বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন
এম আবদুল আলীম
বুদ্ধির মুক্তি হলো, বিচারবুদ্ধিকে সকলপ্রকার শাস্ত্রের অনুশাসন তথা আচার-বিশ্বাস-সংস্কার থেকে মুক্তিদান। এ লক্ষ্যে ১৯২৬ সালের ১৯ জানুয়ারি ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের মুসলিম হল মিলনায়তনে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’। নামে ‘মুসলিম’ শব্দ যুক্ত থাকলেও এ আন্দোলন ছিল পুরোপুরি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত। কেননা, এতে মুসলমান লেখক-চিন্তাবিদদের পাশাপাশি হিন্দু লেখক এবং চিন্তাবিদগণও যুক্ত ছিলেন। হিন্দু-মুসলিম ভাবধারাপুষ্ট পূর্ণাঙ্গ সাহিত্যসৃষ্টি এবং উদার, অসাম্প্রদায়িক, যুক্তিনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণই ছিল বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কর্ণধারগণের মূল উদ্দেশ্য। অর্থাৎ‘ মুক্তচিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ ঘটিয়ে সমাজকে নতুন রূপে গড়ে তোলাই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। এজন্যে পুরনো সংস্কার, রীতিনীতি, বিশ্বাস ও মূল্যবোধের বিরুদ্ধে জ্ঞানের শাণিত তরবারি হাতে তাঁরা বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর সঙ্গে সম্পৃক্তরা চেয়েছিলেন চিন্তাচর্চা, জ্ঞানের আকাক্সক্ষা ও উন্নত রুচি দ্বারা জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে নূতন-পুরাতন সর্বপ্রকার চিন্তা ও জ্ঞানের সমন্বয় এবং সংযোগ সাধন করতে। সাহিত্যে ফুলের চাষের পাশাপাশি তাঁরা ফসল ফলাতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। অর্থাৎ‘সাহিত্যের দ্বারা সৌন্দর্য সৃষ্টি, চিন্তার উৎকর্ষ সাধনের পাশাপাশি সমাজের সার্বিক কল্যাণ সাধন করতে চেয়েছিলেন। এ আন্দোলনের পুরোধাগণ চেয়েছিলেন সমাজের চিন্তাশীল ব্যক্তিদের দ্বারা জাতির নবজীবন দান করতে, যে চিন্তা ধীরে ধীরে সমাজের চতুর্দিকে প্রবাহিত হয়ে কালক্রমে পুরো সমাজকে আলোকিত করবে ও জাগিয়ে তুলবে। এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে তাঁরা নিয়মিত সভা-সম্মেলন আয়োজন করতেন। পাশাপাশি ‘শিখা’ নামে একটি পত্রিকা সম্পাদনা করে তৎকালীন মুসলমান সমাজের জীবন ও চিন্তাধারার গতির পরিবর্তন-সাধনে সচেষ্ট হন। বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের স্লোগান ছিল‘ ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি সেখানে আবদ্ধ, মুক্তি সেখানে অসম্ভব।’ এ বক্তব্য ‘শিখা’র আখ্যাপত্রে মুদ্রিত থাকতো। যে মুক্ত জ্ঞান, যুক্তি আর বুদ্ধির দীপ্তিতে তাঁরা সমাজকে জাগ্রত করতে চেয়েছেলিন, তার উৎসারণ ঘটে ইউরোপের মাটি থেকে। গ্রিস, পারস্য, ইতালি তথা ইউরোপের আকাশ থেকে ঠিকরে পরা এই আলোর ছটা উনিশ শতকের বাঙালি হিন্দুসমাজের উপরিস্তরে প্রতিফলিত হলেও, তা মুসলমান সমাজকে আলোকিত করে অনেক পরে, নির্দিষ্ট করে বলা যায়‘ বিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে। ডিরোজিও যেমন ‘ইয়ং বেঙ্গল’ গোষ্ঠীর মাধ্যমে কলকাতার বুকে বৌদ্ধিক আন্দোলন শুরু করেছিলেন, তেমনি ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র সভ্যগণ ঢাকার বুকে ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’ পরিচালনা করেন।
