image

ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৬

লোরকার দেশে

চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ

(পূর্ব প্রকাশের পর)

গতকাল পিকাসোর ছবি ‘গোয়ের্নিকা’ দেখার পর থেকেই তা মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। ছবিটির রেখা, রঙ ও অবয়বগুলি জটিল ও রহস্যময়‘ যেন এক বড় ধাঁধা। তার পুরো অর্থ বের না করা পর্যন্ত মন স্বস্তি পাচ্ছে না।

এ যেন এক আবর্ত, তা থেকে বের হয়ে আসতে যেতে হবে অন্য এক বিষয়ে, যা সম্পূর্ণ আলাদা, তা হয়তো মুছে দিতে পারবে এ ধোঁয়াশা।

নিসর্গ আমাদের কাছে সবসময় এক বড় আশ্রয়। নাতাশা কদিন ধরেই বলছিল রেথিরো পার্কে বেড়াতে যাবে। আজ ভোরে প্রথমেই মনে আসল এ পার্কের কথা। এর কথা বলতেই সবাই রাজি হয়ে গেল।

‘পার্কে এল রেথিরো’-র উত্তর পাশ দিয়ে প্রবেশ করতেই সামনে পড়ল অপূর্ব সুন্দর এক কৃত্রিম হৃদ‘ ‘এসথাঙ্কে দেল রেথিরো’। সবাই যেয়ে বসলাম হৃদের কিনারের বেঞ্চে। ভোরের শিশিরভেজা নরম বাতাস শরীর-মনে ছুঁইয়ে দিল শান্তির পরশ। হৃদের স্বচ্ছ নীল জলে ভেসে বেড়াচ্ছে বেশ কিছু গনডোলা, তাদের বুকে চড়ে আছে মানুষ, হয়তো আমাদের মতোই শান্তি ও স্বস্তির প্রত্যাশায়। আজ গনডোলায় চড়ে ঘুরে বেড়ানোর চেয়ে তা দেখাই বেশি আনন্দের লাগলো। হৃদের বুকে ভেসে আছে যেন হাঁসের এক দল‘ কাছে আসছে, আবার ধীরে ধীরে দূরে সরে যাচ্ছে, আবার কাছে আসছে। তাদের সাঁতরানো চলছে নিরবধি কাল, কতক্ষণ এভাবে কেটে গেল, বুঝতে পারলাম না। সবকিছু ভুলে হারিয়ে গেলাম হৃদের কাকচক্ষু জলের অতলে।

এখানেই পার্ক ভ্রমণ শেষ হলে ভালো হতো, কাহিনি বা ইতিহাস শুনতে হতো না। সামনের এক সুন্দর মনুমেন্ট দেখে একজনকে জিজ্ঞেস করলাম, এটি কার। এরপর বেরিয়ে আসল কিছু কাহিনি, কিছু ইতিহাস।

‘এল রেথিরো’ পার্কটি ঘিরে আছে এক মা ও ছেলের কাহিনি।

কাহিনির প্রথম ভাগটি দুঃখের এবং কিছুটা অগৌরবের। মা রানি দ্বিতীয় ইসাবেলা১ ছিলেন স্পেনের রানি‘ দীর্ঘ ২৫ বছরের শাসন, সেজন্যই হয়তো তা বয়ে এনেছিল অসন্তোষ, যার কাহিনি অনেক দীর্ঘ। ১৮৬৮ সালে ‘লা গ্লোরিওসা’ নামে খ্যাত এক বিপ্লব রানি দ্বিতীয় ইসাবেলা-কে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর এই ‘এল রেথিরো’ পার্কটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়। এর আগে এটি ছিল রাজপরিবারের একটি উদ্যান।

ইসাবেলা প্যারিসের নির্বাসিত জীবনে পুত্র আলফনসো-কে ভবিষ্যতের জন্য তৈরি করতে থাকেন। তাই তাকে পাঠান ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ার ভাল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। ১৮৭০ সালে রাণী ইসাবেলা আনুষ্ঠানিকভাবে আলফনসোর পক্ষে সিংহাসন পরিত্যাগ করেন।

