image

সাময়িকী কবিতা

দু’টি কবিতা
নাসির আহমেদ
ফাল্গুনে কৃষ্ণচূড়া, শিউলি শীতের

সমুদ্র গর্জন নাবিকের চিরদিন।

তুমি কার, তা-ও জানি, মৌন দীর্ঘশ্বাস

আমি যে ময়রা, মিষ্টি নিষিদ্ধ আমার আজীবন।

বৃক্ষহারা পাখির স্বভাবে

আমি অনিচ্ছুক মরুচারী চিরদিন

তোমার বসন্ত দিনে দিয়েছো মুগ্ধতা

তাতেই অরণ্য স্বাদ পেয়েছি হঠাৎ

তবু দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়

সকৃতজ্ঞ এই বোধ কবিতায় থাক।

ঋণ

নির্দ্বিধায় বলে ফেলি

ও আশ্চর্য সবুজ উদ্যান!

তোমার পাতার ক্লোরোফিলে

দীর্ঘ শ্বাসকষ্ট শেষে নিঃশ্বাস নিলাম।

বিপন্ন বিস্ময় শুধু জীবনানন্দের

চেতনায় জাগে নাই, আমাদেরও

ব্যক্তিগত গোপন বিস্ময় কিছু আছে প্রত্যেকের।

সমুদ্রের স্বপ্ন দেখে আজো মরানদী দেশে দেশে।

স্বপ্নে ঢেউ কলস্বরে বয়ে যায় নদী

এ কথা কখনো যদি জানতো সমুদ্র

পৃথিবীতে ভালোবাসা প্রলয় কা- ঘটে যেতো!

অসম্পূর্ণ প্রস্তুতি
হাসানাত লোকমান
দেয়ালের ক্যালেন্ডারে আটকে থাকে ক্লান্ত তারিখ,

