‘কেবল দৃশ্যের জন্ম হয়’ শুধু দৃশ্য, প্রাকৃতিক, তা রূপকার শিল্পীর সৃষ্টি নয়। শুধু দৃশ্য ছবি নয়, ছবির দুটি প্রাথমিক শর্ত, দৃশ্যতা-গুণ, ছবি ছবি হয়ে ওঠে শিল্পীর স্বাধীন নির্মাণে। ছবির দ্বিতীয় শর্ত- দৃশ্যতার আমন্ত্রণ থাকবে- ছবি নিজেই বলবে আমাকে দেখো। রেখা রঙ স্পেস ও ভাব দৃশ্যতা-গুণ নির্মাণের উপকরণ। ছবির এই দৃশ্যতা-গুণের কথাটি প্রথম রবীন্দ্রনাথই ভারতীয় শিল্পের ইতিহাসে যোগ করেন। ছবি হয়ে ওঠার প্রধান উপাদান দৃশ্য-অদৃশ্য রেখা। শুধু রঙ ছবি নয়, রেখা তার অনিবার্য টুলস। নানা রঙের কম্পোজিশনের ভিতরেও, তা যত বিমূর্ত হোক, রঙের রূপ সৃষ্টির অদৃশ্যে রেখা আছে বলেই রঙের অবয়ব ফোটে। কথাগুলো ভাবনায় এলো জালালীর অনেকগুলো ছবি একসঙ্গে দেখার অভিজ্ঞতা থেকে। অয়েল/এ্যাক্রেলিক, ওয়াটার, মিশ্র প্যাস্টেল, চারকল এবং মাটির সৃষ্টি পটারি, টেরাকোটা, পটচিত্র নানা বৈচিত্রপূর্ণ কাজের ভিতর একটা জোরদার অনুভব বাক্সময় হয়ে ওঠে। জালালীর রঙ ব্যবহারের মধ্যে আছে উদ্দীপনা জাগানো অন্তর্দৃষ্টি, গূঢ় ব্যঞ্জনা। ব্যক্তিত্ব ও শিল্পরুচি ভালভাবে উপলব্ধি করার জন্য শিল্পী জালালীর বিভিন্ন পর্যায়ের একাডেমিক শিক্ষা এবং জীবনযাপন সম্পর্কে সম্যক জানা থাকলে ছবি-রূপের নানা বৈচিত্র্য সম্পর্কে একরকম অনুভব হয়। আবার ব্যক্তি জালালী অজানা থেকেও ছবি, ছবির রঙ, আঙ্গিক শিল্পী সম্পর্কে প্রভূত অনুভূতি সঞ্চার করতে পারে। শিল্পী যখন জীবন যাপনের নানা পর্যায়ে, বহু কিছুর অভিঘাতে রঙ রূপ আঙ্গিকে পর্বান্তর ও বৈচিত্র্যের সম্ভার গড়ে তোলে তখন অনুসন্ধানী দর্শক বুঝতে চাইতেই পারে ড্রইং, ওয়াটার কালার, সাদা কালোর অনেক রূপে যখন বিশেষ কোনো অঞ্চলের বা শিল্প প্রবণতার লক্ষণ দেখা যায় সেই ভিন্নতার কারণ কোথায় নিহিত! একটা পর্যায়ে দেখা যায় উজ্জ্বল রঙের নানা বিমূর্ত কম্পোজিশন! শিল্পী কোন আলোয় আলোড়িত হয়ে তাঁর সাদা কালো জলরঙ, কালি বা পেন্সিল স্কেচ বদলে পশ্চিমি ঘরানার বিমূর্ত কম্পোজিশন বাক্সময় হয়ে উঠতে চাইছে! শিল্পীর জীবন এবং একাডেমিক প্রভাব কি এইসব পর্বান্তরে ভূমিকা রাখবে! কৌশল বা টেকনিক শিক্ষার প্রাথমিক পাঠ একাডেমিই দিয়ে থাকে। শিল্পী সেই কাঠামোগত শিক্ষাকে, ব্যাকরণকে প্রতিভাগুণে শিল্প করে তোলে, নিজস্ব স্বর গড়ে ওঠে। জালালীর আঁকা চিত্রে প্রকৃতি ও প্রাণির ছবিগুলোতে দেখি সেই নিজস্বতা। স্কুলের শিক্ষাকেই একমাত্র মান্য মনে করছেন না, ওসব চিত্রে রেখা বা পার্সপেকটিভের নিয়ম হয়তো মানেন নি, কিন্তু রেখা ও রঙে পুরো বাস্তবচিত্রকেই প্রাণবন্ত করে তুলতে পেরেছেন। মোরগের শরীরের উজ্জ্বল প্যাস্টেল ও ঔজ্জ্বল্য ওই মোরগের পৌরুষ ও সৌন্দর্যকে মূর্ত করে তুলেছে। প্রাকৃতিক চিত্রে বিচিত্র আলো ছায়ার বৈভব আঙ্গিকের চেয়ে অনুভূতি ও সময়ের ভাবকে প্রকাশ করছে। এই আলোছায়ার ছবি ক্যানভাসে ফোটে রঙের ব্যবহারে এবং তার পার্সপেকটিভ থেকে। প্রকৃতপক্ষে প্রকৃতিতে রঙ বলতে কিছু নেই। টিউব-এর কত শত রঙ শুধু ওই আলোর বিভাস ফোটানের জন্য। আলোর পরিস্ফুটনে অথবা আলোর গ্রহণ বর্জনেই রঙের উৎপত্তি, এবং রঙের উৎস। শিল্পী সেই রঙকে নানা রেখায় নানা রঙে, মিশ্র রঙে চিত্রে সৃষ্টি করেন, কৃত্রিম রঙেই তা করেন। ক্যানভাসের এই সৃষ্টি স্বয়ম্ভূ নয়, শিল্পীসাপেক্ষ। সাহিত্য ও চিত্র সেজন্য কখনো বাস্তবের হুবহু অনুকরণ নয় বা কপি নয়। ওই বাস্তবতার শরীর ভেদ করে যে ভাব ফোটে, মনে যে অনুভূতির সঞ্চার করে, সেইটুকু শিল্পীর লক্ষ্য। এজন্য বাস্তবের হাতিকে আকারে প্রকারে রঙে শরীরের গঠন কাঠামোর নিপুণ অঙ্কনই শিল্পীর লক্ষ্য নয়, হাতির একটি অর্থ বা তাৎপর্য বা তার ব্যবহারের ভিতর যে হাতির চরিত্র ফোটে জালালীর লক্ষ্য সেই রকম মোরগ বা হাতি বা কবুতর বা গাছ বা আকাশ।
রঙের বিমূর্ত কম্পোজিশনের ভিতরও ওই রেখা আলোর মায়া, সেই মায়া থেকেই আমরা অধরা সংকেতগুলো কিছু কিছু বুঝে নিতে স্বতঃস্ফূর্তভাবেই অনুপ্রাণিত হই। শিল্পের রহস্য ওই অধরাকে ধরতে বুঝতে অনুসন্ধানের যাত্রা, সেখানেই আনন্দ। এখানে মনে রাখা দরকার রঙ ও রেখা ছবির বক্তব্য প্রচারে বা বহনের দায়িত্ব পালন করে না; চোখের দেখার ভিতর দিয়ে কল্পনায় পৌঁছানোর পথ তৈরি করতে পারে, অর্থাৎ কোনো বোধের সংকেত দর্শকের মনে গুঞ্জরিত হয়। এই বোধের সংকেত বা ইশারা দর্শকভেদে ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে, ছবির ছন্দ, গতিময়তা ওই রেখা ও রঙেই সৃষ্টি হয়, এবং ছন্দই নিষ্প্রাণ জড়বস্তুকে রূপান্তরিত করে তোলে জীবন্ত সৃষ্টিতে।
আশির দশকের প্রথমার্ধে শিল্পী সিরামিক বিভাগ ফাইন আর্ট ইন্সটিটিউট ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ডিপ্লোমা করেন, ১৯৮৬ সালে চায়না সরকারের বৃত্তি নিয়ে বেইজিং যান- প্রথমে এক বৎসর ম্যান্ডারিন ভাষা শেখা তারপর ফাইন আর্ট ডিপার্টমেন্ট, Tsinglua University Beijing থেকে গ্রাজুয়েশন (BFA) সম্পন্ন করেন। আশির দশকের প্রথমার্ধ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত ঢাকা এবং বেইজিং-এ একাডেমির নিবিড় শিক্ষা, ওয়ার্কশপ নিয়ে ব্যস্ত সময়কালে আমরা তাঁর ছবিগুলোর মধ্যে যে লক্ষণ, চরিত্র, প্রবণতা এবং বিচিত্র মাধ্যমে কাজ করার দক্ষতা দেখি পরবর্তীকালে ছবির বিষয় ভাবনায়, রঙ রেখা ব্যবহারে বৈচিত্র্যপূর্ণ শিল্পী মানসের পরিচয় পাই। বিভিন্ন আকার আয়তনের পটারি, কখনো মাটি রঙের, কখনো বহু রঙের খেলায় সেই সব পটারির নান্দনিকতা মুগ্ধ করে। জাতীয় পর্যায়ে সিরামিক আর্ট দর্শনীতে পুরস্কার অর্জন, ক্লাসরুমে সেরা এওয়ার্ড এই সব সাফল্যের সময় তিনি প্রচুর ওয়াটার কালার চিত্র সৃষ্টি করতে থাকেন। ঢাকা অবস্থান কালে জলরঙের ছবিগুলোতে বহু রঙের ওয়াশ, মূলত বিষয় প্রকৃতি হলেও বেইজিং পর্বে পটারির সঙ্গে আশ্চর্য কুশলতায় গাঢ় ছাই রঙের জলচিত্রের বিষয় প্রকৃতির সঙ্গে মানুষ ও তার কর্মময় জীবনের ছবি, অন্যান্য প্রাণির ছবিও ফোটে। সেই ছবিতে ছাই রঙের বাইরে অন্যান্য রঙ ব্যবহার বিরল নয়। এই কাজের মধ্যে প্রথাগত চৈনিক ভঙ্গির প্রভাব খুব স্পষ্ট।
পরবর্তী সময়ে অর্থাৎ বর্তমান প্রবাসে বসবাসের সময় অয়েল ও এ্যাক্রেলিক দিয়ে পেইন্টিংয়ের সৃষ্টি প্রবাহ বেড়ে গেলেও প্যাস্টেল, চারকল, কালি, পেন্সিল দিয়ে বাস্তবোচিত ছবিরও সমাহার ঘটে বিমূর্ত ছবির পাশাপাশি। বিমূর্ত ও বাস্তবচিত নানা মাধ্যমের কাজেও জালালীর নিজস্বতা সুচিহ্নিত।এই সাধারণ ভূমিকা গদ্যটুকুর সঙ্গে বিভিন্ন মাধ্যমের কিছু ছবি ও পটারির নমুনা দেখে নিলে এই গদ্যের কথাটুকু প্রমাণিত হয়।