image
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

স্বপ্নতাড়িত মানুষ

আহমদ জসিম

রশীদ কলিংবেলে টিপ দেওয়ার আগে হাত দিয়ে মাথার চুলের ভাঁজটা ঠিক করে নিল, তারপর প্যান্টের পকেট থেকে রুমাল বের করে মুখের ঘাম ভালো করে মুছে মুখে একটু সুখী-সুখী ভাব আনার চেষ্টা করল। এই সময় মেসে খুব বেশি মেম্বার অবশ্যই থাকার কথা নয়, তারপরেও! কলিংবেলে টিপ পড়তেই একটা নতুন ছেলে এসে দরজাটা খুলে দিল। রশীদ দ্রুত পায়ে হেঁটে নিজের রুমে ঢুকে গেল, ঢোকার সময় অনুমান করে নিল মেসে এখনও চার-পাঁচজনের মতো আছে। গরমটাও বেশ পড়ছে, দ্রুত জামাটা খুলে লুঙ্গি পরে প্যান্ট খুলতে খুলতে বোঝার চেষ্টা করল মেসে কে কে আছে। রায়হান, রিয়াদ আর জনির কণ্ঠস্বর শুনতে পেল। রায়হান রান্নাঘরে যাবার সময় রশীদের সাথে চোখাচোখি হলে একটু মুচকি হাসি দিয়ে রশীদের উদ্দেশ্যে বলল: ‘ভাই এইবার দেখি বাড়িতে অনেক দিনই ছিলেন। আমি তো ধরে নিয়েছি এইবার আপনাকে বিয়ে না দিয়ে আর ছাড়বেই না!’ রশীদ মুখে কোনো কথা না বলেই পাল্টা হাসিতে জবাব দিয়ে দ্রুত বাথরুমে ঢুকে গেল। রশীদের বাথরুমে ঢোকা যতটা শরীরের কারণে তারচেয়ে বেশি চিন্তার প্রয়োজনে। রশীদ এইভাবে পড়নের লুঙ্গিটা উপরে তুলে কমডে বসে জীবনের অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করেছে! আজও সম্ভাব্য কিছু প্রশ্নে তার উত্তরগুলো সাজিয়ে নিচ্ছে। অবশ্যই প্রশ্নগুলো সম্পর্কে মোটামুটি পূর্ব ধারণা আছে বলে উত্তর খুঁজে বের করতে খুব বেশি সময় লাগল না। এবার ফোয়ারার দিকে মনোযোগ দিল, লম্বা পথ পাড়ি দিয়ে বাড়ি থেকে আসতে গিয়ে ঘামের সাথে ধূলি-বালির আস্তরণ পরে শরীরটা কেমন জানি স্যাঁতসেঁতে হয়ে গেছিল। এবার দিগম্বর হয়ে ফোয়ারা ছেড়ে শরীরে আচ্ছা করে পানি ঢালার পর কেমন চনমনে লাগছে। ¯œান শেষ করে লুঙ্গিতে গিঁট দিতে-দিতে বাথরুম থেকে বেরিয়ে ব্যালকনিতে পাতা চেয়ারের ওপর গিয়ে বসল। ব্যালকনিতে বসলে এই গরমে একটু স্বস্তি পাওয়া যায়। তাছাড়া এই ব্যালকনিতে বসে পূর্ব পাশের পাঁচতলা বাড়িটার দ্বিতীয় তলার বারান্দার দিকে তাকিয়ে কল্পনার রাজ্যে হারিয়ে যেতে রশীদের ভালো লাগে।

পনেরো দিন বাড়িতে কাটিয়ে আসার পর আজই মেসে ফিরল। তাই কেমন কেমন জানি লাগছে। ওই বারান্দার দিকে ভালো করে মনোযোগ দেওয়ার আগেই পিছন থেকে রিয়াদ ডাক দিয়ে বলল: ‘ভাই খাবেন না?’ রিয়াদের কণ্ঠ শুনে রশীদ প্রথমে একটু বিব্রত হয়ে গেছে, শেষ হাঁটুর বয়সী ছেলের কাছে ধরা পড়ে গেল কিনা! পরক্ষণে নিজেকে সামলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাল রিয়াদের দিকে। ‘খাবেন না?’ রিয়াদ জিজ্ঞাসা করল। ‘ভাত-তরকারি আছে?’ রশীদ জানতে চাইল। ‘না, আপনে যে আজই আসবেন জানতাম না, তাই আপনার নামে মিল দেওয়া হয়নি’, রিয়াদ বলল। পেটে খিদে আছে রশীদের, কিন্তু পকেটের অবস্থা ভালো না, কিন্তু রিয়াদকে বলল: ‘হোটেলে খেতে ইচ্ছা করছে না, রাতের মিলটা দিয়ে দিও।’

