সুন্দর
নির্মলেন্দু গুণ
সুন্দর এসে থেমে আছে তার
নাসিকার শেষ প্রান্তে।
নাকপাশা যেন সোনা দিয়ে মোড়া
ঘুঘু চোখ ঘুমে বুঁদ:
অথবা শীতের পিঁপড়ের মুখে
আলতা মাখানো খুদ।
আমার জীবন যাবে আজীবন
তোমার জীবন জানতে।
উদীচীর পোড়া বাদ্যযন্ত্রগুলি
জাহিদ হায়দার
ভষ্মপুঞ্জে সমবেত কণ্ঠ, ‘আমরা করবো জয়’।
সেতারের কালো কঙ্কাল তারগুলি লিখেছে দেয়ালে,
‘আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু’।
হারমনিয়ামের শব আমাকে শোনালো,
‘হেই সামালো, হেই সামালো’।
এ¯্রাজের ছাই উড়ছে, শুনছে বাতাস,
‘ও আমার দেশের মাটি তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা।’
অর্ধেক পোড়া মৃদঙ্গে সত্য ইতিহাস,
‘ওরা আমার মুখের ভাষা কাইড়া নিতে চায়।’
তবলা প্রশ্ন করছে, না-সঙ্গীতে তুমি কি সুন্দর?
বাঁয়ার মাটির গন্ধে আর্তনাদ : আমাকে পোড়াতে আসা মানুষের
কি মনে হয়নি আমিও মাটির সন্তান?
বিবেকের পোড়া দরজায় বেহালা কড়া নাড়ছে,
ব্যথা নিয়ে কথা বলা কি অপরাধ আমার হৃদয়ের?
শুনতে পাচ্ছো না শরদের মৃত তারে
‘আগুনের পরশমনি ছোঁয়াও প্রাণে’।
দিনের প্রহরে রাত্রি। মেঝেতে সরল ঋজু একটা রেখা।
বাঁশি আমাকে শোনায়, ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু দুস্তর পারাবার’।
কাঁদছে না। বাদ্যযন্ত্রের জীবনচর্যা গাইছে:
‘তীর হারা ওই ঢেউয়ের সাগর পাড়ি দেব রে’,
কেন তুমি পুড়িয়ে দাও মানুষের সঙ্গীত?
‘বিশ^সাথে যোগে যেথায় বিহারো’,
পথে পথে আমরা বলি সংস্কৃতির ঐক্যমন্ত্রণা,
রাত্রিতে চাই পূর্বফাল্গুনীর মানবচেতনা,
‘শাপলা’র বিবেকী সভ্যতা কি তোমার জন্যে নয়?
বাদ্যযন্ত্রেরা নয় শীতের সন্তান।
বহু শীতরাত্রির বায়োগ্রাফি
আবদুর রাজ্জাক
জ্য্যোৎস্না ভাঙার বহুদিন পর শীত এলো উঠোনে‘
সেই সে শীতের রাত যে-রাতে আমার মৃত্যু হয়েছে। আমি এখন
প্রতিদিন মৃত্যুর গান গাই, আর একা একা বহন করি
শীতবাহী মৃত্যুর লাশ।
তুমিও আমার সঙ্গে মৃত্যুর শব বাহক। বহুদূর যেতে হয়নি,
সেই লাশ কাঁধে নিয়ে আমরা সমুদ্র অবধি গিয়েছি।
দুঃখজনক হলেও সত্য যে, সমুদ্র আমাদের লাশ গ্রহণ করেনি।
ফিরে আসার নদী ছিলো না, নৌকো ছিলো না‘ কাছে-কূলে
ভাঙা একটি নৌকো ছিলো, কেউ তার পালগুলো ছিঁড়ে দিয়েছে।
বহু কষ্টে আমরা ফিরে আসি নগরে। পথে-ঘাটে, শীতে‘
কতো শীতার্থ মানুষ, কাঁপছে।
ততদিনে আমাদের গৃহগুলি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে,
ভালোবাসার চিহ্নগুলি মুছে দিয়েছে, আর আমাদের শীতগাছে
থেকে থেকে দুলছে ভালোবাসার আর্ত-নদীরেখা,
যদি আমার এসব দুঃস্বপ্ন হতো! যদি কুলগাছ, শীতগাছ,
নীলাবতী গাছ... শীতের সাক্ষ্য হতো!
