কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কার
পারভেজ আহসান
কবি কি দুঃখ জাগানিয়া হয়? হতেও পারে। কবিরা করুণ রস সৃষ্টি করে তাদের পাঠকদেরকে দুঃখের জলে ভাসায়। হয়তো জীবন বাস্তবতার এমন মর্মস্পর্শী বর্ণনা পড়ে পাঠকের বুকের পাঁজর ভাঙে, হৃদয়ে দুঃখের বহতা নদী বয়। গত ১৪ জানুয়ারি ২০২৬ খ্রিস্টাব্দে ধানম-ির বেঙ্গল শিল্পালয়ে এ ভাবনা উঁকি দিয়েছিল যখন আগ্রাসী তারুণ্যের প্রতীক, স্যাড জেনারেশনের কবি বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিক আজাদের ৮৪ তম জন্মজয়ন্তিতে ২০২৫ সালের জন্য বাংলাদেশের বিশিষ্ট কবি ময়ুখ চৌধুরী ও ২০২৬ সালের জন্যে গত শতকের নব্বইয়ের দশকের স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী কাব্য ভাষার কবি ওবায়েদ আকাশকে কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ কর্তৃক প্রবর্তিত কবি রফিক আজাদ পুরস্কার প্রদান অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে উপস্থাপিকা কবি সাকিরা পারভীন ‘তোমায় গান শোনাব,তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখ/ওগো ঘুম ভাঙানিয়া’ ‘রবীন্দ্র্রনাথের বিখ্যাত এ গানটি গেয়ে অনুষ্ঠানটির সূচনা করলেন। সে মুহূর্তে অনুষ্ঠানের জন্যে নির্ধারিত কক্ষে নেমে আসল প্রগাঢ় নিস্তব্ধতা। ‘এক জীবনে’, ‘হৃদয়ের কী বা দোষ’, ‘পাগলা গারদ থেকে প্রেমিকার চিঠি’, ‘বর্ষণে আনন্দে যাও মানুষের কাছের, ‘পরিকীর্ণ পানশালায় আমার স্বদেশ’,‘ক্ষমা করো বহমান হে উদার’‘ এমন প্রাণস্পর্শী হিরকখচিত নামগুলো যখন সঞ্চালক উচ্চারণ করছিলেন তখন দর্শক-শ্রোতারা ভাবছিলেন কবির শক্তিমত্তা ও কাব্যপ্রতিভা নিয়ে।
অনুষ্ঠানটির মূল পর্ব শুরু হয় বিশ^কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভক্তিগীতি ‘সকাতরে ওই কাঁদিছে সকলে, শোনো শোনো পিতা / কহো কানে কানে, শুনাও প্রাণে প্রাণে মঙ্গলবারতা’ পরিবেশনের মাধ্যমে। গানটি পরিবেশনের সময় ব্যক্তিগত আকুতি ধীরে ধীরে সামষ্টিক বেদনায় রূপ নেয়। মানুষের যেন সকল ব্যর্থতা, ক্ষয় ভ্রান্তি শেষে দাঁড়ায় একটিই প্রার্থনায়‘ ‘তোমারে দাও, আশা পূরাও, তুমি এসো কাছে’।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কবিপুত্র অব্যয় আজাদ। তিনি এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, রবীন্দ্র বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সৈয়দ আকরম হোসেন,অনুষ্ঠানের সভাপতি কবি ফারুক মাহমুদ এবং বিশেষঅতিথি কবি জরিনা আখতার-এর প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করে এবং পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই কবি ময়ুখ চৌধুরী ও ওবায়েদ আকাশকে অভিনন্দন জ্ঞাপন করে বক্তব্য শুরু করেন। অব্যয় আজাদের বক্ত্যব্যের পর কবি রফিক আজাদের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে একটি লেখা পাঠ করেন কবির ভ্রাতুষ্পুত্রী ড. নিরু শামসুন্নাহার। এ ধরনের অনুষ্ঠানে উত্তরীয় উপহার দেওয়ার রীতি ও প্রচলন দীর্ঘদিনের। ঠিক তাই রেওয়াজ অনুসরণ করেই কবি রফিক আজাদের পরিবারের পক্ষ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই কবি, প্রধান অতিথি, সভাপতি, বিশেষ অতিথি ও আমন্ত্রিত প্রাবন্ধিককে উত্তরীয় পরিধান করানো হয়।
পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই কবি ময়ুখ চৌধুরী ও কবি ওবায়েদ আকাশকে প্রদান করা শংসাপত্র পাঠ করেনকবি আবদুর রব ও কবি প্রাবন্ধিক সাবেরা তাবাস্সুম। কবি ময়ুখ চৌধুরীর জীবন ও কর্মের উপর সংক্ষিপ্তভাবে পাঠ করেন কবি আবদুর রব। এ কবি ও শিক্ষক ১৯৫০ সালের ২২ অক্টোবর চট্টগ্রামের দক্ষিণ নালাপাড়ায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি বাংলাদেশের একজন বিশিষ্ট কবি।তাঁর কবিতায় উঠে এসেছে দেশপ্রে, মুক্তিযুদ্ধ, প্রকৃতি, মানবপ্রেম, জীবন ও জগতের নানামুখী প্রশ্ন ও মৃত্যু ভাবনা। প্রতীক ও চিত্রকল্পের ব্যবহার ইঙ্গিত করে বাংলা কবিতায় তাঁর সুদৃঢ় অবস্থান।তাঁর কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ১০। উপন্যাস ও গবেষণামূলক গ্রন্থসহ প্রায় ১৫টিরও অধিক গ্রন্থ রয়েছে তাঁর। তিনি ‘প্রতীতি’ এবং ‘কবিতা’ নামে দুটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদনা করেছেন।
ওবায়েদ আকাশকে দেওয়া শংসাপত্র পাঠ করেন কবি সাবেরা তাবাসসুম। তিনি নব্বইয়ের দশকের স্বতন্ত্র ও ব্যতিক্রমী কাব্যভাষার কবি । ১৯৭৩ সালের ১৩ জুন রাজবাড়ী জেলার সুলতানপুর গ্রামে জন্ম নেওয়া এ কবির কবিতায় ব্যবহৃত অভিনব রূপক পাঠককে চিন্তার গভীরে নিমজ্জিত করে। চিত্রকল্পগুলো দৃশ্যমান রূপ থেকে অদৃশ্যমান রূপে নিয়ে গিয়ে নান্দনিক আবেশ ছড়ায়। স্মৃতিকাতরতা, প্রকৃতি-মুগ্ধতা, সমাজবাস্তবতা, শেকড় অন্বেষী প্রবণতা হচ্ছে তাঁর কবিতার মূল উপজীব্য। ১৯৯৯ সাল থেকে দীর্ঘ ২৭ বৎসর যাবৎ অধুনাবাদী চিন্তার লিটল ম্যাগাজিন ‘শালুক’ সম্পাদনা করে আসছেন তিনি। এ কবির প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৫০। তাঁর মৌলিক কাব্যগ্রন্থের সংখ্যা ৩০। শংসাপত্র পাঠ শেষে পুরস্কারপ্রাপ্ত দুই কবির হাতে শংসাপত্র ও পুরস্কারের অর্থমূল্য প্রদান করেন অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি সৈয়দ আকরম হোসেন এবং রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদের উপদেশক দিলারা হাফিজ।
পুরস্কার প্রদান পর্ব শেষ হওয়ার পর কবি রফিক আজাদ-এর উপর প্রবন্ধ পাঠ করেন রফিক আজাদ গবেষক এবং বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর-এর বাংলা বিভাগের শিক্ষক গোলাম রব্বানী। তিনি কবি রফিক আজাদকে ষাটের দশকের পৌরুষদীপ্ত কবি হিসেবে অবিহিত করেন। এ কবি স্বদেশ ও প্রকৃতিকে এনেছেন ভিন্নভাবে। যুদ্ধ পূর্ববর্তী আবেগ ও যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তাঁর আশা-প্রত্যাশা ভিন্নতর হয়েছে বলে সময় অতিক্রান্তের সাথে সাথে তাঁর লেখনি হয়েছে ভিন্নতর। ’৭১-এর আগে এ কবি ছিলেন আত্মনিমগ্ন, কিন্তু ৭১-এর পরে এ কবি এসেছেন জনতার কাতারে। এ কবি ছিলেন একজন প্রকৃত দেশপ্রেমিক।মনে প্রাণে ছিলেন মুক্তিকামী মানুষ। কবি রফিক আজাদ সম্পর্কে এ গবেষকের বিদগ্ধ বক্তব্য উপস্থিত দর্শকগণ উপভোগ করেছিলেন নিবিষ্ট চিত্তে। তার আলোচনা শেষে শুভেচ্ছা বক্তব্য রাখেন বিশেষ অতিথি কবি জরিনা আখতার। পুরুষ্কারপ্রাপ্ত দু’জন কবির অনুভূতি প্রকাশ ছিল ব্যতিক্রমধর্মী।
