তুমি ছুঁয়ে দিলে অপবিত্র হয়ে যাই
দিলারা হাফিজ
সৌরলোক থেকে সূর্যদেবের বীর্যপাতে
গর্ভবতী হবো- আমি নই তেমন- মর্ত্যরে কুন্তী-মাতা!
লোকলজ্জার ভয়ে কর্ণকে ভাসিয়ে দেবো অশ্বনদীর জলে?
দেবী নই, আমি যে মানুষ-
তুমি ছুঁয়ে দিলে আমি তবে নারী হয়ে উঠি-
মেঘশাদা চুলের বরণ- কালো শস্যের মতো শোভা পায় মস্তকে...
নির্দয় জীবন নির্জনে ভেসে যায় গোপন তরঙ্গ-তীরে!
বালিয়াড়ি ছেড়ে রাঙা রাজপথগুলো ফিরে যায় ভিড়ে!
রোজ আমাকে তবু পতিতা বলে ডাকো,গালি দাও বেশ্যা
পূত-পবিত্র তুমি, সেই হোরকে ঘিরেই রচনা করো শয্যা!
নগর-অন্তে কার্পাসফুলে ঢাকা সেই যে প্রাচীন কুঁড়েঘর
এখানেই পাপ ও প্রতিভা নিয়ে খেলা কর তুমি অজগর!
সেই ঘরে রোগ-শোক-ব্যাধি আমাতেই পুঁতে রেখে যাও
যেন আমি অভিশপ্ত,ঘৃণ্যজীব,তুমি এক মিশরীয় ফারাও।
ভুলে যেয়ো না, আমারি গর্ভে জন্ম তোমার, হে মরমী!
আমি সেই মহামতি মাতা, তোর পিতার শয্যায় স্রেফ যৌনকর্মী!
শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে
জিললুর রহমান
কতদূর পাহাড়ের কুয়াশায় ঢেকে গেল প্রেয়সীর মুখ,
হাহাকার বারবার- ভাসে চোখে ঠোঁট আর লাজুক চিবুক।
কুয়াশায় পথঘাট নদী টিলা সব মুছে যেতে যেতে
নক্ষত্র তবুও জ্বলো শীতরাতে কাতরাতে কাতরাতে!
সব আলো নিভে গেলো, ঢেকে গেলো স্বপ্নহীন দেশ-
নক্ষত্র, কিসের জন?্য নিদ্রাহীন বাউলের বেশ!
আনাজ ফুরালে তার চাষ হবে আমদানি হবে একদিন,
বিবেক ফুরালে পাবো কোন পথে কোথা থেকে কিছু কিছু ঋণ?
স্বপ্ন কবে গেল উবে কোন পরীদের রাজ্যে দেশান্তর!
আমরা বলির পাঁঠা বালুচরে বালু দিয়ে নিত্য বাঁধি ঘর...
ছাব্বিশের পৌষে
আসাদ উল্লাহ
শীত পড়েছে খুব
যেনো হিম হাওয়া আসছে সাইবেরিয়া থেকে।
তোমাদের পাড়ায় হয়তো নতুন বছর চঞ্চল হয়ে উঠেছে
নিশ্চয়ই বেড়াতে যাবে, শাড়ি পরবে নাকি?
খোলা পার্কে ঘাসে কে জানে নগ্ন পা ফেলে হাঁটো কিনা
তুমি কার্ডিগান পরে নিও
গলায় ওলেনের গলাবন্ধ,
কথা নেই বার্তা নেই তোমার তো অল্পেই ঠা-া লেগে যায়।
কয়েকদিন যাবত এমনিতেই নাক ঝরছে
ভারি ভারি গলায় কাঁপছে তোমার স্বর
অবশ্য এসব আমার নিতান্তই অনুমান নির্ভর কথা
বলতে পারো মাত্রাতিরিক্ত ভালোবাসা।
যদিও তোমার উষ্ণতার অভাব নেই এবং ছিলো না কোনো কালেই
ওষ্ঠে নদীর ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ে ভেজা চুম্বন
দূর থেকে যে কেউ বলবে তোমার ঠোঁট মানে টকটকে সজীব জবা।
তবুও ছাব্বিশের এই পৌষে আমার শহরে কুয়াশা নামলে
তোমার নামটাই আগে ভাসে, কেনো জানি ভাসছে।
চায়ের কাপে ঠোঁট ছোঁয়ালে তোমার ছবি ভেসে উঠে
আর তখন আমার চারদিকে নেমে আসে
ঠা-ার চেয়ে আরো ভয়ংকর- এক নীল নীরবতা!
