মির্জা গালিব
যাকিয়া সুমি সেতু
মির্জা গালিব (১৭৯৭-১৮৬৯) কবিতার নদী, চিঠিপত্রের ঝরনা‘ প্রত্যেকটি শব্দ জলতরঙ্গের মতো প্রবাহিত। নদী যেমন তার ¯্রােতে বহন করে ইতিহাসের পলি, সভ্যতার স্মৃতি এবং মানবজীবনের চিহ্ন, গালিবের কবিতাও তেমনি বহন করে প্রেম, শূন্যতা, আত্মচিন্তা ও দার্শনিক অনুসন্ধানের বহুমাত্রিক স্তর। জলধারা ও নদী-রূপক তাঁর কবিতায় কেবল প্রকৃতির অনুকরণ নয়; বরং তা মনুষ্যত্ব, সময় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের এক চলমান নান্দনিক প্রতিফলন। এই অর্থে গালিবের কবিত্ব এমন এক প্রবাহমান শিল্প, যা ইতিহাসের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় এবং মানবিক আকাক্সক্ষার স্মৃতি বহন করে‘ যেমন অক্টাভিও পাজ স্মরণ করিয়ে দেন, “Poetry is the river that flows through history and carries the memory of human longing.” গালিবের কবিতায় এই নদী কখনো অশ্রুর ক্ষুদ্র ধারায়, কখনো প্রেমের অপ্রতিরোধ্য ¯্রােতে, আবার কখনো অস্তিত্বগত সংশয়ের ঢেউয়ে রূপ নেয়; কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই তা স্থির নয়, বরং সময় ও চেতনার সঙ্গে প্রবাহিত এক জীবন্ত নান্দনিকতা।
মির্জা আসাদুল্লাহ খান গালিব জন্মগ্রহণ করেন ২৭ ডিসেম্বর ১৭৯৭ খ্রিস্টাব্দে, তৎকালীন মুঘল ভারতের প্রাচীন নগর আগ্রাতে। তাঁর বংশপরিচয় ছিল তুর্কি-ফারসি সামরিক অভিজাত‘ মধ্য এশিয়া থেকে মুঘল সা¤্রাজ্যের বিস্তৃত সাংস্কৃতিক নদীপথ ধরে ভারতে আগত এক পরিবার। এই বহুমুখী উত্তরাধিকার গালিবের সত্তায় জন্মগতভাবেই সৃষ্টি করে ভাষিক, সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক প্রবাহমানতা। তাঁর পিতা মির্জা আবদুল্লাহ বেগ খান ছিলেন মুঘল সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা। গালিবের বয়স যখন মাত্র পাঁচ বছর, তখন পিতার মৃত্যু ঘটে। এই শৈশবকালীন বিচ্ছেদ তাঁর চেতনায়প্রথম নিঃসঙ্গতার ঢেউ তোলে‘ যা পরবর্তী জীবনে তাঁর কবিতায় জলরেখার মতো পুনঃপুনঃ দৃশ্যমান।
মির্জা গালিবের সময় আগ্রা ছিল মুঘল ভারতের এক নদীকেন্দ্রিক নগরসভ্যতা। নগরটির বুক চিরে প্রবাহিত যমুনা নদী কেবল ভৌগোলিক জলধারা নয়; এটি ছিল ইতিহাস, স্মৃতি ও সংস্কৃতির বহমান আধার। তাজমহল, লালকেল্লা, দরবারি উদ্যান‘ সবই যমুনার তীরে গড়ে ওঠা জলঘন নান্দনিক ভূদৃশ্য। শৈশবে গালিব যে যমুনাকে দেখেছেন, তা ছিল‘ ধীর অথচ গভীর প্রবাহমান। রাজকীয় জৌলুস ও ঐতিহাসিক ক্ষয়ের যুগল সাক্ষী। প্রেম, শোক ও স্মৃতির প্রতিফলক জলরেখা। যমুনা নদী গালিবের অবচেতন নান্দনিকতার প্রথম পাঠশালা। নদীর চলমানতা তাঁকে শিখিয়েছিল‘ সময় স্থির নয়, জীবন একমুখী নয়; সবই প্রবাহ, সবই রূপান্তর। এই নদীমূলক চেতনা পরবর্তীকালে তাঁর গজলে রূপ নেয় প্রেমের ঢেউ, দর্শনের ¯্রােত ও সংশয়ের জলতরঙ্গে।
