পথিক
ক্যানভাসে রংতুলির আচঁড় দিয়ে
মনের কত কথা বলা যায়
ছোট্ট একটি ফ্রেমে বড় কোনো স্বপ্নকে
ভালোবাসার সুতোয় ঝুলিয়ে রাখা যায়।
যেমন কুয়াশার জালে ঢাকা মৃত নগরী
গোধূলির রং মাখা ধূলিময় বিস্তীর্ণ জনপদ
নগ্ন শিশুর শরীরে লাজুক ভোরের রোদ
মাঘের শীতে নদীর তটে উদাস যুগল।
শীতের হাওয়ায় পাতার নাচন মাটির টানে
মন্ত্রমুগ্ধ সুর যে বাজে ঝরাপাতার গানে
আমাকে তখন জাপটে ধরে ভোরের কুয়াশা
কমলা রোদ ততক্ষণে ফিকে হয়ে আসে।
ঈশ্বর হেঁটে যাচ্ছেন সশব্দে
বুট জুতা পায়ে
দুমড়িয়ে মুচড়িয়ে ঘন শালের বন
কিন্তু কোথায় যাবেন তিনি?
হয়তো আরও অরণ্য গভীরে
রোদ কুয়াশার সীমানা পেরিয়ে
নিরন্তর এক গানের দেশে,
ঝরাপাতার গান যেখানে সারাক্ষণ।
হিমেল হাওয়ায় দুলিয়ে শরীর
ঈশ^র যাচ্ছেন চিরচেনা পথ বেয়ে
শীতের পাখির মতো নিরুদ্দেশ পথিক হয়ে
কেউ একজন বসে বসে সে ছবিই আঁকছে।
কালো চাদর
আমাদের মা ছিলেন নিখোঁজ নিরুদ্দেশী এক নারী
যমুনার পার ভাঙা আমাদের সেই মা
বাবার পিছু হাঁটতে হাঁটতে একদিন
কুপিবাতি থেকে হারিকেনের আলোয় ঘর সাজিয়েছিলেন।
তখন আমাদের রঙিন শৈশব আর
মায়ের চেহারায় ছিল সপ্তরঙা নারীর আভা।
আমরা যখন দুরন্ত, দুর্দান্ত স্বাধীন কিশোর
সাজানো প্রকৃতিতে ছিল আমদের সার্বজনীন অধিকার।
গাছের মরা ডালে চোখ রাখবার সময় ছাড়া।
সারাদিন মায়ের কোনো অবসর ছিল না
এমনকি গুনগুনিয়ে গান গাইবার অবসরও না
যখন সন্ধ্যা নামত মা তখন হেঁশেলে ভাতের হাঁড়ি চাপাতেন
তখন উনুনের জলন্ত আগুনের রক্তিম আভায়
মা-এর চেহারার জৌলুস বেড়ে যেত অনেক গুণ।
আমরা সব ফেলে তখন মায়ের গলায় ঝুল দিতাম
তার শরীরের আমিয়ো গন্ধ সুধা নিয়ে
আমরা রাত্রির প্রস্তুতিতে নিমগ্ন হতাম।
উনুনের পাশে বসে থাকতেন বাবা
সারাদিনের ক্লান্তি শেষে এমনতর দৃশ্যাবলি
তাকে পরের দিনের জন্য জীবন্ত করে রাখত।
অগ্রহায়ণের এক সন্ধ্যায় শীত তখন চুপিচুপি বাড়ির উঠোনে এসেছে
এক শ্মশ্রুমণ্ডিত আগন্তুক বসেছিলেন জলন্ত উনুনের পাশে
তখন মায়ের দুচোখ
তাজা মাছের চকচকে চোখের মতো দেখায়।
কী ভীষণ উজ্জ্বল আর আত্মম্ভরী।
আগন্তুকের শরীর মোড়ানো ছিল এক কালো চাদরে।
তিনি আমাকে অতি ¯েœহে সে চাদর পরিয়ে দিলেন গলায়
সেই আমার প্রথম একটি ছোট পশমী চাদর
নানা ভঙ্গিমায় সে চাদর দিয়ে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছি কিছু দিন
পৌষ মাঘের শীতকে দেখিয়েছি বৃদ্ধাঙ্গুল।
উষ্ণতা প্রদানকারী মাতুল ¯েœহের সে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার
অল্প দিন পরেই মার্চের দাপটে ঘরছাড়া মানুষের ¯্রােতে ভেসে
কোথায় যে হারিয়ে গেল আমরা কেউ তার খবর রাখিনি।
সে বছর ডিসেম্বরের শেষে সারা গ্রাম শহরে ছিল
কেবলই উত্তাপ কেবলই উল্লাস কেবলই ফাগুন কেবলই বসন্ত
এতটুকু শীত নেই জরা নেই কোথাও।
এমন দিনে মা আমাকে তার আঁচল দিয়ে জড়িয়ে ধরেছিলেন
বললেন, তোর কি মনে পড়ে সেই কালো চাদর?
বললাম, নাহ্।
মার্চের হারিয়ে যাওয়া চাদরখানি এই ডিসেম্বর অবধি
হয়তো কাউকে উষ্ণতা দিয়েছে কারো রক্তে নেশা জাগিয়েছে
তাইতো আমার মা-এর এখন নতুন ঠিকানা
নতুন বাড়ি নতুন ঘর আলো ঝলমল স্বাধীন সংসার।
এই সব ভাবনা আমাকে গর্বিত রাখে
আমার ঘরে হিমেল হাওয়া নিষিদ্ধ তাই
কেবলই বসন্ত বাতাস, কেবলই দখিনা হাওয়া।
বসন্ত আসছে
ধান কাটা শেষ
শূন্য বুকে শুয়ে আছে বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠ
উড়ে এসে দলেবলে শালিকের ঝাঁক
ঘরে ফেরার আগে ক্ষতবিক্ষত করছে মাঠের বুক।
অভিমানী সূর্য ক্রমশ পালটাচ্ছে রং
সাদা থেকে কমলা, সব শেষে লাল।
একটু দূরে শীর্ণ দেহে বসে আছে নদী
অবলীলায় তার বুকে মানুষেরা পদরেখা আঁকছে।
এসব ভেবে গাছেরা ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে
দাঁড়িয়ে থাকে ঠাঁয় বিহ্বলতায়
সবুজ পাতারা সব আড়ষ্ট
বিবর্ণ হলুদ হয়ে লুটে পড়ে
পথিকের পায় অস্ফুট ক্রন্দন স্বরে।
বৈরী বাতাস কানে কানে শিস্ দিয়ে যায়
নেচে উঠি জীর্ণ জরা ছুঁড়ে ফেলার গানে
চির নতুন আর সবুজের আহ্বানে
পোয়াতি নদী আর ভরা বুক ফসলের মাঠ
বাবার মতো দিঘলদেহী গাছকে ঘিরে জীবনের হাট।
বসন্ত আসছে।