image
আইজাজ আহমদ (১৯৪১-২০২২)

সংস্কৃতির রাজনীতি প্রসঙ্গে আইজাজ আহমদ

শরীফ আতিক-উজ-জামান

বৈশ্বিক পরিম-লে আইজাজ আহমদ অতি গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিজীবী হলেও তাঁর পরিচিতির পরিসর খুব বড়- একথা জোর দিয়ে বলা যায় না। ২০২২ সালের ৯ মার্চ মৃত্যুবরণের আগে, জীবনের শেষ আট বছর তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্বের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৭১ সালে তিনি একবাল আহমদ, ফিরোজ আহমদ প্রমুখের সাথে মিলে ‘Pakistan Forum’ নামে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন যেখানে দক্ষিণ এশিয়ায় চলমান রাজনৈতিক সহিংসতা নিয়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ লেখা স্থান পেয়েছিল, বিশেষ করে তৎকালীন পূর্বপাকিস্তান অর্থাৎ আজকের বাংলাদেশে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খানের নেতৃত্বে যে দমন-পীড়ন চলছিল তিনি তার কট্টর সমালোচক ছিলেন।

ভারতের মোজাফফরনগরে জন্মগ্রহণকারী আইজাজ আহমদ ১৯৪৭-এর দেশভাগের সময় পরিবারের সাথে পাকিস্তানের লাহোরে অভিবাসী হন। শৈশবে বাবার কাছ থেকে পাওয়া কিছু বামপন্থী পুস্তক তাঁর চিন্তার জগৎ নির্মাণ করেছিল। তখন থেকেই তিনি সমাজতন্ত্র ও আন্তর্জাতিকতাবাদ-এর স্বপ্ন দেখতেন। শ্রেণিকক্ষের চেয়ে ক্যাফেতে বসে পড়াশোনা করতে তিনি বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। সেখানেই তিনি উর্দু সাহিত্যের সান্নিধ্যে আসেন। সারা জীবন যে দুটি বিষয় তাঁকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে, তা হলো কবিতা ও রাজনীতি। মির্জা গালিব তাঁর অন্যতম পছন্দের কবি। জীবনের প্রথম বইটি লিখেছিলেন গালিবের গজল নিয়ে ১৯৭১ সালে। Monthly Review-এর মতো সমাজতান্ত্রিক পত্রিকায় তিনি দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ লিখেছেন।

গত শতাব্দীর আশির দশকে বামপন্থা থেকে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরে আসার সময়কালে মার্কসবাদী তাত্ত্বিক হিসেবে তাঁর উত্থান। প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির পাঠদানে গভীরভাবে নিয়োজিত ছিলেন। দর্শন-রাজনীতি-অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয় নিয়ে তাঁর মতামত বুদ্ধিজীবীদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল। আইজাজ আহমদের বামপন্থী ভাবনার উদ্ভব হয়েছিল জাতীয় মুক্তির আকাক্সক্ষায় প্রথাগত উপনিবেশবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের বিরোধিতা থেকে। উল্লেখ্য, যখন পাশ্চাত্যের প্রভাবশালী বুদ্ধিজীবীরা মার্কসবাদ ও বামপন্থাকে কার্যত অপ্রয়োজনীয় মনে করছিলেন, ঠিক তখনই তিনি নতুন করে মার্কসবাদী ছকে সবকিছুকে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। ধীরে ধীরে তাঁর উত্তর-মার্কসবাদী, উত্তর-ঔপনিবেশিক ও উত্তরাধুনিক ভাবনাসমূহ এইসব প্রতর্কে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছিল। ১৯৯২ সালে তাঁর ‘In Theory: Classes, Nations, Literature’ প্রকাশিত হলে অনেক ‘উত্তর’ প্রতর্ক ও মতাদর্শের পূর্ববর্তী খোলনলচে বদলে যায়।

