ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৭
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ভোরের আলো ফুটতেই নাবিল ও নাতাশা বলল, ‘আজ যাব প্যালেস দেখতে।’ বললাম, ‘মানে, প্যালেসিও রিয়াল‘ রাজকীয় প্রাসাদ? রাজধানীতে সবই তো রাজকীয়। সবচেয়ে বিখ্যাত নাম- রিয়াল মাদ্রিদ। এরপর থিয়েথ্রো রিয়াল, রিয়াল হারদিন বোটানিকো, অনেক রিয়ালের ছড়াছড়ি। ঠিক আছে, প্যালেসিও রিয়াল দিয়ে শুরু করি।’
গাইডেড ট্যুর নিয়েছি, ফলে অনেক কাহিনি, অনেক ইতিহাস জানা যাবে। প্যালেসের কাছে ট্যুর অফিসে ১২ জনের এক দলে যোগ দিলাম। সকাল দশটায় সবাইকে স্বাগত জানিয়ে ট্যুর শুরু করল আমাদের গাইড থাইকোয়ে ভিস।
এটি যখন স্পেন, আর সামনে রাজপ্রাসাদ, ইতিহাস তো আসবেই। তবে তা খুব তাড়াতাড়িই আসল।
প্রাসাদের দিকে যেতে যেতে গাইড থাইকোয়ে মাদ্রিদের ইতিহাসের প্রথম পাতা খুলল, ‘মাদ্রিদের ইতিহাস ও প্যালেসিও রিয়াল এর ইতিহাস একই সাথে লেখা শুরু। ৮৫২ সালে কর্ডোভার আমির প্রথম মুহম্মদ বর্তমান ‘প্যালেসিও রিয়াল’ এলাকায় এক দুর্গনগর ‘মায়ারিত’ প্রতিষ্ঠা করেন।১ এটি পরবর্তীতে মাদ্রিদ নাম ধারণ করে। ১৭৩৪ সালের এক অগ্নিকা-ে দুর্গটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১৭৩৮ সালে রাজা পঞ্চম ফিলিপ একই স্থানে একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। ১৮ বছরের প্রচেষ্টায় ১৭৬৪ সালে এর নির্মাণ কাজ শেষ হলে সৃষ্টি হয় এক অনন্য স্থাপত্য‘ প্যালেসিও রিয়াল।’ এতটুকু বলে থাইকোয়ে একটু দম নিল। এরপর বলল, ‘এরপরের ইতিহাস ভেতরে সব দেখাতে দেখাতে বলব।’
ধীরে ধীরে সবাই আসলাম ‘প্লাসা দে অরিয়েন্ত’-এ, সামনেই প্রাসাদের সম্মুখভাগ। আয়োনীয়২ লম্বা স্তম্ভ ও তাসকানিয়৩ আয়তাকার স্তম্ভ পরপর সাজিয়ে স্থপতি জিয়ানবাতিস্তা সাকেত্তি এখানে গড়েছেন এক ছন্দ। ভোরের আলো এ শিল্পকর্মের সাথে মিলে তৈরি করেছে অনন্য এক সৌন্দর্য। হাজারো পর্যটকের আনাগোনার মাঝেও এখানে শোনা যাচ্ছে পাখির কল-কাকলি, ফোয়ারার জলসঙ্গীত ও গির্জার ঘণ্টা।
এরপর লবি দিয়ে যেয়ে বিশাল বাঁকানো জোড়া সিঁড়ির সামনে সবাই জড়ো হলাম। দুপাশে দুটি ব্রোঞ্জ সিংহ মূর্তি শক্তি এবং মর্যাদার প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে। মার্বেলের সিঁড়ি দুটি দু’পাশের কারুকার্যময় রেলিংসহ ধীরে ধীরে বেঁকে ওপরে যেয়ে মিলিত হয়েছে। দুদিকে বসানো সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ভাস্কর্য। সিলিংয়ে আঁকা রূপক ও ঐতিহাসিক ছবির দেয়ালচিত্র। সব মিলিয়ে এটি একটি অসাধারণ শিল্পকর্ম।