ক্ষতচিহ্ন
শিউল মনজুর
চারপাশটা যেনো ধোঁয়াশায় আক্রান্ত, শীতের কুয়াশার মতন। চায়ের আড্ডাটা আজ জমেনি। ধানচাষীরা তাতচাষীরা বাড়ি ফিরে গেছে সন্ধ্যার আগেই, তাড়াতাড়ি। আর আমি সেই দুপুর থেকে পার্কে হেঁটে হেঁটে ঘুরেফিরে শেষমেশ তোমার ছায়া না দেখে ফিরে গেছি শহরের স্যাঁতসেঁতে মেসের আঙিনায়
এদিকে আজকের কয়েকটি কাগজ লিখেছে, পাখিদের নিরাপত্তা নিয়ে স্বজনেরা উদ্বিগ্ন কেউ কেউ অতিক্রম করছে স্বদেশের সীমানা। আরো লিখেছে কোথাও কোনো ফুলের ঘ্রাণ নেই, প্রজাপতিদের উড়াল নেই, বালিকাদের এক্কাদোক্কা নেই, আর অনতিদূরে প্যালেস্টাইন খাবলে খাচ্ছে বিশ্ব শকুনেরা
কে না জানে স্বদেশের হৃদয়ে নানাবিধ যন্ত্রণার ক্ষতচিহ্ন প্রবাহমান। চাঁদ উঠি উঠি করে আজও আকাশে চাঁদের দেখা মেলেনি। দেখা মেলেনি রাতের জোছনামাখা জোনাকিগ্রাম। মাথার উপরে এখনো ঘুরঘুর করে ঘুরছে জমাট বরফের কালো মেঘ, অবশ্য ধুরন্ধর নেতারা সেই পুরনো উপমা কিংবা চিত্রকল্পের গল্পে গল্পে ভোটের মাঠ গরম করে নিচ্ছে, দখল করে নিচ্ছে প্রিন্ট ও ইলেকট্রিক মিডিয়া। আর আমরা আমজনতারা দেখে নিচ্ছি, জুয়াড়ি ও চাটুকারদের টেবিলেই হাতবদল হচ্ছে, মানবমুক্তির ভবিষ্যত সংবিধান
বিনিদ্র ওমের পালক
মালেক মুস্তাকিম
আহা! শীতকাল! তোমারও কি শীত শীত লাগে?
তোমারও কি মানুষ লাগে ঠা-া তাড়াতে?
উড়ে গেছে বিনিদ্র ওমের পালক হিম ঝরাতে ঝরাতে-
এই ভরা শীতে তুমিও কি গীত গাও শরীর ও শোকের?
এইসব শীতের ভেতরে ওমপাখির গান
এইসব মানুষের ভেতরে বারো মাস শীতঋতু
মানুষ ও শীত এক অভিন্ন কুয়াশা-
কতোটা জমে গেলে শিশির হয়ে ফুটে থাকে হৃদয়-
উষ্ণতা পোহাবে বলে সতত অপেক্ষা করে
ঘনঘোর হিমের;
তবু বুকের ভেতর চিরকাল মানুষ-ই পুষে রাখে মানুষ!
দৃশ্য বদল
জয়নাল আবেদীন শিবু
শুধু শুধু মিথ্যে আল্পনায় সাজিয়ে রাখা নাচঘরে
একের পর এক দৃশ্য বদল চলে- আরাধ্য নিবিড়
সময়গুলো হেঁটে যায় শৃগালের পায়ে পায়ে-
রাতের বিছানায় ফুটে থাকে সুনসান নীরবতা।
নাচঘরের দরোজাটা ভেজানো থাকে না আর
রঙিন আলোয় উড়ে প্রজাপতি ছবি- পুতুল পুতুল খেলা
নাচঘরের দৃশ্য অদল বদল হলে
ফুল হয়ে ফুটে কবুতরের কলিজা।
নিত্যদফতর
ফারুখ সিদ্ধার্থ
অতিরিক্ত কর্মঘণ্টার নিত্যদফতরে
অধিকাল ভাতাটা কাজীর গরু...
