এলিজা খাতুন
অবেলাকে টার্গেট করে ওর চারপাশে একে একে ধেয়ে আসছে অসংখ্য ক্যামেরা!
গোধূলিলগ্নে জন্মেছিল বলে জন্মের সময় ওর দাদা নাম রেখেছিল রাঙাবেলা। অথচ জীবন তার রাঙা নয় ছিঁটেফোঁটাও। বড় হবার পর ‘রাঙা’ বাদ রেখে বেলা নামের আগে অ-যুক্ত করে অবেলা নামেই নিজেকে পরিচয় করাতে স্বচ্ছন্দ সে। অবেলার বয়সের সংখ্যা পঞ্চাশের আশেপাশে। কিন্তু তার মাথায় পাকা চুলের আধিপত্য জোর দাবি জানায় অবেলা ষাট ছুঁয়েছে নিশ্চিত। হ্যাঁ, বলতে গেলে অবেলা প্রতি রাতেই দেখে তার একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধ এই পোড়ো বাড়ির কোনো গোপন কক্ষে আটকে আছে।
মাঝে মাঝে এই স্বপ্ন উন্মাদ করে তোলে অবেলাকে। প্রায় বিশ বছর পূর্বে কোনো এক শীতের দিনে পথের পাশের দোকান থেকে দু’লিটারের জলের বোতল টেনে নিয়ে গড় গড় করে নিজের মাথায় ঢালার দৃশ্যে আশপাশের সকলে অবগত হয় কিছু একটা গ-গোল।এমনই তার হুলস্থুল যে, ভরা শীতেও যেন ঠা-া জলের আকাল। আবার কখনো কখনো পথের পাশে চাচের বেড়ার হোটেলের পেছনে ছুটে গিয়ে পরিত্যক্ত ছাই ওড়ায়। আঙুলে করে ছাই তুলে ঠোঁটে ও গালে মেখে নেয়।
বিগত বিশ বছর ধরেই এমন চিত্র বাতাসের মতো ভেসে বেড়ায় এ পাড়ায়। এই তো সেদিনই গলির ও মাথায় বসানো ট্যাপ থেকে এক জার পানি কোমরে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল চা’ দোকানের কর্মচারী ছেলেটা। পৌঁছেনি দোকান অব্দি, রাস্তার ধুলোয় জলের গড়াগড়ি। না কর্মচারী ছেলেটার দোষ নেই। শূন্যে কপাল ঠুঁকে, বুক চাপড়ে, আকাশ কাঁপিয়ে বুকফাটা চিৎকার জমিয়ে আলুথালু আঁচল উড়িয়ে ছুটে এসে পানির জার ছিনিয়ে নিয়েছিল অবেলা। তুলোর বালিশের মতো হালকাবোধে জারটিকে যেভাবে শূন্যে তুলে নিজের মাথার উপর উপুড় করে কলকলিয়ে জলে ভিজিয়ে নেয় নিজেকে; দেখে মনে হয়, দৈব শক্তি ভর করেছে অবেলার দশ আঙুলে।
ওর গাঁক গাঁক চিৎকারে পাখিগুলো উড়ে যায় সন্ত্রস্ত। কিছুক্ষণের মধ্যে চারপাশে অসংখ্য চোখ জড়ো হয়ে স্থির দাঁড়িয়ে দ্যাখে। থমকে দাঁড়ায় চারপাশের জীবন। কাজ ফেলে ঘুরে তাকায় তেলচিটচিটে ট্রাউজার পরিহিত ময়রার দোকানের কর্মচারীটিও। জিলিপি ভাজা দগদগে তেলের কড়াই উনুন থেকে নামিয়ে কর্মবিরতি ঘটলেও এ সময় বিশেষ আপত্তি থাকে না দোকান মালিকের। পানি নিয়ে অনন্যার তা-ব নৃত্য নতুনরূপে পুরোনো দৃশ্য। এ যেন জীবনের খেলা। কিন্তু এ দৃশ্যে আদৌ উপস্থিত মানুষদের হাসি-তামাশা বা ফুর্তির উদ্রেক হয় না। বরং মর্মবেদনা নতুন করে মনে জাগে সবার। বা একটু বেশিই ভারাক্রান্ত হয় কেউ কেউ।