প্রশ্ন উঠতে পারে, কেন প্রয়োজন ছিল এই আন্দোলনের? সেক্ষেত্রে স্মরণে আসে জ্যাঁ জ্যাক রুশোর কথা। তিনি বলেছিলেন, মানুষ বৃুদ্ধিদীপ্ত প্রাণি হলেও জন্মের পর থেকে নানা শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়। এতে তার বুদ্ধির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়, ফলে যুগ-সমাজ ও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে যেতে পারে না। কালে কালে অগণিত মানুষের বুদ্ধিদীপ্ত কর্ম ও চিন্তার স্পর্শে মানবসমাজ যেমেন এগিয়ে চলেছে, তেমনি এর বিপরীতে নানা শৃঙ্খলায় আবদ্ধ মানুষেরা সভ্যতার পাদপ্রদীপের আলো থেকে দূরে নিঃসীম অন্ধকারে হারিয়ে গেছে। বাংলার মুসলমান সমাজের ক্ষেত্রেও এমনটি ঘটেছিল। বৈরী রাষ্ট্রিক পরিবেশ-পারিপাশির্^কতা এবং বহু ক্ষেত্রে স্বখ্যাত সলিলে আটকে তারা প্রতিবেশি হিন্দুসমাজ থেকে পিছিয়ে পড়েছিল। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য কয়েকজন মুসলিম চিন্তাবিদ ও সমাজ-সংস্কারক এগিয়ে এসেছিলেন; যাঁদের মধ্যে ছিলেন স্যার সৈয়দ আহমদ খান, নবাব আবদুল লতিফ, সৈয়দ আমির আলী প্রমুখের নাম। তাঁদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে জগদ্বিখ্যাত মনীষী ও চিন্তাবিদদের ভাবাদর্শ আত্মস্থ করে পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজকে জাগ্রত করতে ঢাকার বুদ্ধিজীবীদের একাংশ শুরু করেন ‘বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন’। শতবর্ষ আগে পরিচালিত এ আন্দোলন পূর্ব বাংলার মুসলমান সমাজকে ব্যাপকভাবে আলোড়িত করে। এর ফলে তাদের মধ্যে জগৎ, জীবন, মানুষ ও ধর্ম সম্পর্কে নতুন অনুসন্ধিৎসা জাগ্রত হয়; যার প্রভাবে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, ধর্মান্ধতা এবং কুসংস্কারে জর্জরিত মুসলমান সমাজ আধুনিক জীবন ও বাস্তবতার আলোকে নিজেদের এগিয়ে নেওয়ার প্রেরণা লাভ করে। সাহিত্য, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি, সংস্কৃতি সকল দিক থেকেই তাদের নবচিন্তার উন্মেষ ঘটে। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় (১৯২১) প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পরে সৃষ্টি হওয়া এ জাগরণকে কলকাতার প-িতেরা অভিহিত করেন বাংলার ‘দ্বিতীয় রেনেসাঁস’ হিসেবে।
ঢাকাকেন্দ্রিক এই রেনেসাঁস তথা বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় ও ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজের প্রাগ্রস চিন্তার কয়েকজন শিক্ষক-শিক্ষার্থী। পশ্চাৎপদ ও কুসংস্কারাচ্ছন্ন মুসলমান সমাজকে জ্ঞানের আলো ও বুদ্ধির দীপ্তিতে আলোকিত করে এগিয়ে নেওয়াই ছিল তাঁদের লক্ষ্য। যুক্তিগ্রাহ্য ও বাস্তব চিন্তার উন্মেষ ঘটিয়ে মুসলমান সমাজকে জাগিয়ে তোলাই ছিল এ আন্দোলন-সংশ্লিষ্টদের লক্ষ্য। জগদ্বিখ্যাত মনীষী, ধর্মপ্রবর্তক, রাষ্ট্রনায়ক ও চিন্তাবিদদের চিন্তা-চেতনা ও কর্মসাধনার সারনির্যাস ছিল তাঁদের প্রেরণামন্ত্র; যাঁদের মধ্যে ছিলেন হজরত মোহাম্মদ (স.), খলিফা আল মনসুর, শেখ সাদী, কামাল আতাতুর্ক, রাজা রামমোহন রায়, ডিরোজিও, রোমা রোল্যাঁ, গ্যেটে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম প্রমুখ। কাজী নজরুল ইসলাম তো সরাসরি এ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর প্রথম বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দিয়ে