গালিবের জল-নন্দনতত্ত্ব তাঁর কবিত্বকে একটি সুসংহত নদীমূলক নান্দনিক কাঠামো প্রদান করে, যেখানে গজল কেবল পৃথক কবিতার সমষ্টি নয়, বরং একটি প্রবাহমান শিল্পরূপ। প্রতিটি শের, প্রতিটি পংক্তি, এমনকি প্রতিটি শব্দ এখানে তরঙ্গের মতো কাজ করে‘ যা পাঠকের অনুভূতি ও চেতনার গভীর স্তরে ধীরে ধীরে সঞ্চারিত হয়। গালিবের কবিতা ও চিঠিপত্রে নদীর ¯্রােত, বৃষ্টির ধারাবাহিকতা, ঢেউয়ের ওঠানামা ও জলপ্রবাহের চিত্র একত্রে আবেগ, স্মৃতি, ইতিহাস এবং অস্তিত্বগত অনুসন্ধানের তরল ভাষা নির্মাণ করে। এই জলরূপক প্রকৃতির অনুকরণে সীমাবদ্ধ না থেকে মানবিক অনুভব, প্রেমের অনিশ্চয়তা, আত্মচিন্তনের সংশয় এবং দার্শনিক গভীরতার বহুমাত্রিক প্রতীক হয়ে ওঠে। নদীর মতোই এই কবিতা পাঠককে স্থির থাকতে দেয় না; তা তাকে প্রবাহিত করে, আবেগের গভীরে নিমজ্জিত করে এবং স্মৃতির জলভূমিতে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। ফলে গালিবের জল–নন্দনতত্ত্বকে এক চলমান, বহুতল ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন নান্দনিক ব্যবস্থা হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, যা তাঁর সাহিত্যকে চিরন্তন নদীর মতোই জীবন্ত ও নবায়নশীল করে তোলে।
মির্জা গালিবের সৃষ্টিবিশ্ব একটি দীর্ঘ ও বহমান সাহিত্যিক নদী, যার উৎস উনিশ শতকের সূচনালগ্নে এবং যার ¯্রােত বিস্তৃত কবিতা, গদ্য ও চিঠিপত্রের নানা ধারায়। তাঁর প্রধান কাব্যকর্ম দেওয়ান-ই-গালিব‘ যার গজলসমূহ রচিত হয়েছে মূলত ১৮১০ থেকে ১৮৬০-এর মধ্যবর্তী সময়ে‘ উর্দু কবিতায় প্রেম, সংশয় ও অস্তিত্বগত প্রশ্নের এক অনন্য নান্দনিক ধারা নির্মাণ করে। একই সঙ্গে গালিব ফারসি ভাষায়ও বিস্তৃতভাবে লিখেছেন; তাঁর ফারসি কাব্যসংগ্রহসমূহ, যা উনিশ শতকের প্রথমার্ধে রচিত, প্রমাণ করে যে তিনি নিজেকে কেবল ভারতীয় উর্দু ধারায় সীমাবদ্ধ রাখেননি, বরং পারস্য সাহিত্যধারার ¯্রােতেও অবগাহন করেছিলেন। কবিতার পাশাপাশি গালিবের গদ্যরচনা‘ বিশেষত তাঁর চিঠিপত্র (মকতুবাত-ই-গালিব), যা ১৮৪০-এর দশক থেকে তাঁর মৃত্যুর পূর্বকাল পর্যন্ত রচিত‘ উর্দু গদ্যের ভাষাকে নতুন স্বচ্ছতা ও কথোপকথনধর্মী প্রবাহ প্রদান