image
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

ওপরতলায়

হামিম কামাল

ওপরতলায় প্রায়ই চেয়ার সরানোর শব্দ পাওয়া যায়। এ নিয়ে বাবার সঙ্গে কথা বলছি। দেয়ালে ঝোলানো ফটোগ্রাফের ভেতর থেকে তিনি শুনছেন।

“কী জ্বালাতন দেখেছ বাবা? প্রতিরাতে এই এক কাণ্ড। ঘুমানোর উপায় নেই। এখন ক’টা বাজে? আড়াইটা। সবে তো শুরু। সারাটা রাত ওরা এখন চেয়ার নাড়বে। ডান থেকে বাঁয়ে, বাঁ থেকে ডানে। থেকে থেকে কাকে যেন চেয়ারে চেপে ধরে বসাবে। চেয়ারসহই বুঝি ঠেলে ফেলে দেয় একেকবার। নির্যাতন চালায় নাকি কারো ওপর? মৃত্যুর পর তোমার তো এখন কিছু স্বাধীনতা আছে বাবা। তুমি জানো না ওপরে কী হচ্ছে?”

“তোরা যেমন ভাবিস আমার ক্ষমতা তেমন না”, বাবা বললেন। “এই ছোট্ট ফ্রেমের ভেতর দিয়ে তোদের দেখি। সাদাকালো। এ ছবি তোলার সময় আমার স্মৃতি যা ছিল, তা শুধু মনে আছে। তোকে এমন সাতত্রিশ-আটত্রিশ বছরের পাকাচুলের যুবক দেখি নাই আমি। আমার স্মৃতিতে তুই কিন্তু সাত বছরের ছেলে। এরকম ভুলভ্রান্তির একটা জগতে বাস করি। ভুল না ঠিক, অসম্পূর্ণ।”

“তুমি তো এসব বলোনি আমাকে আগে।”

“কথার ফুল ফোটানো, সেই ফুলে মালা গেঁথে এরপর তোর দিকে ছুঁড়ে দেওয়া- জটিল ব্যাপার। জানিস তো না, বেঁচে থেকে কত ভালো আছিস। মৃত্যুর পর একটা ছায়াজীবন শুরু হয়। একজনের জীবন হঠাৎ অসংখ্য জীবন হয়ে যায়। ধর, আমারই যতখানে যত ছবি আছে, সবগুলোই তাদের ওই মুহূর্ত পর্যন্ত স্মৃতি নিয়ে আলাদা আলাদা মানুষ এখন। কেউ অ্যালবামের অন্ধকারে, কেউ কেউ দেয়ালে ঘরের আলোয়। সবাই সবার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। কিন্তু যারা অ্যালবামের অন্ধকারে তা কিছু বলতে পারে না। তারা কিছু দেখেও না, শোনেও না। ঘরে ঘরে দেয়ালে থাকা আমার ছবিগুলো একে অপরকে তথ্য দেয়।তখন শুধু কিছু জানতে পারি। যেমন এই মুহূর্তে জানি, তোর বড় বোন কাল এখানে আসবে বলে ব্যাগ গোছাচ্ছে। ওর ঘরের পূর্বদেয়ালে আমার একটা ছবি ঝুলছে, ওর কল্যাণে জানলাম। তবে ওটা একটু বয়স্ক আমার ছবি। আমার ওই ছবি প্রতিদিন নানান কিছুই দেখে, ভুলে যায়। ও ভুলে যাওয়ার আগে আমি কিছু জানতে পারি। এরপর আমিও ভুলে যাই। তোর সঙ্গেও যে এসব আলাপ হচ্ছে, আর চার ঘণ্টা পর এসব ভুলে যাব আমি। আর চার ঘণ্টা পর সকাল।”

“বাবা, আর কী করছে আপা? কী অবস্থা আশপাশে।”