হৃদয়ে পোড়া দাগ, মুখে আগুনের আঁচ, হায় আমাদের উঠোন যেন
এক কবরখানায় পরিণত হয়ে আছে।
একটি অরাজনৈতিক কবিতা
খালেদ হোসাইন
আমি
তোমার কথা ভাবি‘
হৃদয়ের যা দাবি।
আমি
তোমারই গান গাই
ঢাকা কি সাংহাই।
টোকিও ফ্রাঙ্কফুর্টে
কেন যে যাই ছুটে‘
যেন তোমার দেখা পাই‘
একটি জীবন ফুরিয়ে গেল
বুঝতে পারো নাই।
পুষ্পবিতান
মুজিব ইরম
হারিয়েছো নাকফুল জিপসি ফুলের ক্ষেতে শীতার্ত সকালে। আমিও হয়েছি চাষি কুয়াশার মাঠে। শখ করে বাগানবিলাস চারা করিয়াছি। তুমি রঙে রাঙিয়েছি ঝাড়। তারাও ধরেছে বেশ মনের মতন। ডালিয়া ক্ষেতের পাশে আমাকে টানিছে খুব গাঁদাফুল। তোমার দেহের রঙে রাঙ্গা হলো মাঠ। চাই আমি তোমার উছিলা করে চাষ করি অচেনা অজানা ফুল। ভাবি আমি ভুলে যাবো চিরচেনা গোলাপের চাষ, ভিনদেশি বেগানা কুসুম। তবু তারা বিবিধ ভঙ্গিমা করে, নানা রঙে, নানা ছলে গোলাপের চাষি হতে বলে। ফুলের বাজারে যাই। দেশি ও বৈদেশি ফুল হাটে তুলে আনি। তুমি কি আসবে না আর ফুলের বাজারে? কিনবে না অধম চাষির ফুল, আবেগ আকুল? শীত যায় শীত আসে। মনোবাঞ্ছা বাড়ে। কাটে দিন হাটে আর মাঠে। খুলিবো তোমার নামে ফুলের দোকান গদখালি হাটে।
দাগ
চয়ন শায়েরী
তারচেয়ে এই ভালো‘ ‘ভালো আছি’ ‘ভালো আছি’ ভান;
ভণিতায় ঢেকে রাখি কবিতার ভেতর্গত প্রাণ।
কেঁদেকেটে শেষমেশ কোনো লাভ হয়নি জীবনে;
পরিযায়ী পাখি জানে ঠিকানা তো দূরজলাশয়ে,
শীত শীত বিবর্ণতা মলিন করেছে ওই মুখ।
নোটবুকে ডায়েরিতে দাগ দিই চিহ্নিত করতে,
জীবনের কত মৌন অভিমান দাগহীন থাকে;
কেই-বা চিহ্নিত রাখে এইসব মান-অভিমান?
মুখোশের আড়ালেতে ঘুম দেয় কুয়াশাসকাল‘
কুয়াশা বিভ্রান্ত করে আঁধারের সহোদরা আলো।
মনে কত দাগহীন ঢেউরেখা দাগ কেটে যায়‘
মনোদিঘিটির জলে দাগ কেটে কেউ সাঁতরায়।
টলমলে শীত, পাদটীকাসহ
মাহফুজ আল-হোসেন
এবারের টলমলে শীত সময়মতোই এসে হাজির
এক মনোযোগী বিদ্যার্থীর মতোই,
আর ততক্ষণে হুড়মুড় করে ঢুকে গিয়ে বিশেষ শিরোনামগুলো
পত্রিকার পাতা আর অনলাইন সংস্করণে স্ফীতকায়।
আসলে এটা কোনো বেসুরো ঠা-া নয়‘
বরং নিজেকেই সে দাবি করে বসেছে কিটারোর মাৎসুরি রূপে;
অথবা দৈবচয়িতভাবে নিশ্চয়িত এক নৃত্যপর প্রেস বিবৃতি,
যতক্ষণ পর্যন্ত শ্বাস এতে সম্মতি দেয়।
আর এদিকে নীরবতা যেন
ভ্যানিলা লাতে বা হট চকোলেটের মতোই ধূমায়িত ট্রেন্ডিং;
যেটি ঘর ভরিয়ে তোলে
অনুপস্থিতি দিয়ে নয়,
বরং কতিপয় চীনা ফিসফাসের দ্রবীভূত সমসত্বতায়।
এমনকি সজারু সদৃশ ঘড়ির কাঁটাগুলোও
ফ্যাক্ট-চেক করতে করতে মাঝপথে
ঘুমিয়ে পড়ে কিছু সময়ের জন্য।
কী এক নির্বোধ তুমি‘
ঘরের বাইরে ফুটে থাকা পরাবাস্তব তুষারফুলের গল্প শোনাচ্ছো,
বাস্তবে সেটি তো আর কিছুই নয়‘ যেন বিস্তীর্ণ চরাচরজুড়ে আত্মপ্রবঞ্চক
সময়ের উপরে অবলীলায় ঢেলে দেয়া শ্বেত-শুভ্র সংশোধন-ফ্লুইড।
এখানে সব রাস্তাই এখনো মনে রেখে চলেছে
ওদের শরীর জুড়ে রয়েছে ফুটন্ত সময়ের আঁকা ফেইড জিন্সের আলপনা।
এই স্বেচ্ছাচারী পঙ্ক্তিগুলোকে এখানেই যে থামাতে হয়‘
ওদেরকে জিজ্ঞেস করতে হয়:
এই শীত কি সত্যিসত্যিই রূপকের বাইরে কোনো অস্তিত্বের চিহ্ন রাখে?