করে। এছাড়া দাস্তাম্বু (১৮৫৮) গ্রন্থে তিনি ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহোত্তর দিল্লির অভিজ্ঞতা লিপিবদ্ধ করেন, যেখানে ইতিহাস ব্যক্তিগত স্মৃতির জলধারায় রূপ নেয়। এইভাবে গালিবের সৃষ্টিকর্ম‘ কবিতা ও গদ্য উভয়ই‘ একত্রে একটি নদীমূলক সাহিত্যভূগোল গঠন করে, যেখানে ভাষা, সময় ও অভিজ্ঞতা পরস্পরের সঙ্গে মিশে এক অবিরাম ¯্রােত সৃষ্টি করেছে।
মির্জা গালিবের সৃষ্টিবিশ্বে উর্দু ও ফারসি দুটি ভিন্ন ভাষিক ধারা হলেও নান্দনিকভাবে তারা একটি অভিন্ন নদীমুখে মিলিত হয়েছে। ফারসি ভাষায় রচিত তাঁর কবিতা‘ যার পরিমাণ উর্দু রচনার তুলনায় অধিক‘ এক গভীর, প্রশস্ত ও ধীরগতির নদীর মতো, যেখানে দার্শনিক অনুসন্ধান, অধিবিদ্যাগত সংশয় এবং অস্তিত্বচিন্তা বিস্তৃত ¯্রােতে প্রবাহিত। বিপরীতে উর্দু গজলসমূহ তুলনামূলকভাবে ক্ষুদ্র অথচ তীব্র ¯্রােতের মতো‘ যেখানে আবেগ, প্রেম, ব্যথা ও আত্মসংঘাত ঘনীভূত হয়েপ্রকাশ পায়। ফারসি কবিতায় গালিব নিজেকে পারস্য-ইসলামী বৌদ্ধিক ঐতিহ্যের ধারাবাহিক উত্তরাধিকারী হিসেবে স্থাপন করেন, আর উর্দু গজলে তিনি হয়ে ওঠেন আধুনিক মানবচেতনার কণ্ঠস্বর। ভাষাগত এই দ্বৈততা আসলে বিভাজন নয়; বরং দু’টি নদীর মিলনস্থল, যেখানে ফারসির দার্শনিক গভীরতা উর্দুর আবেগময় স্বচ্ছতাকে সমৃদ্ধ করে। ফলে গালিবের কবিত্ব একটি ট্রান্সকালচারাল জলধারা রূপে আত্মপ্রকাশ করে‘ যেখানে ভাষা ভিন্ন হলেও ¯্রােত এক, এবং সেই ¯্রােত পাঠককে একই সঙ্গে অনুভব ও চিন্তার গভীরে টেনে নিয়ে যায়।
মির্জা গালিবের চিঠিপত্র উর্দু গদ্যের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র জলবিভাজিকা, যেখানে প্রথাগত অলঙ্কারময় ভাষা ভেঙে জন্ম নেয় কথোপকথনধর্মী ও স্বচ্ছ এক নতুন প্রবাহ। উনিশ শতকের মধ্যভাগে রচিত মকতুবাত-ই-গালিব কেবল ব্যক্তিগত যোগাযোগের দলিল নয়; এটি উর্দু গদ্যভাষার রূপান্তরের একটি নান্দনিক মুহূর্ত, যেখানে ভাষা নদীর মতো নিজস্ব পথ খুঁজে নিয়েছে। পূর্ববর্তী ফারসি-প্রভাবিত গদ্যের ভারি অলঙ্কার ও কৃত্রিমতা থেকে সরে এসে গালিবের চিঠিতে দেখা যায় দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, ব্যক্তিগত দুঃখ, অর্থনৈতিক সংকট ও সমকালীন ইতিহাসের স্বচ্ছ বিবরণ‘ যা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের মতোই অনায়াস ও প্রাণবন্ত। বিশেষত ১৮৫৭-এর বিদ্রোহোত্তর দিল্লির সামাজিক বিপর্যয় তাঁর চিঠিতে যে ব্যক্তিগত স্মৃতি ও প্রত্যক্ষতার জলধারা সৃষ্টি করে, তা ইতিহাসকে আবেগ ও মানবিকতার সঙ্গে যুক্ত করে। একাডেমিকভাবে বলা যায়, গালিবের চিঠিপত্র উর্দু গদ্যকে স্থির অলঙ্কার থেকে মুক্ত করে চলমান অভিজ্ঞতার ধারায়প্রবেশ করায়; ফলে আধুনিক উর্দু গদ্যের ভিত্তি গড়ে ওঠে এক স্বচ্ছ, মানবিক ও প্রবাহমান ভাষার মাধ্যমে।
