image
শঙ্খ ঘোষ/ ৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৩২; মৃত্যু : ২১ এপ্রিল ২০২১ : প্রতিকৃতি : স্যমন্তক চট্টোপাধ্যায়

আমার মধ্যে যেভাবে আছেন শঙ্খ ঘোষ

আবুল কাসেম

জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ির রবীন্দ্রনাট্যমঞ্চ। সামনে আমি বসে আছি। সেখানে সপ্তাহব্যাপী সাহিত্য সম্মেলন হচ্ছে। একটি পর্বে ঐতিহাসিক উপন্যাস নিয়ে কথা বলবার কথা আমার। ‘পত্রভারতী’ সবেমাত্র ভারতে আমার লেখা ‘মৌর্য’ উপন্যাসটা প্রকাশ করেছে। এ মঞ্চে একটি অনুষ্ঠানে এর মোড়ক উন্মোচন হবে। মোড়ক উন্মোচন করবেন খ্যাতিমান কবি শঙ্খ ঘোষ। ভারতের বাংলাভাষী লেখক-বুদ্ধিজীবীরা এরই মধ্যে উপস্থিত হয়েছেন। বাংলাদেশ থেকে গেছেন কথা-সাহিত্যিক সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, শিল্পী মেহের আফরোজ শাওন এবং অন্য প্রকাশের কর্ণধার মাজহারুল ইসলাম।

কিছুক্ষণের মধ্যে কবি শঙ্খ ঘোষ এসে উপস্থিত হলেন। তাঁকে আমার পাশের সিটে বসিয়ে আমার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন আয়োজকরা। তিনি করমর্দনের সময় আমার হস্ত চেপে ধরে বসে পড়লেন এবং এভাবে হস্ত ধরেই থাকলেন- যতক্ষণ না মঞ্চে গিয়ে মঙ্গল প্রদীপ জ্বালিয়ে মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানের সূচনা হলো।

আমি তাঁর হাত ধরা অবস্থায় বসেরইলাম। বেশ অসুস্থ তিনি, কথা বলতে পারছেন না। হয়ত আমাকে ঘিরে, আমার বই মৌর্যকে ঘিরে তার অনেক প্রশ্ন, অনেক আলোড়ন। আলোড়ন বলছি এ জন্য যে, একসময় তাঁর দু’চোখ বেয়ে অশ্রুধারা বইছিল অঝোর ধারায়। কেউ একজন টিস্যু পেপার এগিয়ে দিয়েছিলেন। তিনি বাঁ হাতে বার বার চোখ মুছছিলেন, কিন্তু জল মুছছিল না।

প্রকাশক আমার বইটা আগেই পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাছে। তিনি পড়েছেন হয়ত, মতামত ব্যক্ত করতে চাইছিলেন- এটাও হতে পারে, কিন্তু পারছিলেন না বলে আবেগে প্রকম্পিত হয়েছিলেন। আমার হাত ধরে থাকা তাঁর হাত কাঁপছিল প্রায় সারাক্ষণ।

প্রসঙ্গত আরেকজন বড় লেখকের কথা মনে পড়ে। তিনি কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক। আমার একবারই দেখা তাঁর সঙ্গে। তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠান থেকে স্ব উদ্যোগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডীন অডিটরিয়ামে ‘মৌর্য’ উপন্যাসের প্রকাশনা উৎসব করেছিলেন, কারণ বইটা নাকি তাঁর খুব ভালো লেগেছিল। বইটা নিয়ে তিনি লিখেছেনও- একথা বলেছেন নানা জায়গায়। এরকম একটি ভিডিও ক্লিপ আমাকে পাঠিয়েছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক এবং তাঁর ব্যাংকার স্বামী। হাসান আজিজুল হক অসুস্থ ছিলেন, তাই কাত হয়ে শুয়ে ‘মৌর্য’ উপন্যাস দেখিয়ে বক্তব্য দিচ্ছিলেন। এরকম কিছু বলার ইচ্ছে হয়ত ছিল কবি শঙ্খ ঘোষেরও- রুদ্ধবাক তা হতে দেয়নি।