নাকি রূপকটিই প্রতিকূল জলবায়ুর অনিষ্পন্ন আলোচ্যসূচি‘
যাকে নিয়ে আগামী সিওপি’তে কৌতুকী কূটতর্ক সম্ভব।
প্রকৃতপক্ষে কারো কিছু জানা নেই যে,
আগামী দিনের শীতগুলো নতুন করে
পুনর্লিখিত হবে কি-না‘
নস্টালজিক গীতিকবিতার ব্যালাড-রূপে,
অথবা রুদ্ধশ্বাস নাট্যদৃশ্যের ধারাবাহিকতায়...
আর এই নীরবতাও কে জানে কতদিন টিকবে, না কি
শেষমেশ কেউ না কেউ কথা বলে উঠবে:
এই তো উষ্ণতা!
পর্যটক বিড়ালের চিৎকার
ওবায়েদ আকাশ
আচমকা একটি ঢেউ সৈকত ছাপিয়ে গেল
কয়েকটি বিড়াল ভিজতে ভিজতে অটল ভেসে যাওয়ায়‘
তাদের প্রবল চিৎকার‘ থেকে গেল বালুকাবেলায়
চিৎকারগুলো মানুষ হতে হতে দেখল
তাদের গাভর্তি সমুদ্রস্বভাব তুমুল গর্জন করে
গভীর নিশ^াস ফেলে বাঁচিয়ে রেখেছে পর্যটক জীবন
কেউ কেউ ঝিনুক খুঁজে পেতে ফিরে পেল হারানো অতীত
শীতঋতু, ধানগাছ, প্রবল কুয়াশা¯্রােতে পড়ে আছে অশান্ত শিশুবেলা
হঠাৎ বেড়াতে আসা অতিথি
সমস্ত জীবনের ভার বুঝে নিয়ে বলে, ‘গেয়ে নাও আনন্দভৈরবি
এতটা জরাক্রান্ত কাল সামলে নিতে কোথাও হারাতে পারোনি’
চিৎকার ভেসে গেল অর্ণব-মায়ায়
ঢেউয়ে ঢেউয়ে সিঁথি কেটে, সমূহ সোহাগে‘ ব্যক্ত হলো অসম ভাষায়!
জলধিতলে নকশাকাটা প্রাণে নিজেকে খুঁজতে খুঁজতে
লাল-নীল সময় ফিরে এলো
তীরে ভেড়া ক্লান্ত নাবিক‘ এতসব অর্বাচীন রোদে নিজেকে বিছিয়ে
পর্যটক বেড়ালের গ্রীবায় বেঁধে দিলো
ফিবর্ষের নিঃসঙ্গ ভ্রমণ!
সম্পর্ক
মাসুদার রহমান
গতকাল সমুদ্র থেকে ফিরে আজ আবার
পাহাড়ে যাচ্ছো।
গোপনে তুমিই জানাও আমাকে সব কথা।
আমি কে?
‘ শীতের সন্ধ্যাতারা
তুমি কে?