রিয়াদের সাথে কথা বলার মাঝেই এসে পড়ল রায়হান আর জনি, বাকি দুজনকে দেখে একটু মুচকি হাসি দিয়ে রশীদ বলল: ‘বাহ আজ তো দেখি তোমরা একেবারে দলবেঁধে ক্লাস ফাঁকি দিলে।’ রশীদের কথা শুনে রিয়াদ সাথে সাথে বলে উঠল: ‘না মানে জনির কাজিন মোস্তাক আসলো তো, ওকে ঢাকা শহরটা ঘুরে দেখাবে, ভাবলাম সবাই মিলেই ঘুরি।’ রশীদ বুঝে গেল, দরজা খুলে দেওয়া অপরিচিত তরুণটা হচ্ছে জনির কাজিন মোস্তাক। রশীদ ছেলেটা নিয়ে একটু ভাবতে পারত, কিন্তু তার আগেই জনি মোস্তাককে ডেকে রশীদের সামনে হাজির করে: ‘এই হচ্ছে আমাদের রশীদ ভাই, অনেক বড়লোকের ছেলে কিন্তু, মা-বাবার সাথে অভিমান করে আমাদের সাথে থাকেন, বেশ আগেই পড়াশোনা শেষ করেছেন, কিন্তু চাকরির জন্য খুব একটা তাগাদা নেই।’ কথাগুলো জনি এক নিঃশেষে বলেই সম্মতির জন্য রশীদের দিকে তাকাল। রশীদ মুখে কিছু না বললেও একটু লাজুক হাসি দিয়ে মোস্তাককে বুঝিয়ে দিল, জনি যা বলছে সত্য বলেছে। মোস্তাক এবার আরো কৌতূহল নিয়ে জানতে চাইলো: ‘কীসের অভিমান রশীদ ভাই?’ রশীদ উত্তর দেওয়ার আগেই জনি দ্রুত বলে উঠল: ‘আর বলো না, ওনারা তো রশীদ ভাইকে বিয়ে দিয়ে থিতু করতে চায়, কিন্তু রশীদ ভাই তো ওই মানুষ না।’ বিয়ে করতে চাচ্ছে না! মোস্তাক যেন আকাশ থেকে পড়ল, কৌতূহল সংবরণ করতে না পেরে বিড়বিড় করে বলে উঠল: ‘তবে কী রশীদ ভাই?’ প্রশ্নটা পুরোপুরি বের করার আগেই রশীদ জোড় দিয়ে বলে উঠল: ‘সংসার, চাকরি এইসব গৎবাঁধা জীবন আমার ভালো লাগে না, একটাই তো জীবন, জীবনটাকে উপভোগ করতে চাই।’ রশীদের উত্তর শুনে একটা গ্রামের কলেজের ¯œাতক প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী মোস্তাকের মধ্যে কৌতূহলের সাথে সাথে হাহাকারও তৈরি হলো, ভাবছে: ‘আহারে বড়ঘরের ছেলে হলে জীবনকে নিয়ে কতভাবেই না ভাবা যায়। মোস্তাকের ভাবনা গভীর হবার আগেই জনি বলে উঠল: ‘ভাই এইবার কেমনে ছাড়া পেলেন?’ রশীদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল: ‘ছাড়া কি আর পাওয়া যায়, সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে রীতিমতো পালিয়ে এসেছি!’ মোস্তাক এবার আরো কৌতূহল নিয়ে দ্রুত বলে উঠল: ‘ভাই পাত্রী দেখছিলেন?’ ‘ছবিতে’ রশীদ বলল। ‘দেখতে কেমন?’ রশীদ এবার মুচকি হাসি দিয়ে বলল: ‘প্রচলিত অর্থে সুন্দরী বলতে যা বোঝায় সেটা, তবে আমার দৃষ্টিতে মানুষেরা আসল সৌন্দর্য হচ্ছে মানুষের চিন্তা আর ব্যক্তিত্বে।’ রশীদের কথাগুলো মোস্তাকের কাছে একদম নতুন নতুন লাগছে, যতই শুনছে ততই কৌতূহল বাড়ছে। মোস্তাক এবার জানতে চাইল: ‘বাপের মাল পানি কেমন আছে?’ রশীদ নিচু স্বরে বলল: ‘যথেষ্ট, শুনেছি ঢাকাতেও নাকি বাড়ি-টাড়ি আছে!’ জবাব শুনে মোস্তাকের চোখ কেমন জানি চকচক করে উঠল, অনেকটা চিৎকার করে বলে উঠল: ‘ভাই আপনে কী পাগল হয়েছেন? আপনে না করলে বাদ দেন আমারে ধরাই দেন।’ মোস্তাকের কথা শুনে সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। এই হাসির মাঝেই রশীদ বলে উঠল: ‘পড়াশোনাটা ঠিকঠাক মতো করো তোমারও হয়ে যাবে।’ কথাটা বলেই মুখে বোয়াল মাছের মতো একটা বড় হাই তুলে শরীরের আড়মোড়া ভাঙলো। রশীদের অবস্থা দেখে রিয়াদ বলে উঠল: ‘দেখ তো কা-, এত দূর থেকে আসলো রশীদ ভাই, অথচ আমরা তাকে একটু রেস্ট পর্যন্ত করতে দিচ্ছি না! এই সবাই চল রশীদ ভাই একটু রেস্ট করুক।’ সত্যিই রশীদের শরীরটা যেন ভেঙে পড়ছে, রাজ্যের ক্লান্তি ভর করেছে তার ওপর। একে তো দীর্ঘ পথ তার ওপর লোকাল বাসের ঝক্কি! রশীদ এবার হাই তুলে চেয়ার ছেড়ে নিজের বিছানায় গিয়ে চিৎ হয়ে শুল। ততক্ষণে অন্যরা রশীদের ঘর ছেড়ে বেরিয়ে তাকে বিশ্রাম নেওয়ার ব্যবস্থা করে দিল। রশীদ বিছানায় পিঠ লাগিয়েছে ঠিকই, ঘুম তো আসেই না, শুধু চোখ জ্বালাপোড়া করে, আর চোখ বুঝলেই রাজ্যের ভাবনা মাথায় গিজগিজ করে! আজকে অবশ্যই শুধু বাড়ির কথাটা মনে পড়ছে, বাবার মুখের ওপর জোর দিয়ে বলে এসেছে: বাড়ি বেচার দরকার নেই রাহেলার(বোন) বিয়ের টাকাটা আমিই জোগাড় করব! এখন প্রশ্ন‘ কীভাবে করব?’ প্রশ্নটা মাথায় আসতেই রশীদ একেবারে অস্থির হয়ে ওঠে, ভাবে রাস্তায় নেমে ছিনতাই, ব্যাংক ডাকাতি কিংবা কোনো কোটিপতির ছেলে-মেয়েকে অপহরণ! আবার পরক্ষণে নিজেকেই ধিক্কার দেয়। তারপর ভাবতে থাকে কোনো কোটিপতির মেয়েকে যদি...! তারপর রশীদ কল্পনায় ডুব দেয়, ব্যালকনিতে বসে দেখতে পাওয়া দূরের ওই বিল্ডিং এর সুন্দরী তরুণী, টিউশন করা ছাত্রের বড় বোনটা! এইভাবে রশীদের ওপর ক্লান্তি আর নিদ্রা যত বেশি আগ্রাসন চালায় তার কল্পনাগুলো পরিণত হয় স্বপ্নে। রশীদ স্বপ্ন দেখে বাড়িওয়ালার অহঙ্কারী অথচ সুন্দরী মেয়েটাকে। মেয়েটা রশীদের দিকে তাকিয়ে মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে: ‘আজ থেকে তুমি আমার আর বাড়িটা তোমার!’ রশীদের হাত ধরে টেনে নিয়ে যায় একেবারে বেডরুমে। রশীদকে আলতো ধাক্কায় খাটের ওপর শুয়ে দিয়ে বলে: ‘এবার মুখটা হা করো তো আমার সোনা’। রশীদ মুখ হা করলে, মেয়েটা তার দুই স্তনের মাঝ থেকে একটা কাচের কৌটা বের করে, সেই কৌটার ছিপি খুলে রশীদের মুখে ঢেলে দেয় কিছু মধু! কিন্তু মধুর স্বাদটা বোঝার আগেই একটা বিকট শব্দে রশীদের ঘুম ভেঙে যায়, রশীদ হতচকিতভাবে ঘুম থেকে লাফিয়ে খাটের উপর বসে পড়ে আর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দেখে ক্লাস ফাঁকি দেওয়া ছেলেগুলো রশীদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে। তার মধ্যে থেকে নতুন আসা সেই মোস্তাক ছেলেটাই অনেকটা চিৎকার করেই বলছে: ‘আমি নিজ চোখে দেখছি, রশীদ ভাই প্রথমে আঙুলটা মুখের মধ্যে দিল, তারপর মুখের মধ্যে দিয়ে চুষি-চুষি কাইলো!’

সম্প্রতি