আমাদের সবার মুগ্ধতার ভাব দেখে থাইকোয়ে মুখ খুলল, ‘এ জোড়া সিঁড়ি স্থপতি ফ্রান্সেসকো সাবাতিনি-র বারোক৪ স্থাপত্যের এক বড় নিদর্শন। এ দেখে স্বয়ং নেপোলিয়ন বোনাপার্ট৫ এত মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পাশে দাঁড়ানো তাঁর ভাই স্পেনের রাজা জোসেফ বোনাপার্ট-কে বলেছিলেন: জোসেফ, তোমার বাসস্থান আমারটির চেয়ে ভাল হবে। এখন মনে হচ্ছে নেপোলিয়ন ভুল বলেননি। তোমরা কী বল?’ সবাই সমস্বরে বলল, ‘ঠিকই বলেছ।’
সিঁড়ি দিয়ে মূল প্রাসাদে ঢুকব এ সময় আমার ফোনের এলার্ম বেজে উঠল। সবাই আমার দিকে তাকাল, খুব অস্বস্তি অনুভব করলাম। এ রাজপ্রাসাদের ভেতর ফোন চালু রাখা যায় না। এ ভুলের একটি উপকার হলো‘ আমার একটি এপয়েন্টমেন্টের কথা মনে পড়ল। আজ দুপুর ঠিক ১২ টায় আমার আরেক গাইডেড ট্যুরের টিকিট কাটা আছে। এটি মিস হলে পরেরটি কখন পাব তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তাছাড়া কালই আমরা মাদ্রিদ ছেড়ে যাব। তাই একমাত্র উপায় হলো রাজপ্রাসাদের ট্যুর বাদ দিয়ে অন্যটিতে যোগ দেয়া। মূল রাজপ্রাসাদে ঢোকার ভাগ্য আমার আর হলো না, সিঁড়ি থেকেই বের হয়ে আসতে হলো।
হাতে এখনো ঘণ্টাখানেক সময় আছে। শহরের আরেক প্রান্তে ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’, টেক্সিতে করে যেতে আধা ঘণ্টার বেশি লাগবে। সবাইকে ‘সরি’ বলে ছুটলাম সেদিকে। নাবিল-নাতাশা-ফারজানাকে বললাম চালিয়ে যেতে, ৩টার সময় প্লাসা মেয়রে তাদের সাথে মিলিত হব।
ট্যাক্সি নিয়ে একা ছুটলাম। সেখানে পৌঁছে দেখি সামনের ফটকে লেখা‘ ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’।৬ স্পেনীয় নামটি কিছুটা খটমটে লাগলেও বাংলা অর্থটি বেশ সাবলীল‘ ছাত্রাবাস। তবে এটি শুধু ছাত্রাবাস নয়, এটি একটি পরিচিত নাম, যাকে বিখ্যাত করেছেন লোরকা এখানে তাঁর প্রায় এক দশকের অবস্থানে। ফটক পেরিয়ে ভেতরে যেতে একটি ভবনের দেয়ালে চোখে পড়ল এক ব্রোঞ্জ আবক্ষ মূর্তি। নিচে লেখা নাম‘ আলবার্তো হিমেনেস ফ্রদ‘ এ প্রতিষ্ঠানের জন্ম থেকে গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত তিনি ছিলেন এর কৃতি পরিচালক।
‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’-এর দফতরে ঢুকে দেখা করলাম সেক্রেটারি ইসাবেল রেয়েজ-এর সাথে। বেশ সুন্দরী ও চটপটে এক তরুণী, হাত বাড়িয়ে দিয়ে করমর্দন করে বলল, ‘তুমি ঠিক সময়েই এসেছ। আর ২০ মিনিট পরে শুরু হবে আমাদের গাইডেড ট্যুর। তুমি এখানে বসে রেস্ট নিতে পার। কী দেব, চা, কফি না কোক?’ বললাম, ‘ধন্যবাদ! কিছুই লাগবে না। তোমার নাম ইসাবেল শুনে মনে পড়ে গেল লোরকার বোন ইসাবেল-র কথা।’ খুব খুশি হয়ে ইসাবেল বলল, ‘লোরকার বোনের সাথে আমাকে তুলনা করাতে খুব সম্মানিত বোধ করছি। আমি হলাম ইসাবেল রেয়েজ, ইসাবেল লোরকা নই। তবে লোরকার বোনের সাথে অর্ধেক মিলও অনেক আনন্দের, অনেক সম্মানের।’ বলেই হাসতে লাগল। এরপর বলল, ‘তুমি লোরকার ভক্ত জেনে খুব ভালো লাগছে। লোরকার জনপ্রিয়তা দেখি দিন দিন বাড়ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রতিদিনই বহু লোক আসে লোরকার স্মৃতিজড়িত এ সেন্টারটি দেখতে। আমাদের দৈনিক ট্যুর আরো বাড়াতে হবে।’ ইসাবেল একটি বুকলেট দিল, যেখানে ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’-এর ইতিহাস, কার্যক্রম বিষয়ে ভাল তথ্য আছে।
অফিসের পাশের কক্ষে দেখি বেশ বনেদী এক পিয়ানো। জানতাম পিয়ানো বাজানো ছিল লোরকার বেশ প্রিয়। এটাতে কি লোরকার হাতের স্পর্শ পড়েছে? ইসাবেলকে জিজ্ঞেস করতেই সে বলে ঊঠল, ‘ঠিকই ধরেছ। তবে এ পিয়ানোতে লোরকা ছাড়া আরো অনেকের হাতের স্পর্শ আছে। তার মধ্যে নামকরা হলেন ইগর স্ট্রাভিনস্কি।৭ তবে লোরকার নামটিই সবাই মনে রেখেছে। আকাশে অনেক তারা থাকলেও ধ্রুবতারাই সবাই দেখে, মনে রাখে। লোরকাও সেরকম।’ বললাম, ‘এর আগে লোরকা বাজিয়েছেন এ রকম ৪টি পিয়ানো আমি দেখেছি। প্রথমটি তাঁর জন্মস্থান ফুয়েন্তে ভাকুরেজ-এর ‘কাসা মুজেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা’-তে, দ্বিতীয়টি তার ‘ভালদাররুবিও’ গ্রামের কিশোর কালের বাসায়, তৃতীয়টি লোরকা পরিবারের গ্রীষ্মকালীন আবাস ‘হুয়ার্তা দে সান বিসেন্তে’, আর লোরকার চতুর্থ পিয়ানোটি দেখেছি ‘রায়না ক্রিস্টিনা হোটেলের’ লোরকা ক্যান্টিনে। সামনের এই পিয়ানোটি আমার দেখা লোরকার পঞ্চম পিয়ানো। আমি খুবই ভাগ্যবান।’ ইসাবেল বলল, ‘এতেই বোঝা যায় সঙ্গীত লোরকার কত প্রিয় ছিল। তিনি খুব ভালো পিয়ানো বাজাতেন, শিখেছেন তাঁর মায়ের কাছ থেকে। ১৯৩১ সালে বিখ্যাত শিল্পী লা আর্জেন্তিনিতা৮-র গানের সাথে লোরকা পিয়ানো বাজিয়ে গ্রামোফোন স্লেট রেকর্ডে ১০টি গান রেকর্ড করেন। লা আর্জেন্তিনিতা লোরকাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর প্রেমিক ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের৯ সাথে। পরে তাদের মাঝে হয়ে যায় গভীর এক বন্ধুত্ব। ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস নামটি অমর করে রেখেছেন লোরকা তাঁর কবিতার মাধ্যমে।’
আমি যোগ করলাম, ‘লোরকা ভালো ছবিও আঁকতেন, হতে চেয়েছিলেন চিত্রশিল্পীও। তবে সঙ্গীত-শিল্পী বা চিত্রশিল্পী না হয়ে তিনি হয়ে গেলেন কবি। কী নিয়তি! তবে কবিতা, গান, ছবি‘ এ তিনটি খুবই কাছাকাছি। বলা যায়, লোরকা তাঁর কবিতার মাধ্যমে গান গেয়েছেন, ছবি এঁকেছেন। তিনটি মাধ্যম তো একই কাজ করে‘ মানুষের কথা বলে, জীবনের কথা বলে‘ তিনটি ভিন্ন উপায়ে।’ ইসাবেল স্মিত হেসে বলল, ‘তাই হবে।’
