ ভালোই লাগল। আমি ও ফারজানা কয়েক বছর শ্রীমঙ্গল চা বাগানে ছিলাম শুনে খুশি হলেন। পরে নাবিল ও নাতাশার জন্য অর্ডার দিলাম কাচ্চি বিরিয়ানি, আর আমাদের দুইজনের জন্য ইলিশ মাছ, আলু ভর্তা, ডাল ও সাদা ভাত। একটু পরে মিজান চৌধুরী দেখি হাতে দুইটি বাটি নিয়ে এসে বললেন,‘আমি আপনাদের জন্য সামান্য গিফট নিয়ে এলাম। চিটাগাংয়ের লোক শুটকি পছন্দ করে, তাই নিয়ে আসলাম আপনাদের প্রিয় লইট্টা শুটকি। আর সিলেটের লোকের খুব পছন্দের গরুর মাংসের সাথে সাতকরা।’ বললাম,‘শ্রীমঙ্গলেই সাতকরা প্রথম দেখেছি, প্রথম খেয়েছি। অনেকদিন পর আজ আবার খাব। অনেক ধন্যবাদ।’

লাঞ্চ শেষ হওয়ার পর দেখি মিজান সাহেব হাতে কাঁসার এক বড় থালা নিয়ে এসেছেন। সেখানে সাজানো আছে পান, সুপারি, চুন, খয়ের, কয়েক রকমের জর্দা ও মিষ্টি মসলা। মজা করে বললাম, ‘এ যে দেখি বিয়ে বাড়ির দাওয়াত।’ তিনি বললেন,‘এটি সিলেটের ঐতিহ্য’। উত্তরে বললাম,‘বৃহত্তর সিলেটে ছিলাম ৮ বছর, তাই এ ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত। শ্রীমঙ্গলে জেমস ফিনলে চা বাগানে কাজ করতাম। সেখানে বিখ্যাত বালিশিরা ভ্যালি ক্লাবে বছরের বিভিন্ন সময় পার্টি হতো। থাকতো নাচ, গান, আড্ডা। পোলাও, রেজালা, রোস্ট ইত্যাদির সাথে সার্ভ করা হতো দই, মিষ্টি, ব্রান্ডি, হুইস্কি, এবং সাথে অবশ্যই পান, জর্দা ও মিষ্টি মসলা। যার যা পছন্দ, সেভাবেই তাঁরা খেতেন।’ মিজান চৌধুরী সাহেব হেসে বললেন,‘আপনি হয়তো বহু বছর আগে ছিলেন। এখন সব কিছু বদলে যাচ্ছে।’ বললাম, ‘তাই হবে। তবে অনেকদিন পর পুরনো এ ঐতিহ্য মনে করিয়ে দেয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ। তাছাড়া আপনার রেস্টুরেন্টের দেশি সব খাবার বেশ ভালো লাগল।’ পরে কথায় কথায় বললেন, ‘স্পেনে ৭০ হাজারের উপর বাঙালি আছে। দিন দিন এ সংখ্যা বাড়ছে। কারণ, ইউরোপের অন্যান্য দেশ থেকে বাঙালিরা চলে আসছে স্পেনে। এখানকার সরকার এখন ইমিগ্রেশন উৎসাহিত করছে। কারণ, স্পেনে পর্যটন বিপ্লব ঘটেছে। তাই সার্ভিস সেক্টরে অনেক লোক দরকার। বার্সেলোনায়ও অনেক বাঙালি আছে।’ মিজান সাহেব তাঁর সুন্দর রেস্টুরেন্টটি ঘুরিয়ে দেখালেন। তারপর বেশ আলাপ জমালেন। এর মাঝে তাঁর ষ্টাফ নিয়ে আসল খুব ঘন দুধের কড়া, মিষ্টি চা। সবশেষে বললেন,‘মাদ্রিদে এরপর আসলে আমার বাসায় উঠবেন। আমার ফোন নাম্বার, ঠিকানা দিলাম, রেখে দেবেন। ফোন করলেই এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসব।’ শহীদ জননী জাহানারা ইমামের একটি বিখ্যাত উক্তি মনে পড়ে গেল, ‘বিদেশে বাঙালি মানেই সজ্জন, একথা যেমন সত্যি, তেমনি বাঙালি বিদেশে গিয়েও দলাদলি ভুলতে পারে না, সেটাও সত্যি।’১ এর মধ্যেই প্রথমাংশের সত্যতা আমরা দেখেছি। দ্বিতীয় অংশ নিয়ে মিজান চৌধুরী সাহেবকে প্রশ্ন করতেই উনি সোজা জবাব না দিয়ে তাঁর অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন,‘আপনারা দেখেছেন আমার এখানে পাশাপাশি দুইটি পার্টি হল আছে। আগে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলি এখানে ভাড়া নিত সভা করার জন্য। একই দিন পাশাপাশি সভা হলে উত্তেজনা হতো, দুয়েকবার পুলিশও এসেছিল। এখন একই দিনে দুইটি দলকে সভা করতে দিই না। এক দিন পর বা কয়েকদিন পর তারা মিলিত হয়। শুধুমাত্র একটি দলের সভা হলেও সমস্যা অনেকটা আগের মতোই রয়ে গেছে‘ হৈ চৈ চিৎকার চলতে থাকে। বললাম, ‘আসল কথা হলো, আমরা নদী ভাঙ্গনের দেশের লোক, তাই ভাঙা-গড়া আমাদের মধ্যে একটু বেশি। তবে এর মধ্যেই আমরা এগিয়ে যাচ্ছি।’ কথা আর না বাড়িয়ে মিজান সাহেবকে ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে আসলাম। আমাদের চমৎকার এক সময় কেটেছে ‘বাংলার খাবার’-এ।