“কাপড়চোপড়, তুলি-কলম, স্কেচবই, গল্পের বই, ওর বাচ্চাদের দুটো ছবি এসব একটা ব্যাগে ভরছে। ইজেলটা খুলে, বেঁধে খাটের নিচে রাখল। আবছা দেখতে পারছি।কারণ ওর ঘরে ঘুমের আলো জ্বলছে, হালকা নীল আলো। বাচ্চারা লুটিয়ে পড়ে ঘুমাচ্ছে। ওদের কম্বল সরে গেছে, কিন্তু মেয়েটার মনেই আসছে না যে, ওটা আবার গায়ে টেনে তুলে দেওয়া দরকার। ওর মন খারাপ, খুব খারাপ। ডান চোখের নিচে মারের দাগ। আরেকটু হলে চোখটা চলে যেত আজ। ভালো কথা, কোনোভাবে যদি আরেকটা ছবি তুই ওপরতলায় রেখে আসতে পারিস, তাহলে ওপরতলায় কী ঘটছে দেখে বলতে পারব। রেখে আসতে পারবি?”

“ওই যে, শুনলে?”

“না শুনে উপায় কী।”

ওপর দিকে তাকাই। সাদা ছাদ দেখতে পারছি। কল্পনার চোখে ছাদ ভেদ করে দেখছি বেয়াড়া, প্রতিবাদী চেয়ারটাকেও। শুধু কর্তাদের দেখতে পারছি না। যাদের ইচ্ছায় কর্ম ঘটছে। অপকর্ম বলা ভালো।

পরদিন।

অফিস থেকে ফিরে পোশাক ছাড়ার পর চায়ের পানি বসিয়ে আবার বাবার ছবির সামনে এলাম।

“বাবা, কেমন আছ?”

“শীত কি বাড়ল টগর?”

“কুয়াশা পড়েছে, শীত নেই। তুমি কিছু টের পাও?”

“পাই।আজ রোদ পেলাম না, তাই ভাবছিলাম। তুমি জানালার পর্দা সরিয়ে যাওনি।”

“সরি বাবা।” বাবা যে আলোয় স্বচ্ছন্দ এটা বুঝিনি। “মনটা একটু অস্থির।” ব্যাখ্যা দিতে চেষ্টা করি আমি।

“কেন বল্ তো?”

“আজ আমার বোন আসছে। ওর গালে মারের দাগ থাকবে। ওর বর আবারও ওর গায়ে হাত তুলেছে। যখন কোনো ভাই শোনে তার বোনের গায়ে হাত উঠেছে, তার ইচ্ছে করে সেই হাত ভেঙে দিতে। ইচ্ছে করে সেই নীচ মানুষের নীচ মনটাকে পায়ে পিষে দিতে। কিন্তু আমার প্রিয় ভাগনেরা যদি আমাকে তাদের বাবার ওপর চড়াও হতে দেখে, তাহলে আমার ভাবমূর্তিটাও বা ওদের সামনে কী দাঁড়াবে? ভবিষ্যতে ওরা কারো পক্ষ নেবে না আর। কেউ ওদের জীবনে বন্ধু হবে না। সবাই হবে ওদের চোখে দরকারি শয়তান। কাল রাতের পর থেকে এসবই ভাবছি। মন অস্থির, বিক্ষিপ্ত।”

“মায়ানী তোমাকে ফোন করেছিল? ও আসছে জানলে কী করে?”

বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে থাকি হাসি। ছবির ভেতর সমবয়েসী বাবা বিভ্রান্ত হয়ে তাকিয়ে থাকে। খুব মায়া হয়।

“বাবা, তুমি খুব মিষ্টি।”

“হঠাৎ?”

