চপল বাশার
ভজন এখন আর সেলুনে কাজ করে না। খদ্দেররা ফোন করলে তাদের বাড়িতে গিয়ে চুল কেটে দিয়ে আসে, ভালো মজুরিও পায়। সেলুনে কাজ করা ছেড়ে দিয়েছে প্রায় এক বছর আগে। নাপিত হিসেবে তার সুনাম আছে। এলাকার যারা পুরোনো খদ্দের, তারা সেলুনে গিয়ে ভজনকে দিয়েই চুল কাটাতেন। ভজন সেলুনে কাজ করা ছেড়ে দেওয়ায় এখন তাকে বাসায় ডাকতে হয়। ভজন এখন স্বাধীনভাবে কাজ করে, সময়মতো সেলুনে যাওয়ার বাধ্যবাধকতা নেই। মোবাইল ফোনে খদ্দেররা ডাকলে তবেই সে ঘর থেকে বের হয়। এলাকার লোক ভজনের নাম দিয়েছে ‘ফ্রিল্যান্স নাপিত’।
ভজন শীল বংশপরম্পরায় নাপিত। তার বাবা গনেশ শীল একটি সেলুন চালু করেছিলেন। এলাকায় সেলুনটি বেশ জনপ্রিয়তা পায়। আরও কয়েকটি সেলুন এলাকায় থাকলেও গনেশের দোকানে খদ্দের বেশি। গনেশ প্রয়াত হবার পর তার বড় ছেলে সাধন শীল তাদের পারিবারিক ব্যবসার হাল ধরে। বাবার রেখে যাওয়া সেলুনেই কাজ করতে থাকে। ছোট দুই ভাই ভজন ও লিটন বড় ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করতে চাইলেও সাধন দেয়নি।
‘তোরা দুইজনই ছাত্র, ইস্কুলে লেখাপড়া করতাছস। সেইটাই মনোযোগ দিয়া কর। ম্যাট্রিকটা পাস কর আগে। তারপর দেখা যাইবো, আমার লগে কাম করবি কিনা।’
‘কিন্তু দাদা, তুমি একা কাম করবা, কষ্ট করবা, আর আমি বইসা বইসা খামু? সেইটা হয় না দাদা। আমি কাইল থিকা দোকানে যামু, তোমারে সাহাইয্য করুম’, ভজন বলে। সে স্থানীয় হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ে। লেখাপড়ায় মোটামুটি ভালো।
‘শোন ভজন, আমি নিজে লেখাপড়া করি নাই। কিন্তু লেখাপড়ার মর্যাদা বুঝি। তোর যখন এতই শখ্, ছুটির দিনে দোকানে আসবি। চুল কাটার কাজ শিখবি। কিন্তু ম্যাট্রিক পাস করাই লাগবো।’
‘আর আমি কী করুম? বাড়িত বইয়া থাকুম?’ ছোট ভাই লিটনের প্রশ্ন।
‘তুই মোটে ক্লাস সেভেনের ছাত্র। তোর দোকানে আসার দরকার নাই, লেখাপড়া করতে থাক।’
অবশেষে ভজন এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলো, মোটামুটি ভালো রেজাল্ট। সাধনের ইচ্ছা ছিল ভজন কলেজে ভর্তি হোক, আরও পড়াশোনা করুক। ভজন রাজি হয়নি। সে পুরোপুরি কাজে লেগে গেল তাদের সেলুনে। সাধন আপত্তি করে নি, দুই ভাই মিলে দোকান চালায়। দোকানের আকার ক্রমেই বড় হয়, এখন চারজনকে একসঙ্গে বসানো যায়। দুজন কর্মচারি নিয়োগ করা হয়েছে। ওরাও চুল কাটে, দাড়ি শেভ করে। সাধনদের একান্নবর্তী সংসার এখন অনেক সচ্ছল।
