রুহুল আমিন বাচ্চু
মামা, মামা বিশ্বাস করেন পিস্তল মামা ছাড়া কেউ আপনার জমিন বাইর করতে পারবো না। আপন বোনের বড় পুত তুই। সৌদিতে থাকি। হজ-ওমরাহ্ করেছি। পাঞ্জেগানা নামাজ আদায় করি। প্রতি ওয়াক্তে গুনাহের জন্য আল্লাহ কাছে ক্ষমা চাই। লম্বা না হলেও মুষ্টি দাঁড়ি রেখেছি। আমাকে বলিস্ একটা সন্ত্রাসীর সাহায্য চাইতে। দেশে কী আইন, সালিশ, পুলিশ নেই।
ওর কথা, মামা মামলা করবেন ঝুলে থাকবেন শ’ বছর। লাঠি ধরতে পারবেন না। পঁচিশ বছরে জমিনের মাটিটাও দেখতে পারেননি; একটা খুঁটাও লাগাতে পারেননি।
বললাম, কথাতো ঠিকই বলেছিস্। জমি কেনায় সময় ছিল বিল। বিক্রেতা আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়েছিল পানি। এখন বলে এটা না ওটা, আবার বলে আপনার কাগজটাই আছে শুধু মাটি নেই। বেচা হয়ে গেছে।
মামা আমি ডেভলপারের ফার্মে চাকরি করি জমি কিভাবে বের করতে হয় জানি। পিস্তল মামা আমার বসের ডান হাত। খালি হুকুম করলেই ফুটায়।
বললাম, যদি আমার দিকে ছুটে?
ভয় নেই আমি আছি। বসের সাথে আলাপ হয়েছে। এ ছাড়া সাতারকুল আমাদের সোনালী, রূপালী প্রজেক্ট তো দেখেছেন।
বোনের পুত ভাইগনা। আমি তোর ছোট মামা। তোর বড় মামাও মৌলভী মানুষ। আমরা দু’জনেই মালিক। এসবের ধারে কাছেও যাবে না। আমরা মামা-ভাগনা মহব্বতের সম্পর্কের মাঝেই থাকি। মাঝখানে পিস্তল মামার কাজ নেই। শেষে মাঝখানে ফাটালে তোর আর আমার আসল সম্পর্কটাই উড়ে যাবে। যা বাবা, তোর বাসায় যা। খেয়ে দেয়ে রেস্ট নে।
আপনে কই যাইবেন? বাসায় আপনার ভাত রান্না হয়েছে।
বললাম, মতিঝিলে কাজ আছে। তিন মাসের ছুটি। এক মাসতো চলেই গেল। কাজ সেরে সময় থাকলে বিকেলে দেখা হবে। কিন্তু তোর পিস্তল মামা টামা যেন মধ্যখানে না থাকে।
কথা বলতে বলতে রাস্তায় এসে পড়ি। একটা দশ নম্বর বাস মাঝ রাস্তায় ব্রেক কষে দাঁড়িয়ে, হেলপার ডাকছে। দৌড়ে উঠে গেলাম বাসে।
রাতে নয়ছয় অনেক ভাবলাম। বড় ভাইর সাথে ফোনে আলাপ করলাম। বড় ভাইর কথা একটাই, দেখ, যা ভাল মনে হয় কর। পঁচিশ বছর আগে কিনেছি। কাগজটাই শুধু পেলাম। টাকা পয়সাতো কম খরচ হলো না। কতলোক ধরলাম শুধু টাকা ঢালো। শেষমেষ উত্তর হবে হবে। কবে হবে! বুড়ো হয়েছি। ছেলেমেয়েদের জন্য ভেজাল রাখতে চাই না। হোক বা না হোক একটা ফায়সালা করেনে। যাই দাম পাস ছেড়েদে। বললাম, শুধু কাগজ তো বেচা যাবে না। মাটি দেখাতে হবে। ওয়াল না হোক নিদেনপক্ষে একটা মালিকানার সাইন বোর্ড।
পরদিন সকালেই ভাগ্নের কল। মামা একটু আসেন তো।
বললাম, কোথায়?