সেই যে আকাশ থেকে খসে পড়া বিমানের বিধ্বংসী আগুনের লেলিহান শিখা যেদিন সমস্ত শহরের মুখ মেঘে ঢেকে দিয়েছিল কালো ধোঁয়ায়। রক্তলাল করেছিল শহরের হৃৎপি-। পাঠশালার অসংখ্য ফুলেদের রক্তমাংসপোড়া কালো কালো জমাটবদ্ধ ছাই। সেদিন থেকে সবাই জানে অবেলার জল কা-ের কারণ।
অবেলা শহরে চলে গেছে তার কপালদোষে‘ এমন কথা তার গ্রামে প্রচলিত এখনো। সংসার জীবন বছর দুই টিকেছিল অবেলার শিক্ষা, ধৈর্য, তার দেহসৌষ্ঠব ও শান্ত স্বভাবের কারণে। সন্তান জন্ম দেবার পর সেই রূপলাবণ্য ফিকে হতে থাকলে ভাঙন ধরেছিল সংসারে। এক বছরের শিশু অনিরুদ্ধকে কোলে নিয়ে অবেলা যে গ্রাম ছেড়েছিল‘ তার পেছনে আরও এক ঘটনা সেঁটে রয়েছে, পুরোনো প্রাসাদের দেয়ালে খোদাই করে লেখা গেরস্তের নাম আর বংশ-পদবীর মতো। অবেলার কলেজ জীবনের সহপাঠী শাহিন পারভেজ‘ যে কিনা রাষ্ট্রীয় অনাচারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের নামে স্লোগান শিখিয়ে তরুণ ছেলেমেয়েদের মিছিলে লেলিয়ে দিতো, তাকে গা ঢাকা দিতে আশ্রয় দিয়েছিল অবেলারই শোবার ঘরে। শাহিনের অপরাধ‘ ও বিশ^াস করে‘ দরিদ্র দেশ বলে কিছু হয় না, হচ্ছে শুধু সম্পদ ব্যবস্থাপনার অসমতা। সেদিনের কড়া অভিযানে পাড়া খুঁজে পুলিশ ব্যর্থ হয়ে ফিরে গেলেও রাত পোহাতেই বাড়ির চারপাশ ঘিরে ধরেছিল আত্মীয়-প্রতিবেশীরা।
সাধারণত, সেই গ্রামের অনেক মেয়েরই বিয়ের দু-তিন বছর পর ঠাঁই হয় বাবা-মায়ের ঘরে নয়তো সতীনের সাথে। তাদের অনেকেই পরবর্তীতে গ্রাম ছেড়ে শহরে আসে বিভিন্ন গার্মেন্টস-ফ্যাক্টরিতে। অবেলাও এসেছে এই শহরে। অপবাদ সাথে নিয়ে।
আজ আচমকা খুব ভোরে ঘুম ভাঙে অবেলার। বাইরে নরম প্রকৃতির শর শর শব্দের টানে উঠে যায় জানালার কাছে। ভরা ভাদ্রে আকাশের গায়ে হালকা কালির ছোপ। জানালার গ্রিল লাগোয়া সজনে গাছের উপরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি উড়িয়ে ছুটে যায় ছেঁড়া ছেঁড়া মেঘ।
সকাল থেকে মুহুর্মুহু ছোটবড় বাজ পড়ছে আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে প্রচ- শব্দে। ক্ষ্যাপা বাতাস অস্থির করে তুলেছে উঠোনের গাছগাছালিকে। ভাদ্রের শেষ কদিনের গুমোট দেখে মনে হয় ঝড় উঠবে, বৃষ্টি নামবে প্রবল। আজ বোধহয় সেরকমই দিন।