নাপিত হিসেবে ভজনের অনেক সুনাম হয়েছে। খদ্দেররা ভজনকে দিয়েই চুল কাটতে চায়। ভজন চেষ্টা করে সবাইকে খুশি রাখতে। ওর ওপর অনেক চাপ পড়ে; বিশেষ করে ছুটির দিন শুক্রবার-শনিবারে। কর্মচারি দুজনের সাহায্য নিয়ে ভজন খদ্দের সামলায়।
সাধনের শরীর ভালো যাচ্ছে না, বয়সও হয়েছে। তারপরও সেলুনে আসেন, খদ্দেরদের চুল কেটে দেন। কিন্তু তার কাজের গতি ক্রমেই মন্থর হয়ে আসছে। সাধন নিজেও বুঝতে পারেন, ভজনও বোঝে। একদিন ভজন বলে, ‘দাদা, আপনের আর চুল কাটার দরকার নাই। দোকানে আইবেন, কাউন্টারে বইবেন, খদ্দেরদের থিকা টাকা নিবেন হিসাব রাখবেন। তাইলেই চলবো। আপনের এখন বিশ্রাম দরকার।’
‘তাইলে তো আর একজন লোক রাখা লাগবে চুল কাটার জইন্য। চাইরটা সিট, তিনজনে সামলাবি ক্যামনে?’
‘ভালো লোক পাইলে একজন রাখুম। লোক না পাওয়া পর্যন্ত তিনজনেই চালাইয়া নিমু। মোটকথা, তুমি আর কাঁচি ধইরতে পারবা না।’
সাধন ম্লান হাসি হেসে ছোট ভাই ভজনের সিদ্ধান্ত মেনে নিলেন। তাকে এখন সেলুনের ম্যানেজারি করতে হবে। এটাও তো কাজ। ছোটভাই লিটন ইতোমধ্যে এসএসসি পাস করেছে। রেজাল্ট মোটেই ভালো হয়নি। কোনোমতে উৎরে গেছে। সে চুল কাটার কাজ শেখেনি, আগ্রহও দেখায় নি। অন্য কোনো কাজও জানে না। কিছুদিন অন্য কোনও কাজ বা চাকরির চেষ্টা করে বুঝতে পারে চাকরির বাজারে এসএসসি পাসের দাম নেই। পিয়ন, চাপরাশির কাজ পাওয়া যায়, তাতেও তদ্বির লাগে।
একদিন সকালে বাড়িতে দুই দাদাকে একসঙ্গে পেয়ে লিটন বলে, ‘দাদা চাকরি-বাকরি তো পাইনা, চুল কাটতেও শিখি নাই। তাহলে এখন কী করা?’
‘আরও লেখাপড়া কর, বিএ পাস কর। চাকরি পাবি, সরকারি-বেসরকারি সব জায়গায় সুযোগ পাবি’, ছোটভাইকে ভরসা দেয় ভজন।
‘না দাদা, আমারে দিয়া আর লেখাপড়া হইবো না। আমি বরং বিদেশে যাওয়ার চেষ্টা করি। আমার কজন বন্ধু দুবাই গ্যাছে, ওদের লগে যোগাযোগ আছে। ওরা বলে ওখানে কামের সুযোগ আছে। রোজগারও ভালো।’
‘তাইলে ওখানেই চেষ্টা কর।’
‘তাতো করুম। কিন্তু অনেক টাকা লাগে। পাসপোর্ট, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট, দালালের টাকা, বিমানের টিকিট‘ সব নিয়া দুই লাখ টাকার মতো লাগে। এত টাকা পামু কই।’
সাধন ও ভজন একে অপরের দিকে তাকায়। দুজনের চোখে একই প্রশ্ন, এত টাকা পাওয়া যাবে কীভাবে? তা নাহলে ছোটভাই লিটন করবে কী? ওর ভবিষ্যৎটাও তো দেখতে হবে। সবাই নীরব। মুখ খোলেন বড় ভাই সাধন।
‘দেশের বাড়িতে আমার কিছু ফসলী জমি আছে। ওইখান থিকা কিছু বেচলে দুই লাখ পাওয়া যাইবো না ভজন?’