‘আমার অফিসে। ওর অফিস উত্তরায়। আমি থাকি বাসাবো। আসেন বললেই তো আসা যায় না। জ্যামে পড়লো তো দু’চার ঘণ্টা।
বললাম, তোর পিস্তল মামার কাছে নাতো! মনে হলো ও হাসছে। বসের সাথে আলাপ করেছি তো কোনো ভয় নেই। পিস্তল মামাও বসের কাছে ধরা।
ভাবলাম, বস তো নিশ্চই তিন মিঃ মিঃ মর্টার। বললাম, যা বলার যা করার তুই করে নে। ওখানে আমাকে ডাকিস না। বলিস তো কাগজপত্র পাঠিয়ে দেব। ও অভয় দিল। মামা ভয় পাবেন না। আমরা এর মধ্যে কাজ করছি না।
ও বোঝাতে চাচ্ছে ‘ডরাইলেই ডর’। বললাম ঠিক আছে। আল্লাখোদার নাম নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। বাসে বসে বসে ভাবছি। নিশ্চয় দু’চারটা পিস্তল শরীরে বেঁধে রাখে। মাঝেমধ্যে শার্ট উঁচু করে ভনিতা করে পিস্তলের নল দেখাবে।
ভাগ্নের অফিসে এ প্রথম এলাম। টিপ টপ খোলা কাচের দরজা পেরিয়ে পিচ্ছিল ফ্লোর। হেলফ ডেস্ক, টাকা জমা নেয়ার কাউন্টার, এক্সিকিউটিড রুম। দূরে একটা বোর্ডে ম্যানেজিং ডিরেক্টর। এসব দেখে হেল্প ডেস্কে সাহায্য চাইলাম। ভাগ্নে বেরিয়ে এলো।
রিসিপশনে বসে আলাপ জুড়ে দিল ভাগ্নে। অনুচ্চস্বরে তাদের কোম্পানির কার্যক্রম। কোম্পানির বলয়, বসের ক্ষমতা এসব। বলল ঢাকার উত্তর-দক্ষিণ-পূর্ব-পশ্চিম সবখানেই কাজ চলছে। নদী থেকে ড্রেজিং করে পাইপ লাইনে জল-বালু আসছে। দিনে পুকুর রাতে ভরাট প্রান্তর। কার জমিন কি সমাচার বিবেচ্য নয়। এরপর পিস্তল মামার বাহিনীর কার্যক্রম। কেউ জমিন দাবি করলে জবাবটা, আপনের জমিন তো আমাগো বালুর তলে। বাইর করেন পারলে। আর যদি চান, পঞ্চাশ কইরা ধরায়া দেই। ক্যাচালের কাম নাই। আমারও খরচ নাই, খরচ কোম্পানির। দাম নিবেন, টিপসই দিবেন। দুইটাই নগদা‘ নগদি। আর যদি বুঝে না আহে রাস্তা মাপেন যা করার করেন। শর্ত একখান পিছনে চাইবেন না।
ভাগ্নেকে বললাম, একটা সুরাহা করে দে যাই পাই। আমি মামা তোর। আপন মামা। ধার করা বোম-পিস্তল মামার দুয়ারে আমারে ঠেলিস্ না। কথা বলতে বলতে হাফ প্যান্ট পরা জিন্সের শার্ট গায়ে সান গ্লাস পরে খোঁচা খোঁচা দাড়িওলা বাইশ-তেইশ বছরের ছেলে একটা উঁকি মারে প্যাসেজের পাশের একটা কামরা থেকে। কইরে জাফর ভাইগনা। আমার তো আরো কাম আছে নাকি? আইছে তোর মামু। ভাগ্নে লাফিয়ে ওঠে তার কথায়।
আমার শরীরে কাঁপুনি ধরে যায়। বুঝেছি, ইনিই তিনি। প্যাটকেলে সাইজ হলেও কথা আর ভঙ্গিমায় যেন বজ্রপাত আর হাতাহাতি।
ভাগ্নে জবাব দেয়, মামা আসছি।
আমি বললাম, ভাগ্নেরে আমি আসি। তোর বুদ্ধিতে আমার চলবে না।
ভাগ্নে যা বলল, অনেক বুদ্ধি খরচ করেছেন, টাকা পয়সাও যথেষ্ট। আমার ঘটে এর চেয়ে খারাপ বুদ্ধি নাই। কষ্ট আমারও লাগে। আমার লেখাপড়ার সময় অনেক সাহায্য সহায়তা করেছেন। আপনার এই সামান্য কামে যদি লাগি...।
ভাগ্নের কণ্ঠে সিনসিয়ার আর্দ্রতা দেখে খোদার নাম নিয়ে সাহসী হলাম। মানুষের মরণ তো একবারই। তাছাড়া যার কাছেই যাই ছোট হয়ে থাকি, কাজ হয় না। দেখিনা পিস্তল মামা কি ফাটাতে চায়?