এমনই এক ভেজা ভাদ্রে অনিরুদ্ধকে নিয়ে গেছে ঐ পোড়ো বাড়িটায়। অবেলার একমাত্র সন্তান অনিরুদ্ধ। ছোট্ট করে ডাকে অনি। প্রতিকূল আবহাওয়া উপেক্ষা করে যাবার পক্ষে বাড়িটার প্রতি অবেলার সেই বিষণœ স্মৃতি-টানই যথেষ্ট। এক অপ্রতিরোধ্য টান।
ও পথে প্রতিদিন একটু একটু করে অবেলা অগ্রসর হয়, আর ফিরে আসে। পরবর্তী দিন তারো বেশি এগোয় আর ফিরে আসে। আবারো এগোয় আগের দিনের চেয়ে খানিকটা বেশি। এভাবে বাড়িটার প্রধান দরজা অব্দি পৌঁছেছে গতকাল।
কয়েক একর নিয়ে বিশালাকায় বাড়ির উঁচু দরজাটা ক্ষয়িষ্ণু তবু ভারি, মজবুত। ঠেলা দিতেই ফাঁকা করে দু’পাশে সরে গেলো দুটি প্রশস্ত পাল্লা।
কিন্তু এ কী! অন্ধকারের সমুদ্র! একটু কি আতঙ্কিত হলো অবেলা! যদিও অস্বাভাবিক নয় তা। অবেলা এক ঝটকায় ফিরে এসেছে গতকাল। তা বলে ভীত সে নয়। বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে সময় দিতে চায় নিজেকে। বরং কৌতূহল, আকাক্সক্ষা, উদ্বিগ্নতা মিলেমিশে বহুগুণ আকার ধারণ করেছে। যতই বৈরি পরিবেশ হোক বেরোবে আজও।
সন্ধে নাগাদ বেরিয়েছে। রাস্তার গা ঘেঁষে থাকা দু’একটা ঘরের ভেতরের কথাবার্তা, শিশুর কান্না, হাসমুরগি গরুছাগলের ডাক, বাসনকোসন নড়াচড়া গৃহস্থালির বহুমিশ্রিত শব্দে প্রায়-জনহীন পথের পাশে জেগে আছে মানুষ যাপনের স্পন্দন।
লোকালয় ছাড়িয়ে দূরে চলে এলে, বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতের মাঝখানে নিঃশব্দে কাকতাড়–য়ার চুনমাখা মাথাটি আসন্ন অন্ধকারের মাঝে বিনিদ্র প্রহরীর মতো জেগে থাকার সংকেত দিচ্ছে। গাড়িঘোড়া চলার শব্দ অস্পষ্ট হতে হতে নিজের চলার সাথে সাথে বাতাসের সংঘর্ষও এখন আর কানে পৌঁছাচ্ছে না, কেননা এতক্ষণে চলার গতি খানিকটা ধীর লয়ে নেমেছে। হাঁটতে শেখা বাচ্চাদের টলমল অথচ একাগ্র মনোযোগীর মতো।
সম্মুখের পথ জনশূন্য। জোরালো হচ্ছে দুপাশে ঘন ঝোপঝাড়ের উপরে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ার শব্দ। গমক্ষেতের ওপাশে কালভার্ট পেরিয়ে খানিক এগোলে পুরোনো ভঙ্গুর ক্ষয়িষ্ণু উঁচু দেয়াল। চারপাশে বড় বড় গাছের ডালপালা ছুঁয়ে ছুঁয়ে শীলত ছায়াময় করে রেখেছে দেয়ালটাকে। এখানে দেয়াল লাগোয়া পোড়া বিধ্বস্ত ঘরটা থেকেই এক মোটা কালো বিশালদেহি লোক অনিকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে গেছিলো অন্য ঘরে। যে লোকটার টেবিলে মোটা টাকার শর্তে আটকে ছিল একটা বড়সড় কাজের ফাইল।