কথা বলার ফাঁকে দেখলাম ট্যুর গাইড চলে এসেছে। আমাদের দলে ১০ জন, বেশিরভাগ দক্ষিণ আমেরিকার।
প্রথমে ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’-এর ইতিহাস, কার্যক্রম বিষয়ে কিছু তথ্য জানাল আমাদের গাইড মিগেল রিকো। এরপর ঘুরে ঘুরে দেখাল পুরো রেসিদেনসিয়া। মাদ্রিদের শহর কেন্দ্র থেকে দুরে, গাছ-গাছালির মাঝে এক নিরিবিলি জায়গায় এর অবস্থান। ছাত্রদের থাকার জন্য পাশাপাশি দুইটি ভবন আছে। এটি পুরোপরি বিশ্ববিদ্যালয় না হলেও অধ্যয়ন, গবেষণা, সেমিনার, প্রদর্শনী ইত্যাদির জন্য সব সুবিধা আছে। এসব সুবিধা বিনামূল্যে বা খুব কম মূল্যে প্রদান করা হয়।
লোরকা তখন ২১ বছরের এক তরুণ। গ্রানাদা থেকে মাদ্রিদ আসেন ১৯১৯ সালের অক্টোবরে, ভর্তি হলেন মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ে, থাকা শুরু করলেন এই ছাত্রাবাসে। ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’-এর মধ্যে হয়ে উঠেছে শুধু স্পেনের নয়, ইউরোপের কবি-শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক মিলনমেলা। এখানে কয়েকজনের সংস্পর্শে এসে লোরকা তাঁর প্রতিভা বিকাশের সুযোগ পেয়েছিলেন। প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় ঘনিষ্ঠ সহপাঠীদ্বয়ের নাম‘ চিত্রশিল্পী সালভাদর দালি ও চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েল। আরো ছিলেন কবি হিমেনেথ ও নাট্যকার এদুয়ার্দো মার্কুইনা। ১৯২০ সালের প্রথম দিকে সুরকার ও গীতিকার ম্যানুয়েল দে ফাইয়া-র সাথে লোরকা বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন। তবে সবচেয়ে গভীর বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে সালভাদর দালির সাথে, অনেকের মতে তা রোমান্টিক পর্যায়ে পৌঁছেছিল। দালির জন্য লোরকা ১৯২৬ সালে লিখেছেন এক দীর্ঘ কবিতা ‘ওদা আ সালভাদর দালি’।
‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’ এ থাকাকালীন ১৯২০ সালে লোরকা প্রকাশ করেন তাঁর প্রথম কাব্য‘ ‘লিব্রো দে পোয়েমাস, কবিতাগুলি তিনি ১৯১৮ থেকে ১৯২০ সালের মধ্যে লিখেছিলেন।
কবিতা ছাড়াও লোরকা এ সময় নাটক লিখতে থাকেন। এখানেই তিনি লেখেন তাঁর প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য নাটক ‘এল মালেফিসিও দে লা মারিপোসা’ মঞ্চস্থ হয় মাদ্রিদের ‘থিয়েথ্রো এসলাভা’-তে ১৯২০ সালে। দর্শকদের সাড়া পেতে ব্যর্থ হওয়ায় মাত্র ৪টি শো এর পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