তবে ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহ গালিবের জীবনে একটি ভাঙনরেখা‘ যেন ইতিহাসের প্রবল জলোচ্ছ্বাস দিল্লির সামাজিক-সাংস্কৃতিক ভূদৃশ্যকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এই বিপর্যয়ের অভিঘাত গালিবের কবিতা ও চিঠিপত্রে স্মৃতির নদী হয়েপ্রবাহিত হয়, যেখানে ব্যক্তিগত বেদনা ও সমষ্টিগত ধ্বংস একাকার। বিদ্রোহোত্তর দিল্লি তাঁর লেখায় একটি ক্ষতবিক্ষত তীরভূমি‘ পরিচিত মানুষ, আশ্রয়, পৃষ্ঠপোষকতা‘ সবই ¯্রােতে ভেঙে পড়ে। ফলে স্মৃতি এখানে স্থির দলিল নয়; বরং চলমান জল, যা বারবার ফিরে এসে ক্ষয়ের চিহ্ন উন্মোচন করে।
গালিবের মকতুবাত এই স্মৃতি‘ নদীর প্রধান ধারক। সেখানে দেখা যায়, ইতিহাসের বৃহৎ ¯্রােত ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার সঙ্গে মিশে গেছে‘ ক্ষুধা, দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, এবং সংস্কৃতির বিলুপ্তির বেদনা। স্মৃতি এখানে নস্টালজিয়া নয়; এটি এক সক্রিয়প্রবাহ, যা বর্তমানকে প্রশ্ন করে এবং ভবিষ্যৎকে অনিশ্চিত করে তোলে। এইভাবে ১৮৫৭ গালিবের লেখায় কেবল একটি সাল নয়; এটি একটি প্রবাহমান সময়‘ যা নদীর মতোই বহমান, ক্ষয়কারী ও পুনর্গঠক।
গালিবের কবিতা আধুনিক অস্তিত্ববাদী চেতনার সঙ্গে এক আশ্চর্য সাযুজ্য রচনা করে‘ যেন দর্শনের নদী কবিতার খাতে প্রবেশ করেছে। তাঁর শেরগুলোতে আত্মসচেতনতা, সংশয়, অর্থহীনতার অনুভব এবং ঈশ্বর-মানুষ সম্পর্কের টানাপোড়েন এমনভাবে উপস্থিত যে তা উনিশ শতকের সীমানা ছাড়িয়ে আধুনিক মনস্তত্ত্বে প্রবেশ করে। অস্তিত্ব এখানে কোনো স্থির সত্তা নয়; এটি প্রশ্নের ¯্রােত, যা নিশ্চিত উত্তরকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়।
এই চেতনার কেন্দ্রেআছে মানুষের একাকিত্ব ও স্বাধীনতা‘ যা গালিবের ভাষায় আবেগের ঢেউ হয়ে ওঠে। প্রেম, বিশ্বাস, স্বর্গ‘ সবই তাঁর কবিতায় সম্ভাবনার জলরাশি, চূড়ান্ত সত্য নয়। ফলে গালিবের সাহিত্য আধুনিক অস্তিত্ববাদীদের মতোই দেখায় যে মানুষ অর্থ খুঁজে ফেরে এক অনিশ্চিত ¯্রােতে, যেখানে অর্থ নিজেই তরল। এই তরলতা‘ এই জলীয় অস্তিত্ব‘ গালিবকে কেবল তাঁর সময়ের কবি নয়, বরং আধুনিকতার এক অগ্রদূত করে তোলে।