এরপর ‘লাভাপিয়েস’ বাংলা টাউন একটু ঘুরে দেখলাম। মনে পড়ে গেল নিউ ইয়র্কের জ্যাকসন হাইটস ও লন্ডনের ব্রিক লেনের বাঙালি পাড়ার দৃশ্য। এদের মধ্যে কি সুন্দর এক মিল আছে। দেখি আরো অনেক রেস্টুরেন্ট, গ্রোসারী স্টোর, ও অন্যান্য ব্যবসা, তার বেশিরভাগের নাম বাংলায় লেখা‘ গ্রাম বাংলা, দেশ রেস্তোরাঁ, ঘরের বাজার, বৈশাখী, শাপলা, হাট বাজার, মেঘনা, প্রবাসী। সামনের চত্বরে একটু কোলাহল‘ কতজন আড্ডা দিচ্ছে, কেউ আনমনে হাঁটছে, আর কেউ তুলছে ছবি। কয়েকটি দোকানের সামনের কাঁচের ওপর লাল সবুজের রঙ‘ এর মাঝে আঁকা আছে বাংলাদেশের পতাকা ও শহিদ মিনার। সব মিলিয়ে মনে হলো এক টুকরো বাংলাদেশ। গর্ব ও আনন্দে মন ভরে গেল।

আবার ফিরে গেলাম গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল অফ আর্ট এলাকায়, এবার ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’ মিউজিয়ামে।

নাবিল ও নাতাশা জানে যে, এ মিউজিয়ামে আছে পিকাসোর বিখ্যাত ছবি ‘গোয়ের্নিকা’। তারা বলল, এটিই শুধু দেখবে, আর কিছু নয়। বললাম, “‘গোয়ের্নিকা’বিখ্যাত ও ভালো ছবি, তাতে সন্দেহ নেই। এ ছাড়াও আরো অনেক ভালো ছবি আছে এ মিউজিয়ামে। বিখ্যাত আরেকজন শিল্পী ‘সালভাদর দালি’, তাঁর ছবিও আছে এখানে, যা আমরা দেখতে পারি। প্যারিসের ‘ল্যুভ মিউজিয়ামের’ বিখ্যাত ছবি‘মোনালিসা’। আরো অনেক ভালো শিল্পকর্ম সে মিউজিয়ামে আছে। সেসব না দেখে শুধু ‘মোনালিসা’ দেখে ল্যুভ থেকে চলে আসাটা কি ঠিক?”