মিগেল সব দেখানোর পরে আমাদের নিয়ে গেল বিশেষ একটি কক্ষে‘ যা ছিল লোরকার। এখানে লোরকার বইপত্র, লেখার টেবিল, খাতা-কলম, বিছানা-পত্র, আর অনেক কিছু সাজানো আছে। মনে হবে লোরকা এইমাত্র বের হয়েছেন, এক্ষুণি ফিরে আসবেন, সাথে আসবেন সালভাদর দালি, লুই বুনুয়েল এবং ম্যানুয়েল দে ফাইয়া। তাদের আড্ডা বেশিরভাগ হতো এই কক্ষেই। তা কল্পনায় দেখতে পাচ্ছি, শুনতে পাচ্ছি।
ট্যুর শেষ হওয়ার পরে বিদায় নেবার সময় ইসাবেল বলল, ‘আবার আসবে, হাতে নিয়ে আসবে লোরকাকে নিয়ে লেখা তোমার বই। সেখানে লোরকার বোন ইসাবেলার সাথে লোরকার ভক্ত এই ইসাবেলার কথাও যোগ করতে ভুলবে না।’ বলে চোখ টিপে হাসল। বললাম, ‘আমি দুই ইসাবেলার কথাই বইতে লিখব। কথা দিলাম।’
এরপর হেঁটে প্রায় ২ মাইল দূরের এক এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্সে গেলাম। ঠিকানা: কায়ে দে আলকালা, ৯৬, লোরকার নামে এখানে লাগানো আছে একটি প্লাক। এ বাসায় লোরকা তাঁর জীবনের শেষ ৩ বছর ছিলেন। গৃহযুদ্ধ শুরু হলে এখান থেকে গ্রানাদা চলে যান। সেখানে মাসখানেক পরেই তাঁকে হত্যা করা হয়।
আশে পাশে এখনো যেন শুনতে পাই লোরকার পায়ের শব্দ, পিয়ানোতে তাঁর তোলা সুর, আর সুরেলা কণ্ঠে বন্ধুর জন্য রচিত ‘ওদা আ সালভাদোর দালি’ কবিতার আবৃত্তি:
সালভাদোর দালি, জলপাই স্বরের মানুষ, আমি তাই বলি
যা বলে তোমার রং তুলি আর এই তুমি লোকটাই
ইজেলে থমকে থাকা কৈশোরক ব্রাশ, তার গান নয়
আমি গান গাই তোমার লক্ষ্যভেদী তীর ও ফলার।
ক্যাতালুনিয়ার যে আলো তোমার মধ্যে উদ্ভাসিত
আমি তার গান গাই। গান আকারকে স্পষ্ট করার।
ক্ষণভঙ্গুর এই তোমার হৃদয় বেজে উঠছে মহাজাগতিক সুরে
ফরাসি বাহান্ন তাসের অনাহত অভীপ্সার গান আমি গাই।
তুমি খোঁজো পাথরের মূর্তিতে নিহিত গতির গান, সেই গান গাই
এই এক ভয়, পাছে পথের ভাবনার ভার তোমাকে বইতে হয়।
যে সমুদ্র সাইরেন শাঁখ আর ঝিনুকের সাইকেলে সওয়ার
সে তোমারই গান গায় বলে আমি তার গান গেয়ে যাই।১০
জবভ:
১. ৮৫২ সালে কর্ডোভার আমির প্রথম মুহম্মদ এক দুর্গ আলকাসার ও এক দুর্গনগর মায়ারিত প্রতিষ্ঠা করেন ‘মানসানারেস’ নদীর খাড়া পাড়ে। কিছু প-িত মনে করেন ‘মায়ারিত’ এসেছে আরবি শব্দ ‘মাইয়া’ থেকে, যার অর্থ অনেক ‘জলপথ’। এটি পরবর্তীতে মাদ্রিদ নাম ধারণ করে। এর অবস্থান ছিল বর্তমান ‘প্যালেসিও রিয়াল’ এলাকায়। ১০৮৩ সালে খ্রিস্টানরা মায়ারিত অধিকার করে নেয়। তখনও তা ছিল এক ছোট জনপদ‘ তার দুই পাশে শক্তিশালী রাজ্য কাস্তিয়া ও আরাগন। ১৪৭৯ সালে এ দুই রাজ্য একত্রিত হয়ে বৃহত্তর স্পেন গঠিত হওয়ার পথ সুগম করে