ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৮
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘প্লাজা মেয়র’-এ এসে খুঁজলাম সবাইকে। এখানে জনসমুদ্রের মাঝে খুঁজে পেতে একটু সময় লাগল। দেখা হতেই নাবিল বলে উঠল, ‘প্লাসিও রিয়াল না দেখে তুমি অনেক কিছু মিস করেছ।’ বললাাম, ‘তোমরাও লোরকার স্মৃতি না দেখে বেশ মিস করেছ। যা হোক, তোমরা খুশি রাজপ্রাসাদ দেখে, আর আমি লোরকার স্মৃতি দেখে। আমরা কেউ হারিনি। এটাকেই বলে উইন-উইন সিচুয়েশান।’
‘প্লাসা মেয়র’ এ যেন ছিল স্পেনের ইতিহাসের এক রঙ্গমঞ্চ। এখানে হতো আমোদ-প্রমোদ, ষাঁড়ের লড়াই, ফুটবল খেলা, মুক্তমঞ্চে নাটক, ফিয়েস্তার নাচ-গান, রাজকীয় শোভাযাত্রা। এ যেন আনন্দের, উৎসবের এক মহাপ্রাঙ্গণ।
‘প্লাসা মেয়র’-এর বিপরীত দিকও ছিল। স্পেনের সেই কালো অধ্যায় ‘ইনকিসিছিয়ন’১-এর অত্যাচারের বহু দৃশ্যের সাক্ষী হয়ে আছে এ প্রাঙ্গণ। এখানে বিচার হতো তথাকথিত ধর্মদ্রোহীদের। দোষী সাব্যস্তদের প্লাসার চারিদিকে ঘোরানো হতো, গলায় ঝোলানো থাকত তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্বলিত প্ল্যাকার্ড। তারপর প্রকাশ্যে আগুনে পুড়িয়ে বা গ্যারট দিয়ে পিষিয়ে মেরে তাদের মৃত্যুদ- কার্যকর করা হতো। হাজার হাজার লোক এ চত্বরে জমায়েত হতো এ দৃশ্য দেখতে। দর্শকদের দেখার সুবিধার জন্য অতিরিক্ত বেঞ্চ বসানো হতো। আর ধনীরা ব্যালকনি ভাড়া করে এ দৃশ্য দেখত। এ যেন রোমের কলোসিয়ামের আরেক রূপ।
ইতিহাসের নিয়মে এখন সব মুছে গেছে। প্রকাশ্যে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের স্থান এ প্লাসার দখল নিয়েছে সাধারণ মানুষ। তারা হাতে হাত মিলিয়ে নাচছে, গান গাইছে, কেউ বাজাচ্ছে গিটার, কেউ ভায়োলিন। মৃত্যুর স্মৃতি ভুলে সবাই গাইছে জীবনের জয়গান!
প্লাসার ঠিক মাঝখানে ঘোড়ার পিঠে বসে আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন রাজা তৃতীয় ফিলিপ- এ প্লাসার নির্মাতা। ফিলিপের সাথে ছবি তুলে আমরা এগিয়ে গেলাম। চারদিকে ফল-ফুল-তাপাস-স্যুভেনির-পানীয়ের সারি সারি দোকান।
ভেবেছিলাম ডিনার করব ‘কাসা আলবের্তো’তে, এটি এক ঐতিহাসিক সরাইখানা, যা এখন একটি রেস্তোরাঁ। এখানে মিগেল সের্ভান্তেস মাঝেমধ্যে আসতেন, খেতেন, আর লিখতেন। ‘ডন কিহোতে’ উপন্যাসের কিছু অংশ তিনি এ রেস্তোরাঁর এক টেবিলে বসে লিখেছেন। আমার প্রস্তাবে কারো তেমন আগ্রহ দেখলাম না।
এরপর সবরিনা দে বথিন রেস্তোরাঁর কথা বললাম। এ বছর চলছে তার ৩০০ বছর পূর্তি। অনেকে বলেন, পৃথিবীতে চালু রেস্তোরাঁর মধ্যে এটি প্রাচীনতম। এর ঐতিহাসিক গুরুত্বের চেয়ে আমার কাছে বড় আবেদন আর্নেস্ট হেমিংওয়ের স্মৃতি। ৪-তলা এ রেস্তোরাঁর ওপরের এক টেবিলে বসে তিনি লিখেছিলেন, The Sun Also Rises-এর শেষ দৃশ্য।
বিখ্যাত কোন কিছুতে নাবিল ও নাতাশার আলাদা আগ্রহ নেই, এখানেও তাই হলো। তারা যাবে এক বিশেষ রেস্তোরাঁয়। নাম বা ঠিকানা বলল না, আমাদের দুজনকে সারপ্রাইজ দেবে। টেক্সি এসে থামল তাদের দেয়া ঠিকানায়, সামনে দেখি লেখা TKO TACOS। মনে পড়ল, এই সেই ট্যাকো রেস্তোরাঁ যেখানে খেতে চেয়েছিল ফারজানা গতবারের মাদ্রিদ সফরে। সেবার ছিল দীর্ঘ লাইন, আর আমাদের হাতে তেমন সময় ছিল না। তাই এবার এখানে নিয়ে আসল। এই বিশাল মাদ্রিদ নগরীতে এই বিশেষ দোকানটি তারা কীভাবে মনে রাখল, আবার খুঁজে বের করে ফেলল! আমার বিস্ময়ের ভাব দেখে নাবিল বলল, ‘ঠিকানা মনে রাখতে হবে না। গুগলে সেভ করে রাখলেই হবে। আমি তাই করেছিলাম।’
ভেতরে যেয়ে অর্ডার দিলাম বিফ ট্যাকো, চিকেন ট্যাকো আর অরেঞ্জ জুস। ট্যাকোগুলি বেশি বড় নয়, তবে খুবই টাটকা ও সুস্বাদু। আমাদের সামনেই সব তৈরি হচ্ছে। একবার খাওয়ার পর বেশ ভাল লাগল সবার। এরপর আরো দু’বার অর্ডার দিয়েছি। কারো হিসেব নেই ক’টা খেয়েছি। বিল দেয়ার সময় বুঝলাম আমরা সবাই মিলে ২৪টি ট্যাকো খেয়েছি। সবাই খুবই পরিতৃপ্ত। ফারজানা বিশেষভাবে খুশি যে নাবিল ও নাতাশা মায়ের কথা মনে রেখেছে। গতবার ট্যাকো খাওয়া হয়নি এখানে, তাই এবার নিয়ে আসল। পৃথিবীর প্রাচীনতম রেস্তোরাঁ তাদের কাছে কোনো ব্যাপার নয়। তারা মায়ের সাধ পূর্ণ করতে পেরেছে, এটিই বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এরপর হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম কাছের ‘থিয়েথ্রো রিয়াল’-এ। রানি দ্বিতীয় ইসাবেল এর নির্দেশে ১৮৫০ সালে নির্মিত এটি মাদ্রিদের সবচেয়ে বড় ও বিখ্যাত থিয়েটার হল। সুদৃশ্য স্থাপত্যের এ হলে রয়েছে ১৪৭২ বর্গমিটারের বিশাল এক স্টেজ, যেখানে তৈরি করা যায় বিভিন্ন জটিল সেট। থিয়েটার হল থেকে বের হতেই দেখি রানি দ্বিতীয় ইসাবেল এর সুন্দর এক মনুমেন্ট- তিনি তাকিয়ে আছেন তাঁরই নির্মিত ‘থিয়েথ্রো রিয়াল’-এর দিকে। সামনের চত্বরটি তাঁরই নামে- ‘প্লাসা দে ইসাবেল’।তাঁর কীর্তির জন্য যথাযোগ্য সম্মান।
নাতাশা জিজ্ঞেস করল, ‘এই ইসাবেল কি স্পেনের সেই রানি, যাকে ‘লা গ্লোরিওসা’ নামে খ্যাত এক বিপ্লবে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল?’ আমি একটু বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ। তুমি কীভাবে জান?’ নাতাশা বলল, ‘সেদিন এল রিথেরো পার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে রানি দ্বিতীয় ইসাবেল ও তাঁর ছেলের ইতিহাস শুনেছি।’ বললাম, ‘তাঁর ২৫ বছরের দীর্ঘ শাসনে অসন্তোষ তৈরি হয়ে থাকলেও তিনি অনেক ভালো কাজ করেছেন। তার মধ্যে একটি হল থিয়েথ্রো রিয়াল প্রতিষ্ঠা। সেজন্য তাঁর সম্মানে এ প্লাজার নাম দেয়া হয়েছে।’
রানি ইসাবেলকে সিংহাসনচ্যুত করে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল শুনে সেদিন ‘এল রেথিরো’ পার্কে নাতাশা বেশ মন খারাপ করেছিল। আজ ‘প্লাসা দে ইসাবেল’নামও সুন্দর এক মনুমেন্ট দিয়ে ইসাবেলকে সম্মান করা হয়েছে দেখে সে খুব খুশি হয়ে উঠল।
প্লাসা থেকে বের হয়ে মাদ্রিদের সবচেয়ে লম্বা রাস্তা ‘কায়ে দে আলকালা’ ধরে হেঁটে যাচ্ছি। ২০ মিনিটের মতো হাঁটতে সামনে পড়ল ‘পুয়ের্থা দে আলকালা’- মাদ্রিদের বিজয় তোরণ। এই ইউরোপেই আছে পৃথিবীর বিখ্যাত কয়েকটি বিজয় তোরণ- প্যারিসের ‘আর্চ দে ট্রায়াম্প’ ও বার্লিনের ‘ব্র্যান্ডেনবার্গ গেট’। এ দুটির নাম বেশ শুনেছি, তবে ‘পুয়ের্থা দে আলকালা’ নামটি আগে শুনেছি বলে মনে হয় না। অথচ এ বিজয় তোরণটি অন্য দুটির চেয়েও পুরনো। গ্রানাইট পাথরে তৈরি এ তোরণটি রোমান সা¤্রাজ্যের পতনের পরে নির্মিত এ ধরনের প্রথম তোরণ। স্পেনের অনেক কিছুর মতো এ তোরণের পেছনেও কাহিনি আছে।
রাজা তৃতীয় কার্লোস ২ ১৭৫৯ সালে শাসনভার নেয়ার পর প্রথম যে তোরণ দিয়ে মাদ্রিদ প্রবেশ করেছিলেন তা তাঁর পছন্দ হয়নি। পরে তাঁর নির্দেশে ১৭৭৮ সালে অনন্য সুন্দর এই তোরণটি নির্মিত হয়। রাজা কার্লোস-এর অনেক কীর্তির জন্য তাঁকে বলা হতো ‘মাদ্রিদের সেরা মেয়র’।
ইতালীয় স্থপতি ফ্রান্সেসকো সাবিতিনি-র সৃষ্টি ‘পুয়ের্থা দে আলকালা’-র দুপাশে দুরকম নকশা। শহরে প্রবেশ করতে যেদিকটি চোখে পড়ে তা বেশি শোভিত। তার ওপর আছে রাজকীয় প্রতীক। প্রজ্ঞা, ন্যায়, সাহস, সংযম- এ মূল গুণাবলির রূপক হিসেবে তোরণের শীর্ষে বসে আছে ৪টি শিশুর ভাস্কর্য। তোরণের অন্য দিকে আছে যুদ্ব জয়ের ভাস্কর্য- পতাকা, জয়চিহ্ন, বক্ষবর্ম, শিরস্ত্রাণ। আর্চের ওপরে বসানো আছে সিংহের মাথা। বিজয়ের সব স্মারক চিহ্ন দিয়ে সুশোভিত এ বিজয় তোরণ। এটি যে রাস্তার ওপর অবস্থিত তা চলে গেছে সের্ভান্তেস-এর শহর ‘আলকালা দে হেনারেস’ পর্যন্ত। তাই এই নাম- ‘পুয়ের্থা দে আলকালা’।
এ তোরণের চারদিক ঘিরে এক বিরাট গোলচক্কর- ‘প্লাসা দে ইনডিপেনডেনসিয়া’। এর সবদিকে আছে উনিশ শতক ও বিশ শতকের সুরম্য ভবন ও সুদৃশ্য বাগান।
এখানে ঘুরতে ঘুরতে নাতাশা বলে উঠল, ‘সামনেই তো দেখি ‘এল রেথিরো’ পার্ক। চল, আবার যাই।’ সেদিন এ পার্কে এসেছিলাম সকালে, আজ আসলাম বিকেলে। দিনের দুই বেলায় পার্কের রঙ দুই রকম। এ সময়টিতে মানুষ অনেক বেশি হওয়াতে পাখির কলরবের চেয়ে মানুষের কোলাহল কানে বাজছে বেশি। পাখিরাও হয়তো ক্লান্ত, নীড়ে ফিরতে ব্যস্ত। তারপরও হৃদের জল নিয়ে এসেছে এক শান্ত-নরম আবহ।
‘পুয়ের্থা দে আলকালা’ রাস্তা ধরে হেঁটে উঠলাম আরো বড় রাস্তা ‘গ্রান ভিয়া’-তে । আগে এ রাস্তার উল্টো দিকে গিয়েছিলাম, যেখানে আছে থিয়েটার পাড়া।
বেশ কিছুক্ষণ হেঁটে আসলাম ‘গ্রান ভিয়া’-র শেষ মাথায় ‘প্লাসা দে এসপানিয়া’-র সামনে। নাবিল বলে উঠল, ‘এখানেও দেখি মিগেল দে সের্ভান্তেস।’ সত্যিই, প্লাসার ঠিক কেন্দ্রেই দাঁড়িয়ে আছে তাঁর মার্বেলের সৃদৃশ্য এক মনুমেন্ট- সের্ভান্তেস বসে আছেন বেশ আয়েস করে, দার্শনিকের ভঙ্গীতে। নিচে, সামনেই আছে ব্রোঞ্জ ভাস্কর-মূর্তি তাঁর দুটি অমর চরিত্রের- ‘ডন কিহোতে ও সানচো পানজা’। নাবিল ও নাতাশা তাদের সাথে আগেই পরিচিত হয়েছিল সের্ভান্তেস-এর জন্মভিটার জাদুঘরে। এ মনুমেন্টটির সামনে এক আয়তাকার জলাশয়, যার মাঝে ভাসছে রঙ বেরঙের ওয়াটার লিলি। ‘প্লাসা দে এসপানিয়া’-র পেছনেই দুটি আকাশছোঁয়া অট্টালিকা- ‘থরে দে মাদ্রিদ’ ও ‘এদিফিসিও এসপানিয়া’।
এ সুন্দর দৃশ্য দেখে কি কল্পনা করা যায়, ঠিক এ জায়গাতেই স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময় এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়েছিল। ‘মনতানিয়া ব্যারাক’ ও ‘ইউনিভার্সিটি সিটি’ কাছে অবস্থিত হওয়াতে ব্যাটল অফ মাদ্রিদের সময় প্রজাতন্ত্রীরা এখানে কামান বসায়, অনেক প্রতিরক্ষা দেয়াল ও পরিখা খনন করে। আর তার ওপর বোমাবর্ষণ করে জাতীয়তাবাদীরা। ফলে এলাকাটি বেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এখানে কিছু সময় কাটাতে চাইলাম। নাতাশা তাগাদা দিল, কাছে কোথাও যাবে। তাকে অনুসরণ করে ধীরে ধীরে উঠলাম এক টিলাতে। তার ওপর এক সুন্দর সজীব পার্ক- ‘পার্কে দেল ওয়েস্তে’, আর এক মিশরীয় মন্দির- ‘থেমপ্লো দে দেবদ’।
পার্কে আসতেই বৃষ্টি নামল। শীতকালের বৃষ্টি- খুব জোরে নয়, তবে ঝিরিঝিরি হতেই থাকল। কী আশ্চর্য, নীল নদের পাড় থেকে আনা মন্দিরের কাছেই আসল বৃষ্টি। কাকতালীয় বটে, তবে এক অর্থ তৈরি হলো।
ভেজা পাহাড়ের সিডার গাছের ফাঁকে মাদ্রিদ শহরের ৩৬০ ডিগ্রি ভিউ- এক অপূর্ব দৃশ্য। দিনের বিদায়ের বেলায় পুরো শহরকে এক নজর দেখে বিদায় জানানো, মনে হলো কাব্যিক এক ব্যাপার। তবে সূর্যাস্তে এত ওপর থেকে মাদ্রিদ দেখার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করতে চায় না। তাই এ পাহাড়ের পশ্চিমমুখী ঢালের কাছে দাঁড়ানোর জায়গা নেই।
পৃথিবীর বহু বিখ্যাত যাদুঘরে দেখেছি দখল করে আনা প্রতœসামগ্রী। ব্রিটিশ মিউজিয়মে দেখেছি মিশরীয় মমি ও বহু দেশের প্রত্নসামগ্রী। ব্রিটিশ শাসনের সময় এর বেশিরভাগ নিয়ে আসা হয়েছিল। টাওয়ার অফ লন্ডনে দেখেছি রত্ন ‘কোহিনুর’। প্যারিসের লুভর মিউজিয়মের অনেক শিল্পকর্ম নেপোলিয়নের যুদ্ধকালীন নিয়ে আসা হয়েছিল। তবে আগে কখনো শুনিনি কোন দেশ তার অমূল্য প্রতœসম্পদ অন্য কোনো দেশকে উপহার দিয়েছে। তবে আজ তা দেখলাম। ২২০০ বছরের পুরনো সামনের এই ‘থেমপ্লো দে দেবদ’ মন্দির ১৯৬৮ সালে ফ্রাঙ্কোর স্পেনকে উপহার দেয় নাসেরের মিশর।৩
‘থেমপ্লো দে দেবদ’-এর প্রার্থনা কক্ষ ও হল ঘরগুলি পূর্ব থেকে পশ্চিমে সাজানো। প্রথমে, স্তম্ভ-যুক্ত একটি প্রবেশদ্বার, যা উদিত সূর্যের মুখোমুখি করে বসানো। এরপর আচ্ছাদিত এক চত্বর মিলেছে মন্দিরের মূল কাঠামো, স্তম্ভবেষ্টিত এক হলঘরের সাথে। এতে রয়েছে ছোট ছোট প্রার্থনা কক্ষ। আচার-অনুষ্ঠানের জন্য ওপরে রয়েছে সিঁড়িযুক্ত এক সোপান। সবশেষে রয়েছে মন্দিরের পবিত্রতম স্থান, যা অস্ত যাওয়া সূর্যের মুখোমুখি হয়ে আছে। এখানে রয়েছে একটি মঠ। মন্দিরগুলির প্রাচীরে খোদাই করা চিত্রে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে উপাসনার চিত্র- রাজারা নৈবেদ্য দিচ্ছেন দেবতা আমুন ও নাত-কে।
‘থেমপ্লো দে দেবদ’-এর চারপাশে রয়েছে জলাশয়, তাতে টল টল করছে জল। এ কি ৩ মে ১৮০৮ সালের দিনটিতে নিহতদের সঞ্চিত চোখের জল? কারণ মন্দির যেখানে দাঁড়িয়ে আছে,৫ সেখানেই ফরাসি সৈন্যরা এ দিনটিতে ফায়ারিং স্কোয়াডে হত্যা করেছিল বিদ্রোহী নগরবাসীদের। তাদের অপরাধ ছিল তারা এর আগের দিন থেকে ফরাসি শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে আসছিল নগর চত্বরে। ফ্রান্সিসকো গয়া এ প্রতিবাদ ও হত্যাকে ক্যানভাসে ধরেছেন তাঁর অমর চিত্র El 3 de Mayo de 1808 দিয়ে। নাবিল ও নাতাশা দুজনেরই মনে আছে, তারা ছবিটি দেখেছিল ‘মুসেও দেল প্রাদো’-তে।
সেদিনের ট্র্যাজেডির স্মৃতিতে মনটি ভারি হয়ে গেল। তা আরো বিষণœ করে দিয়ে সূর্য ধীরে ধীরে রক্তিম আভা ছড়িয়ে ডুবতে লাগল। সে আভা ছড়িয়ে পড়ল আমাদের সামনে পুরো মাদ্রিদে, সাথে পাশের প্লাসিও রিয়াল, প্লাসা দে এসপানিয়া, আলমুদেনা ক্যাথেড্রাল ও গুয়াদারামা পাহাড়শ্রেণির ওপর। মন্দিরের প্রতিবিম্ব পড়েছে জলাশয়ে, তার জল বিদায়ী সূর্যের আভায় হয়ে উঠেছে রক্তিম। এ যেন সেদিনের হত মানুষদের অশ্রু ও রক্ত!
দিনশেষের এ বিষণœ অনুভূতির কথাই যেন বলেছেন লোরকা তাঁর কবিতায়:
দিন, কী যে গোলমালে পড়ে যাই
তোমাকে বিদায় দেব ভেবে।
যাবার বেলায়, আমার আমিকে নিয়ে পূর্ণগর্ভা তুমি
ফিরছ যখন, সেই তুমি আমাকে চেনো না মনে হয়।
কতটা বিড়ম্বনা ভেবে দেখো
অলীক মিনিট আর অলীক সিম্ফনি
তোমার বুকের ভিতর, বারবার ভরে দিতে হয়।
সন্ধ্যা যখন আসে, পারসিউসের হাত থেকে
তোমার শিকলভার খসে পড়ে যায়।
আর তুমিও তখন পলাতক, পাহাড় পেরিয়ে চলে যাও
বিক্ষত পা থেকে রক্ত ঝরে পড়ে।
তোমাকে নেশাড়– করে দেবে এমন মদিরা নয়
আমার অস্থি, মজ্জা অথবা চোখের জল
এবং যে নদীখানা তোমাকে ঘুমিয়ে রাখে অপরাহ্ণবেলা
মোহ নেই তাতেও তোমার।
পূর্ব থেকে পশ্চিমে
তোমার আলোর বর্তুল আমিই তো বহে নিয়ে যাই।
দারুণ উজ্জ্বল সেই আলোর ছটায়
দিশেহারা হয়ে যায় আমার হৃদয়।
পূর্ব থেকে পশ্চিমে
কেবল তুমি তো একা নও
তোমার পাখির দল, বাতাসিয়া ডানা
বহে নিয়ে যেতে চেয়ে, ভাব
কতটা গভীর দোটানায় প্রতিবার পড়ে যাই আমি।৬
Ref:
১. ইনকিসিছিয়ন (Inquisicion): এটি হলো একটি বিশেষ ধর্মীয় আদালত, যার লক্ষ্য ছিল ধর্মদ্রোহী ও সন্দেহভাজন ধর্মবিশ্বাসীদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা। এর মধ্যে ছিল প্রকাশ্যে শাস্তি কার্যকর করা, যা পরিাচত ছিল অতো-দা-ফা (auto-da-fe) নামে।
স্পেন ছিল ইউরোপে সবচেয়ে বেশি বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির দেশ। ধর্মীয় সহাবস্থান ও সহনশীলতার জন্য তা ছিল বিখ্যাত। তাই একে বলা হতো ক্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদি- এতিন ধর্ম ও তিন সংস্কৃতির দেশ।
আরাগনের রাজা দ্বিতীয় ফার্দিনান্দ ও কাস্তিয়ার রানি ইসাবেল তাঁদের রাজ্য আরাগন ও কাস্তিয়াকে এক করে স্পেনকে ঐক্যবদ্ধ করতে সচেষ্ট হন। এ একত্রীকরণে তাঁরা ধর্মকে ব্যবহার করেন এবং ১৪৭৮ সালে ইনকিসিছিয়ন শুরু করেন। ১৪৯২ সালেফার্দিনান্দ ও ইসাবেল গ্রানাদা জয় করার ফলে প্রায় ৮০০ বছরের যুদ্ধ রেকনকিসতা (Reconquista) শেষ হয়। তবে ইনকিসিছিয়ন চলতে থাকে।
ধর্মদ্রোহী ও সন্দেহভাজন ধর্মবিশ্বাসীদের শাস্তির মাধ্যমে ইনকিসিছিয়ন শুরু হলেও ধীরে ধীরে তা স্পেনের ইহুদি, মুসলিম, প্রোটেস্ট্যান্ট, উদারপন্থী ক্যাথলিক, বিজ্ঞানী, মুক্ত চিন্তার লোক- গোঁড়া ক্যাথলিকদের বাইরের সবাই এর অত্যাচারের শিকার হয়।
১৮২১ সালে ইনকিসিছিয়ন বন্ধ করা হলেও তা স্পেনে রেখে যায় ভীতি, নির্মমতা ও অমানবিকতার এক দুঃসহ ইতিহাস।
২. রাজা তৃতীয় কার্লোস: ইংরেজি নাম ‘রাজা তৃতীয় চার্লস’। ইংল্যান্ডের বর্তমান রাজার নামও একই-রাজা তৃতীয় চার্লস।
৩. থেমপ্লো দে দেবদ: এটি একটি সুপ্রাচীন মন্দির, যা খ্রিস্টপূর্ব ২য় শতাব্দীর শুরুর দিকে মিশরের আসওয়ান থেকে ৯.৩ মাইল দূরে নীল নদের কাছে নুবিয়াতে নির্মিত হয়েছিল। ১৯৬০ সালে আসওয়ান বাঁধ নির্মিত হলে এর জলাধার এক বড় ঝুঁকি নিয়ে আসে। এতে নুবিয়া-র অনেক প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ পানিতে তলিয়ে যাবার সম্ভাবনা দেখা দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে UNESCO-এ ঐতিহাসিক সম্পদ রক্ষা করার জন্য এক আন্তর্জাতিক সাহায্যের জন্য আবেদন করে। কয়েকটি দেশ এতে সাড়া দেয়। স্পেনের সাড়াতে অভিভূত হয়ে মিশর এই মন্দিরটি স্পেনকে উপহার স্বরূপ প্রদান করে।
৪. El 3 de Mayo de 1808: The Third of May 1808: ফ্রান্সিসকো গয়া-র আঁকা ছবি, মুসেও দেল প্রাদো-তে সংরক্ষিত আছে।
৫. ‘থেমপ্লো দে দেবদ’ মন্দিরের জায়গাতে নির্মিত হয়েছিল ‘মনতানিয়া ব্যারাক’। স্পেনের গৃহযুদ্ধের সময়, জুলাই ১৯৩৬ সালে, মাদ্রিদের অধিবাসীরা এ ব্যারাকে হামলা করেছিল অস্ত্রের সন্ধানে, যাতে তারা বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে পারে। এখানে সেময় নির্মিত হয়েছিল অনেকগুলি বাংকার, যার কয়েকটি এখনো আছে।
৬. Cancion del dia que se va..: দিনশেষের গান: অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য।