‘ইশকুল মাঠের কিনারে ফুটে থাকা
ঘাসফুল;
যে কিনা গোপন সম্পর্কে সন্ধ্যাতারার বউ।
আহ্বান
অলীক বিহঙ্গ
প্রিয় কবি, তুমি নাতিশীতোষ্ণ
ওমের বুকে ঘুমিয়ে পড়লে নাকি
শাখায় শাখায় পাতাদের
দেখো, ঝরে পড়ার প্রস্তুতি
হিমহিম শিশির পা ভেজাতে বলে
চরণখানি ছোঁয়াও
আষ্টেপৃষ্টে অনুভবের মতো
তাকে জড়িয়ে নাও
গত ঋতুরাজ কেটেছে বিরহে
ভাষাহীন দিনযাপন
শব্দের ভিড়ে ছন্দের নীড়ে হও
শীতের মতো আপন।
শীতমন্দ্র ফুল
পুলিন রায়
আর ভাল্লাগে না এই কর্কশতা
চলো মাঠে যাই ধুপইন বিলপারে
চলো ইছাবার তীরঘেঁষা হৈমবতীর কাছে
পাকাধানে পূর্ণ জমিনে
আকুল পরান কেঁদে কেঁদে বলে হায়
আমার সোনালি ক্ষেত ফেলে কেন এখানে?
চঞ্চল সময়-এর ঘূর্ণিজলে মন
বিভোর হলেই ফেরি করি স্মৃতিঝাঁপি
শীত ছুঁয়ে গেলে আনমনা হই বারবার
কেন যে আমার শেকড়ের টান বেড়েছে
মননে গেঁথেই আছে শস্যখলা
এবার ফুটুক শীতমন্দ্র ফুল
একটি শীতের কবিতা
আদিত্য নজরুল
হাত নেড়ে শীত আসলেই
ডান গালে টোল কাটা মেয়েটির কথা
মনে পড়ে
তখন কেবলি মুমু
ভোরবেলা হারমোনিয়াম সাধার মতন
রোজ রোজ হাইস্কুলে যায়...
কী আশ্চর্য
প্রুফ রিডিংয়ের দাগের শৈলীতে
তাঁর কালো চুলে আঁকাবাঁকা ক্লিপ...
মুমু যেনো ঝকঝকে
এ-ফোর সাইজের অফসেট!
সে হাইস্কুলে যায়
আমি কার জন্যে যেনো
বুকে হাহাকার নিয়ে
কলেজের মাঠে মাঠে
রাঙা ধুলো উড়িয়ে বেড়াই...
একদিন খুব খুনসুটি হলো
স্কুল ও কলেজের সাথে‘
হাঁপাতে হাঁপাতে মুমু
বুকে জাঁপটে বললো
আমাকে জড়িয়ে ধরো
খুব শীত শীত লাগে...
অপ্রেমে প্রাপ্তি কিংবা বৈকালিক নদী
শেলী সেনগুপ্তা
অপ্রেমের দিনগুলো
নিয়ে আসে শীত
আর
পরিযায়ী পাখি
অপ্রেমের দিনগুলো
বেদনার সিংহদ্বার খুলে
নিয়ে আসে জলের বিলাপ
অথচ
কোথাও বয়ে যাচ্ছে না একটিও বৈকালিক নদী
অপ্রেমের দিনগুলো দেখে
দুধের বাটিতে নীল মাছির আনাগোনা
অপ্রেমের দিনগুলোই কেবল দিতে পারে
অভিন্ন-যাপনের
কিছু বিরহ বিগলিত চরণ...
শীতের নগ্নতা
ফরিদা রানু
শীতের রাত বলে কথা:
বরফ জমা পা দুটো খুঁজে ফেরে উষ্ণতা;
জবুথবু করে রাখা কাঁথা
গায়ে জড়াতেই চোখের কোণ ভাঙে মৌনতা;
নেই কোনো কামনার কথা
শুধু বুক ভরে থাকা অতৃপ্ত মায়া ও মমতা,
খুঁড়ে খুঁড়ে বের করে ব্যথা
আঙুল দিয়ে স্পর্শ করে দ্ঃুখের ঠিকরানো নগ্নতা।
শীতের প্রস্তুতি নিতে থাকো
নাইমুল করিম
অধরে কালো তিল দু’গালে টোলপড়া মুখাবয়ব ও স্মার্ট রমণী!
তুমি অল্প অল্প শীতের প্রস্তুতি নিতে থাকো;
বাতাসে আসতে শুরু করেছে স্নিগ্ধতা !
‘প্রকৃতি যেন জানান দিচ্ছে, শীত দরজায় কড়া নাড়ছে’
সুখভোগের পাশাপাশি বার্ধক্যকে হার মানাতে তদুপযুক্ত
কিছু কার্ডিও ব্যায়ামের তো প্রয়োজন আছে;
তুমি শীতের প্রস্তুতি নিতে থাকো, সুগঠিত রমণী শীতের...