image
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

কালো ট্রাঙ্কের ছায়া

শাহান সাহাবুদ্দিন

ধূসর ট্রাঙ্কের ভিতর অক্ষরের কম্পন। ল্যান্সডাউন রোডের বিকেলগুলোয় একটা অদ্ভুত শব্দ ছিল- দূর থেকে ট্রামের ঘণ্টা নয়, মানুষের হেঁটে যাওয়া নয়, বরং শব্দটা যেন অদেখা কোনো ডায়েরি নিজের পাতায় নিজেই দাগ কাটছে। জীবনানন্দের বাড়ির দেয়ালে সেই শব্দ লেগে থাকত, অদৃশ্য হাত দিয়ে লেখা D & R„ D & R„ Divide and Recombine„ খুন্টিপ্রথম সেই শব্দে চমকে উঠেছিল।

ঘরে তখন দধিমাসি হুল্লোড় শুরু করেছে। হেমন্তকুমারী মাসি আত্মীয়-স্বজন নিয়ে ঘর ভরিয়ে দিয়েছেন- জীবনানন্দের সাবলেট করা কোঠা যেন হঠাৎ ঢেউয়ের ভাঁজে পড়ল। কবি নিজেই দাঁড়িয়ে আছেন, পুরোনো কেরোসিন ল্যাম্পের ধোঁয়া আঙুল দিয়ে আলাদা করে আবার জোড়া লাগাচ্ছেন। যেন ধোঁয়ার মধ্যেই তিনি নিজের ভাঙাচোরা দিনগুলো পুনর্গঠন করেন।

-দাদা, এভাবে ধোঁয়া আলাদা করলে হয়? -খুন্টি ভয়ের সঙ্গে কৌতূহল মিশিয়ে জিজ্ঞেস করল।

-হয় না, কিন্তু আলাদা করার ভান করলে লেখায় গতি আসে, অগ্নি জ্বলে, -জীবনানন্দ বললেন।

-আর “Recombine”? -খুন্টি হালকা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

-ওটা আমার দোষ,- কবির চোখে তখন আলো নেই, আছে উল্টোদিকে চেয়ে থাকা এক গোপন ছায়া, সে ছায়ার ভেতর খেলা করে অসংখ্য চরিত্র।

খুন্টি ভাবল- এই লোকটা আসলে জীবনের সঙ্গে লেখাকে লুকোচুরি খেলায় যুক্ত করেছে। যা দেখে ভয় লাগে তাকেই ইঁদুর বানিয়ে রেখেছে, আর নিজে বেড়াল। মাঝে মাঝে আবার উল্টো। বিড়ালই পড়ে আছে কবির মুখে ধরা- এই দৃশ্য দেখেও হাসতে পারত এমন মানুষ আর ছিল না।

লাবণ্য দাশ তখন রাতের কাশিতে বাড়ি ভরিয়ে তুলছিলেন। সুবিমল-এর বিশেষ ওষুধে রাত দুটোর সময় ভীষণ কাশি, কফ-বারান্দায় দাঁড়িয়ে বারবার জল ঢেলে, scandalously, খুন্টি দেখছে, আর কবি যেন ব্রঞ্জের মূর্তি, লাবণ্যের পাশে দাঁড়াতে তাঁর ইচ্ছে করছে না। অদ্ভুত এক যন্ত্রণা কবিকে চেপে ধরছে। চোখে তখন খুন্টির ছায়া ভেসে উঠছে। -কেন সে ওঠে না?- কবি নিজের মনকে দংশন করছিলেন। যেন কারও বুকে পেরেক ঠুকে পরখ করছেন, সেটা কীভাবে রক্ত ছাড়াই খোঁচা যায়।

ডায়েরি-লাইন লিখলেন:

“Why does not Khunti get up”

এই লাইন যেন কাফকার “Trial” থেকে বেরিয়ে এসে জীবনানন্দের বুকের ওপর বসেছিল-অভিযোগের মতো নয়, বরং আসক্তির অব্যাখ্যাত লবণাক্ত তৃষ্ণার মতো।