“না। হঠাৎ না। সবসময়।”

এর মিনিট পনের পর, যখন দু’কাপ চা বানিয়ে টেবিলে সাজিয়ে রাখা শেষ, দরজায় ঘণ্টি বাজল। মায়ানী এসেছে। সঙ্গে তার লটবহর। রিকশাওয়ালা এসে ইজেলটা ঘর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে গেছে। সঙ্গে আছে তুলির একটা চামড়ার ফোল্ডার, দুটো বড় ক্যানভাস, এক থেলে রঙ। সব বুঝে পেয়ে কোমরে বাঁ হাত রেখে ডান হাতে চুল সরাল মায়ানী। দেখতে একসময় কী সুন্দরীই না ছিল। কিন্তু দুশ্চিন্তা আর নির্যাতনে তার রূপ নষ্ট হয়েছে। ত্বকে এক পরত কালো পড়েছে, চোখের নিচে কালি। চোখের মণি খানিক উন্মাদের মতো জ্বলজ্বলে। রুক্ষ চুল।

“কিরে, কেউ আসবে?”

“তোমার অপেক্ষায় ছিলাম আপা।”

“ফোনে তোকে পাওয়া যায় না, আর এদিকে দুই কাপ ধোঁয়া ওঠা চা। পোষা জ্বিন-ভূত আছে তোর? উত্তরে অপেক্ষা না করে বলল, “চায়ে চিনি দিয়েছিস তো?”

“তুমি তো চিনি খাও না।”

“এখন আবার খাচ্ছি। চিনি দে। দুই চামচ।”

রাতে খাওয়ার পর মায়ানী আমার ঘরে ঢুকে গেল। আমার ঘর ওকে ছেড়ে দিয়েছি। সোফায় শোব। ইজেলে ক্যানভাস চাপিয়েছে মায়ানী। টুল দিয়েছি, সেখানে সব রঙ, রাসায়নিক। পানিভরা ছোট একটা নীল বালতি এনে দিয়েছি।

রান্নাঘরে এলাম। পানি গরম করে ফ্লাস্কে রাখলাম। চা বা কফি খেতে যখন-তখন লাগবে। আমার ঘরের দরজা খানিক ফাঁক। আপা আঁকতে শুরু করেছে। গুনগুন করে গানও গাইছে। ক্যানভাসের দিকে তাকিয়ে মনে হলো একটা সৃজনশীল বিশৃঙ্খলা চলছে ওখানে। আশা করছি আগামীকাল দুপুরের ভেতর দাঁড়িয়ে যাবে ছবির প্রাথমিক কাঠামো। এর ভেতর সুযোগ করে তাকে জোর করে খেতে বসাতে হবে। এসময় তাকে কিছু খাওয়ানো কঠিন। ডাকলে ও ক্ষেপে ওঠে। জলের বালতি উল্টে ফেলে দেয়। রঙ ছেঁচে তোলার ছুরি দিয়ে ক্যানভাস ফালি ফালি করে দেয়। ওর বর এই সময়টারই অপেক্ষায় থাকে। বলে, “ছবি আঁকার সময় তোমার বোনের ওপর শয়তান ভর করে। অবশ্য সে নিজেও সাক্ষাৎ শয়তান।”

হঠাৎ ওপরতলায় প্রবল শব্দ। চেয়ার টানার শব্দ।

কে বা কারা চেয়ারে কাউকে চেপে বসালো। মনে হলো হঠাৎ চেয়ারের পায়ায় লাথি দিয়ে ফেলে দিয়েছে। ভারী চেয়ার দড়াম শব্দ করে মেঝেতে আছড়ে পড়ল। কোনো একটি শরীর ধপ করে পড়ল মেঝেতে।

বসার ঘরে ছুটে যাই। বাবার বুদ্ধি কাজে লাগাব। সেগুন কাঠের শোকেসের দেরাজ থেকে পারিবারিক অ্যালবাম বের করি। এখানে বাবার অনেক ছবি আছে। এতোকাল অ্যালবামের অন্ধকারে ছিল, সহজে হয়ত সাড়া দিতে পারবে না। তবু চেষ্টা করা যাক।

