আবু তালেব সিদ্দিকী
বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায় বারান্দায় বসে বৃদ্ধ শাহেদ আর বৃদ্ধা মালতী‘ হাতে ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাপ। বাইরের রিমঝিম বৃষ্টি যেন তাদের পঞ্চাশ বছরের দাম্পত্য জীবনের নীরব সাক্ষী হয়ে নরম সুরে ঝরছে। শাহেদের সাদা চুলগুলো হালকা বাতাসে উড়ছে, আর মালতীর কপালে বয়সের সূক্ষ্ম রেখাগুলো যেন সময়ের পাতায় লেখা প্রেমের কবিতা।
আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী।
শাহেদ মালতীর হাত ধরে মৃদু হেসে বললেন,
“আচ্ছা মালতী, আজও কি সেই প্রথম দিনের মতোই লাগে?”
মালতী তার চোখে তাকালেন‘ সে চোখে আজও সেই পুরোনো মায়া।
“ঠিক প্রথম দিনের মতো তো নয়”, একটু থেমে তিনি যোগ করলেন,
“কিন্তু ভালোবাসাটা আজ আরও গভীর, আরও নিশ্চিন্ত... যেন বহু ঝড় পেরিয়ে পাওয়া শান্ত সমুদ্র।”
বৃষ্টির শব্দের ফাঁকে ফাঁকে স্মৃতিরা ভেসে উঠল। কলেজের সেই লাল ইটের ভবনের সামনে প্রথম দেখা, শাহেদের কাঁপা গলায় বলা প্রথম ‘ভালোবাসি’, বৃষ্টিতে ভেজা সেই কফি শপে বসে দু’জনের হাত ধরে থাকা‘ সব যেন চোখের সামনে জীবন্ত হয়ে উঠল। তারপর বিয়ে, সংসারের টানাপোড়েন, সন্তানের প্রথম কান্না, আবার প্রথম স্কুলে যাওয়া‘ প্রতিটি মুহূর্তই ছিল ভালোবাসায় গাঁথা।
শাহেদ হঠাৎ একটু আবেগী হয়ে পড়লেন।
“জানো মালতী, আমরা অনেক কষ্ট দেখেছি। কখনো টাকার অভাব, কখনো অসুখ, কখনো ভুল বোঝাবুঝি... তবু একদিনও তোমার হাত ছাড়িনি।”
মালতী চোখ মুছলেন।
“কারণ তুমি ছিলে আমার নির্ভয়ের আলোকিত আশ্বাস এবং সাহস। ঝড়ের মধ্যেও তুমি ছিলে আমার আশ্রয়।”
শাহেদ মৃদু সুরে গান ধরলেন‘
“আজ মন চেয়েছে আমি হারিয়ে যাবো”...
মালতী তার কাঁধে মাথা রেখে গুনগুন করে সুর মিলালেন।
বৃষ্টি, গান আর ভালোবাসা মিলিয়ে এ-ই সময়টা যেন স্বর্গের কাছাকাছি পৌঁছে দিলো ওদের দুজনকে।
হঠাৎ মালতী দুষ্টুমি ভরা চোখে বললেন,
“চলো না, আজ আমরা কোথাও হারিয়ে যাওয়া দিনগুলোর কাছাকাছি পৌঁছে গিয়ে নতুন করে হারিয়ে যাই ‘হেথা নয়, হোথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনোখানে’;
শাহেদ হেসে উঠলেন।
“এই বয়সে?”
কেন মনের কি বয়স বাড়ে? শিশুকাল থেকে এই বয়সের আমি কিছু কি হারিয়ে ফেলেছি মনের গচ্ছিত মনিকোঠা থেকে? বয়সের সৌন্দর্য সব বয়সেই সুন্দরকে আলিঙ্গন করে!”
“কোথায় যাবে?”
“যেখানে প্রথম গিয়েছিলাম‘ সেই পুরোনো কফিশপে।”
ছাতা মাথায় দিয়ে দু’জন বেরিয়ে পড়লেন। রাস্তায় বৃষ্টি পড়ছে, বাতির আলো পানিতে প্রতিফলিত হয়ে যেন তাদের পথ আলোকিত করে পথ চিনিয়ে দিচ্ছে। পথ চলতে চলতে শাহেদ হঠাৎ থেমে মালতীর দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তুমি কি জানো? আজও আমি তোমাকে দেখলে আমার বুক কেঁপে ওঠে।”
মালতী লাজুক হেসে বললেন,
“তুমি বদলাওনি একটুও, শাহেদ।”
কফি শপে ঢুকতেই পুরোনো গন্ধ, পুরোনো গান আর সেই কাঠের টেবিল তাদের স্বাগত জানাল। তারা সেই একই জায়গায় বসে কফি অর্ডার করলেন। যেন সময় পঞ্চাশ বছর পিছিয়ে গিয়ে হঠাৎ থামকে দাঁড়িয়ে আছে একই ভঙ্গিতে।
কফির কাপে চুমুক দিয়ে শাহেদ বলে ওঠে,
“মালতী, পরজন্ম কি তুমি বিশ্বাস করো? আমরা কিছুই জানি না, ভবিতব্যের উপর ছেড়ে দিয়ে বলছি যদি আবারও জন্ম হয় এ-ই ধরার ধূলিতে তবে আমি কিন্তু আবারও তোমাকেই বেছে নেব।”
মালতী তার হাতটা শক্ত করে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ, চুপচাপ নীরব চাহনিতে আকাশ দেখলো তন্ময় হয়ে, খুব মিষ্টি সুরে বলে উঠলো‘ “আমিও, হাজার জন্ম হলেও, শাহেদ‘ শুধু তোমাকেই চাইবো।”
বৃষ্টির গতিবেগে দমকা হাওয়া, রাত গাঢ় হচ্ছিল ধীরে ধীরে। কিন্তু এই যুগল ভালোবাসার উষ্ণতায় বিভোর ভাললাগায় আচ্ছন্ন আবেশে ঘোরলাগা স্বপ্নেন সিঁরি ডিঙ্গিয়ে আকাশ দেখছে বিভোর হয়ে।
পঞ্চাশ বছর পেরিয়েও তাদের প্রেম ক্লান্ত হয়নি‘ বরং সময়ের সাথে সাথে আরও গভীর, আরও পবিত্র হয়ে উঠেছে।
তাদের জীবন যেন এক জীবন্ত প্রেমকাব্য।
যেখানে প্রতিটি বৃষ্টি, প্রতিটি হাসি আর প্রতিটি নিঃশ্বাস ভালোবাসায় লেখা হয় প্রতিক্ষণে।