বাঁক ঘুরে আরেকটু গেলে ঘাসে ঢাকা সরু পথ, কয়েক ধাপ সামনেই শান বাধানো পুকুর ঘাট। স্থির নিঃশব্দ জল। একটু থেমে কী যেন ভেবে অবেলা পুকুরপাড় ধরে পেছন দিকের পতিত জমিটার দিকে যায়। গত বিশ বছরে এখানে গুল্মজাতীয় বুনো গাছে ভরে গেছে। অশ^থ গাছটা বেড়েছে শাখা-প্রশাখা আর ঝুলন্ত শেকড়-বাকড়ে।
সূর্যাস্তের পর পরই সবকিছু অন্ধকারে ডুবে যেতে থাকলে, অশ^থ গাছ আর বুনো ঝোপঝাড়ের আড়ালে হঠাৎ কারো ছায়া বা কিছু একটা রয়েছে আন্দাজ হয়। অবেলার ঘাড়ের নিচ থেকে শিরদাঁড়া বেয়ে কোমর পর্যন্ত একটা হিম ¯্রােত নেমে গেল।
অবেলা আজও বিশ^াস করে এই বিশাল পোড়োবাড়িটার কোনো এক কোণে আটকে রয়েছে “অনিরুদ্ধ স্বপ্ন”। জীবিত অথবা মৃত। অথচ অবেলা সবাইকে বলে থাকে তার ছেলে অনিরুদ্ধ‘ বিদেশে পড়তে গেছে। ওর তো স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাবার কথাই চূড়ান্ত হয়েছিল। কাগজগুলো আটকে গেছে কোনো এক টেবিলে।
অনিরুদ্ধ অন্ধকারের ভেতর হাতড়ে হাতড়ে সিঁড়ি পেয়ে যায়, কিন্তু ধাপগুলো এমন এখানে, বোঝা যায় না কোনদিকে উপরে বা কোনদিকে নিচে যাবার পথ। এ-ঘর ও-ঘর হেলে পড়া ছাদের নিচে একটা কমফোর্ট কর্নার পেয়ে গেছে ঠিকই, কিন্তু একফোঁটা জল নেই এখানে। তেষ্টা নিয়ে এগোতে থাকে উঁচু নিচু এবড়ো-থেবড়ো কাত হয়ে থাকা দেয়ালের ফাঁক ফোঁকরে কুঁজো হয়ে, ধাক্কা খেয়ে, ইট সুরকি ছিটকে আসা, ঘষা লাগা, চোট খাওয়া সহ্য করতে করতে... একটা লিফটের দরজার সামনে যেতেই কী অদ্ভুতভাবে খুলে গেলো লিফট এর দরজা। এটা এখনও কার্যক্ষম! এখনও বৈদ্যুতিক সংযোগের চিহ্ন দেখা যাচ্ছে! কীভাবে সম্ভব! একটা বহুতল ভবনের অর্ধেকের বেশি অংশ মাটির নিচে বসে গেলেও লিফট অক্ষতভাবে সার্ভিস দেবার জন্য যদি প্রস্তুতি নেয় সে-ও কি বিশ^াসযোগ্য!
অনিরুদ্ধ লিফট এ ঢুকে এ বাটনে চাপ দেয়। গ্রাউন্ড ফ্লোরে নামতে এত দেরি হবার কথা তো নয়! ডাউন এরো সেই কখন সেভেন, সিক্স, ফাইভ, ফোর, থ্রি, টু, ওয়ান ডিসপ্লে করে গেছে। অথচ জি বাটনের গ্রিন সিগন্যাল ডাউন এরো শো করেই যাচ্ছে। অর্থাৎ লিফট নিচে নেমেই চলেছে। এর শেষ স্টেশন কোথায়!