বাবার তরুণ বয়সের একটি ছবি পেলাম, আরেকটা শেষ বয়েসের। তরুণ বয়েসের ছবিতে, বাবা একটা কাঠের চেয়ারে বসে ঈষাণ কোণে তাকিয়ে আছেন। বয়সকালের ছবিতে বাবা পা ভাঁজ করে বুকের কাছে টেনে নিয়েছে। জানালা গলে আসা রোদের স্বর্ণ তাঁকে জড়িয়ে ধরে আছে।

তরুণ বয়েসের ছবি নিয়ে ছুটলাম ওপরতলায়। হঠাৎ মনে হলো, বাবার তরুণ বয়েসের এই ছবির তো দ্বিতীয় কোনো কপি নেই। একে বিপদের মুখে ফেলি কী করে? আবার ফিরে এসে অ্যালবামে ঝুঁকি। খুঁজতে থাকি বাবার মধ্যবয়েসী কোনো একটি ছবি যেমন ছবি অনেক আছে। খরচ হয়ে গেলে মনে খুব বেশি দুঃখ হবে না।

ওপরতলার চেয়ার আবারও জীবন্ত হয়েছে। শব্দ এতো তীব্র, মনে হচ্ছে আস্ত এক বিছানা সরানো হচ্ছে। নিশ্চয়ই চেয়ারের ওপর বসা অবস্থায় ঠেলে নেওয়া হচ্ছে কাউকে। দ্রুত পাতা ওল্টাতে থাকি।

পেয়ে গেছি বাবার মধ্যবয়েসী একটা ছবি। বাবা তারুণ্যে ছবিটা তুলেছিলেন যে চেয়ারে বসে, পঞ্চাশে এসে আবার সেই একই চেয়ারে বসে একইভাবে ঈষাণ কোণে তাকিয়ে ছবি তুলেছেন। এমন ছবিই দরকার।

হঠাৎ দরজা খুলে মায়ানী আসে। ক্ষেপে উঠেছে? আশ্চর্য, কোনো কারণে ওর চোখে রাগ নেই। বরং একটা উদ্বেগমাখা কৌতূহল।

“কিরে ওপরে তো যুদ্ধ চলছে।কতক্ষণ থেকে ভাবছি এই বুঝি থামল। কিন্তু কোনো লক্ষণ দেখছি না। চল তো দেখে আসি দুজন?”

“আপা তুমি এখানে বসে থাক। আমি যাচ্ছি আর আসছি।”

দরজা খুলে বেরিয়ে গিয়ে সিঁড়ি ধরে ওপরতলায় ছুটি। ওদের দরজার সামনে এসে দাঁড়াই। বসে দরজার নিচ দিয়ে বাবার ছবি গলিয়ে মৃদু টোকায় ভেতরে ঢুকিয়ে দিলাম। হঠাৎ মনে হলো, এসব কী করছি আমি?

নিচে নেমে আসতেই আমার বোন কাঁধ খামচে ধরে বলল, “টগর, বাবার ছবিটা আমার সঙ্গে কথা বলল! কী হচ্ছে এসব? পালিয়ে এসেছি আমি।”

“আপা তোমাকে কিছু কথা বলা হয়নি। ভয় নেই?” বাবার ছবির কাছে গিয়ে বলি, “ওপরতলায় ছবি রেখে এসেছি। তুমি কিছু দেখতে পারছ?”

“টগর! আমি তো মুগ্ধ আমার মেয়েকে দেখে। কিশোরী দেখেছিলাম। এখন দেখছি আমার চেয়ে বয়েসে বড়। কী আশ্চর্য বল দেখি? ও ভয় পেয়েছে। ধূর, আমি যে কী!”