১৯৮০’র দশকের মাঝামাঝি সময়ে আইজাজ আহমদ তাঁর জন্মভূমি ভারতে ফিরে আসেন। এখানে অবস্থানকালে তিনি উল্লিখিত গ্রন্থটি রচনা করেন। রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রাগ্রসরতা নিয়েও তিনি ভিন্নধর্মী লেখা লেখেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন ও শীতল যুদ্ধের অবসানের পর বৈশ্বিক ক্ষেত্রে আমেরিকার একচ্ছত্র কর্তৃত্ব শিল্প, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক আদর্শের ওপরও ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। সেই বিষয়ে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল তীক্ষ্ণ, আর তার ফলস্বরূপ আমরা পেয়েছি তাঁর ক্ষুরধার বিশ্লেষণী রচনা। একজন সংবেদনশীল মানুষ হিসেবে শিল্প-সাহিত্যের প্রতি তাঁর গভীর অনুরাগ ছিল। তিনি ভারতের বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন। সার্বক্ষণিক ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে কিছু না কিছু শেখার চেষ্টা করতেন। তবে মাতৃভূমি ভারতে মৃত্যুবরণের ইচ্ছা তাঁর পূর্ণ হয়নি, কারণ ফিরে এলেও তাঁকে স্থায়ী নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়নি। বিজেপি ক্ষমতায় আসার পর ২০১৪ সালে তিনি দেশত্যাগে বাধ্য হন। নাগরিকত্ব না পাওয়ার বিষয়টি যখন নিশ্চিত হয়ে যায় তখন তিনি ক্যালিফোর্নিয়া ইউনিভার্সিটির তুলনামূলক সাহিত্যতত্ত্ব বিভাগে পড়ানোর প্রস্তাবটি গ্রহণ করেন। এই সময়কালকে তিনি ‘নির্বাসন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

তৃতীয় বিশ্বের সাহিত্য-সংস্কৃতি থেকে তিনি ভিন্নমাত্রিক ভাবনার প্রকাশ ঘটাতে থাকেন। এইসব ভাবনার সূত্র হিসেবে তিনি এডওয়ার্ড সাঈদের Orientalism, আর্নেস্টো ল্যাকলাউ ও চানতাল মৌফির Hegemony and Socialist Strategy, আন্তোনিও গ্রামসির রচনাসমূহ ব্যবহার করেছেন। আর এভাবেই আইজাজের কালজয়ী গ্রন্থ In Theory লেখার শুরু। বিশ্বব্যাপী এই গ্রন্থ বিশেষ সাড়া ফেলেছিল। The Politics of Culture প্রবন্ধে সংস্কৃতির পরিচিত মুখের পিছনে একটি অপরিচিত চেহারা চিনতে তিনি সাহায্য করেছেন। তাঁর মতে, ভারতের শিক্ষায়তনিক পরিম-ল ও প্রচার মাধ্যমে ‘সংস্কৃতি’ বিষয়ক যে কোনো আলোচনায় ‘সংস্কৃতি’কে ‘সভ্যতা’র সাথে এবং ‘সভ্যতা’কে ‘ধর্মে’র সাথে গুলিয়ে ফেলার প্রবণতা থাকে। এই আলোচনাগুলো তখন ভারতীয় সংস্কৃতির মূল সুরকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ধ্রুপদী বৈশিষ্ট্যের সাথে একযোগে চিহ্নিত করার ভিত্তি প্রস্তুত করে। সংস্কৃতি, সভ্যতা ও ধর্মের এই বিভ্রান্তিকর কেন্দ্রবিন্দুতে হিন্দুধর্মের অবস্থান। প্রাচীনতম উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও বেশিরভাগ স্মৃতি-সাহিত্যের তুলনায় খ্রিস্টধর্মকে খুব কমই সর্ব-ভারতীয় সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ বিবেচনা করা হয়। ইসলাম ধর্মের ক্ষেত্রেও একই কথা খাটে। বেশিরভাগ মধ্যযুগীয় ভক্তিরীতির চেয়ে ইসলামের উপস্থিতি প্রাচীন হলেও তাকে প্রান্তিক ও অতিরিক্ত হিসেবে ধরা হয়। বস্তুনিষ্ঠভাবে বলতে গেলে, এই বিতর্কের শর্তগুলো অতীতের সাথে বিশেষ সম্প্ক্তৃতার কারণে একটি পুনরুজ্জীবনবাদী, এমনকি ফ্যাসিবাদী ধরনের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের পথ প্রশস্ত করে। যেহেতু আধুনিক রাজনীতির প্রেক্ষাপটে সংস্কৃতিবাদীরা একটি সংগঠিত ধর্মের দাবি করে এবং ধর্ম সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের সাথে মিশে যায়, তাই সর্বদাই ধর্মীয়ভাবে সংজ্ঞায়িত সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের মোহিত বৃত্তের বাইরে যাদের অবস্থান, তাদের বিরুদ্ধে অত্যন্ত উচ্চ মাত্রার সহিংসতা লুকিয়ে রাখে।

