image
ফার্নান্দো পেসোয়া

ফার্নান্দো পেসোয়া

অনন্য এক দার্শনিক কবি

মো. রেজাউল করিম

বিশ শতকের ইউরোপীয় সাহিত্যে ফার্নান্দো পেসোয়ার মতো আত্মবিভক্ত, বহুস্বরিক ও দার্শনিকভাবে জটিল সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব বিরল। বাংলাদেশের পাঠকমহলে তিনি এখনো অপরিচিত অথচ তাঁর সাহিত্য-সমগ্র এমন বিস্ময় তৈরি করে যে, তাঁকে না জানলে বিশ শতকের সৃজনশীল মানুষের ভেতরে চলা আত্মসংঘাত ও বহুস্বরের সাহিত্যিক মানচিত্রের বড় অংশ অপঠিতই থেকে যায়। বিশ্বের বহুল আলোচিত এই পর্তুগিজ কবি ও দার্শনিক ছিলেন আত্মবিচ্ছেদের এমন এক শিল্পী, যিনি মানুষের ভেতরের বহুস্বর, বিরোধ, ভাঙন, আবেগ ও চিন্তার সংঘাতকে দর্শনের গভীরতায় রূপ দিয়েছেন। ইউরোপীয় আধুনিকতার কবিবৃন্দ যেমন: থমাস স্টার্নস এলিয়ট, মারিয়া রিলকে বা লুইস বোর্হেস জীবনের বিভঙ্গ ও অস্তিত্ব-বোধে নতুন ভাষা সৃষ্টি করেছেন, পেসোয়া ছিলেন তাঁদের সমান্তরালে দাঁড়িয়ে থাকা এক দুর্লভ প্রতিভা।

বিশ শতকের অন্যতম রহস্যময় ও গভীর চিন্তাশীল কবিদের তালিকায় পর্তুগিজ কবি ফার্নান্দো পেসোয়া (১৮৮৮-১৯৩৫) একটি ব্যতিক্রমী নাম। আধুনিক মানুষের মনস্তত্ত্ব, নিঃসঙ্গতা এবং আত্মসত্তার বহুস্তরের অনুসন্ধান বোঝার ক্ষেত্রে তাঁর গুরুত্ব অপরিসীম। পেসোয়া এমন এক কবি, যার লেখা পড়লে মনে হয় তিনি শুধু কবিতা লেখেননি বরং মানুষের ভেতরের অন্তর্গত প্রশ্নগুলোকে শব্দের আকারে সাজিয়ে তুলেছেন।

লিসবনে জন্ম নেওয়া পেসোয়াকে কৈশোরে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে কাটাতে হয়। ইংরেজি ভাষা, পাশ্চাত্য দর্শন ও ঔপনিবেশিক বিশ্বের বাস্তবতা তাঁর চিন্তাজগৎকে প্রথম দিকে প্রভাবিত করে। পরবর্তীতে লিসবনে ফিরে তিনি লেখক, কবি, দার্শনিক ও অনুবাদক হিসেবে কাজ করলেও তাঁর দর্শন ও কবিত্বে মৌলিকত্ব দেখা যায়; যা মূলত নিজের ভেতরেই বহুস্বরে ভাবতে পারা। মানুষের ভেতরের এই বহুমাত্রিক কণ্ঠই তাঁকে আধুনিক সাহিত্যের এক অনন্য চরিত্রে পরিণত করেছে।

পেসোয়ার বর্ণনাভঙ্গি আবেগী হলেও আবেগের ওপর ভর করে গড়ে ওঠেনি বরং তিনি আবেগের গভীরে থাকা প্রশ্ন ও দ্বন্দ্বকে অনুসন্ধান করেছেন। অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা, নিঃসঙ্গতার নিরাভরণ অভিজ্ঞতা, স্বপ্ন ও বাস্তবের অন্তর্দ্বন্দ্বএবং মানুষের নিজস্ব মনোজগতের সাথে বোঝাপড়ার চিরন্তন চেষ্টা, এসবই তাঁর কবিতার মূল ফোকাস বলে প্রতীয়মান হয়। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষ অন্তর্নিহিত সত্তা তার নিজের ভেথরেই একটিমাত্র আত্মপরিচয়ে সীমাবদ্ধ নয় বরং সময়, পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে গড়ে ওঠে অসংখ্য রূপ ও অসংখ্য ‘আমি’তে ভরপুর। এই বিশ্বাসই তাঁর সাহিত্যকে দিয়েছে অনন্য গভীরতা।