কাহিনির দ্বিতীয় ভাগটি তবে গৌরবের। ১৮৭৪ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানের পর আলফনসো রাজা হিসেবে স্পেনে ফিরে আসেন। তাঁকে বলা হতো দ্বাদশ আলফনসো‘ যিনি পেয়েছিলেন এক সংক্ষিপ্ত জীবন, মাত্র ২৭ বছরের। এর মধ্যে ছিল ১১ বছরের শাসনকাল‘ ১৮৭৪ থেকে ১৮৮৫ পর্যন্ত‘ এ কম সময়ের মধ্যেও অনেক বড় কীর্তি গড়েছিলেন আলফনসো। তার মধ্যে প্রধান হলো নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি আনয়ন। তাঁর প্রবর্তিত এ বেসামরিক শাসন ব্যবস্থা ১৯২৩ সালে প্রিমো দে রিভেরা-র সামরিক অভ্যুত্থান পর্যন্ত টিকে ছিল। সেজন্য তাঁর সম্মানে ‘এল রেথিরো’ পার্কটিতে নির্মিত হয়েছে এক সুন্দর মনুমেন্ট। সামনেই দেখি, অর্ধবৃত্তাকার এক স্তম্ভমালার মাঝে উঁচু এক বেদীতে অশ্বারোহী রাজা দ্বাদশ আলফনসো আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন গর্বিত ভঙ্গীতে। স্পেনের এ বিখ্যাত রাজা আলফনসোকে প্রেক্ষাপটে রেখে আমরা সবাই ছবি তুললাম এ সুন্দর হৃদ ও চারদিকের পার্কের।

ইসাবেলার কাহিনি স্মরণ করে ভারাক্রান্ত মনে ‘পার্কে দেল রেথিরো’ থেকে বের হয়ে আসলাম। পার্কটিতে এসেছিলাম পিকাসোর ছবি ‘গোয়ের্নিকা’ দেখার ঘোর কাটাতে, এখন বরং যোগ হলো এক হালকা বিষাদ।

নাতাশা স্পেনীয় ভাষা ও সাহিত্যের চর্চা করছে। আমি সব সময় লোরকার কথা বলাতে সে বলল, ‘আরো একজন সাহিত্যিক আছেন, যার স্মৃতি জড়ানো স্থান না দেখলে স্পেন দেখা অসম্পূর্ণ থাকবে। তিনি হলেন ‘মিগেল দে সের্ভান্তেস’। বললাম, “এ নামটি প্রায়ই শুনি স্পেনীয় সাহিত্যের আলোচনায়। চারশো বছর আগে তাঁর লেখা ‘ডন কুইকসোট’-কে অনেকে মনে করেন বিশ্ব সাহিত্যের প্রথম আধুনিক উপন্যাস।” নাতাশা বলল, “উপন্যাসের নামটি হল ‘দন কিহোতে’, ডন কুইকসোট নয়।” বুঝলাম, এরকম অনেক উচ্চারণের মতো এটিও এতদিন ভুল উচ্চারণ করে এসেছি।

নাতাশাই বের করে রেখেছিল‘ ‘মুজেও কাসা নেথাল দে সের্ভান্তেস’‘ সের্ভান্তেস এর জন্মভিটার জাদুঘর। এটি মাদ্রিদের এক ঐতিহাসিক এলাকা ‘আলকালা দে এনারেস’-এ অবস্থিত। পার্কে এল রেথিরো থেকে সেখানে প্লাসা দে সের্ভান্তেস এ টেক্সিতে যেতে লাগল ৩৫ মিনিট ।