দেয়। রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ১৫৬১ সালে স্পেনের রাজধানী তোলেদো থেকে মাদ্রিদে নিয়ে আসেন। তখন নগর দুর্গটির গুরুত্ব আরো বেড়ে যায়। তবে ১৭৩৪ সালের এক অগ্নিকা-ে দুর্গটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। ১৭৩৮ সালে রাজা পঞ্চম ফিলিপ একই স্থানে একটি রাজপ্রাসাদ নির্মাণ করার নির্দেশ দেন। ১৮ বছরের প্রচেষ্টায় ১৭৬৪ সালে নির্মিত হয়ে উঠে ‘প্যালেসিও রিয়াল’। মুরদের ৮৫২ সালের ‘আলকাসার’ থেকে ১৭৬৪ সালের ‘প্যালেসিও রিয়াল’।
২. আয়োনীয় স্তম্ভ: এটি গ্রীসের আয়নিয়া অঞ্চল থেকে উদ্ভূত এক শৈলী, যেখানে স্তম্ভের ওপরে দুইটি সর্পিল নকশা পাকানো থাকে।
৩. তাসকানির আয়তাকার স্তম্ভ: ইতালির তাসকানি অঞ্চল থেকে উদ্ভূত এক শৈলী, যেখানে দেয়ালের গায়ে চারকোণা এ স্তম্ভগুলি লাগানো থাকে, আর দেয়াল থেকে তা কিছুটা বেরিয়ে আসে।
৪. ১৭শ শতাব্দীর গোড়ার দিকে ইতালিতে উদ্ভূত হয় বারোক স্থাপত্য। এ স্থাপত্যে সরলরেখার বদলে ব্যবহার করা হতো বক্ররেখা ও সর্পিল আকার‘ এতে সৃষ্টি হতো গতি ও নাটকীয়তার অনুভুতি। আরো থাকে জাকজমক ও সজ্জা, স্বর্ণের কাজ, জটিল নকশা ও কারুকাজ, বিশাল চিত্রকর্ম ও সূক্ষ্ম ভাস্কর্য। দর্শকদের ভক্তি ও বিস্ময় জাগানোর জন্য থাকত বিশাল আয়তন, উঁচু সিলিং ও বর্ণাঢ্য সজ্জা।
৫. ফ্রান্সের স¤্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট ১৮০৮ সালের ডিসেম্বর মাসে মাদ্রিদ সফরে আসেন ভাই জোসেফের বিরুদ্ধে মাদ্রিদে সংঘটিত অসন্তোষ প্রশমিত করতে, আর সাথে স্পেনের সিংহাসনের উত্তরাধিকার নিয়ে সৃষ্ট বিরোধের সমাধান করতে। এর আগে তাঁর ভাই জোসেফ বোনাপার্টকে তিনি স্পেনের রাজা ঘোষণা করেছিলেন। মাদ্রিদের নাগরিকরা ফরাসি দখলের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ১৮০৮ সালের ২রা মে। তা দমন করতে ফরাসি সৈন্যরা শত শত মানুষকে ধরে গুলি করে হত্যা করে ২রা মে সারাদিন ও ৩রা মে ভোরবেলা। ফ্রান্সিককো গয়া এই বিদ্রোহ ও হত্যাকা-ের দৃশ্যটি এঁকেছেন এর ৬ বছর পরে, ১৮১৪ সালে আঁকা ‘মাদ্রিদে ১৮০৮ সালের ৩রা মে’ ছবিটিতে, যা প্রদর্শিত আছে ‘মুসেও দে প্রাদো’-তে।
৬. ১৯১০ সালে প্রতিষ্টা থেকে ১৯৩৬-১৯৩৯ সালের গৃহযুদ্ধ পর্যন্ত ‘রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস’ ছিল স্পেনের অগ্রণী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, যেখানে নতুন চিন্তাধারার চর্চা হতো। এখানে অবস্থান করেছেন স্পেনের প্রধান শিল্পী-সাহিত্যিক-বিজ্ঞানীরা। প্রবীণদের মাঝে ছিলেন‘ হুয়ান রামোন হিমেনেথ, মিগেল দে উনামুনো, হোসে অতের্গা ই গেসেথ, হোসে মরেনো ভিয়া; আর