তিনি পরিবেশন করেন তাঁর ‘খোশ আমদেদ’ শীর্ষক গান এবং আবৃত্তি করেন ‘খালেদ’ কবিতা। এছাড়া দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশন উদ্বোধন করেন তাঁর ‘নতুনের গান’ গানটি গেয়ে। প্রথম সম্মেলনে ভাষণ প্রদানকালে তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র কার্যক্রমকে ‘মুসলমানদের নূতন অভিযান’ বলে অভিহিত করেন। এতে অনেক ‘গুণী ব্যক্তি’র সম্পৃক্ততা দেখে নিজের দল ভারী হয়েছে বলে মন্তব্য করেন।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত সকলেই ছিলেন প্রাগ্রসর চিন্তার অধিকারী। এ আন্দোলনের দেহ ছিলেন আবুল হুসেন; মস্তিষ্ক ও হৃদয় বলা হতো যথাক্রমে কাজী আবদুল ওদুদ ও কাজী মোতাহার হোসেনকে। এছাড়া ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্, আবদুল কাদির, কাজী আনোয়ারুল কাদির, কাজী আকরম হোসেন, মোহিতলাল মজুমদার, মোতাহের হোসেন চৌধুরী, শামসুল হুদা, আবদুর রশীদ, ফজিলাতুন নেসা, ফাতেমা খানম, মমতাজউদ্দীন আহমেদ, এ. এফ. রহমান, তসদ্দুক আহমদ, সৈয়দ মোয়াজ্জম হোসেন, আবুল ফজল প্রমুখ বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সারথী হয়েছিলেন। ‘শিখা’র পাতায় পাতায় ঘটেছে তাঁদের শাণিত যুক্তি আর বুদ্ধির দীপ্তির অভিপ্রকাশ। ধর্ম, শিক্ষা, রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন-কানুন প্রভৃতি বিষয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে তাঁরা মুক্তবুদ্ধি ও ক্ষুরধার যুক্তি উপস্থাপন করেছেন।
রেনেসাঁসের আলোয় মুসলমান সমাজকে জাগ্রত করতে তাঁরা এর অন্ধকার দিকগুলো চিহ্নিত করেছেন। মুসলমান সন্তানদের পিছিয়ে পড়ার প্রধান কারণ হিসেবে এ আন্দোলনের ভাবযোগী আবুল হুসেন চিহ্নিত করেন জবরদস্তিমূলক শিশুশিক্ষাকে। তিনি এই জবরদস্তিমূলক শিক্ষার বিরোধিতা করে জীবনমুখী শিক্ষাপ্রসারের কথা বলেছেন। তাঁর মতে, যে শিক্ষার সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক নেই, সে শিক্ষা পঙ্গু, আর শিক্ষার সঙ্গে সম্পর্কহীন জীবন অন্ধ। তাই তিনি বলেছেন‘ ‘যে-শিক্ষা হৃদয় প্রশস্ত করে না, বুদ্ধিকে জাগ্রত করে না, চিত্তকে মার্জিত করে না, সংস্কার হতে মুক্তি দেয় না‘ সে-শিক্ষা জাতির প্রাণ বিনাশ করে। সঙ্কীর্ণ মন নিয়ে কোনো জাতি টিকে থাকতে পারে না’ (‘বাঙ্গালী মুসলমানের শিক্ষা-সমস্যা’)। শিক্ষার পাশাপাশি রাজনীতি নিয়েও তিনি কথা বলেছেন। রাজনীতি বলতে তিনি রাষ্ট্র সংরক্ষণ ও পরিচালনার নীতিকে বুঝিয়েছেন। বলেছেন, একটি রাষ্ট্র বিভিন্ন ধর্মের মানুষের সমন্বয়ে গঠিত হবে, তবে একই ভৌগোলিক পরিবৃত্তে বসবাসরত বিভিন্ন ধর্মের মানুষ আলাদা আলাদা ধর্মীয় পরিচয়ে রাষ্ট্র গঠন করতে পারবে না। দেশের মানুষের ব্যক্তিত্ব বিকাশের জন্য তিনি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা কায়েমের কথা বলেছেন। তিনি মনে করেন, সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেই মানুষের শক্তি বাড়ে না; মানুষের শক্তি বাড়ে বুদ্ধি, চরিত্র ও জ্ঞানে। ধর্মচর্চায় তিনি কোরানের মর্মবাণীকে যুক্তি দ্বারা অনুসরণ করতে বলেছেন। তাঁর মতে, প্রচলিত ধর্মের মূল শর্ত হচ্ছে দুটি‘ আল্লাহতে আত্মসমর্পণ এবং মানুষের কল্যাণ। সমাজের কল্যাণ চাইলে সাম্প্রদায়িক গ-ির বাইরে গিয়ে সকল মানুষের কল্যাণের চিন্তা করতে হবে। হিন্দুর দিকে পিঠ ফিরিয়ে চলবে না। হজরত মোহাম্মদ (স.)