‘প্লাসা দে সের্ভান্তেস’‘ যার নামে এই প্লাজা, সেই বিখ্যাত লেখক মিগেল দে সের্ভান্তেস এর মনুমেন্টটি যে এর মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকবে তা আমাদের প্রত্যাশিত ছিল। ঠিকই, তা আছে প্লাজার কেন্দ্রে। এর চারপাশে ক্যাফে-রেস্তোরাঁ-স্যুভেনির শপ আর লোকজনের আনাগোনা। সের্ভান্তেসের জন্মভিটার জাদুঘরটিই এ এলাকাকে বিখ্যাত করে রেখেছে। এখান থেকে ‘কায়ে মেয়র’ রাস্তা ধরে কিছুটা হেঁটে দেখি, একটি সাইনবোর্ডে লেখা ‘মুজেও কাসা নেথাল দে সের্ভান্তেস’। সামনে ১৬শ’-১৭শ’ শতাব্দীর একটি পুরনো দোতলা ভবন। মনে করা হয় ২৯ সেপ্টেম্বর ১৫৪৭ সালে এ ভবনের একটি কক্ষে মিগেল সের্ভান্তেসের জন্ম। ভবনের প্রবেশপথে এক বেঞ্চে দুইটি ভাস্কর্য। পরে জানলাম তারা হচ্ছে‘ ‘ডন কিহোতে ও সানচো পানজা’‘ সের্ভান্তেসের ‘দন কিহোতে’ উপন্যাসের দুইটি প্রধান চরিত্র। ২০০৫ সালে উপন্যাসটির ১ম খ- প্রকাশের ৪০০তম বার্ষিকীতে ভাস্কর্য দুটি স্থাপিত হয়। ভবনটির মাঝখানে স্তম্ভ-শোভিত এক আঙ্গিনা, যার চারদিকে বিভিন্ন কক্ষের অবস্থান। আঙ্গিনার কোনায় রয়েছে পাথর বাঁধানো এক কুয়া, যা থেকে সারভেন্তেস এর পরিবার পানি সংগ্রহ করত। বাসাটির নিচের তলায় ছিল রান্নাঘর, খাবার ঘর, ও একটি বিশেষ কক্ষ‘ সার্জনের অফিস‘ যেখানে সের্ভান্তেসের বাবার অতিথি ও রোগীরা এসে বসতেন। দ্বিতীয় তলায় ছিল বসার ঘর ও শয়ন কক্ষ। সেখানে এখন রাখা আছে সে সময়ের বিভিন্ন সংগ্রহ‘ আসবাবপত্র, চীনামাটির পাত্র, বিভিন্ন নকশার কাজ ও চিত্রকর্ম। আর আছে তাঁর বাবার চিকিৎসা পেশার বিভিন্ন সরঞ্জাম। কয়েকটি কক্ষে রাখা আছে ১৭শ শতাব্দী থেকে ২১শ শতাব্দী পর্যন্ত সময়ে প্রকাশিত ‘মিগেল দে সের্ভান্তেস’ এর বিভিন্ন বইয়ের সংস্করণ। আর একটি কক্ষে আছে একটি তথ্যসূত্র পাঠাগার‘ এখানে দেখি অনেকে নিবিড় মনে পড়ছে আর নোট নিচ্ছে।

জন্মভিটার জাদুঘর থেকে বের হয়েই বললাম, ‘এতক্ষণ সের্ভান্তেসের স্মৃতি-বিজড়িত কিছু দেখলাম। চল, এবার দেখি লোরকার স্মৃতি-বিজড়িত কিছু।’ তারা কেউ আপত্তি না করাতে উবারে একটি ঠিকানা Teatro Fontalba, Gran Via 30, Madrid 28013 দিয়ে টেক্সিতে উঠে বসলাম। ঠিকানাটি পেয়েছিলাম লোরকাকে নিয়ে লেখা এক বইয়ে২, যেখানে উল্লেখিত যে, এই থিয়েটারে মঞ্চস্থ হয়েছিল লোরকার নাটক ‘মারিয়ানা পিনেদা’, ১২ অক্টোবর ১৯২৭ এবং তার পরে অনেকদিন। তার মঞ্চসজ্জা ও পরিচ্ছদ পরিকল্পনায় ছিলেন সালভাদর দালি। প্রধান চরিত্রে অভিনয় করেছেন মার্গারিটা জিরগু।

কিছুক্ষনের মধ্যেই টেক্সি চলে আসল এ ঠিকানায়। তা থেকে নেমে সামনে দেখি এক নাইকি স্টোর‘ সারি সারি ক্রীড়া জুতা, পোশাক ও সরঞ্জাম সাজানো। ভাবলাম থিয়েটারটি আশেপাশে হবে। তবে তার কোন চিহ্ন দেখলাম না কোথাও। নাবিল গুগলে সার্চ করে দেখল এখানে কোন থিয়েটার নেই। কাছেই এক তাপাস বারে বসে কিছু ¯œ্যাকস খেয়ে নিলাম। এরপর পাশের টেবিলে একাকী বসা বয়স্ক একজনকে জিজ্ঞেস করলাম ‘থিয়েথ্রো ফনথালবা’ কোথায়। উনি একটু হেসে বললেন, ‘এ থিয়েটারটি কয়েক বছর আগে বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক পুরনো ও নামকরা থিয়েটার ছিল। আমিও এখানে অনেকবার নাটক দেখেছি। এখন সব কিছু স্মৃতি।’ একটু থেমে বললেন, ‘এখানে এই গ্রান ভিয়াতে মাদ্রিদের সবচেয়ে বেশি থিয়েটার আছে। সেজন্য এটাকে বলা হয় ‘স্প্যনিশ ব্রডওয়ে’। তোমরা কি জান, নিউ ইয়র্ক ও লন্ডনের পরেই মাদ্রিদের থিয়েটার পাড়ার অবস্থান? এখান থেকে ১০ মিনিট হাঁটলেই পাবে বিখ্যাত সব থিয়েটার‘ ক্যাপিথল, কলোসিয়ম, লোপে দে ভেগা, আরো কত! আর একটু দূরে আছে বিশ্বমানের দুইটি থিয়েটার‘ থিয়েথ্রো রিয়াল ও থিয়েথ্রো সারসুয়েলা।’ বললাম, ‘গ্রাসিয়াস! থিয়েটারে কোন শো দেখা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমরা ‘থিয়েথ্রো ফনথালবা’ খুঁজছিলাম, কারণ সেখানে লোরকার একটি নাটক মারিয়ানা পিনেদা মঞ্চস্থ হয়েছিল ১৯২৭ সালে। এটি লোরকার স্মৃতি বিজড়িত, তাই তা দেখার ইচ্ছে ছিল। থাক, এটি এখন নেই।’ ভদ্রলোক, অনেকক্ষণ পরে তাঁর নাম বললেন, হোজে অর্তেগা। এরপর বললেন, ‘এতক্ষণ তা বলোনি কেন? লোরকার নাটক দেখিয়ে বিখ্যাত হয়ে আছে ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’। বছর দুয়েক আগে আমি সেখানে লোরকার নাটক ‘এল পাবলিকো’৩ দেখেছি। এ নাটকটি খুব একটা পরিচিত নয়, তবে খুবই ভাল কিন্ত জটিল নাটক। তোমরা থিয়েথ্রো এসপানিয়ল যেতে চাইলে এখান থেকে হেঁটে যেতে পার, এটি প্লাসা দে সান্টা আনা-তে, মাত্র ১৫ মিনিট লাগবে। যেতে যেতে এই ‘গ্রান ভিয়া’ দেখতে পার। এটি হল মাদ্রিদের হৃৎপি-।’ বললাম, ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল আমার লিস্টে আছে। এটি হবে আজকের সবার শেষের গন্তব্য।’ হোজে অর্তেগাকে অনেক ধন্যবাদ দিয়ে বের হয়ে আসলাম আবার গ্রান ভিয়াতে।

আমাদের পরবর্তী গন্তব্য হল ‘থিয়েথ্রো এসলাভা’।

‘গ্রান ভিয়া ও কায়ে দেল আরেনাল’ দিয়ে ৮-১০ মিনিট হেঁটে আসলাম এক ঐতিহাসিক হলে, সামনে নিয়ন সাইনের সুন্দর লেখা‘ ‘থিয়েথ্রো এসলাভা’। লোরকার প্রথম পূর্ণ দৈর্ঘ্য নাটক ‘এল মালেফিসিও দে লা মারিপোসা’৪এখানে মঞ্চস্থ হয় ১৯২০। দর্শকদের সাড়া পেতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র ৪টি শো এর পর তা বন্ধ হয়ে যায়।