তিনি এক পর্যায়ে লিখেছেন To feel everything in every way is to be nothing in any definite way (অনুভবের বহুমাত্রিকতাই তাঁর দর্শনের মূল সূত্র)। জীবদ্দশায় তাঁর খুব সীমিত সংখ্যক বই প্রকাশিত হলেও মৃত্যুর পর তাঁর ঘরে পাওয়া এক বিশাল ট্রাঙ্ক ভর্তি পা-ুলিপি সাহিত্য-জগতে বিস্ময় সৃষ্টি করে। সেই বিপুল সৃষ্টির মধ্য দিয়ে পেসোয়া আজ বিশ্বসাহিত্যের এক অনিবার্য নাম হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পেসোয়ার দর্শন হেটেরোনিম বলতে মূলত বোঝায় নিজের ভেতরে বহুজনের জন্ম। পেসোয়ার সাহিত্য নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমে আসে তাঁর ‘হেটরোনিম’ তত্ত্বের ধারণা। বিশ্বসাহিত্যে এমন বিচিত্র অথচ গভীর কৌশল প্রয়োগ করতে আগে দেখা যায়নি। তিনি নিজের ভেতরে একাধিক কবিসত্তা সৃষ্টি করেছেন‘প্রতিটি সত্তার আলাদা জীবনী, আলাদা কাব্যভাষা ও আলাদা দর্শন। লেখক কেবল ছদ্মনাম নেননি; সৃষ্টি করেছেন পরিপূর্ণ ব্যক্তিত্ব‘যেন স্বতন্ত্র লেখক। এই হেটেরোনিমদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত তিনজন চিন্তক হলেন আলবার্তো কাইরো, রিকার্দো রেইস এবং আলভারো দে কাম্পোস।

কাইরো প্রকৃতিকে দেখেন এমন এক শান্ত দৃষ্টিতে; যেন সবকিছুই অকৃত্রিম। তাঁর কবিতায় কোনো আড়ম্বর নেই; আছে রৌদ্র, বাতাস ও পশুপাখির সরল উপস্থিতি। কাইরো মনে করেন, চিন্তা করা মানেই প্রকৃতিকে দূরে সরিয়ে ফেলা। তাই তিনি ‘দর্শন’কে ভুলে গিয়ে প্রকৃতির নৈর্ব্যক্তিক সৌন্দর্যের মধ্যে অস্তিত্ব খোঁজেন। পেসোয়ার ভাষায় কাইরো ছিলেন “my master” যে সরলতা তাঁকে মুক্তি দিয়েছে।

অন্যদিকে রিকার্দো রেইস ছিলেন একধরনের নব-ক্লাসিক্যাল চিন্তার প্রতিনিধি। তাঁর কবিতায় গ্রিক-রোমান ঐতিহ্যের মিতব্যয়িতা, মাপা আবেগ ও সংযত ধ্বনি রয়েছে। রেইস জীবনকে দেখেন স্বল্পায়ু একটি যাত্রা হিসেবে, যেখানে নিয়ন্ত্রণ ও স্থিতধী মনোভাবই মানুষের প্রধান গুণ। তিনি আনন্দকেও খানিক দূরত্বে রেখে অনুভব করেন, যেন আবেগ তাকে গ্রাস না করে।

সবচেয়ে তীব্র ও আধুনিক ছিলেন আলভারো দে কাম্পোস। যন্ত্রসভ্যতা, শিল্পায়ন, মহানগর এসবের প্রতি তাঁর তীব্র আকর্ষণ ও হতাশা মিলেমিশে এককার হয়ে গিয়েছে। তিনি ভবিষ্যতবাদী কবিতার সুরে রচনা করেছেন নগরায়ণের উত্তেজনা ও ক্লান্তি। দে কাম্পোসের কবিতায় মানব মনের চঞ্চলতা, আত্মবিদ্বেষ, অপ্রাপ্তি এবং দ্রুতবেগে ছুটে চলা ও জীবনের চাপ একইসঙ্গে বিস্ফোরিত।

