image

রাহমান ওয়াহিদ: সংযত ভাষা ও আত্মবীক্ষণবোধের কবি

দ্বীপ সরকার

সমকালীন বাংলা কবিতার ভিড়ে যাঁরা চিৎকার করেন না,অথচ গভীরভাবে শোনা যায়-কবি রাহমান ওয়াহিদ তাঁদের অন্যতম। তাঁর কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতা তাৎক্ষণিক নয়; বরং ধীরে ধীরে উন্মোচিত। এই ধীরতা কোনো দুর্বলতা নয় বরং একটি সচেতন নন্দনতাত্ত্বিকের অবস্থান। ভাষার সংযম, আত্মবীক্ষণী দৃষ্টিভঙ্গি এবং নৈঃশব্দ্যের ভেতর দিয়ে সমকালকে ধরার প্রবণতা- এই তিনটি বৈশিষ্ট্য রাহমান ওয়াহিদের কবিতাকে স্বতন্ত্র করে তুলেছে। রাহমান ওয়াহিদের আটটি কবিতাগ্রন্থের মধ্যে পাঁচটি গ্রন্থের কিছু উল্লেখযোগ্য কবিতা নিয়ে বিস্তর আলোচনা করা যেতে পারে।

‘সারাক্ষণ ভিজি আমি’(ভেঙে ভেঙে জেগে থাকে নদীর হৃদয়)-কবিতায় এই পংক্তিটিই একটি পূর্ণাঙ্গ দার্শনিক অবস্থান। এখানে ভেজা মানে শুধু জলস্পর্শ নয়; ভেজা মানে অস্তিত্বে আক্রান্ত থাকা। বৃষ্টি নয়,রোদ নয়-কবি যে ‘ভিজি আমি আশ্চর্য নোনাজলে’-এর কথা বলেন, তা মূলত ভেতরের জল। নাভীমূল, পাঁজর, হৃৎপিণ্ড-এই শারীরিক কেন্দ্রগুলো খুঁড়ে যে জল পাওয়া যায়, তা আসলে অভিজ্ঞতার জল,স্মৃতির জল, ক্ষয়ের জল। টিএস এলিয়ট দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড-এ যেমন লিখেছিলেন-‘Iwill show you fear in a handful of dust.’ রাহমান ওয়াহিদ যেন বলেন-আমি দেখাবো ভেজাভাব এক মুঠো শরীরের ভেতর থেকে। এখানে জল জীবনদায়ী নয়, আবার পুরোপুরি মৃত্যু প্রতীকও নয়। জল এখানে এক অবিরাম অবস্থান-যার ভেতর মানুষ বাস করে কিন্তু যার উৎস সে খুঁজে পায় না। তাই ‘জলহীন জলাধার’-এর মতোই মানুষ নিজেই নিজের শূন্যতা। নারী ও নদীর তুলনা ভেঙে দিয়ে কবি যে বলেন-‘নারীরা নদী হলে দেখো, সুকান্ত নদীরা কতটা ভেজায় তোমাকে’-এটি রোমান্টিক কল্পনার বিরুদ্ধে এক নির্মম বাস্তবতা। নারী এখানে আশ্রয় নয় বরং ক্ষয়ের সহযাত্রী।