‘থিয়েথ্রো এসলাভা’‘ ১৮৭২ সালে থিয়েটার শুরুর সেই নামটি এখনো আছে, তবে ভেতরে হয়েছে অনেক পরিবর্তন। এটি এখন আর নাটক দেখার হল নয়। বরং এটি একই সাথে এক ডিসকো ক্লাব, কনসার্ট হল ও ফ্লেমেনকো নাচ-ডিনারের হল। ২০০০ বর্গ মিটারের হলটি ৪তলা বিশিষ্ট। বিখ্যাত ফরাসি স্থপতি ফিলিপ্পে স্টার্ক এর নকশা ও পরিকল্পনায় পুরনো হলটির ব্যাপক সংস্কারের পর তা নতুন করে চালু করা হয় ২০২২ সালে। তবে তার মূল স্থাপত্য, যেমন সিলিংয়ের গম্বুজ, কাঠের কারুকাজ, সিঁড়ির দু’পাশের হাতল ইত্যাদি অপরিবর্তিত রাখা আছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা, আধুনিক অ্যাকোস্টিক হল ও সরঞ্জাম যোগ করা হয়েছে। সময়ের বিবর্তনে কত কিছুর পরিবর্তন হয়ে গেল।

এরপরের গন্তব্য‘ প্লাসা দে সান্টা আনা‘ মাদ্রিদের কেন্দ্র পুয়ের্থা দেল সল এর কাছাকাছি। সবদিকে ক্যাঁফে, রেস্তোরাঁ, বই-ফুল-ফল-স্যুভেনিরের দোকান, আর পপলার ও ওক গাছের সারির মাঝে এর অবস্থান।

এ প্লাসার ঠিক কেন্দ্রে এক মনুমেন্টে বসানো লোরকার ব্রোঞ্জ ভাস্কর্য‘ তিনি দাঁড়িয়ে আছেন, দু’হাতে ধরে রেখেছেন একটি ভরতপক্ষী যা উড়তে উদ্যত। মনুমেন্টটির ভিত্তিতে লেখা আছে: ‘MADRID, A FEDERICO GARCIA LORCA’, অর্থাৎ, ‘ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার প্রতি মাদ্রিদ’। শুনেছি, লোরকার গলায় এক লাল রুমাল জড়িয়ে দেয় তাঁর ভক্তরা, পরে তা সরিয়ে দেয় বিরোধী পক্ষ। কোন এক সময় ভরতপক্ষীটিও হাত থেকে তুলে নেয়া হয়েছিল। পরে তা আবার স্থাপিত হয়।

মনুমেন্টটিতে দাঁড়িয়ে লোরকা তাঁকিয়ে আছেন সামনের দিকে‘ সেখানে বিশাল, সুন্দর স্থাপত্যের ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’৫। এই থিয়েটারেই প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল লোরকার নাটক ‘ইয়ের্মা’ ২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালে‘ সে বছরই নাটকটি তিনি লিখেছিলেন এক নিঃসন্তান নারী ইয়ের্মার জীবনের বেদনা ও করুণ পরিণতি নিয়ে। প্রথমে কিছুটা প্রতিবাদ ও সমালোচনার সম্মুখীন হলেও পরে এটি বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’ এ লোরকার ‘ইয়ের্মা’ নাটকটির মঞ্চায়নের ৫০তম বার্ষিকী উপলক্ষে ব্রোঞ্জের এ ভাস্কর্যটি ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৬ সালের মধ্যে সৃষ্টি করেন স্থপতি হুলিও লোপেজ হারনানডেজ। তবে প্লাজায় বড় ধরনের সংস্কার কাজ চলতে থাকায় লোরকার ভাস্কর্যটি তখন স্থাপিত হয়নি। এর পরে মিলল আরো বড় উপলক্ষ‘ ১৯৯৮ সালে লোরকার জন্মশতবার্ষিকী‘ ভাস্কর্যটি সে বছর স্থাপিত হয় প্লাজার কেন্দ্রে।