অনিরুদ্ধ হতভম্ব হলেও ভয় বা দুঃশ্চিন্তা কোনটিই ওকে স্পর্শ করতে পারে না। প্রতি মুহূর্তে গতির কাছে, অনন্তের কাছে, বিশালত্বের অচেনা ভয়ের প্রতি স্যারেন্ডার করলে আগামী পৃথিবী কী করবে? নিজেকে নিশ্চিন্ত করার চেষ্টা করে এই ভেবে যে‘ কোথাও না কোথাও তো আছে লিফট থামবার স্টেশন।
অনিরুদ্ধর নিজেকে মনে হচ্ছে কোনো কাচের এক্যুরিয়ামে একটা রঙিন মাছ। তবে সাঁতারের দৃশ্যটা একেবারেই বিপরীত। লিফটের চার দেয়ালের গ্লাসের ভেতর আবদ্ধ অনিরুদ্ধ স্থির নির্বাক, অন্যদিকে লিফটের বাইরে চতুর্দিকের চলমান সমস্তটাই দৃশ্যমান। ঐ তো বাইরে অজ¯্র মানুষ! কীসের যেন জটলা!
ছেলেধরা সন্দেহে ক’জন সুশ্রীচেহারার নারীকে পিটিয়ে আহত করছে বিক্ষুব্ধ জনতা, শোনা যাচ্ছে সে নাকি তার ছোট্টমেয়েটাকে স্কুলে ভর্তির ব্যাপারে খোঁজ-খবর নিতে এসেছে। কিন্তু তা সত্য বলে প্রতিষ্ঠা পাবার কথা নয়; যেখানে সাক্ষী, বিচারক ও শাস্তিদাতা সবকিছুর ভূমিকায় এই উচ্ছৃঙ্খল জনতা। দৃশ্যটি সরে গেল এক-দুই সেকেন্ড এর সমান্তরালে।
আর ঐ যে দেখা যাচ্ছে রাজধানীর জনবহুল সড়কটাতে প্রকাশ্যে দিনের আলোয় পাথর মেরে একজন মানুষকে যেভাবে মারা হচ্ছে, এ যুগের মানুষ হয়েও মধ্যযুগীয় বর্বরতার প্রত্যক্ষদর্শী হয়ে উঠলো অনেকে।
আহা! ওখানে পুলিশ হাঁটুগেড়ে শ্বাসরোধ করছে কাকে! হ্যাঁ ক্রমশ দৃশ্যগুলো সম্মুখে চলে আসছে বাইস্কোপের রিলসের মতো। মৃত্যুর প্রতিবাদে পৃথিবীর নানা প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছে বিক্ষোভ। মিছিলে পথে নামছে মানুষ। জন্ম নিয়েছে বর্ণবাদ বিরোধী আন্দোলন‘ ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার।
বিশ্ব পরিবেশ দিবসে জাতিসংঘের একটি সংস্থা ‘পরিবেশ সংরক্ষণে যুবসমাজের ভূমিকা’ বিষয়ে একটি বিশেষ আয়োজনে দেশের স্কুল, কলেজ, ভার্সিটি থেকে সমস্ত কিশোর তরুণ যুবকদের অংশগ্রহণের আহ্বান জানিয়েছিল। অনিরুদ্ধর উপর দায়িত্বদেওয়া হয়েছিল তার ক্যাম্পাস থেকে প্রত্যেকের নিশ্চিত অংশগ্রহণের। মেস থেকে বেরিয়ে সেদিন ব্যাচে সবার সাথে এ বিষয়ে কথা বলতেই যাচ্ছিল ক্যাম্পাসের দিকে।