ঘুমকাতুরে আলোয় ভেঙে পড়ে চেনা দুপুর।

ফেলে আসা কথাগুলো কাগজে মুড়ে রাখি যতেœ,

সেলাইয়ের দাগে দাগে বাড়তে থাকে নীরব দূরত্ব।

চায়ের কাপ ঠা-া হয়, আড্ডা গুটিয়ে যায় ভাঁজে,

হাসির শব্দগুলো লুকায় রুমালের কোণে।

বারান্দার হাওয়ায় ঝুলে থাকে না-পাওয়া বিকেল,

সময় তখন চোখ ফেরায়, কিছু বলে না।

রাত গভীর হলে তালা লাগে স্বপ্নের দরজায়,

পাসওয়ার্ড ভুলে যাই‘ ভয় ঢুকে পড়ে নিঃশব্দে।

চোখের পাতায় টোকা দেয় অচেনা অনিদ্রা,

দীর্ঘশ্বাস গুনে গুনে জেগে থাকি।

টেবিলের উপর বই‘ অর্ধপড়া, অর্ধেক জীবন,

পাতার ফাঁকে জমে থাকে অমীমাংসিত প্রশ্ন।

কিছু নীরবতা বসে থাকে চেয়ারের পাশে,

আর আয়োজন‘ সব প্রস্তুতি নিয়েও‘ ব্যর্থ হয়ে পড়ে থাকে।

উপেক্ষার পদব্রজে
অনিল সেন
এইখানে দাঁড়িয়ে একদিন অনেক দূর দেখেছিল

দু’চোখ ভরে,

এখন নিজেকেও দেখতে পায় না।

ফুটপাতের কোণে কুকুর ছানা জড়িয়ে, আমার

মতো এক মানব শিশু চোখ ঝাপটায়

গা তার হিম শীতল,

উপেক্ষার পদব্রজে পাশ কাটিয়ে জনাকীর্ণ স্রোতে

নিজেকে আড়ালে রেখে দেই,

হঠাৎ থেমে যাওয়া দেখে হাত বাড়িয়ে দেয়

অসময়ে কাঠ হয়ে যাওয়া দু’হাত।

ঘন কুয়াশার রাত আরো গভীর হয়ে আসে

শিশুটির স্নিগ্ধ দৃষ্টি আচ্ছন্ন করে ফেলে পথ

আমি আর এগোতে পারি না

উত্তুরে বাতাস আশপাশে শুধু কাঁপায়,

এইখানে একটু দাঁড়াও‘

দু’বাহু খুলে সামন এগোতে থাকুক

চলার আছে এখনও অনেক পথ।

ভিক্ষুক
মাহবুবা ফারুক
রাজা ঢাকঢোল পিটিয়ে ঘোষণা দিলেন

প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় চতুর্থ পঞ্চম রানির নাম

কবে কোন মহলে তিনি যাবেন তার দিন তারিখ

কোন কোন সখি থাকবে কোন রানির মহলে,

এমনকি সাকী, বাঈজীদের জন্যেও হলো প্রাসাদ বণ্টন

ঘোষণা শুনেই রানিরা সাজতে লাগলো

হাসি, হিংসা, সম্পদ, গহনা প্রাপ্তির সুখে

সখিসহ চললো তারা মহলের দিকে

রাজা ভুলে গেলেন পূর্বজন্মে

সাধুদেরকে দেয়া প্রতিশ্রুতি

উপস্থিত সন্যাসীগণ মর্মাহত হলেন

রাজার তো আর কোনো সম্পদ বাকি নেই

নিজের হাতে রাখলেন শুধু রঙমহল।

সন্ন্যাসীরা ফিরে যেতে যেতে ভাবেন

এভাবেই কেউ কেউ সর্বস্বান্ত হয়

রূপ, যৌবন, লীলাখেলার মোহে

রাজাও নাহয় হলেন ভিক্ষুক যৌবনের পায়ের কাছে।

প্রত্যাবর্তন
নূর কামরুন নাহার
ফিরে যাচ্ছি একা।

এখানে অনেকের পদচিহ্নের সাথে

মিশিয়ে রেখেছি আমারটাও

এতটা পথ হেঁটেছি মার্চপাস্টের মতো

এতবার পায়ের ছন্দোময় ওঠানামা।

তবু বিশ্বাস থাকে

কোথাও একটা স্বতন্ত্র ছাপ রেখে যাচ্ছি

আমার পায়ের মাপে আর কারো পা নেই

আমার চোখের মতো কোনো চোখ দেখেনি

জীবনের এই রকম গোপন সন্ধি

মাটির ভেতর নিশ্বাসের মতো

মিশে থাকা মানুষের যাত্রার ধ্বনি।

বারবার ফিরে যাই

সেই একা আর একান্ত যাত্রা

বারবার জানি আর ফিরবো না

তবু ফিরি আশ্চর্য কুয়াশার মতো

জেগে থাকা আমার পদচিহ্নের কাছে।

বাউয়ার প্রেমে জেগেছে নতুন চাঁদ
হাবীব ইমন
বাউয়ার বুকে জেগেছে প্রেম,

নতুন চাঁদ উঠছে খেতের ধারে।

হাল রেখে সে বসে পড়ে,

মন ডাকে কারে‘ কারে।

পায়ে তার মাটির ব্যথা,

হাতে ফাটল, চোখে রাত,

তবু তোমার নাম নিলেই

বুকে বাজে ঢোল-সানাইয়ের তাত।

তুমি এলে পথের ধুলো

আলতা রঙে ভিজে যায়,

নদীর হাওয়াও থেমে বলে‘

এই প্রেম ভাঙা যায়?