কবি শঙ্খ ঘোষ বাংলাদেশের চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। তারিখটা ছিল ১৯৩২ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি। তাঁর শৈশব-কৈশোর কেটেছে বরিশালের বানারিপাড়ায়। সেখানে ছিল তাঁর পৈতৃক নিবাস। পাবনায় ছিল পিতার কর্মস্থল। তাই ক’বছর সেখানে কাটান এবং চন্দ্রপ্রভা বিদ্যাপীঠ থেকে ম্যাট্রিকুলেশন পাস করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে এঁরা স্বপরিবারে ভারতে চলে যান। তখন বয়স ছিল তাঁর পনের বৎসর। দেশ ছেড়ে ভারতে চলে গেলেও জন্মভূমির প্রতি ছিল তাঁর গভীর টান। সম্ভবত এ জন্যই বাংলাদেশের সামান্য এক লেখকের প্রতি তাঁর অশ্রুময় প্রাণের এরকম দরদ।

এরকমটি মনে করার বাস্তব একটি কারণ আছে। আমার প্রথম উপন্যাস ‘ক্যাপ্টেন কক্স’ প্রকাশিত হলে ব্রিটিশ লেখক উইলিয়াম রাদিচের অনুরোধ অনুযায়ী লেখক-এডভোকেট-সাংবাদিক নন্দ কিশোর আগারওয়ালের মাধ্যমে কলকাতায় একটি কপি পাঠিয়ে দিই। নন্দ কলকাতায় গিয়ে জানতে পারেন রাদিচে ইংল্যান্ড চলে গেছেন। নন্দ বইটি নিয়ে দেন কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায়কে। তিনি বইটি পড়ে এতটাই উচ্ছ্বসিত হয়ে ওঠেন যে, তার প্রমাণ পাওয়া গেল একটি ছোট্ট চিঠিতে। চিঠির সঙ্গে পাঠানো তাঁর অনূদিত নাজিম হিকমতের একটি কবিতার বই, তাতে লাল-নীল-সবুজ কালিতে আমার নাম আর প্রশংসা বাক্য লেখা ছিল। চিঠিতে লেখা ছিল একটি উপদেশ, ‘ক্যাপ্টেন কক্স’ ইংরেজি অনুবাদ করতে হবে- এই একটি বই-ই নাকি আমার ভাগ্য বদলে দেবে। তাঁর সঙ্গে আমার দেখা নেই, কথা নেই- কত আন্তরিকতা! তিনিও বাংলাদেশের নওগাঁ জেলায় শৈশব-কৈশোর কাটিয়েছিলেন, বলেছেন, বাংলাদেশের নওগাঁ শহর তার ব্যক্তিত্বের ভিত তৈরি করে দিয়েছিল। সে মায়ায়ই বোধহয় এতকিছু বলা। দেশভাগ হয়ে সীমান্তে বসেছে কাঁটাতারের বেড়া, কবিদের আবেগের আকাশ ভাগ হয়নি। সেটা অবিভক্তই রয়ে গেছে। এটা বোধ হয় কখনোই ভাগ হবার নয়।

শঙ্খ ঘোষের প্রকৃত নাম চিত্তপ্রিয় ঘোষ। কবি ও লেখক নাম শঙ্খ ঘোষ। তিনি আরও অন্তত দু’টি ছদ্মনামে লেখালেখি করেছেন- কুন্তক এবং শুভময়। কৈশোরেই কবিতার প্রতি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। স্বপ্ন দেখতেন কবি হবেন। কবিতার জন্য রাত জাগতেন, কলম ধরে বসে থাকতেন, প্রাণান্তকর তপস্যায় কবিতা দেবীর সাক্ষাৎ মিলল বটে। কিন্তু লেখা কবিতা আলোর মুখ দেখল না। বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় কবিতার পর কবিতা পাঠিয়েও সফলকাম হননি। বুদ্ধদেব বসু শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতাও ছাপেননি। রাগে-ক্ষোভে শঙ্খ ঘোষ কখনোই বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেননি।