‘এক নদীর হৃদয়’(প্রাগুক্ত) এই কবিতাটি অপেক্ষার কবিতা। কিন্তু এটি কোনো নির্দিষ্ট মানুষের জন্য অপেক্ষা নয়-এটি সময়ের জন্য, অর্থের জন্য, নিজের জন্য অপেক্ষা। ‘চিঠি আসে, খাম খোলা হয় না’-এই দৃশ্যকল্পটি আধুনিক মানুষের মানসিক অবস্থার এক নিখুঁত রূপক। আমরা বার্তা পাই, কিন্তু গ্রহণ করতে পারি না। রিলকে যেমন লিখেছিলেন- “Life is lived in questions.” রাহমান ওয়াহিদের এই কবিতায় প্রশ্নই মুখ্য: মানুষ কি একা হাঁটে? নাকি সে মানুষই নয়- ছায়া, চিহ্নহীন কোনো সত্তা? নদীর হৃদয় এখানে চলমান নয় বরং স্থির। ভাঙা জগৎ নিয়েও সে টিকে থাকে। এই নদী আসলে কবির আত্মসত্তা- যে বহমান না হয়েও গভীর। ‘দ্রোহ’(ভালোবাসাও ভ্রমণে যায়) কবিতাটি রাহমান ওয়াহিদের সবচেয়ে তীব্র অস্তিত্ববাদী উচ্চারণগুলোর একটি। এখানে কবি প্রশ্ন করেন, যে আমার দহন বোঝে না, সে কেন আমাকে জন্ম দিতে আসে? জন্ম এখানে আশীর্বাদ নয় বরং এক ধরনের সহিংসতা। আলবেয়ার কামু বলেছিলেন-‘The only serious philosophical problem is suicide.’ কিন্তু রাহমান ওয়াহিদের কবিতা আত্মহননের নয় বরং আজন্ম আকাক্সক্ষার। তিনি মানুষ হতে চান না-মাছ হতে চান, ঘড়িয়াল হতে চান। কারণ প্রাণিজগতে অন্তত আত্মজিজ্ঞাসার বোঝা নেই। এই কবিতায় শরীর,জরায়ু, দহন-সবই আছে, কিন্তু কোনো নাটকীয়তা নেই। ভাষা ঠা-া, প্রশ্ন কঠিন। এটি আধুনিক মানুষের জন্ম-সংকটের কবিতা।