ঘরে দধিমাসির রগড়, হাসিঠাট্টা, রান্নার গন্ধ, পুরোনো শাড়ির কলকল-সব মিলে কবি মনে করতেন, তিনি যেন এক অদ্ভুত গণিত-কক্ষে আটকে আছেন। মেঝেতে কল্পনায় একাধিক অক্ষ বরাবর জীবন সাজাচ্ছেন-এক অক্ষে খুন্টি, এক অক্ষে বেবি, আর কোথাও মাঝ বরাবর বিরক্ত ক্লান্ত লাবণ্য। সবচেয়ে দূরের অক্ষটায় নিজের লেখাপড়া, যেখানে তাঁর সৃষ্টি কথা কয় রোগগ্রস্ত শীতের মতো নিঃসঙ্গ ভূগোলে।

জানতেন- নিজের ভেতরে এক অদ্ভুত বৈদ্যুতিক অস্থিরতা আছে, যা আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্রে “বাইপোলার ডিজঅর্ডার” বলে ডাকবে। কিন্তু তখন ডাকতেন- অক্ষতাপ, ভিতরের ঝড় যা রাতচিরে লিখিয়ে রাখত, দু’হাতে, দু’কলমে, দু’দিকের নরক নিয়ে। নরকগুলোর নাম দেওয়া যেতে পারে-অপ্রকাশিত কবিতা, গল্প, উপন্যাস। তারা সবাই ধূসর ট্রাঙ্কে যায়- যে ট্রাঙ্ক খোলার অধিকার পরবর্তী সময়ে ভূমেন্দ্র গুহর ভাগ্যে জুটে গেল। শুধুই কী ভূমেন্দ্রর ভাগ্য? কবির তো বটেই, তার অধিক পাঠকের, সাহিত্যবোদ্ধা ও শিল্পচাষীদের।

ট্রামের ঘণ্টাধ্বনি অদ্ভুতভাবে প্রতিদিন একটু একটু করে কাছে আসছিল। কবি সেটা টের পেতেন, কিন্তু কাউকে বলতেন না-

‘এই শব্দ আমাকে ডাকছে।’

ল্যান্সডাউনের সেই ঘরটি ধীরে ধীরে রূপ নিতে লাগল এক অদ্ভুত পরীক্ষাগার-হাইজেনবার্গ, গ্যোডেল, সার্ত্র একত্র হয়ে তাঁর অন্দরমহলে রূপক-ভৌত-অস্তিত্বের যৌথ গবেষণাগার বানিয়ে দিয়েছে। দিনগুলো বেজে উঠছে অদ্ভুত ছন্দে-লাবণ্য কাশি, খুন্টির নীরবতা, কবি দাঁড়িয়ে আছেন এক অদৃশ্য কোর্টরুমে। বিচারকও তিনি, আসামিও তিনি, সাক্ষ্যপ্রমাণ কেবল নিজের তিক্ততার দাগ।

কলকাতার বৃষ্টি যেন ভেজাতো জানে না-বিশাল অন্ধকারের আঠা হয়ে শরীরে লেগে থাকে। ঘরে হাঁটাহাঁটি, জানালার কাঁচে আঙুল দিয়ে লেখা- D & R, Recombine the ruins। নিজের ভগ্নাংশ থেকে পুনর্গঠন। খুন্টি ভয় পায় না, মুগ্ধ হয়। ভাবতে থাকে- “এই মানুষটা নিজের যন্ত্রণা নিয়ে নিজেই এক নিষ্ঠুর পরীক্ষণচর্চা করেন। যন্ত্রণার ধাতু আগুনে তাপ দিয়ে পরে আবার কালি মাখিয়ে লেখেন।”

একদিন দেওয়ালের ছায়া বদলে গেল। খুন্টির কত কী জানতে চাওয়ার ইচ্ছে!

-দাদা, আপনি এত হাঁটেন কেন?

জীবনানন্দ থামলেন।

-হাঁটা মানে আমার কাছে দুই ভাগ।

-দুই ভাগ?

