জসীম উদ্দীনের ‘কবর’
সালাহউদদীন আহমেদ মিলটন
বাংলা সাহিত্যের কালোত্তীর্ণ প্রতিভার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র কবি জসীম উদ্দীন। বাংলার অধিকাংশ মানুষের কাছে তিনি পল্লীকবি হিসেবেই পরিচিতি পেয়েছেন। যার ফলে তাঁর কবিতার দর্শনতত্ত্বের দিকটি বিদগ্ধ গবেষকগণ অনেকটাই এড়িয়ে গেছেন বলে প্রতীয়মান হয়। মাটি ও মানুষের পবিত্র গন্ধমাখা এমন শব্দাঞ্জলির ব্যবহার বাংলা সাহিত্যে আর কোনো কবির কলমে উঠে আসবে বলে মনে হয় না। অর্থাৎ তিনিই প্রথম, তিনিই শেষ।
যাহোক, আমার আলোচনার বিষয় ‘কবি জসীম উদ্দীনের কবিতা ‘কবর’: সময়ের দ্বান্দ্বিক রূপায়ণ।’ বাংলা কবিতায় জসীম উদ্?দীনের ‘কবর’ একটি অনন্য মাইলফলক। এ কবিতায় লোকজ আখ্যান ও জীবনদর্শন মিলেমিশে যেন মানুষকে এক মহান সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে।
মূলত কবিতাটি সামগ্রিকভাবে অনুধাবন করলে একজন বৃদ্ধের মর্মস্পর্শী আত্মকথন উঠে আসে। যা লোকায়ত জীবনের এক হৃদয়বিদারক স্মৃতি পাঠের মূর্ত প্রতীক। মৃত্যু এক অনিবার্য সত্য, তা যেন কবিতাটির পরতে পরতে আঠার মতো লেগে রয়েছে। আমরা বলতেই পারি‘ মানুষ অতীতের মধ্যে পরিভ্রমণ করেন। অর্থাৎ মানুষ সর্বশেষ একা এবং তার এই একাকীত্বই বারবার অতীতকে আহ্বান করে।
সময়ের সাথে মানুষের যে চিরন্তন দ্বান্দ্বিকতা তা আদিকাল থেকেই শুরু হয়েছে। অর্থাৎ যেদিন থেকে মানুষের হৃদয়ে প্রেম-ভালোবাসা-স্নেহ-মমতা আষ্টেপৃষ্ঠে বাসা বেঁধেছে, সেদিন থেকেই এ দ্বন্দ্বের গোড়াপত্তন ঘটেছে।
মানুষ মূলত সময়ের সাথে তার জীবনকে ভাগ করে নেয়। অর্থাৎ হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালোবাসা, স্নেহ-মমতা এ সবই যেন মানুষ সময়ের কাছেই আত্মসমর্পণ করেন। আমি মনে করি‘ সময়-ই মানুষের শ্রেষ্ঠ পাঠশালা। আর এ কারণেই মানুষ তার অতীত স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে সান্ত¡না খোঁজেন। কবি জসীম উদদীনের ‘কবর’ কবিতায় একজন গ্রামীণ বৃদ্ধের আত্মকথনে তা যেন বারবার ফুটে উঠেছে। তিনি অশ্রুভেজা চোখে তার নাতির কাছে জীবনের হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখ, প্রেম-ভালবাসা সবই যেন ভাগ করে নিচ্ছেন। স্বজনের মৃত্যু তার কাছে মৃত্যু নয়, তা যেন সময়ের প্রতারণা। আর এভাবেই বৃদ্ধ তার নিজের মধ্যে এক অনন্য মহাকাব্য রচনা করেছেন। আর এ মহাকাব্যের ভাষা-ছন্দ-অলংকার-রস যেন সময়েরই ঔরসজাত সন্তান। অর্থাৎ ‘সময়’ এ মহাকাব্যের মহানায়ক হয়ে উঠেছে। এখানে বলতেই হবে‘ কবি যেন নিজেই নিজের সাথে দ্বন্দ্বে বেদনার এক মহাসাগরে সাঁতার কাটতে চান।
কবিতাটির শুরুতেই কবি বলে ওঠেন‘ ‘এইখানে তোর দাদীর কবর’। প্রথম চরণের এ অংশ বিশেষের ওপরই মূলত পুরো কবিতাটি ভর করেছে। এ কথা বলাই যায়‘ কবিতার এ অংশটুকুই কবিতার অস্তিত্ব। মৃত মানুষকে কবর দেওয়া শুধু রীতি নয়, এটি এক আবেগী বিদায়ও বটে। আমরা সাধারণত ‘কবর’ বলতে বুঝি‘ মানুষের শেষ ঠিকানা। অর্থাৎ মাটিই মানুষের চূড়ান্ত ঠিকানা। এখানে এসেই যেন হিংসা-প্রতিহিংসা, অহংকার-বিদ্বেষ, হানাহানি সবকিছু থেমে যায়। কিন্তু, কবি জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতার কবরগুলো যেন বৃদ্ধের জবানিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে। তিনি যখন বলেন‘
“এই মোর হাতে কোদাল ধরিয়া কঠিন মাটির তলে,
গাড়িয়া দিয়াছি কত সোনামুখ নাওয়ায়ে চোখের জলে।
মাটিরে আমি যে বড় ভালবাসি, মাটিতে মিশায়ে বুক,
আয়-আয় দাদু, গলাগলি ধরি কেঁদে যদি হয় সুখ।”