‘খোড়াখুঁড়ি’(প্রাগুক্ত) এই কবিতায় খোঁড়া মানে ধ্বংস নয় বরং অনুসন্ধান। পাহাড় খুঁড়লে পাথর পাওয়া যায়, নদী খুঁড়লে জল-কিন্তু মানুষ খুঁড়লে পাওয়া যায় ‘মাকড়সার সুতা’। অর্থাৎ মানুষ ভেতরে শক্ত কিছু নয় বরং অস্থায়ী সংযোগে গড়া। পাবলো নেরুদা যেমন লিখেছিলেন-‘To feel the love of people whom we love is a fire that feeds our life.’ রাহমান ওয়াহিদের কবিতায় সেই আগুন নেই-আছে ছাই, খোলস, শূন্য কলসের মতো কিছু। ‘মৃত নক্ষত্রের শহরে’(মৃত নক্ষত্রের শহরে) এই কবিতাটি সমকালীন নগরসভ্যতার সবচেয়ে তীব্র সমালোচনা। আলো আছে,আয়না আছে-কিন্তু মানুষ নেই। গ্যুন্টার গ্রাস লিখেছিলেন-‘Progress is a comfortable disease.’এই কবিতায় সেই রোগে আক্রান্ত শহর,যেখানে ভালোবাসাও টিকে থাকতে হলে-খানিক নমিত হতে হবে। এটি নৈতিক আপস নয় বরং মানবিক বেঁচে থাকার কৌশল। অদৃশ্য ধ্বংসের নন্দনতত্ত্ব ‘অলৌকিক ঠুমরি’(নীল জল সমুদ্দুরে যাবো) কবিতায় দৃশ্যমান কোনো ভাঙচুর নেই, অথচ সর্বনাশ ঘটে গেছে। এই অভিজ্ঞতা উত্তরাধুনিক নগরজীবনের চেনা ট্রমা। পল সেলান লিখেছিলেন-‘Poetry is what gets lost in translation between silence and speech.’এই কবিতায় ধ্বংস ঘটে নীরবতার ভেতর। ‘ঠুমরি’-একটি মোলায়েম সংগীত-এখানে ব্যবহৃত হয়েছে ভয়াবহতার বিপরীত প্রতীক হিসেবে। ভালোবাসা এখানে বৃষ্টি নয়, বরং শিরিনের মতো কষ্ট। এই sweet pain ধারণা বোদলেয়ারীয় আধুনিকতার সঙ্গে সাযুজ্যপূর্ণ। ‘বোঝাপড়া’(ধুলো অক্ষরের চিঠি)কবিতায় কবি বলেন, শেষ হিসাবটা মিটিয়ে নেওয়া দরকার-আমরা কি অরণ্যে লুকোতে গিয়ে মায়ামৃগ পুষেছিলাম? এখানে আত্মসমালোচনা আছে, কোনো আত্মমুগ্ধতা নেই।‘বুনো বোবা রাত’(ভেঙে ভেঙে জেগে থাকে নদীর হৃদয়) একটি স্মৃতিময় কবিতা, কিন্তু নস্টালজিক নয়। নদী, চাঁদ, হাতের স্পর্শ- সবই ঝুলে থাকে একলা হাওয়ায়। সঙ্গী বলতে শুধু রাত। এই রাত কোনো ভয়াবহ অন্ধকার নয় বরং শেষ আশ্রয়। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন- ‘রাত্রি যখন গভীর হয়, তখন আলো নিজের ভিতর ফিরে যায়।’ রাহমান ওয়াহিদের রাতও তেমন-ভিতরে ফেরার রাত। আর ‘নষ্ট পোড়া চাঁদ’(ধুলো অক্ষরের চিঠি)কবিতাটি সংরক্ষণের কবিতা। কবি জমিয়ে রাখেন ঘাম, ধুলো, ভাঙা রাত, মরা নদী। কিছুই ফেলে দেন না। কারণ আধুনিক মানুষ যা ফেলে দেয়, কবিতা সেটাই ধরে রাখে। অক্টাভিও পাজ বলেছিলেন-‘Poetry is the memory of the world.’ এই কবিতাটি সেই স্মৃতির ভা-ার। রাহমান ওয়াহিদের কবিতার কেন্দ্রে রয়েছে আত্মবীক্ষণ-তবে তা আত্মমগ্নতা নয়। আধুনিক কবিতার একটি মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাকে শিল্পিত করে সামষ্টিক অর্থে উত্তরণ। রাহমান ওয়াহিদ এই উত্তরণে সচেতন। ওয়ার্ডসওয়ার্থ বলেছিলেন-‘Poetry is the spontaneous overflow of powerful feelings; it takes its origin from emotion recollected in tranquillity.’ রাহমান ওয়াহিদের কবিতায় আবেগের সেই ‘recollection’ গুরুত্বপূর্ণ। এখানে অনুভূতি তাৎক্ষণিক বিস্ফোরণ নয় বরং সময়ের মধ্য দিয়ে পরিশীলিত অভিজ্ঞতা। এই কারণেই তাঁর কবিতায় স্মৃতি, অনুশোচনা, নৈঃসঙ্গ্য ও আত্মপ্রশ্ন এক ধরনের ধ্যানমগ্ন আবহ তৈরি করে।

রাহমান ওয়াহিদের কবিতায় ভাষা কখনোই অতিরিক্ত অলংকারে ভারী হয়ে ওঠে না। বরং শব্দের ব্যবহার স্বল্প, কিন্তু অর্থবহ। আধুনিক ও উত্তর-আধুনিক কবিতায় “less is more” ধারণাটি গুরুত্বপূর্ণ-রাহমান ওয়াহিদ সেই ধারায় অবিচল। কবির ভাষাও যেন ঘরে ফেরার ভাষা-অতিরিক্ত সাজসজ্জা নেই, কিন্তু গভীর আত্মীয়তা আছে। অনেক সময় তাঁর কবিতায় যা বলা হয়নি, সেটাই বেশি অর্থবহ হয়ে ওঠে। নৈঃশব্দ্য এখানে ভাষার ব্যর্থতা নয় বরং ভাষার সীমাবদ্ধতা স্বীকারের নৈতিক সাহস। জন কিটসের ধারণা অনুযায়ী কবির থাকতে হবে Negative Capability-অর্থাৎ অনিশ্চয়তা, দ্ব্যর্থতা ও অসম্পূর্ণতার সঙ্গে সহাবস্থান করার ক্ষমতা। রাহমান ওয়াহিদের কবিতা এই তাত্ত্বিক ধারণার বাস্তব প্রয়োগ। তিনি পাঠককে নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে বাধ্য করেন না। বরং প্রশ্ন, ইঙ্গিত ও অসম্পূর্ণ দৃশ্যকল্প রেখে দেন।