এই তিনজন আসলে পেসোয়ার তিনটি দিক সরলতা, সংযম এবং বিক্ষুব্ধ আধুনিক চেতনাকে এক সঙ্গে বহন করেন। তাঁর বিখ্যাত উক্তি “To be multiple is to be universal” এ অর্থেই সত্য। একজন মানুষের ভেতর যে কতগুলো স্বর লুকিয়ে থাকে, তা পেসোয়ার হেটেরোনিমরা অভূতপূর্ব স্পষ্টতায় ফুটিয়ে তোলে।

পেসোয়ার সবচেয়ে আলোচিত রচনা আত্ম-অস্তিত্বের গোলকধাঁধা (The Book of Disquiet)। বইটি কোনো ধারাবাহিক উপন্যাস নয়; বরং খ- খ- নোট, পর্যবেক্ষণ, স্বগতোক্তি এবং দার্শনিক তত্ত্বের টুকরো টুকরো সমাহার, যেন এক মানুষের ভেতরের নীরব ঝড়ের সংকলন। এর লেখকও একজন হেটেরোনিম: বার্নার্দো সোয়ারেস, এক নীরব লিপিকার, যিনি দিন শেষে নিজের একাকীত্বে ডুবে যান।

এ বইয়ে উঠে এসেছে জীবনের অর্থহীনতা, মানুষের অন্তরঙ্গ নীরব যন্ত্রণা, স্বপ্নের বিস্ময় এবং ভয়ের ভেতর থেকে জন্ম নেওয়া এক হতাশ-নৈর্ব্যক্তিক দর্শন। আধুনিক মানুষ যার অর্থ খুঁঁজে পায় না, নিজের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ডুবে থাকে, কালহীন ক্লান্তির কাছে পরাজিত হয়‘সোয়ারেস তারই কণ্ঠস্বর। পেসোয়া দেখিয়েছেন, মানুষ সবসময়ই নিজেকে চিনতে চায়, কিন্তু নিজের ভেতরের অসংখ্য প্রতিচ্ছবির জটিলতায় সে কখনোই সম্পূর্ণ এক একক সত্তায় পরিণত হতে পারে না। পেসোয়া তাঁর কবিতায় আত্ম-অস্তিত্বের গোলক ধাঁধা তথা হেটোরিনম প্রতিফলিত হয়েছে।

পেসোয়ার কবিতায় সরলতা ও দার্শনিকতার বিরল মিশ্রণ দেখা যায়। যদিও তিনি বহুস্বরের কবি, তবু তাঁর কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে একটি বিষয়ই মানুষের অস্তিত্ব। তিনি ভাবনার গভীরতাকে লুকিয়ে রেখেছেন সরল চিত্রকল্পের আড়ালে। পাথরের গায়ে রোদ, নদীর স্থিরতা, ছাদের ওপরের নীরব বৃষ্টি এসব ক্ষুদ্র দৃশ্যও তাঁর কবিতায় দর্শন হয়ে উঠেছে। তিনি প্রমাণ করেছেন, জটিল চিন্তাকে প্রকাশ করতে কঠোর ভাষা লাগে না; লাগে কেবল গভীর অন্তর্দৃষ্টি।

পেসোয়ার কবিতায় বারবার ফিরে আসে স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্ব। স্বপ্ন তাঁর কাছে পরিত্রাণ, আবার ফাঁদও; আর বাস্তবতা একদিকে প্রাত্যহিক রুটিনের ক্লান্তি, অন্যদিকে অস্তিত্বের ভার। তাঁর কবিতার পাঠক দ্রুতই বুঝতে পারে, পেসোয়া আসলে কবিতাতে নিজেকেই খুঁঁজছেন; আর নিজের মতো বহু ‘নিজেকে’ খুঁজে পাচ্ছেন, যারা পরস্পরকে প্রশ্ন করে, পরস্পরকে ছায়া দেয়, আবার অস্বীকারও করে।