-হ্যাঁ। Divide and„

তিনি থেমে গেলেন। জানালার বাইরে তাকিয়ে বললেন-

-মানুষ যা দেখে তা বাস্তব নয়। মানুষের মাথা যা পুনর্গঠন করে সেটাই বাস্তব।

-লাবণ্য কাশি? - খুন্টি।

-ওটা দৃশ্য।

-আপনার নীরবতা?

-ওটা বাস্তব।

খুন্টি দীর্ঘক্ষণ চুপ। ভয় হালকা করে ধুপধাপ শব্দ করল- যেন ট্রাঙ্কের ওপর বিড়াল লাফ দিচ্ছে।

Divide and Recombine: রাতের ল্যাবরেটরি

রাত নেমেছে। ল্যান্সডাউন রোডের বুকে, জ্যামিতিক আলো-ছায়ার খেলায়, জীবনানন্দ দাঁড়িয়ে আছেন জানালার পাশে, চোখে শতাব্দীর নীল অন্ধকার, বুকের মধ্যে অস্থির বাতাস। বাইরে ট্রামের ধাতব ঝংকার ভেসে আসে, দূরের। কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার খুন্টি। খুন্টি, যে স্থিরভাবে বসে আছে, ঘরে অর্ধেক আলো। চোখে অদৃশ্য শ্বাসের রেখা। এই রেখা মিলিত হতে চায় জীবনানন্দের ধূসর পা-ুলিপির সঙ্গে।

-দাদা, -খুন্টি কণ্ঠ চেপে বলল-

-আপনি কেন পাশে যাচ্ছেন না? লাবণ্য তো কাশি করছে, কফ-ভরা, জল ঢালা, scandalously„

জীবনানন্দের চোখ কাঁচের ভাপে আচ্ছন্ন।

-আমি দাঁড়াতে চাই না... যদি দাঁড়াই, আমি ভেঙে পড়ব। আর ভেঙে পড়লে লেখা থেমে যাবে। লিখতে না পারলে বাঁচবই বা কীভাবে?

খুন্টি কিছুটা অবাক, কিছুটা কাঁপছে।

-অথচ, অন্তত আমি উঠতে পারতাম, -সে বলল।

জীবনানন্দ থামলেন, ভেতরের অন্ধকারে হাত চালালেন।

-তুমি আমার পুনর্গঠনের অক্ষ, খুন্টি। I divide myself around you.

খুন্টি ভাবতে চাইল-কবি ভালোবাসেন না, ভালোবাসতে জানে না, তিনি মানুষের সঙ্গে যুক্ত নন; বরং তাঁর কাছে মানুষের তথ্য, শব্দ, রূপ- সবই এক ধরনের জ্যামিতিক নিরীক্ষণ। বেবি? মামাতো বোন? অতীতের এক দিগন্তে। খুন্টি? বর্তমানের মাপজোখ। লাবণ্য? ক্লেদ ও নিরাশার স্থায়ী জায়গা।

রাতের ঘরে জীবনের সমস্ত অক্ষ ভেসে ওঠে। বাইপোলার ডিজঅর্ডারের প্রকাশ, যেন ধূসর ট্রাঙ্কের ভিতরে অক্ষরের কম্পন। কবি দু’হাতে কলম নিয়ে লেখেন-একটি পাতায় লাবণ্য, অন্যটিতে খুন্টি, মাঝখানে বেবি। বাক্য সৃষ্টি হতে থাকে, বাক্য নষ্ট হতে থাকে, বাক্য পুনর্গঠিত হতে থাকে। রবীন্দ্রনাথ হলে বাক্য বিন্যাসের ওপর চমৎকার প্রতিকৃতি আঁকতেন কোন নারীর, এবং তা ধ্রুপদী চিত্রকলা হত।

-উ্জ? -খুন্টি হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।

-উরারফব ধহফ জবপড়সনরহব, -জীবনানন্দ ঠা-া কণ্ঠে বললেন।

-আর তুমি? তুমি কি বুঝছো?