তবে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় ‘যমুনাবতী’সহ তাঁর কয়েকটি কবিতা ছাপা হয় এবং তা পাঠক ও কবিদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তারপর আর তাঁকে পেছনের দিকে তাকাতে হয়নি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়রা ‘কৃত্তিবাস’ প্রকাশ করবেন। প্রথম সংখ্যায় প্রথম কবিতাটা কার হবে। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো শঙ্খ ঘোষের কবিতা। তাঁর কাছে কবিতা চাইতেই পুরো কবিতার খাতা তুলে দিলেন ওদের হাতে। এবার বড় সমস্যায় পড়লেন ‘কৃত্তিবাসী’রা। সবগুলো কবিতাই লোভনীয় রকম পরিণত। একবার ভাবলেন সবগুলো কবিতাই ছেপে দেবন। পরে তা থেকে সরে এলেন এজন্য যে, বাস্তবে তা সম্ভব নয়। কারণ প্রথম সংখ্যায় প্রসিদ্ধ ব্যক্তি, বিশেষ করে ‘কৃত্তিবাসী’দের কবিতা তো ছাপতে হবে।

শঙ্খ ঘোষের আবির্ভাব পঞ্চাশের দশকে। ত্রিশ এবং চল্লিশের দশক ছিল বাংলা কবিতার ঐশ্বর্যময় সমৃদ্ধির যুগ। জীবনানন্দ দাশ, বিষ্ণু দে, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত, অমীয় চক্রবর্তী, প্রেমেন্দ্র মিত্র,সুভাষ মুখোপাধ্যায়,অরুণকুমার সরকার, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী প্রমুখ কবি বাংলা কবিতার স্বর্গলোক সৃষ্টি করেছিলেন এ সময়টায়। পঞ্চাশের দশকে তাই কবি হিসেবে স্বাতন্ত্র্য প্রদর্শন কিংবা ঔজ্জ্বল্য ছড়িয়ে আবির্ভূত হওয়া বেশ কঠিন ছিল।

সাতচল্লিশে দেশভাগ তখন অনেক বড় ঘটনা। তখন তার বয়স ১৫ বছর। বুঝবার, উপলব্ধি করার বয়স তার হয়েছে। দাঙ্গা, উদ্বাস্তু জীবনের যন্ত্রণা, অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই, দুর্ভিক্ষ- সব মিলিয়ে মানুষের দুঃখ-দুর্দশা কাছে থেকে দেখেছেন। সমকালীন কবিতায়ও সে উত্তাপ অনুভব করলেন। সুভাষ মুখোপাধ্যায়, মঙ্গলাচরণ, রামবসু, গোলাম কুদ্দুস প্রমুখ সে প্রেক্ষাপটকে নিয়ে লিখে যাচ্ছেন।

এরকম একটি পটভূমিতে উঠে এলেন পঞ্চাশের কবিরা। কিন্তু সে উত্তাপ রইল না তাদের কবিতায়, যেন স্তিমিত হয়ে এসেছে। সে স্থান দখল করেছে আত্মমগ্ন ভাবলুতা। কবি শঙ্খ ঘোষের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘দিনগুলি রাতগুলি’ প্রকাশিত হয় ১৯৫৬ সালে। এ কাব্যগ্রন্থের কবিতা বেশিরভাগই আত্মমগ্নতার। তবে সমাজবাস্তবতার কবিতাও আছে। ‘যমুনাবতী’ তার প্রমাণ। কোচবিহারে খাদ্য আন্দোলনের মিছিলের ওপর পুলিশের গুলি চালিয়ে কিশোরী হত্যার প্রতিবাদে তিনি লিখেছেন, ‘নিভন্ত এই চুল্লি তবে / একটু আগুন দে- / হাতের শিরায় শিখার মাতম / মরার আনন্দে!’ (যমুনাবতী)। প্রকৃত অর্থেই শঙ্খ ঘোষের কবিতার ধারা চিহ্নিত হয়ে গেল দিনগুলি রাতগুলি কাব্যগ্রন্থ থেকেই। ড. শিশির দাশ লিখেছেন, ‘একটি ব্যক্তিমুখী, এর নির্জনতা সন্ধানী ব্যক্তিসত্তার আত্মকথা; সংকেত ভাষায় ও প্রতিমায়, মৃদুকোমল ছন্দস্পর্শে অনুত্তেজিত কণ্ঠস্বরে এই কাব্যধারা বিশিষ্ট; অন্য ধারাটি চারপাশের জগতের অসঙ্গতি, সমাজের বৈষম্য ও অমানবিকতার প্রতিক্রিয়ায় বিচলিত ও ক্রুদ্ধ এক ব্যক্তিমনের প্রতিবাদের ধারা, তা মূলত বিদ্রƒপে ও ব্যঙ্গে, কখনো স্পষ্ট ও তীব্র, কখনো বেদনা ও যন্ত্রণায় গভীর।’