১০ সেপ্টেম্বর ১৯৯২ সালে ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’ মিউজিয়ামের উদ্বোধন করা হয়।‘রেইনা সোফিয়া’, অর্থাৎরাণী সোফিয়া-র নামে এর নামকরণ। তিনি ১৯৭৫ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত স্পেনের রানী ছিলেন।

আধুনিকতার ছোঁয়া ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’এর সবদিকে‘ স্থাপত্য থেকে শুরু করে শিল্পকর্ম‘ প্রতিটিই আধুনিক কালের প্রতিনিধি। এ মিউজিয়ামে ২০ শতক ও তার পরের ছবি, মূলত স্পেনীয় শিল্পের ছবিই রাখা আছে। স্পেনের ইতিহাসের ব্যাপ্তির তুলনায় ২০ শতক খুব কাছের সময়, বেশ আধুনিক কাল। আর এ মিউজিয়ামের প্রধান দুই শিল্পী- পাবলো পিকাসো ও সালভাদর দালি‘ চিত্রশিল্পে আধুনিকতার পথিকৃৎ।

দিনের প্রথম ভাগে মুসেও দেল প্রাদোতে তিন দিকপাল‘এল গ্রেকো, ভ্যালাস্কেস, গয়া‘ এর বাস্তববাদী ছবিগুলি বেশ ভালো লেগেছিল আমাদের, বিশেষ করে নাবিল ও নাতাশার। সেখান থেকে ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’যেন বিপরীত মেরুর এক জগত। চিত্রকলায় আধুনিকতা নিয়ে আসে ইঙ্গিতময়তা, বিমূর্ততা ও রহস্যময়তা, আর সাথে যোগ হয় শিল্পের বহু পরীক্ষা-নিরীক্ষা। এ ব্যাপারগুলি যে কোন ছবিকে জটিল করে তোলে তা আমরা ‘মুসেও দে রেইনা সোফিয়া’-র কিছু ছবি দেখে বুঝতে পেরেছি। আধুনিক অনেক ছবি, বিশেষ করে সালভাদর দালির পরাবাস্তব ছবিগুলি বোঝা বেশ কঠিন। পাবলো পিকাসোর ছবিগুলিও অনেকটা সেরকম।

‘গোয়ের্নিকা’‘ ইতিহাসের এক ট্র্যাজেডির ওপর আঁকা ছবিটি নিজেই হয়ে আছে এক ইতিহাস। আমরা সবাই এখন এ দুই ইতিহাসের মুখোমুখি হবো।

প্রথম ইতিহাসের দিকে চোখ ফেরানো যাক। স্পেনের রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে বাস্ক অধ্যুসিত উত্তরাঞ্চল ছিল প্রজাতন্ত্রীদের এক বড় ঘাঁটি‘ গোয়ের্নিকা ছিল সে অঞ্চলের এক শহর ও বাস্ক সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র। তাদের বিপরীতে ছিল জেনারেল ফ্রাঙ্কোর নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী জোট। তাদেরকে সমর্থন দেয় হিটলারের নাজি ও মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল। ট্র্যাজেডির দিনটি ছিল সোমবার, ২৬ এপ্রিল ১৯৩৭ সাল‘ বিকেল ৪.৩০ টায় জার্মান বিমান বহর গোয়ের্নিকা শহরের ওপর ২ ঘণ্টার বেশি সময় ধরে বোমাবর্ষণ করে। নিহত ও আহত হন বহু বেসামরিক মানুষ। অভিযোগ আছে, জার্মানি তার নতুন অস্ত্র ও কৌশল পরীক্ষা করার জন্য এ বিমান আক্রমণের সুযোগকে কাজে লাগায়।