বাউয়ার প্রেম সস্তা না রে,

এই প্রেমে দরদ লাগে,

ভাত-নুনে সংসার গড়ে

চোখের জলে সুখ জাগে।

চাঁদটা তাই আকাশে না,

বাউয়ার উঠোনে নামে,

মাটির মানুষ মাটি বুকে

প্রেমের আলো জ্বালায় গ্রামে।

মুক্ত বিহঙ্গ
মাসুমুর রহমান মাসুদ
গবাক্ষের পাশ থেকে অন্তরীক্ষ পর্যবেক্ষণ করছো

রাতের ঝুম বৃষ্টি শেষে আসমান শাদা বর্ণের

মনে হচ্ছে সব শোক বৃষ্টি ধারার সাথে পতিত

সোঁদা মৃত্তিকার ঘ্রাণ নিতে বিহ্বল ক্লান্ত শরীর

দীর্ঘ সংসর্গের অনুরণন মনে দোলা দিচ্ছে আবার

অথচ সাদাসিধা মানুষটি জটিল অংকের ফাঁদে আটক

মুক্ত প্রাণের আকাক্সক্ষা ধূলিসাৎ করে বন্দিদশা

সত্য উপস্থাপন বহুবিধ জটিল রসায়নে জিম্মি

শত্রুপক্ষ অসম শক্তি সঞ্চার করে আজ ঐক্যবদ্ধ

প্রেমপূর্ণ হৃদয়গুলো বিচ্ছিন্নতার কঠোরতায় বিভক্ত

ক্ষমতার লিপ্সা থেকে অনড়তা মিলন স্বাদ থেকে দূরে

অঝর ধারার বৃষ্টি রুদ্ধ করে হাহাকার বন্ধে উদ্যোগী হও

ক্লান্তি মুছে ফেলে ডানা মেলো মুক্তির আকাক্সক্ষায়

পরিকল্পিত আকাশে মুক্ত বিহঙ্গের সারি দৃষ্টিতে মিলবে।

শীতঘুম
নীহার মোশারফ
সিলগালা কথার ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে দু’জন

দূরে আকাশ, সরষে রঙে চোখ

পথের নকশায় কত ছাপ রেখে যায়

সূর্যজনক। আমরা এখন সময়ের বাসিন্দা।

সন্ধে হলেই ধেয়ে আসে শীতঘুম

খুব বেশি মনে পড়ে তাকে;

তার হাসি, রান্না দুপুর, আলুভর্তার ঘ্রাণ

পৌষের শুভ্র বাঁকে, আশ্চর্য রেখোয় হাঁটে।

ভোরে রসের ধোঁয়া, খেতে সবজির বাহার

পাখপাখালির রূপ-লাবণ্যেও বার্তা সুখের

মন চলে না আর, ঝরাপাতার মর্মর ধ্বনি

বুকে কাঁপন ধরায়, তবুও আসে না সুমনা।

দুঃখ ভারি হয়, ইলশে নদীর ভাবনা বাড়ে

সুমনা কেমন আছে মুখরবান্ধায়?

শৈশবের প্রেম, বাড়ির পাশের উঠোন

শিশিরভেজা সকাল যেন ফিরে আসে গহনে।

কেন ধূম্রজাল তৈরি করো
রেখা আক্তার
তোমাদের এতো সব শব উৎসব শেষ হয়ে এলে‘

চল্লিশ দিনের দিন ঘাসফুল হাওয়ায় দোলে,

বোধের দরজা আঁটে ভোর।

পলকা বাতাসে যে পাতাটা মাত্র খসে পড়লো

ও জানে শূন্যতা কতটা ‘শ্মশান’।

ক্রন্দন নিষ্পল জেনেও কেউ কেউ কাঁদে!

তবুও ঘটা করে প্রলেপ লাগাই চাই ঘাস ফড়িং জীবন

কেবল খল মানুষের ভিড়ে নীড় বাঁধে না আর পরিযায়ী পাখি

হঠাৎ যদি দেখো পাল্টে ফেলেছি দোপেয়ে জীবন,

তবে কি অবাক হবে?

বিবর্তন চিরন্তন জেনেও কেন দুঃখ হয়ে ঝরো?

পৌষালি ছায়া পড়েছে বিকেলের আঙিনায়

হাওয়ায় হাওয়ায় এ কী ধূম্রজাল তৈরি করো?

সম্প্রতি