কবি শঙ্খ ঘোষের কবিতার ভাব ও বোধ বহুমাত্রিক। কথাবার্তার চাল সহজ শব্দের প্রয়োগ নৈপুণ্যেও জটিল। তাঁর ভাষায় ‘সহজসীমায় সমভাবে ধরে রাখতে পারে যে ভাষা, সে কিন্তু অন্যদিকে আবার গড়িয়ে যেতে পারে অনেক দূরে’। এই কবির মননশক্তি, কল্পনা, অভিজ্ঞান এবং জীবনবোধ প্রতীক, রূপক, রূপকল্প, চিত্রকল্পসহ শাব্দিক ও আর্থিক আলংকারিকতায় শিল্প-নির্মাণের মুঠোমুঠোমুক্তো ছড়ায়। কবিতা পাঠের সঙ্গে সঙ্গে সবটা হয়ত বোঝা যায় না, উপলব্ধি করা যায় না। অপেক্ষার অভিজ্ঞতায় আনন্দের দুকূল প্লাবিত করে আবিষ্কারূপে ধরা দেয়। আশির দশকে কবি আহসান হাবীবের কবিতার বই ‘দুহাতে দুই আদিম পাথর’ প্রকাশিত হয়। বইটি হাতে দিয়ে কবি আমাকে বললেন, পড়ে আমার সঙ্গে কথা বলবে। বইটিতে ‘সময়-অসময়’ একটি কবিতা আছে। তখন পড়ে কিছুই বুঝিনি। মাথায়ও রাখিনি। দু’দিন পর ঢাকা থেকে কুমিল্লায় ফিরে যাচ্ছি। তখন মেঘনা ব্রিজ হয়নি। ফেরিতে উঠেছি। আকাশে ঘনকালো মেঘ। বাতাস বইছে। দূরে বেশ দূরে একটি সাদা পাল খাটানো নৌকো। নৌকোটি যেন পাল নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তীব্র স্রোত এবং বাতাসে তার দাঁড়িয়ে থাকার কথা নয়। কয়েকদিন আগে অধ্যাপক কবির চৌধুরী টিএস এলিয়টের ‘ফোর কোয়ার্টেটস’ নিয়ে কথা বলছিলেন। বার্ন নর্টনের গোলাপ উদ্যান। সেখানে একটি সাদা গোলাপ ফুটে আছে এবং বাতাসে তার পাপড়ি দুলছে। এলিয়ট যেন আবিষ্কার করে ফেলেছেন এ হচ্ছেন যিশুখ্রিস্ট- লোকচক্ষুর সামনে যার প্রকাশ এবং বিকাশ আছে। যাকে দেখা যায় না তিনি ঈশ্বর, যিনি সময়ের বিচারে অনাদি এবং অনন্ত।