আইজাজ আহমদ মনে করতেন যে, সংস্কৃতির এই পুনরুজ্জীবনবাদী সংজ্ঞার বিপরীতে আমাদের এমন একটি আদর্শের প্রয়োজন যা সংস্কৃতিকে আধ্যাত্মিক বা ধর্মীয় ঐতিহ্যের বাইরে বস্তুগত অনুশীলনের সমষ্টি হিসেবে দেখতে শেখাবে যার মাধ্যমে মানুষ বেঁচে থাকবে এবং জীবনের বিশেষ অর্থ তৈরি করবে। এই ধরনের বিশ্লেষণের সূচনা বিন্দু অতীত-ঐতিহ্য নয়, বরং এখনকার বাস্তবতা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি হলো, বিভিন্ন শ্রেণি ও সামাজিক গোষ্ঠী কর্তৃক বাস্তব জীবনে শিল্পকলার শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের মাধ্যমে অর্জিত সাংস্কৃতিক সম্পদে প্রবেশাধিকার। যখন আমরা সংস্কৃতিকে এভাবে দেখি, তখন তাৎক্ষণিকভাবে বুঝতে পারি যে, শ্রেণি, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতিসত্তা ইত্যাদি বিভিন্ন ধরনের সামাজিক দ্বন্দ্ব আসলে সব মানুষের জন্য খুব কম স্থান ছেড়ে দেয়। এমনকি সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষেরও সাংস্কৃতিক সম্পদে মোটামুটি প্রবেশাধিকার থাকে। তাঁর মতে, সংস্কৃতি জাতীয় চেতনার সুসংহত প্রকাশের কোনো ক্ষেত্র নয়। এর সমর্থকরা জার্মান রোমান্টিসিজম থেকে তাদের জাতীয়তাবাদী শব্দভাণ্ডার ধার করেছিলেন। আবার ‘সংস্কৃতি’ কেবল একটি নান্দনিকতার ক্ষেত্রও নয়, বরং তা এমন এক ক্ষেত্র যেখানে শ্রেণি ও অন্যান্য সামাজিক শক্তিকে প্রতিনিয়ত আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে বিবাদ ও সংঘাতে লিপ্ত থাকতে দেখা যায়। সবসময়ই দেখা যায় যে, প্রতিটি জাতির একটি নয়, বরং একাধিক সংস্কৃতি থাকে এবং এই বিরোধগুলো জাতীয়তাবাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী কেবল ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’-এর নিরীহ রূপ ধারণ করে না, বরং বৈপরীত্যের ঐক্য হিসেবেও কাজ করে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আমাদের নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে প্রত্যাখ্যান করতে হবে এবং ভিন্নধর্মী বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করতে হবে। সংস্কৃতির রাজনীতিতে অপরিহার্য কাজ হলো, অতীত ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ধ্রুপদীবাদ অভিমুখী অভিজাত, পুনর্জাগরণবাদী ও সাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বিরুদ্ধে লড়াই করা। এই ধরনের সংস্কৃতির পরিবর্তে আমাদের আধুনিক নাগরিক মূল্যবোধ ও মৌলিক সমতার একটি গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