রাহমান ওয়াহিদ সরাসরি রাজনৈতিক বা সামাজিক স্লোগানের কবি নন। কিন্তু তাঁর কবিতা সময় বিচ্ছিন্নও নয়। সমকাল তাঁর কবিতায় প্রবেশ করে মানুষের মানসিক বিপর্যয়, সম্পর্কের ভাঙন, নাগরিক ক্লান্তি ও অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তার মাধ্যমে। রাহমান ওয়াহিদের কবিতা সেই আধুনিক ‘attitude’ ধারণ করে যেখানে সমকাল কোনো ঘোষণায় নয় বরং মানুষের অনুভবের ভেতর দিয়ে প্রকাশিত হয়। তিনি চরম আবেগ, অতিনাটকীয়তা বা কৃত্রিম বাগ্মিতা এড়িয়ে চলেন। এই সংযমই তাঁর কবিতাকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন-‘সংযমই শিল্পের সৌন্দর্য।’এই সংযম আধুনিক প্রেক্ষাপটে রাহমান ওয়াহিদের কবিতায় নতুন ব্যঞ্জনা পায়। রাহমান ওয়াহিদের কবিতা পাঠককে উপদেশ দেয় না, সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয় না। বরং একটি নীরব সংলাপ তৈরি করে। এই সংলাপে পাঠক প্রশ্ন করে, দ্বিধায় পড়ে, আবার নিজেকেই উত্তর খুঁজে নিতে হয়। রোলাঁ বার্থ তাঁর “The Death of the Author” প্রবন্ধে বলেছেন-“The birth of the reader must be at the cost of the death of the Author.” রাহমান ওয়াহিদের কবিতায় এই পাঠককেন্দ্রিকতা স্পষ্ট। কবি পেছনে সরে যান, পাঠক সামনে আসে।

কবি রাহমান ওয়াহিদ বাংলা সমকালীন কবিতায় একটি সংযত, মননশীল ও তাত্ত্বিকভাবে সচেতন কণ্ঠস্বর। তিনি একাধারে কবি,শিশুসাহিত্যক ও কলামিস্ট ও সংগঠক। আশির দশকের এই কবির জন্ম ১৭ জানুয়ারি, ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ, বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার পাইকড় গ্রামে। বর্তমানে তিনি বগুড়া শহরের অবস্থান করেন। তার প্রকাশিত মোট গ্রন্থ ২৩টি। এর মধ্যে কবিতাগ্রন্থ ৮টি, শিশুতোষ গল্পগ্রন্থ ৯টি, ছোটগল্পগ্রন্থ ২টি ও উপন্যাস ৪টি। তিনি বগুড়ার আঞ্চলিক ভাষায় লেখা ‘আতোর-আদুরি উপাখ্যান’ উপন্যাসের জন্য স্বনামধন্য সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ‘বগুড়া ইয়্যুথ কয়্যার’ কর্তৃক ২০১৯ইং সালে গুণীজন সম্মাননা পদকপ্রাপ্ত হয়েছেন। কবি দীর্ঘায়ু হোন,অরো লিখুন, আরো সমৃদ্ধ করুন কবিতাকে- সেই প্রত্যাশা রইলো।

সম্প্রতি