যে জায়গাটিতে এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় করবীর হাতে হাত রেখে হেঁটেছিল, দিনের আলোয় সে পথেই হকারদের দৌরাত্ম্য, তৃতীয় লিংগের নাছোড়বান্দা দলের হাততালি, ফুল বিক্রেতা নিষ্পাপ ছোট্ট এক বালিকার মাথায় হিজাব, আঠা খেয়ে টালমাটাল দুটো টোকাই-বালকের জড়াজড়ি পড়ে থাকা, মেট্রোরেল থেকে বিয়ারিং প্যাড পড়ে পথচারীর মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় বাতাসে নিদারুণ কোলাহল, খুব কাছেই ডাস্টবিনের পচা গন্ধ, এসবকিছু একধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি করছে; অথবা হতে পারে ক্যাম্পাসে সবাইকে সফলভাবে সংগঠিত করতে পারবে কি-না সেই আশংকায় চাপা চাপ!? বলা মুশকিল। কেননা ভেতরে ভেতরে আরেকটি সঙ্কীর্ণস্বার্থবাদী গোষ্ঠী কাজ করছিল।
তাছাড়া সংগঠিত করার কাজটি তো সহজ নয়, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ হয় সর্বদা নির্বোধ। সমাজের অতি তুচ্ছ বিষয়গুলি নিয়ে মানুষ আলোচনায় মেতে থাকে। মূল বিষয়গুলো হারিয়ে যায়। সমাধান হয় না মূল সমস্যা। প্রতিটি সচেতন শব্দের বিপরীতে থাকে হাজার হাজার পচনশীল শব্দ। ফলে ব্যর্থতার গভীরে ডুবে যেতে থাকে সমাজ, দেশ, রাষ্ট্র। অনিরুদ্ধ মূল সমস্যা উদঘাটনে হাত বাড়িয়েছিল।
একের পর এক রিলস ভেদ করে নেমে যাচ্ছে নিচে, এবার স্পষ্টদেখা যাচ্ছে সবচেয়ে বড় ঘনবসতিপূর্ণ বস্তিতে ভয়াবহ আগুন।একপাশে গলাগলি দলাদলি আকাশচুম্বী অট্টালিকা আর অন্যপাশে টিনের চালের জরাজীর্ণ খুপড়ি-ছাপড়ি ঘরবসতি, মাঝখানে ব্যবধান শুধু একটি লেক। এই বস্তির আগুন যেন এক পুরোনো অতিথি, অপ্রত্যাশিত সত্ত্বেও ঘুরেফিরে আসে, রেখে যায় ছাই, কান্না আর ক্ষত। সংগতকারণে অনিরুদ্ধর হৃদয়ে আটকে থাকা আতঙ্কের নাম আগুন। মায়ের মুখে শুনেছিল শহরে প্রথম এই বস্তিতেই এসে উঠেছিল অবেলা, কোলের শিশু অনিরুদ্ধকে নিয়ে।
যেন লিফট এর গ্লাস ভেদ করে অনিরুদ্ধর কানে পৌঁছে যাচ্ছে সচেতন নাগরিক মহলের কিছু কথা, যে শহরে একদিকে কাঁচের আড়ম্বর, আরেকদিকে মানুষ বাঁশ, টিন, প্লাস্টিক, কাঠ-বোর্ডের ঘনবসতিতে জীবন সাজায়, সেই শহরের আগুন শুধু ঘর পোড়ায় না; পোড়ায় সমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন, নিরাপত্তার অধিকার, আর বেঁচে থাকার ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকু।
হ্যাঁ, এই তো! এরপর তাদের দুর্ভাগ্যকে সমবেদনা জানিয়ে একটা পক্ষ এগিয়ে আসছে মানবিক সাহায্যের হাত বাড়িয়ে। কেননা পোড়াবসতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হলে, তাদের বিশ্বাস করাতে হবে যে, তাদের দুর্ভোগের জন্য তারাই দায়ী। এরপর নিজেকে উপস্থাপন করতে হবে তাদের রক্ষাকর্তা হিসেবে।