“বাবা, এ নিয়ে পরে কথা বলছি।”

“তুই যাকে রেখে এসেছিস সে এতোকাল অ্যালবামের অন্ধকারে ছিল। অন্ধকার থেকে যদি তাকে আলোতে যেতে হতো চোখ ঝলসে যেত। সে আবার অন্ধকারের জন্য চিৎকার করত। কিন্তু তোর আর তার দুজনেরই ভাগ্য ভালো। ওপরতলায় গোটা ঘরে আলো প্রায় নেই। যা দেখছি, চারজন মৃত মানুষ একজন জীবিত মানুষকে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে।”

ঢাকায় এখন ঘরে ঘরে এমন হচ্ছে। রাস্তায় রাস্তায় এসব ঘটছে। আমি মায়ানীকে নিয়ে ছুটলাম।

ওপরতলায় ওই ফ্ল্যাট ছাড়াও আরো দুটো ফ্ল্যাট আছে। সেগুলোর দরজার নিচে আলো। আমরা অভিযুক্ত দরজায় দমাদম কিল মারতে থাকলাম। মনে হলো ভেতরে হুটোপুটি হচ্ছিল, হঠাৎ থেমে গেল। আবারও কিল হাঁকালাম, দম দম দম! অন্য দুটো বন্ধ ফ্ল্যাটের দরজার নিচের আলো নিভে গেল। বুঝলাম মানুষজন পিপহোল দিয়ে তাকিয়ে দেখছে।

আবার কিল মারতে যাব এমনসময় দেখি, দরজার নিচ দিয়ে, যেখান দিয়ে আমি বাবার ছবি ঢুকিয়ে দিয়েছিলাম, কেউ একটা থেঁৎলানো বুড়ো আঙুল ঠেলে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করছে। টুকরো বুড়ো আঙুল সিঁড়িঘরের মরা আলোয় আমার দিকে তাকিয়ে থাকল। শত হোক, আমি তো মানুষ। বোনও দেখতে পেল সেই আঙুল। চিৎকার করে বসল। তার তার মুখ ছাই হয়ে গেছে। এবার ধীরে ধীরে আমাদের সামনের দরজা খুলে গেল। দেখি ঘরের ঠিক মাঝখানে একটা চেয়ার। এতোদিন যা কেবল শুনে এসেছি এবার চাক্ষুষ করলাম।

চেয়ারে একটি মেয়ে বসে আছে।তাকে দুপাশ থেকে ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে চারজন মানুষ। দুজন পুরুষ, দুজন নারী। ঘর অন্ধকার। কিন্তু পাশের দালানের রান্নাঘরের জানালা দিয়ে আসছে হালকা আলো। সেই আলো তাদের ওপর পড়েছে। চেয়ারে বসা মেয়েটির মাথা নিচু, চোখ বুজে থাকা। তার বাহু খামচে ধরে রাখা চারটি অবয়ব ঠিক স্বাভাবিক নয়। বাবা এদের কথাই বলেছে। চারজন মৃত মানুষ। মেরে ফেলার চেষ্টা করছে এক জীবিতকে।

“কী করছেন ওখানে আপনারা! মেয়েটাকে কী করেছেন। মেরে ফেলেছেন?”

কণ্ঠে জোর আর রাগ ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করি। অনভ্যাসের জন্য ফুটতে চায় না। তখন কল্পনা করার চেষ্টা করি বোনের বরের সঙ্গে লড়তে চলেছি, সামনে সে উদ্ধত তাকিয়ে আছে এবং তার এই ঔদ্ধত্যের আজই অবসান ঘটবে।

“উত্তর নেই কেন। মেরে ফেলেছেন, নাকি বেঁচে আছে।”

একজন কথা বলে উঠল। “ও যেভাবে বেঁচে আছে তাকে বেঁচে থাকা বলে? থুহ্! ও মরে গেছে আরো বহু আগেই।”

“তাহলে একজন মৃত মানুষকে কেন মারতে হচ্ছে আপনাদের!”

কেউ কোনো উত্তর দিলো না। বললাম, “ও কে হয় আপনাদের?”

“বোন।”

চমকে উঠি। হয়ত বোন বিষয়ে স্পর্শকাতরতার কারণে।

“বোন?”