নবীনদের মাঝে ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, লুই বুনুয়েল, সেভেরো অচোয়া, সালভাদর দালি, রাফায়েল এলবার্তি ও পেদ্রো সেলিনাস। এঁদের অনেকের অবদান ছিল স্পেনের সৃষ্টিশীলতার এক উজ্জ্বল অধ্যায়ে, যাকে বলা হয় he Silver Age of Spanish Culture। এঁদের মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, সালভাদর দালি ও লুই বুনুয়েল। এখানে আরো এসেছেন, আলোচনা করেছেন আলবার্ট আইনস্টাইন, ইগর স্ট্রাভিনস্কি, লা আর্জেন্টিনিতা, মারি কুরি ও হেনরি বার্গসঁ-এর মতো বিখ্যাত ব্যক্তিরা।
১৯৮৬ সালে এ কেন্দ্রটি আবার তার কার্যক্রম শুরু করে। পাশাপাশি একজোড়া ভবন ‘পাবেইয়োনেস হেমেলস’ এ থাকে ছাত্রছাত্রীরা। এর পরের ভবন ‘পাবেইয়ন ট্রান্সআটলান্টিকো’-তে আছে প্রদর্শনী হল, নথিপত্র কেন্দ্র, সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের দফতর এবং ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ফাউন্ডেশানের প্রধান কার্যালয়।
৭. ইগর স্ট্রাভিনস্কি: বিশ্বমানের ধ্রুপদী ও আধুনিক সঙ্গীত রচয়িতা। জন্ম রাশিয়ায়, পরে ফরাসি ও যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব নিয়েছিলেন। স্ট্রাভিনস্কি ১০ বছর বয়সে পিয়ানো বাজানো শেখা শুরু করেন। পরে পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন ও সঙ্গীত বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। তিনি নিজের সম্বন্ধে বলতেন, ‘সঙ্গীতের আবিষ্কারক’।
৮. লা আর্জেন্তিনিতা: এটি তাঁর পেশাগত নাম, প্রকৃত নাম ‘এনকারনাসিঁওন লোপেজ হুলভেস’। ১৮৯৮ সালে আর্জেন্টিনায় জন্ম, ছোট বেলাতেই পরিবারের সাথে চলে আসেন স্পেনে। মাত্র ৪ বছর বয়স থেকে নাচ শিখতে শুরু করেন, আর ৮ বছর বয়সে মঞ্চে প্রথম নাচ প্রদর্শন করেন। পরে তিনি ফ্লেমেনকো নাচে বিশেষ পারিদর্শিতা লাভ করেন এবং সে সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ ফ্লেমেনকো নর্তকী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার প্রথম নাটক ‘এল মালেফিসিও দে লা মারিপোসা’-এর শুভ মহরত হয় মাদ্রিদের ‘থিয়েথ্রো এসলাভা’-তে ১৯২০ সালে, আর এতে প্রজাপতির নাম ভূমিকায় অভিনয় করেন লা আর্জেন্তিনিতা। ১৯২৬ সালে পেশাগত কাজ থেকে বিরতি নিয়ে তিনি পরের বছর নতুন ভাবনা ও নতুন উদ্যোগে ফিরে আসেন, আর যুক্ত হন ‘জেনারেসিওন দেল ২৭’-এর সাথে। এ সময় তিনি ফ্লেমেনকো, ট্যাঙ্গো, বুলেরিয়া ও বোলেরো‘ এসব নৃত্যশৈলীকে একত্রিত করেন। ১৯৩১ সালে তাঁর কণ্ঠে ও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার পিয়ানো বাজনায় ৫টি গ্রামোফোন স্লেট