গালিবের প্রেম নদীর ¯্রােত, বৃষ্টির ঝরনা, ঢেউয়ের লহর‘ সবই একত্রে প্রবাহিত। প্রেমের আকাক্সক্ষা, ব্যথা, অনিশ্চয়তা‘ এসব ঢেউয়ের মতো ওঠানামা করে। সেজন্য তাঁর লেখায় অনুরণিত হয় “হাজারো খোয়াহিশ এমন যে প্রতিটি খোয়াহিশে প্রাণ যায়।”এই লাইনটি যেমন নদীর লহরী, তেমনি প্রেমের ঢেউ‘ অবিরাম, বহুমাত্রিক, কখনও শান্ত, কখনও ঝড়ো। পাশাপাশি নদী গালিবের স্মৃতির প্রতীক। নদীর মতো স্মৃতি প্রবাহিত হয়, অতীত বহন করে, স্থির হয় না। দিল্লিরধ্বংস, মুঘল দরবার, শহরের সংস্কৃতি‘ সবই নদীর ¯্রােত দ্বারা জীবন্ত রাখা হয়েছে। নদী একটি স্মৃতি–¯্রােত, যা গালিবের আবেগ এবং দার্শনিক অনুসন্ধানকে বহন করে। আবার ব।বৃষ্টি এবং ঢেউ গালিবের আবেগ ও চিন্তার জলতরঙ্গ চিত্র। ঢেউয়ের অস্থিরতা, নদীর গভীরতা‘ মানুষের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, প্রেম, শূন্যতা ও আত্মচিন্তার প্রতিফলন।
চিঠি ও গজল‘ দুইই নদী এবং বাতাসের মতো, আবেগ এবং চিন্তার প্রবাহ বহন করে। গালিবের কবিতা ও চিঠিপত্রে জল–নন্দনতত্ত্বের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে প্রেম, স্মৃতি, ইতিহাস ও অস্তিত্ব‘ সবই নদী ও জলধারার মতো প্রবাহমান, স্থির নয়। তাঁর বহুল উচ্চারিত লাইন‘ “ইশক পর জোর নাহি হ্যায় য়ে ও আতিশ গালিব, কি লাগায়ে না লাগে আর বুজায়ে না ব্যানে”। (প্রেম কোনো নিয়ন্ত্রণ মানে না; সে এমন এক আগুন, যা জ্বালাতে চাইলেও জ্বলে না, নিভাতে চাইলেও নিভে না) এই শের-এ প্রেম এক অনিয়ন্ত্রিত ¯্রােতের মতো‘ যা নদীর মতোই নিজের পথে চলে, বাঁধ মানে না। একইভাবে স্মৃতি ও আকাক্সক্ষার জলরাশি ধরা পড়ে তাঁর আরেক বিখ্যাত পংক্তিতে‘ “হাজারো খোয়াহিশেন আইসি কি হর খোয়াহিশ পে দম নিকলে, বহুত নিকলে মিরে আর্মান লেকিন পির ভি কাম নিকলে”(হাজারো ইচ্ছা এমন যে প্রতিটি ইচ্ছায়প্রাণ যায়; অনেক ইচ্ছা পূরণ হলেও তবু তা কম মনে হয়) এখানে ইচ্ছা ও স্মৃতি নদীর ঢেউয়ের মতো একের পর এক উঠে আসে‘ পরিতৃপ্তি নয়, বরং আরও প্রবাহ সৃষ্টি করে।
ইতিহাস ও ব্যক্তিগত অস্তিত্বের অস্থিরতা গালিব প্রকাশ করেন এই লাইনটিতে‘ “হাম কো ওন সে ওয়ফা কি হ্যায় উম্মীদ, জো নাহি জানতে ওয়ফা কিয়া হ্যায়” (আমরা আশা করি আনুগত্য তাঁদের কাছ থেকে‘ যাঁরা জানেনই না আনুগত্য কী)
এখানে সম্পর্ক, সমাজ ও ইতিহাস এক অনিশ্চিত নদীতীরে দাঁড়িয়ে‘ যেখানে প্রত্যাশা বারবার ভাঙে, ¯্রােত ঘুরে যায়।