-হ্যাঁ, -খুন্টি বলল, - তুমি নিজেকেই গিনিপিগ বানাচ্ছো।

কবি হেসে বললেন:

-তুমি জানো না। লেখক, শিল্পী, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী- সবই তত্ত্ব, তথ্য, সংযোগ। আমি সেই তথ্য নিয়ে নিজেকে তৈরি করি। আবার ভাঙি। আবার লিখি। কবিতা, গল্প, উপন্যাস- সবই ধূসর পা-ুলিপি, ঢুকে ট্রাঙ্কের মধ্যে।

ঘরের মধ্যে লাবণ্য কাশি করছে। কফ-ভরা, জল ঢেলে, যেন বস্তুবাদী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। কবি উঠছেন না। শোনে, মনোযোগ দেয়, কিন্তু কিছু করে না। এই যন্ত্রণা, এই অসহায়তা, তাঁর লিখনের উপাদান। খুন্টি ভাবছে- এ কি প্রেম, নাকি পরীক্ষা?

- আপনি কি মানুষকে ভালোবাসেন, নাকি মানুষকে কাগজে বন্দি করেন? - খুন্টি জিজ্ঞেস করল।

জীবনানন্দ জানালার কাঁচে আঙুল দিয়ে লিখলেন:

- মানুষকে কখনো পূর্ণভাবে ভালোবাসা যায় না। ঘটনা, রূপ, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমা- এই তিনটাই সত্য।

কিছুক্ষণ চুপচাপ। ঘরের বেজে ওঠা ঘড়ির টিকটিক, লাবণ্য কাশি, ট্রামের দূরের ঝংকার- সব মিলিয়ে একটি মহাজ্যামিতিক সঙ্গীত। কবি আবার লিখলেন-

“তুমি এলে- সময়ের ঢের আয়ু শেষ ক’রে

তবে এখনো প্রদীপ জ্বলে এ রকম স্থির অনুভবে

তোমার শরীর আজো সুশ্রী নম্র- তবুও হৃদয়

সেই স্নিগ্ধ শরীরের সতীনের মত কাটা নয়?

দুরু দুরু হৃদয়ের বিস্ময়ে ব্যথায়

এ কথা যদি ভাবি তবু সে ব্যথার চেয়ে আরেক শক্তির বেশি দাবি

সেই স্বাদ তুমি- আমাদের চোখে এসেছিলে ব’লে

পৃথিবীকে ভালো ক’রে পাই আমি- এ পৃথিবী ভালো লাগে।”

খুন্টি ভাবল- এই কবির হৃদয়, এই অদ্ভুত শৃঙ্খলা, এ কি সত্যিই জীবনের অংশ, নাকি কেবল লেখার জন্য ব্যবহৃত ল্যাবরেটরি?

রাত গভীর হচ্ছে। লাবণ্য কাশি থামছে না। কবি তখনও লিখছেন। দু হাতে। দু দিক। শব্দ জন্মাচ্ছে, শব্দ নষ্ট হচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। D&R ïay shorthand নয়- এটা তাঁর অস্তিত্বের প্রতিফলন। Divide- নিজেকে ভাঙা, Recombine- নিজেকে পুনর্গঠন।

-আপনি কি কখনও ভেবে দেখেছেন,- খুন্টি বলল- আপনার জীবন কি কেবল এক বিশাল পরীক্ষা?

-হ্যাঁ,- জীবনানন্দ বললেন- এই পরীক্ষা ছাড়া আমি বাঁচি কী করে বল? প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি অক্ষর, প্রতিটি ঘটনা- সবই পরীক্ষা। আর তুমি, খুন্টি, সেই পরীক্ষার অংশ।

কিছুক্ষণ চুপ। ঘরে কেবল লাবণ্য কাশি, বাইরের ট্রামের দূরবর্তী ঝংকার। খুন্টি বুঝতে পারছে- কবি মানুষকে ভালোবাসেন না, ভালোবাসেন নিজের সৃষ্ট চরিত্র,আত্মমনীষা, মনীষার আলো। কিন্তু এসবের মধ্যেই রয়েছে তাঁর আবেগের পুরো ভা-ার।

ঘরে আরও একটি ধূসর ছায়া ভেসে আসে- বেবি। অতীত। খুন্টি চোখ বুলিয়ে দেখে- অন্তর্গত স্মৃতি। কবি মনে করেন- ভবিষ্যৎও এই ট্রাঙ্কে ঢুকে থাকবে। ধূসর পাণ্ডুলিপি। কালো ট্রাঙ্ক।

রাতের শেষে, কবি লিখে ফেললেন:

“Recombine the ruins, if only to stay alive.”