আহসান হাবীবের কবিতায়ও একটি চমৎকার চিত্রকল্প আছে। ঝিলের ধারে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাদা বক। ঝিরি ঝিরি বাতাস তার পালকে যেন খুনসুটি করছে। কিন্তু সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ করে আমার উপলব্ধিতে মেঘনার বুকে দাঁড়িয়ে থাকা সাদা পাল, বার্ন-নর্টনের বাগানের সাদা গোলাপ এবং আহসান হাবীবের কবিতার সাদা বকের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি হয়ে গেল। আমি আবিষ্কারের আনন্দে লাফিয়ে উঠলাম। ব্যক্তির সময় এবং বিশ্ব চরাচর (ইউনিভার্স) কিংবা মহাবৈশ্বিকবোধ সাহিত্যে এসেছে বক কিংবা গোলাপের প্রতীকে। টিএসএলিয়ট ক্যাথলিক খ্রিস্টধর্মে বিশ্বাসী ছিলেন বলে ঈশ্বর এবং যিশুখ্রিস্টের উপলব্ধিটা প্রতীকে সাহিত্যায়িত হয়েছে নৈর্ব্যক্তিক সময়স্বরূপে। কবি আহসান হাবীবের সে রকম বিশ্বাসের দুর্বলতা ছিল না, তাই তিনি নিজেকেই দেখেছেন বকের প্রতীকে, সময় স্বরূপে। যেন বলতে চেয়েছেন আমিই সময়- অনন্ত সময়ের ঈশ্বর। আমরা উপনিষদের সে সত্যেরই মুখোমুখি হই আবার, মানুষ অমৃতের সন্তান।

শঙ্খ ঘোষের ‘মুহূর্ত’ নামে একটি কবিতা আছে। কবিতাটির প্রথম পংক্তি ‘মেঘ ঘোরাফেরা করে চেতনার অগ্নিসন্ধি ঘিরে’, আর শেষ পংক্তি ‘কবিতা মুহূর্ত চায়, শিকড়ে সর্পিল স্বাধীনতা’।

দৃশ্যত কবি শঙ্খ ঘোষের প্রকাশভঙ্গি এবং ভাষা সহজ। কিন্তু বোধ বা উপলব্ধির গভীরতা সে সহজ কথাটিকে অতিক্রম করে গেছে। তাঁর কবিতায়ই আছে, ‘একটা দুটা সহজ কথা/বলব ভাবি চোখের আড়ে, / জৌলসে তা ঝলসে ওঠে/বিজ্ঞাপনে রংবাহারে/... বিকিয়ে গেছে চোখের চাওয়া/ তোমার সাথে ওতপ্রত/নিয়ন আলোয় পণ্য হলো/ যা কিছু আজ ব্যক্তিগত’(মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে)। বাস্তব ঘটনাকে কেন্দ্র করে লেখা কবিতা যেন সহজ কিন্তু দৃঢ়ভাবে অন্তর স্পর্শ করে, ‘ময়দান ভারি হয়ে নামে কুয়াশায়/দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যায় রুটমার্র্চ/তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ওকি/কৃষ্ণচূড়া’/নিচু হয়ে বসে হাতে তুলে নিই/ তোমার ছিন্ন শির, তিমির (তিমির বিষয়ে দুটুকরো)। এ কবিতার প্রেক্ষাপট সম্পর্কে শঙ্খ ঘোষ ‘কবিতার মুহূর্ত’ গ্রন্থে বিস্তারিত বলেছেন। তিমিরবরণ মিছিলে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। অসাধারণ এ দৃশ্যকল্প ‘তার মাঝখানে পথে পড়ে আছে ওকি/কৃষ্ণচূড়া’?। আমার ‘মৌর্য’ উপন্যাসে এরকম একটি চিত্রকল্প ব্যবহার করেছি। বারো হাজার দ্বিগম্বর শিষ্য নিয়ে জৈন সন্ন্যাসী আচার্য ভদ্রবাহু মৌর্যসাম্রাজ্যের রাজধানী ছেড়ে যাচ্ছেন। তাদের ভেতর আছেন নব দীক্ষিত পদত্যাগী সম্রাট চন্দ্রগুপ্ত মৌর্য। রুটমার্চ এগিয়ে যাচ্ছে। একসময় দেখা যায় তার দিগম্বরার্থে ছেড়ে যাওয়া পরনের শেষ বস্ত্রটা রাস্তায় পড়ে আছে। শঙ্খ ঘোষের ‘অমৃতধাম যাত্রা’ কবিতার দৃশ্যকল্প তা আবার মনে করিয়ে দেয়, ‘মনে হয় পিশাচ পোশাক খুলে পরেনিই/মানব শরীর একবার’।