প্যাসেজের শেষ রুমটায় ভাগ্নের পিছু পিছু স্লাইড টেনে ঢুকে পড়ি।
সোফায় বসা ছেলেটি। পাশের টেবিলে সাজানো কয়েকটি গোলাকার লাল ট্যাপ মোড়ানো বস্তু। সামনের টেবিলে দুটো পিস্তল। টেবিলে চানাচুর, বিস্কুট সাথে এলোমেলো কাপ পিরিচ। এক কোণে ঢুলছে দু’টি মানব সন্তান।
সব হালায় কয় মামু। আপনে আর কী কইবেন? ভাইগনা ও মামু, আপনেও মামু। হুনছি বেবাক।
বহেন খবর পাডাইছি অহনই আইয়া পড়বো। একটু পরেই দেখি স্লাইড খুলছে। ওদিকে না তাকিয়েই বোম মামা বলে, কদমা আইছস?
জ্বে বস। পেছনের ইশারায় ঢুকে পড়ে আমাদের জমি বিক্রেতা আবদুল্লা। দৌড়ে এসেই পিস্তল মামার টেবিলে ওঠানো পা দুটো ধরে বসে পড়ে।
‘ঐ হালারপো মুরব্বীরে চিনছস্? আমারে তো কস্ মামু, হে কিন্তুক আমারও বড় মামু। জমি বেচ্ছস্ বুঝাইয়া দেস্নাই ক্যানরে হালার পো? কয় বেচা দিচ্ছস?
মামা মামা বিশ্বাস করেন, হেরা তো আহে যায়। কইলাম কাগজপাতি উঠাইতে অইবো... ভাগ্নে এবার মুখ খোলে কতবার টাকা নিয়েছেন? কাগজপাতি তো আপনারই দেয়ার কথা?
না মাইনে। থাকে বিদেশে। দুই বছরে একবার আছে। কই তো জমিন বুইজ্যা লন?
ভাগ্নের গলায় জোর দেখে আমি ভয় পেয়ে যাই। খালি তো কন জমিন নাই। জমিন কেডায় না কেডায় বেইচ্যা ফালাইছে।
পিস্তল মামা এবার উঠে দাঁড়িয়ে তার পেছনে মেরুদ- বরাবর পিস্তল ঠেকায়। বেশি না একটা হান্দাইয়া দিমুরে। তোর কোন বাপের ডাক্তার বাইর করতে পারবো না। মরবি না। জীবন ভর তেড়াবেকা অইয়া কুঁ-ক্যাঁ কইরা বাঁচবি।
কাগজ দিবো কেডায়রে হালার পুত? তোর টেকায় বাইর করবি। কালকার মধ্যে জায়গা বাইর কইয়া দিবি। এক সপ্তাহের মধ্যে কইলাম সাইনবোর্ড লাগবো।
যা ভাগ হালার পো। আমার দিকে বাম হাতে ইশারায় বলে, যান মামু কাম অইয়া গেছে। আমি কি করবো না করবো ভেবে উঠতে পারছি না। মামা গেলাম বলে ভাগ্নে আমাকে টেনে বের করে আনে।
প্যাসেজে এসে একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে আল্লাহ-খোদার নাম নিলাম। ভাগ্নে কাছ থেকে বলে, বোম মামা কিন্তুক এক কথা দুইবার কয় না।
ঘাবড়ে গেলাম, ঐ আবার ঠাসঠুস করেনা তো। মামা আমি কোম্পানির লোক পিস্তল মামাও কোম্পানির।
বলতে চাস্, কাক কাকের গোশত যায় না এই ত্?ো কিন্তুক ভাইগ না কাক যখন কাউয়া অইয়া যায় তখন কিন্তুক ঠিকই খায়। ল চল। আল্লায় অহনো জিন্দেগী রাখছে শোকর আল-হামদুলিল্লাহ।
রাস্তায় বের হয়ে ভাগ্নেকে চুপি চুপি জিজ্ঞেস করলাম ঐ কয়ডা খুন করছেরে?