ঘরের মধ্যে এক অদ্ভুত শান্তি, এক অদৃশ্য ঝড়, যা বাইপোলার ডিজঅর্ডারের প্রকাশ, জীবনের অসহায়তা, লাবণ্য কাশি, খুন্টির দ্বিধা- সব মিলিয়ে এক ভৌতিক, অথচ অমোঘ রহস্যময় ক্যানভাস তৈরি করেছে।

রাতের ট্রাম, ভাঙা অক্ষর, ধূসর ট্রাঙ্কের আড়াল রাত গভীর, ল্যান্সডাউনের বাতাসে আড়াই মিনিটের ফাঁকে ট্রামের দূরের ঝংকার। জীবনানন্দ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ অন্ধকারে ডুবে, হাত আঙুলের ছাপ কাঁচে মেখে লিখছে- D & R„ Divide and Recombine„ শব্দগুলো যেন কেবল ল্যাবরেটরির shorthand নয়, বরং ভেতরের একটি ঝড়ের নাম। খুন্টি ঘরের অন্যপ্রান্তে বসে, চোখে অন্ধকার, বুকের ভেতর অদ্ভুত চাপ।

- দাদা,- খুন্টি কণ্ঠ কেঁপে বলল-

- আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আপনার এই অসহায় ভাঙন, এই কাশি, লাবণ্যদির ক্লেদ...- আপনি কি পাশে দাঁড়াবেন না, নাকি দাঁড়ানোর ইচ্ছে নেই?

জীবনানন্দ ভূপাতিত একটি হাসি দিলেন। কবি নজরুল হলে ঠিক উল্টোটি করতেন। সেটি জীবনানন্দও জানেন। নজরুলকে এক পাশে রেখে জীবনানন্দ বলেন:

- আমি পাশে দাঁড়াতে জানি না। যদি দাঁড়াতে যাই, আমি ভেঙে পড়ব। আর ভেঙে পড়লে লেখা বন্ধ হয়ে যাবে। লিখতে না পারলে- বাঁচবই বা কীভাবে?

বাইরে ট্রামের ঝংকার কাছে আসছে, যেন একটি ধাতব দীর্ঘশ্বাস। অদৃশ্য ভবিষ্যৎ আসে কবিকে তুলে নিতে। তিনি সেই শব্দ শুনতে পাচ্ছেন, কিন্তু কেউ আর দেখতে পাচ্ছে না। লাবণ্যদির কাশি যেন বস্তুবাদী মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে- scandalously, suffocating।

খুন্টি মনে মনে জানল- কবি মানুষকে ভালোবাসেন না। তিনি মানুষের মুখ,হাসি, বিষাদ ও ঘটনা- সবই সংগ্রহ করেন। Divide and Recombine- নিজেকে ভাঙা, পুনর্গঠন, একই সাথে সমস্ত অক্ষরে লিখন।

বেবির স্মৃতি ভেসে আসে। অতীতের ছোট্ট দিগন্ত। খুন্টি মনে মনে ভাবে- কবি কি সত্যিই প্রেমিক? নাকি প্রেমও শুধুই পরীক্ষা?