রেকর্ডে ১০টি গান রেকর্ড করা হয়। গানগুলির বাছাই ও অভিযোজন করেন লোরকা। রেকর্ডটির শিরোনাম ছিল: Coleccion de Canciones Populares Espanolas। এ গানগুলির অন্যতম ছিল লোরকার কবিতা: En el Café de Chinitas। দ্বিতীয় প্রজাতন্ত্রের শুরুতে লা আর্জেন্তিনিতা তাঁর বোন পিলার হুলভেস ও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে নিয়ে তাঁর ব্যালে দল Bailes Espanoles de las Argentinita গঠন করেন। লা আর্জেন্তিনিতা-র জীবনের উল্লেখযোগ্য দিক হলো সাহিত্যিক ও বুল-ফাইটার ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস এর সাথে তাঁর দীর্ঘ ৯ বছরের প্রেম, যদিও মেহিয়াস আরেক নারীর সাথে বিবাহিত ছিলেন। ১৯৩৪ সালে মেহিয়াসের করুণ মৃত্যুর পর লা আর্জেন্তিনিতা তাঁর দল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র সফরে যান। ১৯৪৩ সালে নিউ ইয়র্কের ‘মেট্রোপলিটান অপেরা হাউস’ এ তিনি তাঁর নিজের কোরিওগ্রাফি দিয়ে ফ্লেমেনকো নাচ En el Café de Chinitas প্রদর্শন করেন। লোরকার কবিতার সাথে এ নৃত্য প্রদর্শনীর মঞ্চসজ্জায় ছিলেন দালি, অর্কেস্ট্রায় ছিলেন হোসে আতুরবি। ২৪ সেপ্টেম্বও ১৯৪৫ সালে নিউ ইয়র্কে লা আর্জেন্তিনিতা মৃত্যুবরণ করেন।
৯. ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস: সাহিত্যিক ও বিখ্যাত বুল-ফাইটার, নৃত্য শিল্পী লা আর্জেন্তিনিতা-র প্রেমিক। ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াস-কে লোরকার সাথে পরিচয় করিয়ে দেন লা আর্জেন্তিনিতা। মেহিয়াস ও লোরকার মধ্যকার এ পরিচয় গভীর বন্ধুত্বের রূপ নেয়। ষাঁড় লড়াইয়ে আহত হওয়ার পর ১৯২৭ সালে তিনি এ থেকে অবসর নেন এবং সাহিত্যচর্চায় আরো বেশি মনোযোগী হন। তাঁর সেভিয়ার খামার বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় কবি লিউইস দে গঙ্গোরা-র ত্রিশততম মৃত্যবার্ষিকী উপলক্ষে নবীন শিল্পী-সাহিত্যিকদের এক সমাবেশ, যা থেকে জন্ম নেয় নতুন ভাবনা-চিন্তার আন্দোলন‘ ‘জেনারেসিওন দেল ২৭’। কয়েক বছর পরে মেহিয়াস আবার রিংয়ে ফিরে যান। এ রকম এক ষাঁড় লড়াইয়ে তিনি ১১ আগস্ট ১৯৩৪ সালে আহত হন, আর দুদিন পর মারা যান। তাঁর এ করূণ মৃত্যু প্রেমিকা লা আর্জেন্তিনিতা এবং বন্ধু ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকাকে গভীরভাবে শোকাভিভূত করে। লোরকা এ নিয়ে পরের বছর রচনা করেন তাঁর সবচেয়ে দীর্ঘ কবিতা‘ Llanto Por Ignacio Sanchez Mejias, ইগনাসিও সানচেস মেহিয়াসের জন্য বিলাপগাথা।
Oda s Salvador Dali: সালভাদোর দালির প্রতি: অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য।