প্লাজার পশ্চিম প্রান্তে স্থাপিত হয়েছে ১৭শ শতাব্দীর স্পেনের বড় কবি ও নাট্যকার পেদ্রো কালদেরন দে লা বারাকা-র মার্বেল ভাস্কর্য। এ দুজন কবি ও নাট্যকারের মনুমেন্ট যেন প্রকাশ করছে এ এলাকাটির গুরুত্ব। এটি মাদ্রিদের শিল্পী-সাহিত্যিকদের মিলনের সবচেয়ে প্রিয় জায়গা। তাই এর নাম ‘বারিও দে লাস লেথ্রা’, অর্থাৎ ‘সাহিত্য এলাকা’। এখানে প্রায়ই আসতেন আর্নেস্ট হেমিংওয়ে। সামনেই তাঁর প্রিয় রেস্তোরাঁ ‘সেরভেসেরিয়া এলেমানা’। এর সামনে যেতেই বললাম, ‘চল, লোরকার স্মৃতি থেকে এবার হেমিংওয়ের স্মৃতিতে যাই। এ রেস্তোরাঁয় আজকের ডিনার সারি।’ সবাই রাজী হওয়াতে ‘সেরভেসেরিয়া এলেমানা’-র ভেতরে যাই। সন্ধ্যার পর পর এ সময়টি তাদের বেশ ব্যস্ততার।

বেশ জমজমাট এক পরিবেশ, আমরা উপভোগ করছি, আর দেখছি চারপাশের মানুষ, মনুমেন্ট ও থিয়েটার। ডিনার সেরে আবার গেলাম লোরকার মনুমেন্টের সামনে।

লোরকার সাথে ছবি তুলে আমরা এগিয়ে গেলাম ঠিক সামনেই‘ ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’ দেখতে, যেখানে তাঁর নাটক ‘ইয়ের্মা’ প্রথমমঞ্চস্থ হয়েছিল। এটি মাদ্রিদের সবচেয়ে পুরনো থিয়েটার। লোরকার নাটক ছাড়াও এখানে মঞ্চস্থ হয়েছে অনেক বিখ্যাত নাটক। এখানে ‘ইয়ের্মা’-র নাম চরিত্রে অভিনয়কারী স্পেনের বিখ্যাত অভিনেত্রী ‘মার্গারিতা জিরগু’-র নামে একটি হল আছে। ‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’ প্রধান তোরণে অনেক বিখ্যাত নাট্যকারের নাম খোদিত আছে, এর মাঝে আছে একটি প্রিয় নাম‘ ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা।

‘থিয়েথ্রো এসপানিয়ল’-এর করিডোরে ঘুরে বেড়াচ্ছি, কোন শো শুরু হবে, তাই এখন দর্শকে পরিপূর্ণ। কল্পনায় ফিরে গেলাম ২৯ ডিসেম্বর ১৯৩৪ সালের এক রাতে, যখন নাটক ‘ইয়ের্মা’ শুরু হচ্ছে। এখনো যেন শুনতে পাচ্ছি নাটকের শুরুতে তার স্বপ্নের ছেলেকে নিয়ে ইয়ের্মার ঘুম পাড়ানো গান:

ইয়ের্মা, শিয়োতে বসে

কোথা থেকে বল আসলি ও সোনা, ওরে ও ছেলে আমার?

‘আসছি গো সেই জমাট কঠিন বরফের চুড়ো থেকে।’

বল রে, কী তোর চাই বল, সোনা, ওরে ও ছেলে আমার?

‘তোমার ও শাড়ির তাপ ভাঁজটুকু পাই যদি, তাই চাওয়া।’

ছুঁচে সুতো পরাতে পরাতে

ঘন ঘন তোলপাড় হয়ে উঠুক ডালপালা রোদে রোদে!

ঝাঁপ দিয়ে ছুটে বেড়াক ঝর্না চার ধার আমাদের।

যেন কথা বলছে একটা ছোটো ছেলের সঙ্গে

কুকুর উঠছে ডাক পেড়ে ওই উঠোনের চত্বরে,

হাওয়া যেন গান গেয়ে গেয়ে ওঠে গাছে গাছে থেকে থেকে।

ষাঁড় রাব করে উঠল ও তার রাখালের উদ্দেশ্যে,

দেখ রে কোঁকড়া করে করে দেয় চাঁদ আমার চুলগুলো।

অতদূর থেকে এলি, বল তোর কী চাই, ওওে ও ছেলে?।৬

Ref:

১. দ্বিতীয় ইসাবেলা ছিলেন একীভূত স্পেনের একমাত্র Queen Regnant‘ যিনি কোন রাজার স্ত্রী হিসেবে নন, বরং নিজের অধিকারে সিংহাসনে বসেন ও শাসন করেন। তিনি ১৮৩০ সালের ১০ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সপ্তম ফার্দিনান্দ-এর কোন পুত্র সন্তান না থাকায় তিনি স্যালিক আইন পরিবর্তন করে ইসাবেলাকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী করেন। এর বিরোধিতা কওে তবে চাচা কার্লোস সিংহাসন দাবি করলে কার্লিস্ট যুদ্ধ শুরু হয়। ১৮৩৩ সালের ২৯ শে সেপ্টেম্বর মাত্র ৩ বছর বয়সে দ্বিতীয় ইসাবেলা সিংহাসনের অধিকার পেলেও ১৮৪৩ সালে পূর্ণ বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত তাঁকে অপেক্ষা করতে হয়। তখন তিনি ব্যক্তিগতভাবে শাসন শুরু করেন। প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, সামরিক অভ্যুত্থান ও ব্যক্তিগত কেলেঙ্কারীর কারণে তাঁর শাসনামলে অসন্তোষ দানা বেঁধে ওঠে। অতপর ১৮৬৮ সালে এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ক্ষমতাচ্যুত ও নির্বাসিত হন।

২. Edwards, Gwynne. 1980. Lorca: The Theatre Beneath the Sand. London and New York: Marion Boyars

৩. El Publico: ‘এল পাবলিকো’ লোরকার সবচেয়ে বেশি জটিল ও গভীর নাটক, যা তিনি ১৯৩০ সালের দিকে লিখেছিলেন। স্পেনীয় নাটকে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা ছিল লোরকার উদ্দেশ্য। এ নাটকটিতে আছে এক ঝলমলে কাব্যিকতা।

৪. El maleficio de la mariposa : এল মালেফিসিও দে লা মারিপোসা

৫. থিয়েথ্রো এসপানিয়লএ লোরকার আরো কয়েকটি নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। এই থিয়েটারে ‘লা ছাপাতেরা প্রদিওহিওসা’ নাটকের প্রথম মঞ্চায়ন হয়েছিল ২৪ ডিসেম্বর ১৯৩০ সালে। এর নাট্য নির্দেশক ছিলেন সিপ্রিয়ানো রিভাস ছেরিফ ও অভিনয় করেছিলেন মার্গারিতা জিরগু। ১৯৩৩ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘আমর দে দন পারলিম্পলিন কন বেলিসা এন সু হারদিন’। মে ২০২৩ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘এল পাবলিকো’। ২০২৫ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল ‘রোমানসে সোনামবুলো’।

‘বোদাস দে সাংগ্রে’ প্রথম মঞ্চস্থ হয় মাদ্রিদের ‘থিয়েথ্রো বিয়াথ্রিছ’ থিয়েটারে, ৮ মার্চ ১৯৩৩ সালে। এখানে এটি বিপুল সাফল্য লাভ করে।

লোরকার ‘রুরাল ট্রিলজী’-র শেষ নাটক ‘লা কাসা দে বারনার্দা আলবা’। এটি লোরকা তাঁর মৃত্যুর দু’মাস আগে ১৯ জুন ১৯৩৬ সালে লেখা শেষ করেন। বুয়েনিস আইরেস এর ‘আভেনিদা থিয়েটারে’ ৮ মার্চ ১৯৪৫ সালে নাটকটি প্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল।

নাটক ‘মারিয়ানা পিনেদা’-র শুভ মহরত হয় ২৪ জুন ১৯২৭ বার্সেলোনার ‘থ্রিয়েথ্রো গয়া’-তে। মাদ্রিদে এর প্রথম মঞ্চায়ন হয় ১২ অক্টোবর ১৯২৭ সালে ‘থ্রিয়েথ্রো ফনথালবা’-তে, যা এখানে বিপুল সফলতা পায়।

৬. ণবৎসধ: উব ফড়হফব ারবহবং..: ইয়ের্মা, আত্মগত ১: অনুবাদ: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়।

সম্প্রতি