কবি রফিক আজাদ সম্পর্কে ওবায়েদ আকাশ বলেন‘ ‘যেন আগে আগে হেঁটে যাচ্ছেন প্রিয় কবি রফিক আজাদ’। তিনি বলেন, ‘কাক্সিক্ষত পুরস্কারটি যদি একদিন আনায়াস স্বচ্ছন্দে নিজের উপর এসে বর্তায়, তখন সে আনন্দ প্রকৃতই আনন্দ’। তিনি রফিক আজাদের মতো প্রিয় কবির নামে পুরস্কারকে কাক্সিক্ষত বলে উল্লেখ করেন। ওবায়েদ আকাশের পর অনুভূতি প্রকাশ করেন কবি ময়ুখ চৌধুরী। তিনি বলেন, ঢাকা আসলে যে ক’জন কবির সাথে তার দেখা হতো তাঁদের মধ্যে রফিক আজাদ অন্যতম। রফিক আজাদের সরলতা ও সারল্যমিশ্রিত অনুভূতির প্রকাশকে ঔদার্যের প্রতীক হিসেব চিহ্নিত করেন। তিনি পুরস্কারের ইতিবাচকতা ও নেতিবাচকতা সম্পর্কে আলোকপাত করেন। কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পুরস্কারকে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে তিনি দেখেন।
কবি রফিক আজাদ স্মৃতি পর্ষদ-এর প্রধান উপদেশক দিলারা হাফিজ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্পর্কে উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাকে অবহিত করেন এবং সকলকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।
এ অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথির ভাষণটি ছিল দর্শনমিশ্রিত। তিনি বলেন, ‘অনেকে প্রায়ত হয়ে জীবিত আছেন আবার অনেকে জীবিত থেকেও চুপ হয়ে আছেন। মনে রাখতে হবে, কে কোথায় ঘুমিয়ে আছে সেটা বড় কথা নয়, কে কোথায় জেগে আছে সেটা বড় কথা’। বক্তব্যের এক পর্যায়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের চাইতে অনেক বেশি কথা বলছেন বাংলা ভাষার কবি আমার বন্ধু রফিক আজাদ। রফিক আজাদ তাঁকে বই উপহার দেওয়ার সময় কিছু একটা লিখে দিতেন। এ কথা বলতে বলতে তাঁকে উপহার দেয়া বইয়ের পৃষ্ঠা খুলেই তিনি উচ্চারণ করেন,‘প্রিয় বন্ধু, প্রিয় সতীর্থ সৈয়দ আকরাম হোসেন, আমরা যেন আরো কিছুটা সময় শুধু দেশের জন্যে বাঁচতে পারি। ‘রফিক’ দেশপ্রেমের জলে ভেজা কথাগুলো পাঠ করে তিনি বলেলেন ‘এখন আমার কাছে মনে হয় আমি অপরাধী, সে মুক্তি পেয়েগেছে। এক বাক্যে রফিক আজাদকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘রফিক আজাদ মন, মানুষ, মৃত্তিকা এবং প্রকৃতির কবি’। সৈয়দ আকরাম হোসেনের বক্তব্যটিছিল দৃষ্টিভঙ্গিকে পাল্টে দেওয়ার মতো। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার প্রাক মুহূর্তে শালুকের পক্ষ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত কবিদ্বয়কে পুষ্পস্তবক প্রদান করেন কবি ও নন্দনতত্ত্ববিদ মাহফুজ আল-হোসেন। কবি রফিক আজাদ স্মৃতির পর্ষদের সভাপতি ফারুক মাহমুদ সমাপনী বক্তব্যে রফিক আজাদের সঙ্গে তার সম্পর্কের নানা অধ্যায় উন্মোচন করেন। এবং ধন্যবাদ জ্ঞাপন পর্বে কবি দিলারা হাফিজ বলেন, আমরা হয়তো থাকবো না, আমাদের উত্তর প্রজন্ম এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে। তিনি অনুষ্ঠানে আগত সকল অতিথি, পুরস্কাপ্রাপ্ত দুই কবি ও উপস্থিত কবি-লেখকবৃন্দ, শুভাকাক্সক্ষী ও দর্শক-শ্রোতাদের ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।