‘তোমার দুই ছেলে মেয়ে আছে। ওদের বঞ্চিত কইর্যা লিটনকে দিয়া দিবা?’
‘সবটা তো বেচতাছি না। কিছু থাকবো। তাছাড়া তুই আছস, লিটন আছে, তোরা আমার ছেলেমেয়েদের দেখবি। ওর তো বিদেশ যাইতে হইবো।’
শেষ পর্যন্ত তাই হলো। সাধন নিজের জমি বিক্রি করে ছোট ভাই লিটনকে দুই লাখ টাকা দিলেন, সেই টাকা নিয়ে সে গেল দুবাই।
দুই
পাঁচ বছর পার হয়ে গেল। লিটন দুবাইতে আছে, কাজ করছে। কী কাজ, কী চাকরি, কেউ জানে না। তবে সে ভালোই রোজগার করছে। ইতোমধ্যে বড় ভাই সাধন মারা গেছেন। লিটন বড় ভাইর বিধবা স্ত্রী ও ছেলেমেয়েদের জন্য টাকা পাঠায়। ভজনের সঙ্গে মাঝে মাঝে মোবাইল ফোনে কথা বলে। একদিন সে ভজনকে বলেন, সেলুনটাকে আর একটু বড় আর আধুনিক করতে। দোকানে এসি, নতুন ফার্নিচার, নতুন আয়না, বেসিন, খদ্দেরদের বসার জন্য নতুন সোফা ও সিট দিলে দোকানটি আধুনিক হবে। আকর্ষণীয় হবে।
‘সেলুনটাকে আধুনিক করো, চুল কাটার রেটও বাড়াও। দোকানের খদ্দের বাড়বো, ইনকামও বাড়বো।’
‘তা তো করাই যায়, কিন্তু টাকা পামু কই? আমার কি অতো টাকা আছে?’
‘টাকা আমি পাঠামু, তুমি শুধু সেলুনটারে নতুন আধুনিক কইর্যা সাজাও। ব্যবসা ভালোই হইবো।’
ভজন ছোট ভাইর কথা মেনে নেয়। সেলুনটাকে নতুন করে সাজিয়ে আধুনিক রূপ দিতে খরচ হবে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা। এটা সে লিটনকে জানিয়ে দিলে এক সপ্তাহের মধ্যেই টাকাটা চলে আসে দুবাই থেকে। এবার ভজনের কাজ। সে দিনরাত পরিশ্রম করে সেলুনের চেহারাটা পাল্টে দেয়। সেলুনে আসন সংখ্যা বাড়ায়, সবকটি আসন আধুনিক, আরামদায়ক। দুটি আরামদায়ক সোফাও রাখা হয়েছে দরজার পাশে। ঘর ঠা-া রাখার জন্য বড় একটি এসিও লাগানো হলো। এসব কাজ সারতে প্রায় দুমাস লেগে যায়। এরপর ভজনের সেলুন নতুন করে যাত্রা শুরু করে। দোকানের বাইরে নতুন সাইনবোর্ড ‘সৌভাগ্য আধুনিক সেলুন’।
সেলুনটি আগে থেকেই জনপ্রিয় ছিল। সেটা ভজনের কারণে। এই এলাকায় আরও সেলুন আছে। কিন্তু ভজনের সেলুনেই খদ্দের বেশি। এলাকার প্রবীণ মানুষ ও মুরুব্বিরা এই সেলুনেই আসেন, ভজনকে দিয়ে চুল-দাড়ি কাটান, শেভ করান। প্রবীণদের কেউ অসুস্থ হলে, ভজন তার বাড়ি গিয়ে চুল কেটে দিয়ে আসে। ভজন শীল এলাকার একটি পরিচিত, জনপ্রিয় নাম। সেলুনটির আধুনিকায়ন বিশেষ করে শীতাতপ ব্যবস্থার জন্য এটির ব্যবসা আরও বেড়ে যায়। ভজন এখন ভালোই আছে। একমাত্র ছেলে সুজন কলেজে বিএ পড়ছে।