একটি অবয়ব অন্ধকার থেকে আলোয় আসে। প্রথম কথা বলা মানুষটি নয়। এ অপর পাশে ছিল। আলোতে আসার পর দেখি ফ্যাকাসে মলিন চেহারা, চোখ দুটো খোলা, সেখানে বিচিত্র ভয়ের ছায়ার আসা যাওয়া। “জানতাম এমন দিন আসবে”, বলল লোকটা। “আমাকে আজ স্বীকার করতেই হবে।”

“কী হয়েছে, কী স্বীকার করতে হবে।”

লোকটা মুখে বলার কথা বললেও পরে দ্বিধা করতে থাকে।

“বলুন, নয়ত এমন নরকে আটকে ফেলব কল্পনাও করতে পারবেন না।”

“মাথায় পানি জমেছিল আমাদের ছোট বোনের। সেই থেকে শুরু। এ কেমন অসুখ? মাথায় কেন পানি জমবে? কিন্তু জমেছিল এটাই সত্য। অনেক কষ্ট পেত, এলোমেলো আচরণ করত। ওকে সামলাতে খুব বেশি বেগ পেতে হতো। কিন্তু একদিন টের পেলাম... একদিন টের পেলাম ওর মাথায় হাতুড়ি মারলে, ঘরে শান্তি নেমে আসে। মাথার মাঝবরাবর। হঠাৎ আমরা কাউকে আঘাত করার আনন্দ টের পেয়ে গেলাম। দুর্বল কাউকে মারার কী যে আনন্দ! কিন্তু এর একটা পাল্টা ধাক্কাও আছে। এরপরই বিবেক ভেতরটা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেয়। আমাদেরই তো বোন! প্রথম আমিই ওর চিকিৎসা করানোর কথা মুখে এনেছিলাম। কিছু চিকিৎসা বাবা মা করিয়ে গিয়েছিল। প্রথমে মা, এরপর বাবা মারা যাওয়ার পর ওর চিকিৎসা থেমে যায়। না থেমে উপায়? ততদিনে আমাদের পরিবার বড় হয়েছে। সবাইকে তখন বাঁচতে হচ্ছে। এই বাজারে আমাদের মতো একটা পরিবারের স্রেফ মড়ার মতো বেঁচে থাকাও ত্রিশ হাজার টাকা থেকে শুরু করতে হয়, খাওয়া-পরা ছাড়া। বাবার সম্পদ ভাগবাটোয়ারা হলো। আমরা ভাগ করে নিলাম। হ্যাঁ, বোনকে আমরা কিছুই দিইনি। এসব ওর কী কাজে আসবে চিকিৎসা ছাড়া? আর সেটা তো আমরাই চালাতে পারি! সুতরাং ওর প্রাপ্য টাকাগুলো আমরা দুই ভাই ভাগ করে নিয়ে নিলাম। ধর্মমতে ওর ভাগে পড়েছিল আমাদের চেয়ে অনেক কম। দুভাগ হলে আর কী থাকে। তেমন কিছুই যোগ হলো না। ওই সামান্য অঙ্ক আমরা ভালো মনে শেয়ার বাজারে খাটালাম। মার গেল। এই দেশ শয়তানের ইশারায় আমাদের চেয়েও কালো নিয়মে চলে! কত লোকে আত্মহত্যা করল! কেউ এসে কোনোদিন জানতেও চাইলো না আমরা কীভাবে বেঁচে থাকলাম। তখন আমাদের গাঁটের টাকা থেকে ওর চিকিৎসা করাতে থাকি। তবে নিউরো হাসপাতালে আর না। আমরা কবিরাজের কাছে নিলাম। কবিরাজরাও আজকাল নরকের জোঁক, জানেন? চোঁ চোঁ করে রক্ত টানে! চিকিৎসার একেকটা পর্বের পেছনে বাচ্চাদের স্কুলের বেতন বেরিয়ে যেতে থাকে। খাওয়ার খরচ কমতে থাকে। আমি, বড় ভাই, আমার বউ, ভাবি, আমাদের ছয়জন ছেলেমেয়ে, আপনি কল্পনা করতে পারেন? কতটা আন্তরিকতা থাকলে আমরা আমাদের আসবাব বিক্রি করতে থাকি! খাট, টেলিভিশন, কম্পিউটার, ফ্রি, সোফা, মাদুর, ওয়াশিং