এই বিকল্প ধারণায়, সংস্কৃতিকে চেতনা গঠনের অনুশীলনের সুযোগ হিসেবে দেখা হয়, যার কিছু মানুষ উপলব্ধি করলেও বেশিরভাগ অস্বীকার করে। তখন উন্নত সংস্কৃতি ও জনপ্রিয় সংস্কৃতি, মহান ঐতিহ্য ও ক্ষুদ্র ঐতিহ্যের মধ্যে পার্থক্যগুলোকে সামগ্রিকভাবে শ্রেণিবদ্ধ সাংস্কৃতিক সংগঠনের নানা ধরন হিসেবে বিবেচনা করা হয়, যা চরিত্রগতভাবেই দমনমূলক। তাই, ধ্রুপদীবাদকে কেবল যুগ যুগ ধরে সঞ্চিত জ্ঞান হিসেবেই নয়, বরং একটি কালবৈষম্য হিসেবেও দেখা হয়- যা নিপীড়িতদের আত্মার ওপর চেপে বসে।

সমাজের বিভিন্ন স্তরের বস্তুগত অনুশীলনের সমষ্টি হলো সংস্কৃতির বস্তুবাদী ধারণা, যাকে গ্রামসি ‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ ধারণা হিসেবে অভিহিত করেছেন। যেখানে জাতি নিজেই জনপ্রিয় শ্রেণির সাথে সম্পৃক্ত সেখানে একটি ‘জাতীয় সংস্কৃতি’ কেবল সেই শ্রেণির অনুশীলন ও আকাক্সক্ষা থেকেই উদ্ভূত হতে পারে। ‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ হিসেবে জাতীয় সংস্কৃতির এই ধারণাটি পুনর্জাগরণবাদী ধারণার মতো অতীতমুখি নয়, বরং ভবিষ্যৎ অভিমুখী। সংস্কৃতিকে তখন বিভিন্ন সামাজিক শ্রেণিবিন্যাসের বাইরে একটি পূর্ণ সাধারণ অধিকার হিসেবে নয়, বরং বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও অর্থনৈতিক অধিকার আদায়ের আরো বড় গণতান্ত্রিক সংগ্রামের অংশ হিসেবে কল্পনা করা হয়। ‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ ধারণাটি জনপ্রিয়তাবাদ থেকে নিজেকে কেবল দুটি উপায়ে আলাদা করে:

একটি হলো, এটি নিপীড়িতদের সংস্কৃতিহীন মনে করে না। এটি স্বীকার করে যে নিপীড়িতদের অসংখ্য ঐতিহ্য রয়েছে যা অন্তর্নিহিতভাবে উদার ও সমতাবাদী বৈশিষ্ট্যের এবং এই ঐতিহ্যগুলো আমাদের ভবিষ্যৎ সাংস্কৃতিক প্রত্যাশার গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তবে সস্তা জনপ্রিয়তার বিপরীতে এটি নিপীড়িতদের সাংস্কৃতিক জীবনের সমগ্রতাকে সমালোচনা, এমনকি সন্দেহের সাথে বিশ্লেষণ করে, কারণ তাদের সাংস্কৃতিক জীবনে এমন অনেক কিছু রয়েছে- যা প্রভাবশালী মতাদর্শের অভ্যন্তরীণ রূপগুলোকে তুলে ধরে। এমনকি নিপীড়নের পদ্ধতি দ্বারা নিপীড়িতদের চৈতন্যে সৃষ্ট বিকারগুলিকেও প্রতিফলিত করে।