-এর যুগে আরব দেশে প্রচলিত আইনকে গোঁড়া মুসলমানেরা জগতের সর্বত্র সর্বাবস্থায় প্রযোজ্য বলে বিশ্বাস করেন। আবুল হুসেন মনে করেন, এ বিশ্বাস মানুষের সমাজ ও রাষ্ট্রের ইতিহাস সমর্থন করে না। ‘নিষেধের বিড়ম্বনা’ ও ‘আদেশের নিগ্রহ’ প্রবন্ধে তিনি মুসলমান সমাজে অন্ধভাবে অনুসরণ করা ধর্মীয় নানা আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে খোলামেলা আলাপ করেছেন। প্রবন্ধটি প্রকাশের পর ভীমরুলের চাকে যেন ঢিল পড়ে। ঢাকার রক্ষণশীল মুসলমান সমাজ তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়। পরিস্থিতি এমন জটিল আকার ধারণ করে যে, এক সালিশি বৈঠকে আবুল হুসেনকে ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চাইতে হয়। এ ঘটনায় তিনি ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ থেকে পদত্যাগ করেন। ‘শতকরা পঁয়তাল্লিশ’ নামে আরেকটি প্রবন্ধ রচনা এবং স্বীয় যুক্তির পক্ষে অবস্থান গ্রহণ করে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের চাকুরি থেকে ইস্তফা দেন। এক পর্যায়ে ঢাকা ত্যাগ করে কলকাতা চলে যান এবং সেখানে আইন পেশায় নিযুক্ত হয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন। এমন প্রতিকূলতা ও বৈরী পরিস্থিতি সামাল দিলেও আবুল হুসেনের চিন্তা সেকালের মুসলমান সমাজের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আলোকের ঝর্নাধারা প্রবাহিত করে।
বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কর্মযোগী কাজী আবদুল ওদুদ মুসলমানদের সাহিত্যচর্চা এবং জীবনাচারে গোঁড়ামি, ধর্মান্ধতা ও নানাবিধ সংস্কার-কুসংস্কার লক্ষ করে ‘সম্মোহিত মুসলমান’, ‘বাঙালী মুসলমানদের সাহিত্য সমস্যা’সহ বেশ কয়েকটি প্রবন্ধ লেখেন। তাদের অধঃপতনের কারণ হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন পশ্চাৎপদ চিন্তা, ধর্মগ্রন্থ ও ঐতিহ্যের প্রতি অতি অন্ধ আনুগত্যকে। তাঁর মতে, জীবনকে সম্যক দৃষ্টিতে উপলব্ধি করতে না পারার কারণে মুসলমানদের সাহিত্যপ্রতিভার যথাযথ বিকাশ ঘটেনি। এছাড়া নারীর প্রতি অবরোধ আরোপ, ললিতকলার প্রতি বিরূপ দৃষ্টি এবং ধর্মশাস্ত্রের প্রতি অন্ধ আনুগত্য তাদের পিছিয়ে দিয়েছে বলে তিনি মনে করেন। এ থেকে উত্তরণের জন্য তাদের প্রয়োজন মুক্তবুদ্ধির চর্চা ও সাম্প্রদায়িক সঙ্কীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাহিত্য-সাধনা। মুসলমানদের সংগীতচর্চা ও ললিতকলার প্রতি বৈরী মনোভাব দূর করতে কাজী মোতাহার হোসেন ও আবদুস সালাম রচনা করেন ‘সঙ্গীতচর্চায় মুসলমান’ ও ‘মোগলযুগের চিত্রচর্চা’ প্রবন্ধ দুটি। ‘ধর্ম ও শিক্ষা’ নামক আরেকটি প্রবন্ধে কাজী মোতাহার হোসেন টোল, মাদ্রাসা, হিন্দু কলেজ, ইসলামিয়া মাদ্রাসা প্রভৃতি সাম্প্রদায়িক প্রতিষ্ঠানের অকল্যাণকর দিকগুলো তুলে ধরে বৃহৎ চিন্তা ও কর্মের উপযোগী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার তাগিদ দেন। ‘বাঙালী মুসলমানের সামাজিক গলদ’ প্রবন্ধে আনোয়ারুল কাদির বলেন‘ যুক্তি, সামাজিক সাম্য, মানব ভাতৃত্ব প্রভৃতি ইসলামের মূল শক্তি হলেও মুসলমানেরা এসব থেকে দূরে সরে গিয়ে নিজেদের অধঃপতন ডেকে এনেছে। তাছাড়া আধুনিক শিক্ষার প্রতি মুখ ফিরিয়ে থাকা এবং ক্রমিক অবহেলা দ্বারা তারা পিছিয়ে পড়েছে। এভাবে ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র পুরোধাগণ মুসলমান সমাজের গলদ চিহ্নিত করে মুক্তবুদ্ধি ও যুক্তি দ্বারা তা অপনোদনের পথনির্দেশ করেছেন।
‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর বুুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের কার্যক্রম দশ বছর সচল ছিল। ১৯৩৬ সালের ৩১ জুলাই এর দশম বার্ষিক অধিবেশনে কাজী আবদুল ওদুদ বলেছিলেন‘ ‘সাহিত্য-সমাজের যা বলার তা বলা হয়েছে। এখন কাজ চাই। সমিতির কাজ শেষ হয়েছে।’ মাত্র এক দশকে এই সংগঠন ঢাকার বুকে যে যুক্তি, বুদ্ধি ও মুক্তচিন্তার আলো ছড়িয়ে যে রেনেসাঁস ঘটিয়েছিল, তার প্রভাব ছিল সুদূরপ্রসারী। ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’-এর মুখপত্র ‘শিখা’র ভাবধারা আত্মস্থ করে পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয় অসাম্প্রদায়িক ও মুক্তবুদ্ধির চেতনাবাহী ‘কাফেলা’, ‘মুক্তি’, ‘চন্দ্রবিন্দু’, ‘সমকাল’, ‘কণ্ঠস্বর’, ‘পূর্বমেঘ’ প্রভৃতি পত্রিকা। সাহিত্য-সংস্কৃতি এবং মননশীলতার জগতেও বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের চেতনাবাহী লেখকদের আবির্ভাব ঘটে। যাঁদের মধ্যে উল্লেখ করা যায় সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সত্যেন সেন, হাসান আজিজুল হক, আবু জাফর শামসুদ্দিন, শওকত আলী, শওকত ওসমান, আনিসুজ্জামান, আহমদ শরীফ, সৈয়দ শামসুল হক, শওকত আলী, রশীদ করীম, আহসান হাবীব, আবুল হোসেন, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, হাসান হাফিজুর রহমান, শামসুর রাহমান, জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, হুমায়ুন আজাদ, আবুল কাসেম ফজলুল হক প্রমুখের নাম। তাঁদের ভাষাচিন্তা, রাজনৈতিক ভাবনা ও অসাম্প্রদায়িক সমাজ নির্মাণের স্বপ্ন বাস্তব রূপ লাভ করে ভাষা আন্দোলন, স্বাধিকার সংগ্রাম এবং স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে।
সার্বিক মূল্যায়নে বলা যায়, গত এক-শ বছরে এ অঞ্চলের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক জীবনে নানা চড়াই-উৎরাই ও উত্থান-পতনের ঘটনা ঘটলেও ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজ’ পরিচালিত বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের সেই আলো নিভে যায়নি। সময় সময় নিষ্প্রভ হলেও এবং সমান্তরালভাবে সমাজের সবখানে এর বিচ্ছুরণ না ঘটলেও, যতটুকু দ্যুতি ছড়াতে পেরেছিল, তার মূল্য নিতান্ত কম নয়। গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, পূর্ব বাংলার সমাজ, রাজনীতি, ধর্ম, অর্থনীতি, সাহিত্য-সংস্কৃতি সবকিছুতেই এর প্রভাব পড়েছে; বিপরীতে অশিক্ষা, কুশিক্ষা, অজ্ঞতা, অন্ধবিশ্বাস, কুসংস্কার এবং ধর্মান্ধতার অন্ধকারও প্রসারিত হতে দেখা গেছে। সামগ্রিক বাস্তবতায় এখন প্রয়োজন আরেকটি বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন। শতবর্ষ আগে ঢাকার ‘মুসলিম সাহিত্য-সমাজে’র কর্ণধারগণ রেনেসাঁসের যে আলোর বিচ্ছুরণ ঘটিয়েছিলেন, তার সঙ্গে বর্তমান যুগ-জীবন ও বাস্তবতার সম্মিলন ঘটিয়ে নতুন আলোর উৎসারণ ঘটাতে হবে। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে জ্ঞানভিত্তিক, যুক্তিনিষ্ঠ এবং নৈতিক মূল্যবোধসম্পন্ন বুদ্ধিবাদী সমাজব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।