শঙ্খ ঘোষের কবিতায় প্রেম, দ্রোহ, প্রতিবাদ ক্ষমতাতন্ত্রবিরোধিতা সবই আছে। আর তা দু’ধারায় আত্মমগ্নতা ও সামাজিক বাস্তবতায় প্রথম থেকে শেষাবধি। একজন কবির কাছে তার সব লেখাই প্রিয়, সন্তানের মতো। তবে কোনো কোনো লেখা বেশি প্রিয়। শঙ্খ ঘোষ দীপকরঞ্জনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তাঁর ‘পাঁজরে দাঁড়ের শব্দ’ এবং ‘গান্ধর্ব কবিতাগুচ্ছ’ কাব্য গ্রন্থ দু’টি বেশি প্রিয়। তাঁর কথিত নিঃশব্দের শিল্প কাব্যদ্বয়ের কবিতাগুলোয় অধিকমাত্রায় পরিস্ফুট। তার বিপরীতে ক্ষমতাতন্ত্রের বিরোধিতা এবং প্রতিবাদী কথা আছে ‘সমস্ত ক্ষতের মুখে পলি’, ‘মাটি খোঁড়া পুরোনো করোটি’, ‘প্রতি প্রশ্নে কেঁপে ওঠে ভিটে’, ‘খুনি নীরব চিৎকার’, ‘এও এক ব্যথা উপশম’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থে। কবিরা যেন দায় থেকেই ক্ষমতার বিরুদ্ধে দাঁড়ান। সিঙ্গুর-নন্দগ্রাম-লালগড় আন্দোলনকালে ঝলসে উঠেছিল তাঁর কলমের শাণিত তরবারি। তাই কটাক্ষের সুরে বলতে পেরেছিলেন, ‘দেখ খুলে তোর তিন নয়ন/রাস্তা জুড়ে খড়গ হস্তেদাঁড়িয়ে আছে উন্নয়ন’। অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই কবির ধর্ম। না হয় নিজেকে বড় ছোট মনে হয়। তাই তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘আর কত ছোট হব ঈশ্বর/ভিড়-এর মধ্যে দাঁড়ালে/আমি কি নিত্য আমারও সমান?/শহরে বাজারে আড়ালে’। একসময় যেন উপলব্ধি করতে পারেন, ‘তোমার কোনো ধর্ম নেই, শুধু/বুকে কুঠার সইতে পারা ছাড়া’ (ত্রিতাল)। অথবা ‘প্রহর জোড়া ত্রিতাল শুধু গাথা/মদ খেয়ে তো মাতাল হত সবাই/কবিই শুধু নিজের জোরে মাতাল’ (ঐ)। তাই বোধ হয় উচ্চারণ করতে পারেন, ‘আমার কথা কি বলতে চাও না? নিশ্চিত তুমি বহিরাগত/উঁচু স্বর তুলে কথা বলে যারা জেনে নাও তারা বহিরাগত (বহিরাগত)। বুঝতে অসুবিধা হয় না সম্প্রতি বহিরাগতদের নিয়ে যে কা- ঘটিয়েছে শাসকচক্র, তারই প্রতিবাদে এ ক্ষোভের কবিতা।

তাঁর প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ ৩৫ টি, গদ্যগ্রন্থ ৪৯ টি, শিশু-কিশোরদের জন্য প্রকাশিত বই ২৩টি, বক্তৃতা বা সাক্ষাৎকার ভিত্তিক সংকলন ৫টি, এছাড়াও অগ্রন্থিত রচনা সংকলন রয়েছে ২টি। গদ্য রচনার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক লেখালেখাগুলি বিখ্যাত।

কবি, গদ্যকার এবং শিশুসাহিত্যিক শঙ্খ ঘোষ আজ দুই বাংলায় তো বটেই, বৈশ্বিক বিচারেও শীর্ষস্থানীয় এক বাঙালি কবি। তাঁর বিশাল সাহিত্যকর্মের জন্য তিনি চিরকাল সকলের মধ্যে বেঁচে থাকবেন। আমিইবা তাঁর স্মৃতিভুলে যাব কী করে?

সম্প্রতি