এ বর্ণনায় আমরা বাংলার গ্রামীণ সমাজের এমন এক আখ্যান খুঁজে পাই, যা শুধু ব্যক্তিগত শোকগাথা নয়, বরং মাটির প্রেম এবং ভালোবাসায় মাটিই যেন অস্তিত্ব, আধ্যাত্মিক আশ্রয় ও স্মৃতির সংগ্রহশালা হয়ে ওঠে। এখানে মাটি চূড়ান্ত সমতার দর্শন হিসেবে উদ্ভাসিত‘ যা অন্য কোনো তত্ত্বে নয়, এসেছে গ্রামীণ জীবনের সহজ সত্য থেকে। এটি একাধারে লোকজ-অস্তিত্ববাদ এবং গ্রামীণ অন্তঃসংবেদনশীলতার শিল্পিত প্রকাশ।
আমরা জানি‘ দুঃখের ইতিহাস গোপন নয়, তা উত্তরাধিকার। অনেকটা ভবিষ্যতের কাছে সত্য হস্তান্তর। বলা যায়‘ এটাই ‘কবর’ কবিতার মূল উপজীব্য।
বৃদ্ধের স্বজন হারানো বেদনার ফোঁটা ফোঁটা জীবন্ত অশ্রু যেন তিনি নির্দ্বিধায় তার উত্তরাধিকারের মধ্যে ভাগাভাগি করে পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ থাকতে চান।
অর্থাৎ স্বজনের মৃত্যুর পরও তা যেন আমাদের অস্তিত্বের অংশ হয়ে থাকে। এই ভাবনা কবিতাটিকে গভীর মানবিক দর্শনে উন্নীত করেছে। আমি মনে করি‘ ‘কবর’ কবিতার এ চরম সত্য প্রতিটি মানুষের অন্তরে এক গভীর অনুভূতির জন্ম দেয় এবং এটিই কবিতার প্রধান দার্শনিক উপলব্ধি।
জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি মূলত একটি গ্রামীণ শোকগাথা। কবিতাটির একদিকে যেমন স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন বারবার বিধৃত হয়েছে, তেমনি আবার প্রিয় মানুষটির বিয়োগ-ব্যথায় গাছের পাতা, ফাল্গুনী হওয়া সমব্যথী হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে সন্তানকে ছেড়ে যেতে মায়ের এক দুঃসহ যন্ত্রণার চিত্রও ফুটে উঠতে দেখি। এ সকল অব্যক্ত বেদনা তুলে ধরতে কবি বাংলার অনন্য প্রকৃতির অসাধারণ উপমা-প্রতীক-চিত্রকল্পের ব্যবহার করেছেন‘ যা কবিতাটির মর্যাদা এক অনন্য স্তরে পৌঁছে দিয়েছে। এছাড়াও কবিতাটিতে কবি তৎকালীন সময়ের বাল্য বিয়ে ও নারী নির্যাতনের চিত্রও তুলে ধরেছেন।
কবিতাটির অন্তর্গত স্তরে রয়েছে গভীর সুফীবাদী তত্ত্ব। মৃত্যুর আধ্যাত্মিক গ্রহণ, মাটির প্রতি প্রত্যাবর্তন, মানবিক দুঃখের মাধ্যমে আত্মশুদ্ধি এবং পরম সত্তার একত্ব উপলব্ধি। এখানে মৃত্যুর মধ্য দিয়েই যেন জীবনের অর্থ আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
কবিতাটির শেষ চরণটিতে কবি বলেন‘‘ভেস্ত নসিব করিও সকল মৃত্যুব্যথিত প্রাণ।’
অর্থাৎ মানুষ মৃত্যুর দ্বারা ব্যথিত হলেও তার পরিণতি যেন সৌভাগ্যময়, শান্তিময় ও করুণাপূর্ণ হয়। চরণটি মূলত মহান আল্লাহর কাছে একজন বান্দার গভীর আহ্বান‘ যাতে পৃথিবীর দুঃখে আক্রান্ত প্রতিটি আত্মা মৃত্যুর মুহূর্তে নফসের পর্দা থেকে মুক্ত হয়, ইলাহি নূরের দিকে প্রত্যাবর্তনের সৌভাগ্য পায় এবং দুনিয়ার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করে রহমতের মধ্যে ফানা হতে পারে। এটিকে আমরা কেবল সাধারণ প্রার্থনা হিসেবে দেখবো না, বরং এটি রুহের চূড়ান্ত মুক্তি ও আলোর প্রত্যাবর্তনের সুফী দর্শন।
পরিশেষে বলবো‘ কবি জসীম উদ্দীনের ‘কবর’ কবিতাটি একই সঙ্গে সামাজিক বাস্তবতার করুণ দলিল এবং আধ্যাত্মিক মুক্তির প্রার্থনাগাথা। ফলে একই কবিতায় সমাজবাস্তবতা ও সুফীবাদের আধ্যাত্মিক দর্শন পরিলক্ষিত হয়। আর এই দুই ভিন্ন তত্ত্বের দ্বৈত পাঠের ভাঁজে ভাঁজে যেন সময়ের দ্বান্দ্বিক রূপায়ণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে‘ যা কবিতাটিকে বাংলা সাহিত্যে কালোত্তীর্ণ করেছে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: এক নজরে ভিভো এক্স৩০০ প্রো
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: স্মার্ট ক্রিক ফেস্ট ২০২৬ অনুষ্ঠিত
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি: ইউএনডিপি-গ্রামীণফোন ‘ফিউচারনেশন’ কর্মসূচিতে যুক্ত হলো ইউআইটিএস