- আপনি কি মানুষকে ভালোবাসেন, নাকি লেখায় বন্দি করেন?- খুন্টি জিজ্ঞেস করল।

জীবনানন্দ আঙুল দিয়ে জানালার কাঁচে লিখলেন:

- মানুষকে কখনো পূর্ণভাবে ভালোবাসা যায় না। ঘটনা, রূপ, অক্ষাংশ-দ্রাঘিমা- এই তিনটাই সত্য। এই তিনটাই চূড়ান্ত নিয়তি।

হঠাৎ, দূর থেকে ট্রামের আকস্মিক খসখস শব্দ- অদ্ভুতভাবে আরও কাছে। জীবনানন্দ থমকে দাঁড়ালেন। কণ্ঠে শুধু নিজেকেই বললেন-

- একদিন এই শব্দ আমাকে শূন্যে নিক্ষেপ করবে।

খুন্টি চোখ বড় করে দেখল। ভয়ের সঙ্গে মুগ্ধতা। মনে হলো- কবি সম্পূর্ণ ভাঙছে। বাইপোলার ডিজঅর্ডারের ঝড়, লাবণ্য কাশি, অতীতের স্মৃতি, খুন্টির দ্বিধা- সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত চাপ।

-দাদা,- খুন্টি কণ্ঠ চেপে বলল-

- আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আপনার মৃত্যু, আপনার এই ভাঙন...- আমার উপর কি প্রভাব ফেলবে?

জীবনানন্দ ধীরে ধীরে ফিরে তাকালেন, চোখে অন্ধকার, মুখে অদ্ভুত নিঃশ্বাস-

- তুমি আমার পুনর্গঠনের অক্ষ। তুমি না থাকলে আমি বাঁচতে পারব না। Divide„ Recombine„

ঘরে অদৃশ্য ভাঙা অক্ষর। শব্দ জন্মাচ্ছে, শব্দ নষ্ট হচ্ছে, আবার ফিরে আসছে। খুন্টি বুঝতে লাগল- কবি মানুষকে নয়, শব্দকে বাঁচাতে চান, সৃষ্টিকে আগলে রাখতে চান। লাবণ্যদির ক্লেদ, কাশি, রাতের দৃশ্য- সবই লেখার অনুষঙ্গ করতে চান।

হঠাৎ ট্রামের শব্দ। খুন্টি কেঁপে উঠল।

- দাদা, এটা কি... দুর্ঘটনার আভাস?

জীবনানন্দ মাথা নত করে বললেন-

- হ্যাঁ, ট্রাম আসছে, কিন্তু শুধু শোন। তোমার কাজ, খুন্টি, শুধু শোনা। আমি লিখব।

লাবণ্য দাশ চুপচাপ, নীরব। অসহায়। তার জীবন যেন শুধুই ট্র্যাজেডি। খুন্টি বুঝল- কবি পাশের মানুষ নয়; পার্শ্ববর্তী প্রয়োজনীয়তা শুধু।

রাতের মধ্যে জীবনানন্দ দু’হাতে কলম নিয়ে লিখছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ক্ষেত্রবিশেষে প্রবন্ধ ও ডায়েরি- সবই ধূসর ট্রাঙ্কে ঢুকে যাচ্ছে। কালো ট্রাঙ্ক, যা পরে ভূমেন্দ্র গুহ আবিষ্কার করবেন। ভাঙা অক্ষর, ধূসর পাতাগুলো, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের প্রকাশ- সব মিলিয়ে এক মহাকাব্য।

- দাদা, আমি কিৃ? - খুন্টি কণ্ঠ কমিয়ে বলল।

জীবনানন্দ হেসে বললেন:

- তুমি জানো না, না জানিলে, তবু বলি- তুমি শুধু আমার স্থানাংক। তোমাকে দিয়ে আমি নিজেকে মাপি। কোথায় দাঁড়াই- মানুষের সাথে নাকি আমার নিজস্ব অন্ধকারে। সেইসব অন্ধকারের ভেতর দৌড়ে যায় একটি ইঁদুর, রক্তফেনামাখা মুখে মড়কের ইঁদুর।

ঘরের মধ্যে শান্তি, অদৃশ্য ঝড়, লাবণ্য কাশি, ট্রামের দূরবর্তী শব্দ- সব মিলিয়ে শতাব্দীর গভীর নীল অন্ধকার। খুন্টি মনে করল- লেখার জন্য সমস্ত ব্যথাই উপাদান।

রাত গভীর, ঘর শান্ত। শুধু জীবনানন্দের দু’হাতে কলমের শব্দ। ধূসর ট্রাঙ্ক, অক্ষরের কম্পন, সৃজনের জন্ম-মরণ।