অন্যদিকে, ‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ ধারণাটি উচ্চ শ্রেণির সংস্কৃতিকে উচ্চ শ্রেণির কাছে অর্পণ করতে অস্বীকৃতি জানায়। কারণ এটা চিনতে শেখায় যে প্রভাবশালী সংস্কৃতি কোনো অবসরের ফসল নয়, বরং কঠিন শ্রমের ফসল। প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক ও অন্যান্য নিপীড়িত সামাজিক শ্রেণি রক্ত ও ঘাম দিয়ে যে সংস্কৃতি তৈরি করেছে সেটাই উচ্চ শ্রেণির লোকেরা তাদের নিজস্ব বলে দাবি করে।

‘জাতীয়-জনপ্রিয়’ ধারণা তৈরির কাজটি দ্বিগুণ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ জনগণের মুক্তির জন্য নিপীড়িত এবং নিপীড়ক উভয়ের সংস্কৃতিতেই এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক আত্মসাৎ’ প্রয়োজন। মার্কসীয় তত্ত্বে সংস্কৃতির রাজনীতি সর্বদাই অধিক গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসের নিজের লেখায় দুটি বড় অনুমান লক্ষ্য করা যায়। তাঁর কাজের একটি বড় অংশ পুঁজিবাদের রাজনৈতিক অর্থনীতির বৈজ্ঞানিক উপলব্ধি এবং পুঁজিবাদ থেকেই সমাজতন্ত্রে উত্তরণের বৈশিষ্ট্যগুলো তুলে ধরার জন্য নিবেদিত ছিল। তবে, একইভাবে এর ব্যাপক অংশ ছিল চেতনা, আদর্শ ও সংস্কৃতির একটি বস্তুবাদী ধারণা বিকাশের জন্য নিবেদিত। ১৮৫৯ সালে রচিত Capital: A Critique of Political Economy-এর মুখবন্ধে মার্কস মানবচেতনার নানা ক্ষেত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য তুলে ধরেছেন:

‘...উৎপাদনের অর্থনৈতিক অবস্থার বস্তুগত রূপান্তরের মধ্যে সর্বদা একটি পার্থক্য থাকা উচিত, যা প্রাকৃতিক বিজ্ঞান, আইন, রাজনীতি, ধর্ম, নন্দনতত্ত্ব, দর্শন- সংক্ষেপে, আদর্শিক একটি রূপ দ্বারা সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত হবে, যেখানে মানুষ তাদের দ্বন্দ্ব সম্পর্কে সচেতন থাকবে এবং তার বিরুদ্ধে লড়াই করবে।’

তবে এ সম্পর্কে আইজাজ আহমদ ভিন্ন কথা বলেন। তাঁর মতে, মার্কস কথিত পার্থক্য-এর লক্ষ্যণীয় বিষয় হলো যে ‘উৎপাদনের অর্থনৈতিক অবস্থার রূপান্তর’ কেবল বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ‘সুস্পষ্টভাবে’ নির্ধারিত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। সেই মৌলিক দ্বন্দ্বের ‘চেতনা’ অন্যত্র ‘আইন, রাজনীতি, ধর্ম, নন্দনতত্ত্ব, বা দর্শন’-এর রূপগুলিতে অন্তর্ভুক্ত বলে বলা হয়েছে যা স্পষ্টতই একইরকম ‘নির্ভুলতার সাথে’ ‘নির্ধারণ’ করা যায় না, যার সম্ভাব্য কারণ হলো, সেখানেই মানুষ আসলে ‘বিরুদ্ধবাদী লড়াইটা করে।’

অন্য কথায়, এই রূপগুলোকে খুব কমই বস্তুনিষ্ঠ কাঠামোগত আইনের ফলাফল বলা যায়, বরং সামষ্টিক সংগ্রামে মানুষ যেভাবে লড়াই করে তার দ্বারা অনেক বেশি নির্ধারিত। তাহলে, এই নীতি অনুসারে, ‘রাজনৈতিক সংগ্রাম’ উৎপাদনের সময়ে সংঘটিত সংগ্রামের পাশাপাশি আরও অনেক ধরনের ‘রূপ’ (ধর্মীয়, নান্দনিক ইত্যাদি) পরিগ্রহ করে। কারণ, অতীতের বিপ্লবের সময় আমরা একটি তিক্ত শিক্ষা পেয়েছি যে কেবল শোষণের ঘটনাই বিপ্লবী চেতনা তৈরি করে না। এর জন্য চেতনার ক্ষেত্রটিকে সেই রূপগুলোর সাথে মেলাতে হবে যেখানে বিশ্বকে অনুভব করা যায় এবং সেই রূপগুলো হবে বৈশিষ্ট্যগতভাবে সামাজিক ও আদর্শিক।

উপনিবেশবাদ কেবল একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাই ছিল না, বরং একটি শক্তিশালী সাংস্কৃতিক শক্তিও ছিল। সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম জাতীয় আন্দোলনের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল। সেই আন্দোলনে যুক্ত থাকা সমস্ত শক্তি আমাদের সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদের ভিত্তি দখল করার চেষ্টা করেছিল। ডানপন্থী, উচ্চবিত্ত ও উচ্চবর্ণের লোকেরা এই সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদকে একটি পুনর্জাগরণবাদী রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল যা সাম্প্রদায়িক উত্থানের ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। এর বিপরীতে, বাম ও উদারপন্থী শক্তিগুলি সেই পুনর্জাগরণবাদী ও সাম্প্রদায়িক শক্তিগুলির বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি তৈরি করার চেষ্টা করেছিল। সেই সংগ্রাম আজও অব্যাহত রয়েছে। গত দুই দশক ধরে সেই পুনরুজ্জীবনবাদী ও সাম্প্রদায়িক প্রবণতাগুলোর ব্যাপক প্রসার ঘটেছে, যা এখন ‘হিন্দু জাতীয়তাবাদ’ এবং পর্যায়ক্রমে ভারতীয় সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদ হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে। সংস্কৃতির সংগ্রাম এখন সামগ্রিকভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের একটি মূল উপাদান, যা আগের চেয়েও অনেক বেশি অপব্যবহৃত হচ্ছে।

আমাদের সময়ে সাংস্কৃতিক ও আদর্শিক কর্মকাণ্ডের সামগ্রিক সমস্যাসমূহ ধ্রুপদী মার্কসবাদের মৌলিক নীতিগুলো প্রণয়নকালীন অবস্থার তুলনায় ভিন্ন বৈশিষ্ট্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। মার্কসের সময়ে রেডিও, টিভি ও চলচ্চিত্রের মতো কোনো ইলেকট্রনিক মিডিয়া ছিল না, তাই শাসক শ্রেণির মতাদর্শের ধারকরা এত সহজে সকলের ঘরে প্রবেশ করতে পারত না, কিন্তু এখন তারা সহজে গ্রামাঞ্চলের খুব গভীরে পৌঁছাতে পারে। মার্কসের সময়ে বেশিরভাগ শ্রমজীবী মানুষ নিরক্ষর ছিল, এমনকি ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও তখনো পর্যন্ত গণসাক্ষরতার জন্য সত্যিকারের উল্লেখযোগ্য কোনো কর্মসূচি গৃহীত হয়নি। বিশ্বে সর্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে পরিচালিত একটিও দেশ ছিল না। ইউরোপের বেশিরভাগ দেশেই কোনো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার ছিল না। নির্বাচনী গণতন্ত্র, গণসাক্ষরতা বৃদ্ধি, ইলেকট্রনিক মিডিয়ার ক্রমবর্ধমান সহজ ব্যবহারের মতো পরিবর্তনসমূহ শ্রমিক শ্রেণির চেতনার ওপর গভীর প্রভাব ফেলেছে। বলা বাহুল্য, শাসক শ্রেণির এই সব বিষয়ে আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রবেশাধিকার রয়েছে। সংসদীয় গণতন্ত্র ও শ্রমিক শ্রেণির চেতনাকে বদলে দেওয়ার বিষয়টিকে বাদ দিলেও, আমরা সহজেই দেখতে পাব যে বিভিন্ন ধরনের গণমাধ্যম- মুদ্রণ ও মূলত ইলেকট্রনিক মিডিয়া- সংস্কৃতির বাইরের কোনো ক্ষেত্রের বিনোদন নয়, বরং সাংস্কৃতিক নিয়ন্ত্রণের কেন্দ্রীয় উপাদান। একটি সুসংগঠিত সাংস্কৃতিক শিল্প প্রতিষ্ঠান হিসেবে, যা আদর্শ বিতরণ করে বিশ্বাসের কোনো বিমূর্ত উপাদান হিসেবে নয়, বরং দৃশ্য ও আখ্যান হিসেবে, আর তা এই সাংস্কৃতিক শিল্প নিয়ন্ত্রণকারীদের পক্ষে চেতনাহীনদের মনের গভীরে বসবাসের মাধ্যমে বশ করতে চায়। শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনকে এই সমস্যা মোকাবেলার নতুন উপায় বের করতে হবে।

গত দশকে সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে তিনটি মৌলিক পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। প্রথমত, জাতীয় আন্দোলনের সময় এবং প্রজাতন্ত্র-পরবর্তী প্রথম দশকগুলিতে জাতীয় সংস্কৃতির প্রান্তিক অবস্থানে থাকা হিন্দুত্ববাদী শক্তিগুলো এখন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী, বিশেষ করে উত্তর ভারতে। দ্বিতীয়ত, অর্থনৈতিক উদারীকরণ পণ্যের আরাধনা ভিত্তিক একটি সর্ব-ভারতীয় সংস্কৃতির নির্মাণকে ব্যাপকভাবে ত্বরান্বিত করেছে এবং ইলেকট্রনিক্স মিডিয়া বুর্জোয়াদের শহুরে আবাসস্থল ছাড়িয়ে তা গ্রামের বেশ গভীরে নিয়ে যাচ্ছে। সেইসাথে প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠিত নীতিগুলোর ওপর এই সুদূরপ্রসারী আক্রমণ দৈনন্দিন সাংস্কৃতিক জীবনে বিরাট এক নিষ্ঠুরতার দিকে চালনা করেছে, ধনী ব্যক্তিদের ওপর তো বটেই, সমাজের ওপরও তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়েছে, কারণ তৃপ্ত ও অতৃপ্ত লোভের প্রতিযোগী অপচ্ছায়ারা দেশের ওপর আছর করেছে।

তৃতীয়ত, সামাজিক ন্যায়বিচারের জন্য একটি জাতীয় পরিকল্পনার অভাব এবং সামাজিক কল্যাণের চূড়ান্ত বিচারক হিসেবে বাজার-আধিপত্যের গ্রহণযোগ্যতা, প্রতিযোগী ধর্মীয় বিশ্বাসের পরিপূর্ণ পণ্যকরণের সাথে মিলিত হওয়ার ফলে বর্ণ ও সম্প্রদায়ের বর্বর পরিচয়ের একটি নতুন বিস্ফোরণ ঘটেছে, যা আদিবাসী পণ্ডিতদের কাছ থেকে বৌদ্ধিক সম্মাননা পায়, যারা ধর্মনিরপেক্ষতাকে আধুনিকতার পাপ বলে মনে করে, আবার ধর্ম ও সম্প্রদায়ের বর্বর পরিচয়গুলোই তাদের কাছে মূল ঐতিহ্য। এর মধ্যে আদিবাসী ঐতিহ্য থেকে ‘উচ্চ সংস্কৃতির’ একটি বিশেষ বালাই আবির্ভূত হয়েছে এবং হিন্দুত্ব ধর্মনিরপেক্ষ সংস্কৃতির জন্য তাৎক্ষণিক বিপদ ডেকে আনে, তবে সবচেয়ে দীর্ঘমেয়াদী বিপদটি এসেছে ‘উদারীকরণ’ নামে চলমান বাজারের উপাসনা থেকে। কারণ, সম্পদ কুক্ষিগতকরণ ও বঞ্চনার বিশালতার উপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা বহু-সাংস্কৃতিক একটি সমাজে অনিয়ন্ত্রিত বাজার সৃষ্টি এমন এক সংস্কৃতি তৈরির প্রতিশ্রুতি দেয় যা এতই নিষ্ঠুর, এতই স্ব-বিরোধপূর্ণ এবং ‘সাধারণ জীবনধারা’ হিসেবে সংস্কৃতির যে কোনো ধারণা থেকে এতটাই বঞ্চিত যে রাজনৈতিক গণতন্ত্র বা একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি সুসংহতভাবে এই বর্বরতার মুখে টিকে থাকতে পারবে না।

বস্তুত, আইজাজ আহমদ তাঁর ‘Politics of Culture’-এ বলতে চেয়েছেন যে সংস্কৃতি কোনো আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য নয়, বরং শ্রেণি ও সামাজিক দ্বন্দ্বের স্থান, যা আদর্শায়িত জাতীয়তাবাদ ও উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ করে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ দাবি করে। সংস্কৃতিকে তিনি কেবল পশ্চিমা প্রতর্ক নয়, রাজনৈতিক অর্থনীতি ও পুঁজিবাদ দ্বারা গঠিত চলমান বস্তুগত অনুশীলন হিসেবে দেখেছেন। এমনকি সংস্কৃতি উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত কোনো ঐতিহ্যও নয়। ভারতীয় সংস্কৃতিকে হিন্দুধর্ম ও আধ্যাত্মিক ঐতিহ্যের সাথে মিশ্রিত করার প্রবণতাকে প্রত্যাখ্যান করে তিনি যুক্তি দেন যে এটা বাস্তব ও সামাজিক সংগ্রামকে আড়াল করে। তিনি সাম্প্রদায়িক, পুনরুজ্জীবনবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য মৌলিক সমতাসহ একটি আধুনিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে তোলার আহ্বান জানান। জাতি ও সংস্কৃতি একচেটিয়া নয়, বরং অর্থ ও আধিপত্য নিয়ে অভিজাত ও ভিন্নমতাবলম্বীদের মধ্যে দ্বন্দ্বের স্থান। মার্কসবাদী রাজনৈতিক অর্থনীতি ও শ্রেণি বিশ্লেষণের ওপর আহমদের অত্যাধিক গুরুত্ব প্রদানকে কেউ কেউ ক্ষমতা বোঝার জন্য অপরিহার্য বলে মনে করেন, আবার কেউ কেউ এটিকে খুব সংকীর্ণ বিবেচনা করেন, যা অ-শ্রেণি-ভিত্তিক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে অবমূল্যায়ন করে। তাঁর সংস্কৃতি অধ্যয়নে বস্তুবাদী বিশ্লেষণ বেশি গুরুত্ব পাওয়ায় আদর্শিক ও পরিচয়-কেন্দ্রিক আখ্যানগুলির প্রতিরোধের জন্য চাপ সৃষ্টি হয় বলে কেউ কেউ মনে করেন। সমসাময়িক ধর্মীয় জাতীয়তাবাদ, নব্যউদারনৈতিক বিশ্বায়ন এবং উত্তর-ঔপনিবেশিক বিশ্বে সংস্কৃতি, শ্রেণি ও ক্ষমতার জটিল পারস্পরিক ক্রিয়া বিশ্লেষণের জন্য তাঁর সংস্কৃতি বিষয়ক ধারণা প্রাসঙ্গিক।

সম্প্রতি