তিন
এভাবে ছয় মাস কেটে যায়। লিটন একদিন দুবাই থেকে ফোন করে ভজনকে জানায় সে শিগগিরই ঢাকায় ফিরে আসছে। কতদিনের ছুটিতে আসছে জানতে চাইলে লিটন বলে, ‘ছুটি না দাদা, আমি চাকরি ছাইরা একেবারেই চইলা আইতাছি।’
লিটন ভালো বেতনের চাকরি ছেড়ে দিয়ে হঠাৎ চলে আসছে কেন? ভজনের মনে সন্দেহ দেখা দেয়। সে লিটনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আনিসের বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলে। আনিসের কাছে জানতে পারে লিটন চাকরি ছেড়ে দিয়ে আসছে না, তার চাকরি গেছে। সে দেশের ওয়ার্ক পারমিটও বাতিল।
‘কারণটা কী? লিটন কী করসে?’ ভজনের কণ্ঠে উদ্বেগ।
‘কিছু অপকর্ম তো করসেই। না হইলে কি চাকরি যায়? ওয়ার্ক পারমিট বাতিল হয়? এখান থেকে যাওয়ার পর একবছর ভালোই ছিল। ঠিকমতো কাজ করসে, ভালো বেতনও পাইসে। এরপরই খারাপ মানুষের পাল্লায় পইরা অসৎ পথে গেল বেশি টাকা কামানোর জইন্য। ওদের দলের বেশিরভাগ লোক ধরা পড়ছে পুলিশের হাতে। লিটন পালাইয়া গেছে অন্য দেশে। সেখান থিকা ঢাকায় আইবো।’ আনিস সব কথা খুলে বলে ভজনকে। তাকে অনুরোধ করে কাউকে যেন কিছু না বলে, তাতে লিটনের বিপদ আরো বাড়বে।
ভজন সব শুনে স্তম্ভিত হয়ে যায়। টাকার লোভে লিটন অসৎ পথে গেল? তাদের বড় ভাই জমি বেচে ওকে বিদেশ পাঠিয়েছে এসব করার জন্য।
লিটন দেশে ফিরে আসার পর ভজন ওকে কিছুই বলে না। স্বাভাবিক আচরণ করে তার সঙ্গে। একদিন ওকে সঙ্গে করে সেলুনে নিয়ে যায়, সব কিছু দেখায়। সব দেখে লিটন খুশি হয়ে বলে, ‘সেলুনটা এখন সত্যিই আধুনিক হইসে দাদা। এসিতে বইসা চুল কাটাইতে কত আরাম। খদ্দেরও মনে হয় বাড়সে।
‘তা বাড়সে, রোজগারও বাড়সে, দোকানের খরচও তো আগের থিকা বেশি।’
‘ঠিক আছে, চিন্তা কইরো না, আমি আইসি পড়সি, এখন রোজগার আরও বাড়বো।’