ভাগ্নে একটু, ভাবলো।
পরক্ষণে দাঁড়িয়ে পড়লো। আমার মাথার টুপির দিকে, তাকিয়ে বল্লো আপনে মোল্লা মৌলভির বংশধর। ইমানদার হাজী মানুষ। আপনারে এসব বলে দুনিয়া-আখিরাতের সাক্ষী বানাতে চাই না।
ভাবলাম ভাগ্নে সঠিক কথাটি বলেছে। আলহামদুলিল্লাহ বলে, কদম বাড়ালাম। একটু দাঁড়িয়ে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললাম, আল্লাহ তোর খায়ের করুন।
সপ্তাহখানেক পর ভাগ্নের ফোন মামা কাগজপাতি অইয়া গেছে। তবে জমিন দলিলে যা আছে তা পাইবেন না। ছয় শতাংশের জায়গায় চাইর শতাংশ।
বললাম, তাতেও রাজি। হিসেব করলাম বর্তমান দামে চাইর সাতাশ আটাশ লাখ টাকার সম্পদ। আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলাম। আরব দেশে পঞ্চাশ বছর থেকেও এত টাকা জমাতে পারবো না। আরেক ট্রিপ মেরে খোদা হাফেজ জানিয়ে চলে আসবো। ভাগ্নের পরামর্শে তাড়াতাড়ি সাতারকুল চলে গেলাম। বাজার থেকে খানিকটা দূরেই জমিনটা। ভাগ্নে একটা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে দুটো বাঁশের মাথায় একটা সাইন বোর্ড লাগাচ্ছে। পাশেই দাঁড়ানো জমি বিক্রেতা আবদুল্লা ওরা দুজনে ভাগ্নে বাঁশ দুটো বয়ে নিয়ে যাচ্ছে জমির আলে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে লেখাটা পড়লাম। এ জমির প্রকৃত মালিক আবু রায়হান এবং সালে আহমেদ। চমৎকৃত হলাম। নিচে জমির তফসিল, পরিমাণ ইত্যাদি। কালো টিনের গায়ে সাদা হরফে লেখা। এতদিনে একটা গতি হলো ভেবে ইচ্ছে করছিল ভাগ্নের কপালে একটা চুমু খাই। বোনের যোগ্য সন্তান।
সাইনবোর্ড গেড়ে কাদামাথা শরীর নিয়ে ওরা উঠে এলো। একটু দূরে উঁচু অবস্থানে একটা রেনট্রির ছায়ায় আমি দাঁড়িয়ে। পাশের মসজিদের দু’রাকাত শোকরানা নামাজ পড়লাম।
আবার দাঁড়ালাম গাছটার তলে। অদূরে চলছে পাইপে জল-বালুর কর্মকা-। পানির সাথে স্রোতের মতো নদীর বালু এসে ভরাট হয়ে যাচ্ছে খানা-খন্দক। বেশ ভালই দেখাচ্ছিল কর্মযজ্ঞ।
সপ্তাহ পরে ভাগ্নের ফোন। মামা, পিস্তল মামা খবর দিছে। এখানে আসতে হবে না। বলল জমিনটা দেখে আসতে।
সমস্ত কাজ ফেলে ছুটে গেলাম। উত্তর বাড্ডা বাজারের মোড়ে ভাগ্নে দাঁড়ানো ছিল। একটা রিকশা চেপে চলে গেলাম সাতারকুল। রিক্শা রেখে দুটো বাড়ির গলি পেরিয়ে সেই রেনট্রির নিচে দাঁড়ালাম।
ভূমি থেকে দশ ফুট উঁচুতে গেড়ে রাখা সাইনবোর্ডের অর্ধেক ইতোমধ্যে তরল বালিতে ডোবাডুবি করছে। ভাগ্নের দিকে তাকালাম। ভাগ্নে মাথা নিচু করে আছে। বললাম, কী হচ্ছেরে কামাল?
কিছুক্ষণ পর আমাদের মালিকানা জানান দেয়া সাইন বোর্ডের পুরোটাই ঢেকে গেল তরল বালুতে।
ভাগ্নের মোবাইল বেজে উঠলো। আঁৎকে উঠে মোবাইলের কভার খুলে। পিস্তল মামা! ভাগ্নে দু’মিনিট শুধু কথা শুনলো, শেষটায় আচ্ছা বলে ফোনটা বন্ধ করলো।
বললাম, কী হলোরে। অফিসে যেতে বলল? জিজ্ঞেস করলাম, জমির কী হবে?
পঞ্চাশ হাজার করে দু’লাখ টাকা দিবে। আবার এক লাখ খরচ।
‘মানে?
কয়েকদিন আগে পিস্তল মামা পিস্তলসহ ধরা পড়ে। জামিনে বেরিয়ে এসেছে কাল। বলল, আমি তো বাইর অইছি, মামলা খরচ, আর দুইখান পোলা অহনো জেলে পচতাছে। খরচপাতি দিতে অইবো।
মনে পড়লো ভাগ্নের প্রথম হুঁশিয়ারি, পিস্তল মামা এক কথা দু’বার বলে না।
অপরাধ ও দুর্নীতি: জাতীয় পরিচয়পত্র নিয়ে জালিয়াতি, তথ্য বিক্রি করে মাসে কোটি টাকার বেশি আয়
শিক্ষা: এসএসসি পরীক্ষা ২১ এপ্রিল শুরু