মেশিন, সেলাই মেশিন, ওভেন, কাপ, পিরিচ, প্লেট, জগ, গ্লাস সব একে একে বিক্রি করতে থাকি। আমাদের সন্তানেরা আধপেটা খায়। আমাদের স্ত্রীরা ধীরে ধীরে মাছের কাঁটার মতো হয়ে ওঠে। বিবেক আমাদের আবারও পুড়িয়ে খাক করে দিতে থাকে, এবার ভিন্ন দিক থেকে। বাচ্চাদের পৃথিবীতে নিয়ে আসার জন্য অনুতাপ হতে থাকে। মধ্যবিত্ত হওয়ার জন্য লজ্জা করতে থাকে। আরো নিচে নেমে যেতে না পারার জন্য অনুতাপ হতে থাকে! শেষটা খুব অদ্ভুত। আমরা এরপর সিদ্ধান্ত নিলাম, সোমাকে মেরে ফেলব। সোমা, আমাদের বোন। এমনভাবে মারব যেন বাইরে কেউ টের না পায়, সে ভেতর থেকে মরে যায়। যেন ওর যকৃত পচে যায়, ফুসফুস নষ্ট হয়ে যায়। মগজে জমা পানিতে যে পোকাগুলো কিলবিল কিলবিল করছে সেগুলো তার খুলিকে যেন খোসা বানিয়ে দেয়। তার নখের যেন কৃমি হয়, পেটের কৃমিগুলো যেন লম্বা লম্বা সাপ হয়ে ওঠে। ও হা করলে উৎকট পচা গন্ধ বেরিয়ে আসত। আমরা খুশি হতাম, আমাদের কাজ সফল হতে চলেছে। কিন্তু ক’দিন পরই আমরা হতাশ হলাম। হতাশ হলাম এই জন্য যে, ও মরছে না। কেন নিজ থেকে আপসে মরে যাচ্ছে না? ওর শরীরে ঘা বাড়িয়ে দিতে নখগুলো তুলে ফেললাম। অসাবধানে বুড়ো আঙুলের একটা কড় আলাদা হয়ে গেল। বাচ্চারা যোগ দিলো। ওরা ফুপুর নরম শুকনো অবশিষ্ট নখে সুঁই ফুটিয়ে দিয়ে হাসে। সোমা বাধা দিতে চায়, তখন বাচ্চাদের মায়েরা হাতুড়ি দিয়ে ওর গিঁটে গিঁটে মারে। মেয়ে মানুষের নরম হাড়, থেঁতলে গেল। মারার একটা নেশা আছে। সোমা গাল দিয়ে উঠেছিল। ওরা তখন ওর মুখে মারে। দুটো দাঁত ভেঙে যায়, নাক ভেঙে যায়। বোন হামা দিয়ে পালিয়ে যেতে চাইলে আমাদের বড় ভাই, একসময় কবিতা লিখতেন ভেবে এখন লজ্জা পান, ওকে টেনে তুলে চেয়ারে বসিয়ে কষে বেঁধে ফেলে। পালাবি কোথায়? আপনি চিন্তাও করতে পারবেন না এ অবস্থায়ও ও কীভাবে তাকিয়ে থাকল আমাদের দিকে! অবিকল আমাদের মায়ের দৃষ্টি। বিবেক, বিবেক! বুকের ভেতর থেকে বিবেকটাকে খুবলে ফেলে দিতে পারতাম? ভাবতে পারেন, মানুষকে এই কুৎসিত পৃথিবীতে ছেড়ে দিয়ে, খোদা কত বেশি নির্দয় হলে, বুকের ভেতর আবার বিবেক দিয়ে দিতে পারে? তার আগুন সহ্য করতে না পেরে বাঁচতে চেয়ে মানুষ কখন ততোধিক শয়তান হয়ে উঠতে পারে, তা আপনি নিজে সেই দরজায় পৌঁছে না গেলে, কেউ আপনাকে সেখানে নিয়ে না গেলে, আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না! এই একটা জিনিস বুঝলাম। বিবেক পুণ্যের জন্যে দায়ী, বিবেক পাপের জন্যেও দায়ী। ওর তাকিয়ে থাকায় বিবেকের আগুন অসহ্য হলো! ওর চোখ গেলে দিলাম। প্রথমে একটা। এরপর আরো একটা। বিশ্বাস হয়? সোমা ছিল বাবা-মায়ের সবচেয়ে আদরের।”

আমি দাঁতে দাঁত পিষে “শয়তান” বলে চিৎকার করে উঠে সবলে ঘুষি বসিয়ে দিই লোকটার চোয়ালে। মুহূর্তের জন্যে সেখানে মায়ানীর বরের ছবি ভেবে ওঠে। হঠাৎ পেছনে তাকিয়ে দেখি অন্য ফ্ল্যাটগুলো থেকেও বেরিয়ে এসেছে মানুষ।

“কেউ পুলিশ ডাকুন।”

“দারোয়ানকে বলা হয়েছে।”

দুজন প্রতিবেশি এসে সোমা নামের মেয়েটিকে চেয়ারসহ সামনে নিয়ে এসেছে। মুখ তুলল মৃতপ্রায় মেয়েটা। চোখ গলিত সাদা থিকথিকে জেলির মতো দীর্ণ বিশ্লিষ্ট হয়ে লেপ্টে আছে অক্ষিকোটরের কিনারে, হাড়ে। মেয়েটা কথা বলতে চেষ্টা করলে দেখা গেল ওর জিভ পরজীবীর সংক্রমণে কালো! মায়ানী বলল, “ও বাঁচবে, মন বলছে ও এখনো বাঁচবে!”

সোমা কিছু একটা বলতে চাইছে। বসে ওর কানের কাছে মুখ নিলাম। দুর্বল গলায় বলল, “আপনারা বিশ্বাস করবেন আমার কথা? আমার ভাইয়েরা কেউ বেঁচে নেই। আমার ভাবীরা, তাদের বাবুগুলো, কেউ বেঁচে নেই। বিশ্বাস করছেন? ওদের বড় কষ্ট। আমি ঠিক আছি। এরচেয়ে ঠিক থাকার কথা না আমার।”

বললাম, “আপনি শান্ত হোন। সব সমাধান হবে।”

পুলিশ এলো। এরপর অ্যাম্বুলেন্স ও লাশের ঠা-া-গাড়ি। প্রতিবেশিরা সোমাকে শুইয়ে দিয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের কালো রেক্সিনের বিছানায়। আমার বোনও উঠে বসেছে তার পাশে। বলল, “টগর, ওকে নিয়ে আমি মিটফোর্ট যাচ্ছি। আমার বান্ধবী আছে। সাবধানে যাস।”

“যাব। তুমিও সাবধানে থেকো।”

আমার ইশারায় ছয়জন মানুষ, দুটি ভাই, তাদের দুই স্ত্রী, দুটি শিশু ঠাসাঠাসি করে লাশের ফ্রিজারে উঠে বসল। সোমার কাছ থেকে ঠিকানা নিয়েছি। ওদের বাড়ি ফেনীর শুভপুর, ব্যাপারীবাড়ি, সবাই চেনে। পারিবারিক সমাধিস্থল আছে ওদের, সৎকার নিয়ে ভাবনা নেই।

লাশের গাড়ির চালকের মমতাভরা চোখ। কপালে কাটা দাগ। কীভাবে আঘাত পেল? বললাম, “বাসায় একবার বলে আসি।”

সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠতে থাকলাম। বাবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া দরকার।

সম্প্রতি