পেসোয়ার কবিতায় প্রায়শঃই শব্দের অভ্যন্তরে লুক্কায়িত নিঃসঙ্গতা লক্ষ্য করা যায়। পেসোয়ার কবিতা অনেকটা স্তরযুক্ত কুয়াশার মতো ওপরে স্বচ্ছ, নিচে অতল। তাঁর কবিতায় সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে অস্তিত্বের অনিশ্চয়তা। তিনি লিখেছেন‘

To feel everything in every way,

To live everything from all sides

শাব্দিক বাংলা করলে অর্থ দাঁড়ায়: সবকিছু অনুভব করা-যতটুকু সম্ভব, সবকিছু যাপন করা-সব দিক থেকে। তাঁর কবিতার বিশেষত্ব হলো প্রতিটি হেটেরোনিমের কবিতা আলাদা এক জগৎ। কাইরো প্রকৃতিকে দেখে, রাইশ নিয়তির কথা ভাবেন; আর কাম্পোস শহরের উত্তাল গতি ও শূন্যতার কথা কবিতায় তুলে এনছেন।

আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নীরবতা। তাঁর কবিতা যেন শব্দের ভেতর নীরবতা তৈরি করে। এই নীরবতাই পেসোয়ার বিশেষ কাব্যভাষা, যা পাঠককে মননের গহীনে টেনে নিয়ে যায়। পেসোয়ার কবিতায় বিষণœতা কোনো দুর্বলতার জায়গা নয়; বরং এক ধরনের সৌন্দর্যবোধ। তাঁর কাছে দুঃখ মানে জীবনের তীক্ষè উপলব্ধি যা মানুষকে নিজের ভেতরের গহিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। বাংলা কবিতায় বিশেষ করে জীবনানন্দ দাশের নিঃসঙ্গতা বা শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বিভ্রান্তিময় আত্মউপলব্ধির সঙ্গে পেসোয়ার ভাবনার একটি আকর্ষণীয় সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। পেসোয়ার কবিতায় বিষণœতা কোনো দুর্বলতার জায়গা নয়; বরং এক ধরনের সৌন্দর্যবোধ, যা নন্দনশাস্ত্র নামে অভিহিত হয়।

বাংলাদেশে পেসোয়া এখনো পাঠকের কাছে খুব পরিচিত নন। আমাদের সাহিত্যচর্চায় তাঁকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি; কারণ তিনি আধুনিক মানুষের মানসিক বিচ্ছিন্নতা, আত্মদ্বন্দ্ব, বিক্ষুব্ধ প্রয়াস, নৈঃসঙ্গ্য এবং অস্তিত্বের সংকটকে এমনভাবে তুলে ধরেছেন, যা সময় ও ভৌগোলিক সীমারেখা অতিক্রম করে গিয়েছে। যে সমাজ দ্রুতগতির নগরজীবন, প্রযুক্তি-নির্ভরতা ও অন্তর্দ্বন্দ্বে আক্রান্ত, পেসোয়ার লেখা সেখানে আশ্চর্যভাবে প্রাসঙ্গিক।

ফার্নান্দো পেসোয়ার সাহিত্য এক অর্থে মানব আত্মার বহুস্তরীয় ইতিহাস। তিনি দেখিয়েছেন, একজন লেখক কেবল নিজের হয়ে লেখেন না; নিজের ভেতরে থাকা অসংখ্য সত্তার হয়েও লিখতে পারেন। তাঁর হেটেরোনিমরা মানুষের অন্তর্জগতকে যেমন খনন করেছে, তেমনি তাঁর কাব্য মানুষের নীরব দুঃখ ও চিন্তার পরিহাসকে নতুন করে সংজ্ঞায়িত করেছে। জীবদ্দশায় অখ্যাত হলেও মৃত্যুর পর পেসোয়া বিশ্বসাহিত্যের এমন এক মহীরুহে পরিণত হয়েছেন, যিনি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের অন্তর্লোকের জটিলতা উন্মোচিত করে যাবেন। পেসোয়া দেখিয়েছেন, একজন মানুষ এক নয়, বরং অনেক মানুষের সত্তা তার মধ্যে লুক্কায়িত থাকে। আমরা আমাদের ভিতরের বিভিন্ন কণ্ঠকে কখনোই পুরোপুরি মেলাতে পারি না। এই বহুত্বই আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় সত্য বা চিরন্তন।

সম্প্রতি