সস্তা রঙ ও তামাশাপূর্ণ জন্মান্ধ বিধিমালা
তবু তাকেই জপমালা করে
যাপন করতে হয়
আস্ত ভেড়া, দু-পায়া জন্তুজীবন
দেয়াল-ঘড়ির মতো বর্ষপঞ্জিটাও লোকদেখানো
সারিবদ্ধ কালো সংখ্যাগুলো কর্মদিবস নয়
প্রতীক দুঃখ ও শোকের; লালগুলো
ছুটি নয়- সমূহ সংকেত
এমন দফতর- একবার নাম লিখালে
হাজির থাকতে হয় খোদার তিরিশ দিন
আর হামেশা দেখা হয় শুভংকরের সাথে...
সোয়েটার
চরু হক
নীশিথের অন্ধকারে সবচেয়ে বেশি আলো ফোটে
তাই আমি স্বপনেতে মায়ের লাল সোয়েটার মনে এনে
সময়ের কাটা হাতে একা একা সোয়েটার বুনি।
সেই সোয়েটার জুড়ে সারাক্ষণ আকাশ খেলা করে
খেলা করে রামধনু, লাল নীল, সবুজ বেগুনি
আমার মায়ের হাত যেনো এক অদৃশ্য ইশারা
যুগে যুগে নেমে আসা সময়ের আঙুর লতারা
এইখানে জাগায় নৈঃশব্দ্য।
অন্ধকার গাঢ় হলে আমার মায়ের হাত পূর্ণ করে শেষ টানটুকু
ভোরের ইশারা নিয়ে জেগে ওঠে অপূর্ব সোয়েটার।
মহোদয়
সাহিনা মিতা
প্রতি ভোরে মৃত্যু ঠেলে জেগে ওঠা মস্তিষ্কে জমা
থাকে আপনার মুখ! তারে আমি রাখিনি চেষ্টায়!
স্বানন্দে সারাবেলা জুড়ে থাকেন মন আর মগজের
পূর্ণ দীর্ঘ পথ! স্বেচ্ছাচারী হয়েছেন বড় মনদখলে!
মহোদয়,
কোথাও কি আছি ঐ প্রাণে? সামান্যতম জুড়ে?
বেখেয়ালে কখনো কি আসি মনে? কোন অলস
দুপুরে? এপারে হুলস্থুল হাহাকার, ভালোবাসবার!
কতশত অনুভবে ভরে থাকে একতরফা বাসন্তী!
একতরফা অপেক্ষায় কাটে কত মোমের বিকেল!
মহোদয়,
হলুদখামে করে এই নামে কখন আসবে এক মিষ্টি
অনুভব? এই শীতে? আসছে বসন্ত, অথবা বর্ষায়?
কত কী রয়ে যায়
ওয়াহিদা মিশা
এই যে আসতে আসতে তোমার দেরি হয়ে গেল-
ত্রস্ত পায়ে ইতস্তত আহ্বান
মাছেদের মতো ঘোলা চোখ নিয়ে সময়ের নির্বাসন-
কেন জেগে থাকো
জলেই জীবন- জীবনের জন্য যে জল, রক্তশীতল শরীর নিয়ে
জলের অতলে মাছেরা ঘুমায় না তবে??
অপেক্ষার তুমুল নেশায় ক্লান্ত ভীষণ- আকাশের গায়ে মৃত
ছোপ ছোপ জমা অভিমান
ঝরে যাবে বলে ক্ষরণের দিনে কেউ কেউ সব অবহেলা সয়ে
খুব করে কাছে সরে আসে
আমি জানি, তুমিও তো জানো- অতদূর যাওয়া যায় না
যতদূর চলে গেলে ছেড়ে যাওয়া বলে!
সারাদেশ: দুপচাঁচিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত