image

বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকা

লোকজ ঐতিহ্যের নব অন্বেষণ

মাসুদ রানা

আমাদের জাতীয় সংস্কৃতির মূল ভিত্তিই হচ্ছে লোকসংস্কৃতি। জাতির মননের প্রতীক বাংলা একাডেমি প্রকাশিত ফোকলোর পত্রিকা আমাদের লোকজ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি পুনরাবিষ্কারের এক মূল্যবান উৎস। পত্রিকার সাম্প্রতিক সংখ্যাটি পাঠকের সামনে তুলে ধরে বাংলার লোকধারা, নৃতাত্ত্বিক ঐতিহ্য, মৌখিক ইতিহাস, লোকসাহিত্য, লোকবিশ্বাস, আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতির সমৃদ্ধ বৈচিত্র্যকে। বিষয়বৈচিত্র্য ও গবেষণার গভীরতা দুই দিক থেকেই এটি নিঃসন্দেহে উল্লেখযোগ্য একটি প্রকাশনা। এ পর্বের আলোচ্য বিষয়‘ ৫ম বর্ষ : ২য় সংখ্যা [জানুয়ারি-জুন ২০২৪]। ৬ষ্ঠ বর্ষ : ১ম সংখ্যা [জুলাই-ডিসেম্বর ২০২৪]।

পত্রিকার সূচিপত্রই বলে দেয় এর বিষয়বৈচিত্র্যের পরিধি কতটা প্রশস্ত। ভাষাবিজ্ঞান, নৃতত্ত্ব, সমাজসংস্কৃতি, ইতিহাস, সাহিত্য, শিল্প, আচার-অনুষ্ঠান ফোকলোরের প্রায় সব বৈশিষ্ট্যকে ধারণ করেছে এই সংখ্যা। এর প্রথম কয়েকটি প্রবন্ধ তাত্ত্বিক কাঠামো নির্মাণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

শক্তিনাথ ঝা-এর ‘বাউল ফকিরেরা এবং কলিকাল’ বিষয়ক আলোচনা পত্রিকাটির একটি দৃঢ় ভিত্তি তৈরি করেছে। মিলনকান্তি বিশ্বাসের ‘নাগরিক লোকসংস্কৃতি’ প্রবন্ধে শহুরে জীবনে লোকঐতিহ্যের পরিবর্তিত রূপকে বিশেষণ করা হয়েছে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভঙ্গিতে। ওয়াহিদা মোমেন চৌধুরীর ‘নববর্ষে হালখাতা’ এই বিষয়ের সূক্ষ¥ দিক তুলে ধরে পাঠককে নিয়ে যায় গ্রামীণ জীবনের গভীরে। এই সংখ্যায় অন্যতম সংযোজন হলো প্রযুক্তি-পরিবর্তনের সঙ্গে লোকঐতিহ্যের সম্পর্ক। দীপ্তি রানী দত্তের ‘ডিজিটাল ফোকলোর এবং ডিজিটাল মাধ্যমে বাংলাদেশ’ বিষয়ক গবেষণা আধুনিক সময়ের সঙ্গে লোকঐতিহ্যের সম্পর্ককে নতুন দৃষ্টিতে দেখতে সাহায্য করে। ডিজিটাল ফোকলোর বিষয়ক আলোচনায় উঠে এসেছে কীভাবে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে লোককথা, লোকসঙ্গীত, লোকআচার নতুনভাবে পুনর্গঠিত হচ্ছে। গবেষণাগদ্যটি আমাদের সময়ের প্রয়োজনীয় ও অত্যন্ত সময়োপযোগী।

৮১ পৃষ্ঠায় এ পত্রিকায় সূচিভুক্ত ‘রবীন্দ্রনাথের বাউলগান ভাবনা’ শীর্ষক সুজিতকুমার পালের লেখায় উঠে এসেছে বাঙালির কাছে বাউলগান ও রবীন্দ্রনাথের গান মিলেমিশে একাকার। বাউলের ঘরানা আলাদা হলেও রবীন্দ্র ঘরানার মধ্যে অকপটেই প্রবেশ করেছে বাউলের বৈশিষ্ট্য। বাউল সম্প্রদায় হয়েও গানের সুর সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। আবার বাউলের অনন্ত সুরের সাধনা কেবল রবীন্দ্রগানের মধ্যেই থেমে নেই আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, সব ধরনের গানেই বাউল সুর স্বাভাবিকভাবেই এসে পড়েছে। বাউল সম্পর্কে ‘পত্রপুট’ কাব্যের ১৫ নং কবিতায় কবি বলেছেন‘

দেখেছি একতারা হাতে চলেছে গানের ধারা বেয়ে

মনের মানুষকে সন্ধান করবার গভীর নির্জন পথে

কবি আমি ওদের দলে, আমি ব্রাত্য, আমি মন্ত্রহীন।

তানভীর আহমেদ সিডনীর ‘মান্নান হীরার নাটক চতুষ্টয়ে লোকঐতিহ্য অনুসন্ধান’ প্রবন্ধটিও বিষয়গুণে মূল্যবান।

বৃত্তান্তমূলক প্রবন্ধ, লোককথা, কৃষিজ সংস্কৃতির চারুকর্ম ও সাক্ষাৎকারগুলো পত্রিকাটিকে আরও তথ্যসমৃদ্ধ করেছে। বিশেষভাবে উলেখযোগ্য হলো সাক্ষাৎকার বিভাগ। মুহম্মদ আবদুল জলিলের সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে লোকঐতিহ্য সংরক্ষণের জরুরি প্রশ্ন, আর মহসিন হোসাইনের সাক্ষাৎকারে দেখা যায় তাঁর ফোকলোরচর্চায় যুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা ছিল না। মোস্তফা সেলিম-এর সাক্ষাৎকারে সিলেটি নাগরী লিপির পুনর্জাগরণ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস উঠে আসে।

পত্রিকার শেষে পুস্তক আলোচনা অংশটিও একইভাবে গুরুত্ববহ-সমসাময়িক ফোকলোর গবেষণার বইগুলোর মূল্যায়ন পাঠককে করে তোলে সমৃদ্ধ। পত্রিকায় রয়েছে গ্রামীণ জীবনের প্রাত্যহিক শিল্প-সংস্কৃতি নিয়েও গভীর আলোচনা। সামনে এক অভিনব দৃষ্টিকোণ তৈরি করে।

শেষাংশের পুস্তক আলোচনা অংশটিও বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য। অদিতি চ্যাটার্জীর ‘লোকসাহিত্যের ব্রতকথা’ এবং আবদুল্লাহ আল-আমিনের ‘কবিগান: সমাজবাস্তবতা, বিষয়বৈভব ও রূপবৈচিত্র্য’-এর আলোচনা ফোকলোর গবেষণার প্রবহমান ধারাকে মূল্যায়নে সাহায্য করে।

সবমিলিয়ে, বাংলা একাডেমির এই ফোকলোর পত্রিকা শুধু প্রবন্ধ সংকলন নয়, বরং বাংলার লোকজ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও সমাজগঠনের একটি সমন্বিত দলিল। গবেষক, শিক্ষার্থী, সংস্কৃতিপ্রেমী-সবার জন্যই এটি একটি পূর্ণাঙ্গ পাঠ্যবস্তু। এই সংখ্যা একদিকে যেমন গবেষকদের জন্য মূল্যবান তথ্যভা-ার, তেমনি সাধারণ পাঠকের কাছেও সহজপাঠ্য। আলোচনার গভীরতা, বিষয়বৈচিত্র্য এবং উপস্থাপনার পরিমিতি‘ সব মিলিয়ে বাংলা একাডেমির ফোকলোর পত্রিকা বাংলা লোকসংস্কৃতির জীবন্ত দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত। বাংলা সংস্কৃতির শিকড় জানতে আগ্রহী যে কোনো পাঠকের সংগ্রহে রাখার মতো একটি অসাধারণ সংখ্যা এটি।

বাংলা একাডেমি ফোকলোর পত্রিকা (ফোকলোর বিষয়ক ষাণ¥াসিক)। সম্পাদক : মোহাম্মদ আজম। প্রচ্ছদ: নাজিব তারেক। প্রকাশক: বাংলা একাডেমি। মূল্য: ১০০ টাকা।

সম্প্রতি

Sangbad Image

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: এক নজরে ভিভো এক্স৩০০ প্রো