এরপর দেখি দ্বিতীয় ইতিহাস। পিকাসো গোয়ের্নিকা ট্র্যাজেডীর সংবাদ পান প্যারিসে বসে পত্রিকার পাতায়। এর নির্মমতা ও অমানবিকতায় পৃথিবীর আরো অনেকের মতো পিকাসোও গভীরভাবে ব্যথিত ও ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠেন। তখন তিনি প্রজাতন্ত্রী সরকারের পক্ষে প্যারিস বিশ্ব মেলার জন্য এক ম্যুরালের ওপর কাজ করছিলেন। গোয়ের্নিকা ট্র্যাজেডির পর তিনি তার বিষয় পরিবর্তন করে এর ওপরই ম্যুরালটি আঁকার সিদ্ধান্ত নেন। পিকাসো ১ মে ১৯৩৭ তারিখে আঁকা শুরু করে ৪ জুন ১৯৩৭ তারিখে শেষ করেন‘গোয়ের্নিকা’। সে বছরে অনুষ্ঠিত প্যারিস বিশ্ব মেলায় প্রদর্শনের পরে ছবিটি পৃথিবীর বহু শহরে নিয়ে দেখানো হয়‘ সাথে স্পেনের গৃহযুদ্ধে প্রজাতন্ত্রীদের পক্ষে সমর্থন ও সাহায্য সংগ্রহ করা হয়। তবে ১৯৩৬-১০৩৯ সালে সংগঠিত এ গৃহযুদ্ধে জাতীয়তাবাদীরা জয়ী হলে ফ্রাঙ্কোর দীর্ঘ একনায়কত্বের শাসন শুরু হয়।

পিকাসো এরপর প্রিয় মাতৃভূমি স্পেনে যান নি। সাথে তাঁর গোয়ের্নিকাকেও যেতে দেননি, বলেছিলেন ফ্রাঙ্কোর শাসনে ছবিটি স্পেনে যাবে না। ফ্রাঙ্কো ও পিকাসো‘ দুজনের মৃত্যুর পরেই ১৯৮১ সালে গোয়ের্নিকা যায় স্পেনে।

গোয়ের্নিকার ট্র্যাজেডি নিয়ে আমি ভাবতে ভাবতেই দেখি নাবিল ও নাতাশা গভীরভাবে ছবিটি দেখছে, বোঝার চেষ্টা করছে, মনে হয় সুবিধে করতে পারছে না। বললাম,‘আধুনিক চিত্রকর্ম অনেকটা আধুনিক কবিতার মতো‘ সবটি বুঝতে পারবে না, হয়তো কিছুটা উপলদ্ধি করতে পারবে। দুঃখ ও শোক প্রকাশ করার জন্য ছবিটিতে পিকাসো শুধু সাদা-কালো-ধূসর রঙ ব্যবহার করেছেন। রেখা, আকৃতি ও রঙে পিকাসো প্রকাশ করেছেন তাঁর মনের গভীর এক কান্না।’এ কান্নার কথা আগেই বলে গেছেন স্পেনের গণমানুষের কবি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা:

‘আমার ব্যালকনির জানলা বন্ধ ক’রে রেখেছি

কারণ, কান্নার শব্দ আমার পছন্দ নয়।

তবু ধূসর দেয়ালের আড়াল থেকে

কান্না ছাড়া আর কোনো কিছুরই শব্দ শোনা যায় না।

খুব কম দেবদূত আছে যারা গান গায়

খুব কম কুকুর আছে যেগুলি ডাকে

আমার হাতের তালুর উপর

বোবা হয়ে পড়ে থাকে হাজার ভায়োলিন।

কিন্ত ঐ কান্না হয়ে যায় এক দুর্দান্ত কুকুর,

হয়ে যায় এক প্রবল ভায়োলিন

বাতাস বেয়ে গড়িয়ে পড়ে অশ্রু

কান্না ছাড়া আর কোনো কিছুরই শব্দ শোনা যায় না।’২

গোয়ের্নিকার ছবিটির মাঝে যেন দেখতে পাচ্ছি অগণন মানুষের রক্তধারা, সাথে শুনতে পাচ্ছি তাঁদের নীরব কান্না। ক্রমশ...

সূত্র:

১. প্রবাসের দিনলিপি: জাহানারা ইমাম

২. উবষ খষধহঃড়..: কান্না নিয়ে: অনুবাদ: অমিতাভ দাশগুপ্ত।

সম্প্রতি

Sangbad Image

অর্থ-বাণিজ্য: স্বর্ণের দামে বড় পতন