ছাই হতে হতে দৌড়াচ্ছে আগুন... জীবনের স্বপ্নচূড়া ভেঙেচুরে গুঁড়ো গুঁড়ো ঝুরো ঝুরো হতে হতে ধূম্রকু-লী পাকিয়ে দলা দলা আগুন হড়হড়িয়ে নেমে যাচ্ছে বন বাদাড় উঁচু নিচু পথের বাঁক ডিঙিয়ে ঢালু থেকে আরো ঢালু কোথাও, আরো গভীরে, অজানা অতল। ট্রাফিকজ্যামে জীবন থমকে যাবার মতো কোত্থাও থামে না এই অগ্নি-হড়পা। ছুটতে ছুটতে হাঁফাচ্ছে অনিরুদ্ধ। রাত গভীর, অন্ধকারের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে বীভৎস আগুনের লেলিহান শিখা। অনিরুদ্ধর মনে হয়: মা বেঁচে আছে তো? কষ্ট পাক তবু বেঁচে থাকুক মা।
অনিরুদ্ধ আজ বহুদিন আইসিইউ কেবিনে। মূলত তার দেহটা এই কেবিনে। কিন্তু অনির্দিষ্ট অনিশ্চিত গন্তব্যের দিকে ছুটছে স্বপ্নগ্রস্ত অনিরুদ্ধর স্নায়ু। অচেতনতার অতল থেকে একটু কেঁপে উঠলো কি! এই তো মনে হচ্ছে প্রবল শক্তিতে শ্বাস টানছে!
বাইরে প্রহরায় খাকি পোশাক পরা দুটো লোক।ওদের একজন ডাকছে ডাক্তার... সিস্টার...।
অন্যজন ফোনের স্ক্রিনে ডুবে দেখছে একের পর এক শর্ট ভিডিও, ছবি। সকাল থেকে বার বার সামনে আসছে ছবিটা; একজন বয়স্ক নারী তন্ন তন্ন করে কী যেন খুঁজছে পোড়া বস্তির ছাই কয়লার স্তূপে।
অবেলার মতো লাগছে না!?
হাসপাতালের বেড যেন এক ঘুমন্তস্বপ্নের দ্বীপ, যেন চারপাশে গভীর অন্ধকার জলে সন্তরণরত রঙিন মাছ, যেন মা মাছটির ফুলকা থেকে বের হচ্ছে কালো ধোঁয়া। পৃথিবীতে আর কোথাও কোনো শব্দনেই। পোড়া ছবি থেকেও কি মা মা গন্ধরেরোয়! অনিরুদ্ধ নড়ে উঠলো যে!
ভাইরাল ছবিটা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে বিতর্কের ঝড় উঠেছে। কেউ বলছে ওটা কোনো হাসপাতাল নয়, টর্চার সেল। কেউ বলছে অনিরুদ্ধ আর বেঁচে নাই। কেউ বলছে এসব এআই প্রযুক্তির খেল। কেউ বলছে এটা বিশ বছর পূর্বের ছবি। কেউ বলছে অনিরুদ্ধ বেঁচে আছে। আবার একদল বিশিষ্ট সমাজসেবক অবেলার মানসিক ভারসাম্যহীনতাকে ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে তার পোশাকের শালীনতা নিয়ে অতি চিন্তিত।
অনিরুদ্ধ বেঁচে আছে!? নাকি অপ্রকৃতিস্থ অবেলার ভ্রম!! পোড়া ভূমিতে ছাই ঘেঁটে ঘেঁটে অনুসন্ধানরত অবেলার চারপাশে ধোঁয়ার মতো ঘিরে আছে অসংখ্য ক্যামেরা।
ছবিটা আবার একজন আপলোড করলো জাস্ট নাও। তাতে ক্যাপশন লেখা‘“কেউ তোমার মনে সত্য ঢুকিয়ে দেবে না; সত্য এমন কিছু, যা তোমাকেই খুঁজে নিতে হয়।”