লিটন রোজই সেলুনে আসতে থাকে। কাজকর্ম দেখে। কিন্তু সে নিজে তো চুল কাটতে জানে না, তাই বসেই থাকে। ভজন একদিন তাকে বলে দোকানের ম্যানেজার হিসেবে কাজ করতে, যে কাজটা তাদের বড় ভাই সাধন করতেন। লিটন পরদিন সকালেই কাউন্টারে বসে ম্যানেজারের কাজ শুরু করে। কয়েকদিনের মধ্যেই বোঝা গেল লিটন কেমন ম্যানেজার। পাঁচজন কর্মচারি, সবাই তার ব্যবহারে অসন্তুষ্ট।
কর্মচারিদের মধ্যে বয়োজ্যেষ্ঠ হারাধন শীল একদিন ভজনকে বলে, ‘দাদা, আপনের ভাই যেমন করতাসে, কর্মচারি তো কেউ থাকবো না, কোনো কারণ ছাড়াই বকাবকি, রাগারাগি করে। আমারেও ছাড়ে না। এখনই ওরে সামলান, না হইলে কর্মচারি থাকবো না, দোকানও শেষ।’
ভজনও লক্ষ্য করেছে লিটনের আচরণ দিন দিন খারাপ হচ্ছে, সবার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে। হারাধন একদিন ভজনকে জানায়, সামনের মাস থেকে সে আর এই সেলুনে কাজ করবে না। অন্য জায়গায় কাজ পেয়েছে। আরও একজন চাকরি ছাড়ার নোটিশ দেয়। সেলুনের অবস্থা যে খারাপের দিকে যাচ্ছে ভজন বুঝতে পারে। একদিন লিটনের মুখোমুখি বসে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করে এমন করলে সেলুনে কোনো কর্মচারি থাকবে না। ভালো নাপিত পাওয়াও যাবে না।
‘পাওয়া যাইবো না ক্যান? ভাত ছড়াইলে কাকের অভাব হয় না। লোক গেলে লোক আনুম,’ চড়া গলায় জবাব দেয় লিটন।
ভজন তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়। এক পর্যায়ে লিটন উত্তেজিত হয়ে বলে, ‘দাদা, ভুইলা যাইও না, দোকানটা আমার। দোকানের সব খরচ আমিই দিসি। আমার ইচ্ছামতো দোকান চলবো। তোমার যদি না পোষায়, তুমিও যাও আমি একাই সেলুন চালামু।’
ছোট ভাই লিটনের কথা শুনে স্তব্ধ হয়ে যায় বড়ভাই ভজন। তার এত পরিশ্রমে গড়ে তোলা সেলুন থেকে ছোট ভাই তাকে বের করে দিচ্ছে? ‘সৌভাগ্য আধুনিক সেলুন’ শেষ পর্যন্ত তার দুর্ভাগ্যের প্রতীক হয়ে গেল?
ভজন নীরবে দোকান থেকে বেরিয়ে যায়, বাড়ি গিয়ে চুপচাপ শুয়ে থাকে বিছানায়। স্ত্রী নির্মলা কাছে এসে জানতে চায় কী হয়েছে? শরীর খারাপ? ভজন তাকে সব খুলে বলে। সব শুনে নির্মলা অবাক হয়ে যায়। মানুষ এত নিচে নামতে পারে? যে বড় ভাই তার জন্য এতকিছু করেছে, তাকেই দোকান থেকে তাড়িয়ে দেয়?