অস্তিত্ববাদী চেতনার জলীয়প্রকাশ ঘটে এই আত্মস্বীকারোক্তিতে‘ “ইশক নে গালিব নিকাম্মা কর দিয়া, বরনা হাম ভি আদমি থে কাম কে” (প্রেম গালিবকে অকেজো করে দিয়েছে; নইলে আমিও তো কাজের মানুষ ছিলাম)এখানে ‘আমি’ একটি ভাঙা নৌকার মতো‘ নিজের অস্তিত্ব নিয়েপ্রশ্ন করতে করতে ¯্রােতে ভেসে চলে। আর বাস্তব ও কল্পনার দ্বৈততা, যা নদীর দুই তীরের মতো পাশাপাশি থাকে, ধরা পড়ে এই পংক্তিতে‘ “হাম কো মালুম হ্যায় জান্নাত কি হাকিকত, দিল কে খুশ রখনে কো গালিব ইয়েহ খায়াল আচছা হ্যায়” (আমরা জানি স্বর্গের বাস্তবতা; তবু হৃদয়কে সুখী রাখতে এই কল্পনাই সুন্দর)
এখানে স্বর্গ একটি মানসিক জলধারা‘ যা বাস্তব নয়, তবু জীবনধারণের জন্য অপরিহার্য।এইসব উদ্ধৃতি প্রমাণ করে যে গালিবের কবিতা ও চিঠিপত্রে নদী, বৃষ্টি ও ঢেউ কেবল নান্দনিক প্রতীক নয়; তারা মানবিক আবেগ, সাংস্কৃতিক স্মৃতি ও দার্শনিক অনুসন্ধানের বহনকারী প্রবাহ। জল-নন্দনতত্ত্ব গালিবের কবিত্বকে বহুমাত্রিক, ট্রান্সকালচারাল এবং অন্তর্দৃষ্টি-সমৃদ্ধ করে তোলে। তাঁর কবিতার নদী কখনও থেমে যায় না‘ তার ¯্রােত চিরন্তন, তরল, জীবন্ত এবং পুনর্নবীকরণশীল।
প্রকৃতঅর্থে মির্জা গালিবের কবিতা ও চিঠিপত্রকে জল-নন্দনতত্ত্বের আলোকে পাঠ করলে দেখা যায়,তাঁর সাহিত্য এক স্থির পাঠ্য নয়, বরং একটি প্রবাহমান সাংস্কৃতিক ও দার্শনিক নদী হিসেবে উদ্ভাসিত হয়। প্রেম, স্মৃতি, ইতিহাস ও অস্তিত্ব‘ সবই তাঁর লেখায় জলধারার মতো চলমান; কখনো আবেগের ঢেউ হয়ে ওঠে, কখনো স্মৃতির ¯্রােত, কখনো বা সংশয়ের গভীর জল। নদী, বৃষ্টি ও ঢেউ গালিবের কাছে নিছক প্রকৃতির প্রতীক নয়; এগুলি মানবচেতনার রূপান্তরশীল অবস্থার ভাষা, যেখানে অনুভূতি ও চিন্তা পরস্পরের মধ্যে প্রবাহিত হয়। ফারসি ও উর্দু ভাষার মিলন তাঁর কবিত্বে একটি ট্রান্সকালচারাল জলপ্রবাহ সৃষ্টি করেছে, যা ভৌগোলিক ও সময়গত সীমা অতিক্রম করে আধুনিক পাঠকের মনেও সাড়া জাগায়। বিশেষত ১৮৫৭ সালের ঐতিহাসিক অভিঘাত ও ব্যক্তিগত সংকট তাঁর লেখায় স্মৃতি-নদীকে আরও গভীর ও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন করেছে। ফলে গালিবের জল-নন্দনতত্ত্ব আমাদের শেখায় যে কবিতার নদী কখনো থেমে যায় না‘ তার ¯্রােত চিরন্তন, বহুমাত্রিক, তরল এবং জীবন্ত; এবং সেই প্রবাহেই গালিব আজও সমকালীন, আজও প্রবাহমান।
অপরাধ ও দুর্নীতি: জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি, তথ্য বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয়
শিক্ষা: এসএসসি পরীক্ষা ২১ এপ্রিল শুরু