‘এর ফল কিন্তু ভালো হইবো না, ঈশ্বর ওরে ক্ষমা করবো না’, ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলে নির্মলা।
‘ওরে অভিশাপ দিও না বউ, ওর বুদ্ধিসুদ্ধি এখনও হয় নাই। চিন্তা কইরো না, আমি কাজ জানি, আমার কাজের অভাব হইবো না। আমার কাঁচি, ক্ষুর, চিরুনি সব আছে। লোকেও আমারে চেনে।’
পরের দিন থেকেই ভজন কাজে নেমে পড়ে। লোকের বাড়িতে যায়, চুল কেটে দিয়ে আসে, উপার্জনও বেশি। সেলুনে চুল কাটলে একজন খদ্দেরের কাছ থেকে একশ’ টাকা পেতো, এখন বাড়িতে গেলে পায় দুইশ’।
এলাকার সবাই জেনে গেছে। ভজন এখন সেলুনে কাজ করে না। চুল কাটতে বাড়িতে যায়। পুরোনো খদ্দেররা মোবাইল ফোনে ভজনকে বাড়িতে ডাকে, সেও যায়, চুল কেটে দেয়, শেভও করে। অনেক বাড়িতে চা-নাশতাও খেতে হয়। ভজন এখন আরও জনপ্রিয়। একদিন হিসেব করে দেখে, সেলুনে কাজ করে তার যা আয় হতো, এখন আয় তার চেয়ে বেশি। স্ত্রী নির্মলাকে সে বলে, ‘দেখলা বউ, যে কাজ জানে আর কাজ করে, তার ভাতের অভাব হয় না। ঈশ্বর তার সহায়।’
চার
এদিকে লিটনের সেলুনের অবস্থা খুব খারাপ। পুরোনো কর্মচারি কেউ নেই। নতুন যাদের এনেছে তাদের কাজ ভালো না। খদ্দের অনেক কমে গেছে। দোকান থেকে লাভ তো হচ্ছেই না, খরচও উঠে আসেনা। কর্মচারিদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল বাকি পড়ছে। লিটন তার ভুল বুঝতে পারে। ভজন দাদাকে বাদ দেয়ায় বিরাট ক্ষতি হয়ে গেছে। সে ভাবছে দাদাকে কীভাবে ফিরিয়ে আনা যায়।
এলাকার মুরুব্বি মিজানুর রহমান আগে এই সেলুনেই চুল কাটাতেন ভজনের হাতে। ভজন এখন তার বাসায় গিয়ে চুল কেটে দিয়ে আসে। লিটন জানে মিজান সাহেব ভজনকে খুব ¯েœহ করেন। ভজনও তাকে শ্রদ্ধা-ভক্তি করে। লিটন একদিন সকালে মিজান সাহেবের বাড়িতে গিয়ে হাজির হয়। তার সমস্যার কথা জানিয়ে বলে এভাবে চললে সেলুনটা বন্ধ হয়ে যাবে।
‘এর জন্য তুই দায়ী। তোর ভজন দাদাকে বাদ দিলি কেন? ওকে ছাড়া সেলুন চালাতে পারবি না।’
‘দাদারে ফিরাইয়া আনতে চাই। কিন্তু কোন মুখে তারে বলি। আপনে যদি দাদারে একটু বুঝাইয়া কন সেলুনে ফিরা আসতে। আপনের কথা উনি শুনবো।’
‘তা হয়নারে লিটন। আমি কেন ওকে বলতে যাবো? তুই বরং দাদার কাছে যা, তার পায়ে ধর, মাফ চা। এতে যদি কাজ হয়।
লিটন তখনই ভজনের বাড়িতে যায়। গিয়ে দেখে দাদা-বৌদি ঘরের বারান্দায় বসে চা খাচ্ছে। লিটনকে দেখে ভজন বলে, ‘কে, লিটন? আয়, বয় এখানে। চা খা।’
লিটন কোনো কথা না বলে ভজনের দুই পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে। ‘দাদা আমি অনেক অপরাধ করসি, আমারে ক্ষমা কইরা দাও। তুমি সেলুনে ফিরা চলো দাদা। তোমার দোকান তুমিই চালাও, আমি কিছুই কমু না।’
ভজন ছোটভাইর মাথায় হাত রাখে, একটু হাসে। ‘তোরে তো আমি আগেই ক্ষমা করসি লিটন। আমার কোনো অভিযোগ নাই। তবে আমি আর সেলুনে যামু না। আমি তো এখন ফ্রিল্যান্স নাপিত। বাড়ি বাড়ি গিয়া চুল কাটি, ভালোই আছি। আমারে আমার মতো থাকতে দে।’
অর্থ-বাণিজ্য: স্বর্ণের দামে বড় পতন
জাতীয়: বায়ু দূষণে শীর্ষে ঢাকা
আন্তর্জাতিক: দুবাইয়ে মার্কিন দূতাবাসে এবার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
আন্তর্জাতিক: নতুন বিস্ফোরণে কেঁপে উঠল তেহরান