- Recombine the ruins, if only to stay alive, - জীবনানন্দ লিখলেন।

খুন্টি চুপ। বাইরে ট্রামের দীর্ঘশ্বাস। বেবি দূরের অতীত। লাবণ্য নীরব। সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত, ভাঙা, কিন্তু সম্পূর্ণ জীবনানন্দ দাশের বিশ্ব।

ট্রাম, ট্রাঙ্ক, মৃত্যু এবং ধূসর সমাপ্তি

রাত গভীর, ল্যান্সডাউনের বাতাসে ট্রামের ধাতব দীর্ঘশ্বাস যেন প্রতিটি ঘরের দেয়াল ভেদ করে। জীবনানন্দ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছেন, চোখে অন্ধকার, হাতে কলম। D & RÑ Divide and Recombine। শব্দগুলো শুধু shorthand নয়; ভেতরের একটি ঝড়, বাইপোলার ডিজঅর্ডারের প্রকাশ, একটি জীবন্ত পরীক্ষাগার।

- দাদা, -খুন্টি কণ্ঠ কেঁপে উঠল-

- আপনি কি জানেন, ট্রামের সেই হঠাৎ শব্দ কি দুর্ঘটনার পূর্বাভাস?

জীবনানন্দ থমকে দাঁড়িয়ে আছেন। অদ্ভুত নিঃশ্বাস। তিনি জানেন- এই ট্রাম শুধু ধাতু নয়, এটা ভেতরের অক্ষর, অপ্রকাশিত কবিতা, অনির্বচনীয় উপন্যাস।

- হ্যাঁ, খুন্টি,- তিনি বললেন, চোখে কাঁচের নীরবতা-

- এটা আসলে মৃত্যু নিজেই।

লাবণ্যদির কাশি ক্রমশ বাড়ছে। রাতের অন্ধকারে বারান্দার লোহার রডে হাত রেখে তিনি ঢেউ খেলছেন- scandalously, suffocating। জীবনানন্দ কিছুই করেন না। পাশে দাঁড়ালে ভেঙে পড়বেন। লেখা বন্ধ হলে- বাঁচা সম্ভব নয়।

খুন্টি কণ্ঠ স্বরে কেঁপে বলল-

- দাদা, আমি কি কেবল আপনার স্থানাংক? আমি কি শুধুই আপনার পুনর্গঠনের অক্ষ?

জীবনানন্দ ধীরে ধীরে তাকালেন, চোখে অদ্ভুত নীরবতা।

- হ্যাঁ, খুন্টি। তুমি ছাড়া আমার প্রকাশ নেই। তোমাকে দিয়ে আমি নিজেকে মাপি। যেখানে দাঁড়াই- মানুষের সাথে নয়, নিজের অন্ধকারে।

ঘরে অদ্ভুত চাপ। বাইপোলার ডিজঅর্ডারের ঝড়, অতীতের বেবি, লাবণ্যদির নীরব ক্লেদ, খুন্টির দ্বিধা- সব মিলিয়ে এক তীব্র, ঠাস, বহুদূর বিস্তৃত অনুভূতি।

সেখানে হঠাৎ ট্রামের ধাতব চাকা যেন ঘরের মেঝে ছুঁয়ে গেছে। জীবনানন্দ থমকে দাঁড়ালেন। খুন্টি কেঁপে ওঠে।

- দাদা, আসলেই কি ট্রাম...?

- হ্যাঁ, -জীবনানন্দ বললেন-

- ভবিষ্যৎ এসে ধরে নেবে আমাকে। কিন্তু লিখতে হবে, খুন্টি। লিখতে না পারলে বাঁচা যায় না।

লাবণ্যদির কাশি রাতের ভেতরে মিলিয়ে গেলো, যেন ধাতব অনুনাদ। জীবনানন্দ দু’হাতে কলম নিয়ে লিখছেন। কবিতা, গল্প, উপন্যাস- সবই ধূসর ট্রাঙ্কে ঢুকে যাচ্ছে। সেই ট্রাঙ্ক, যা পরে ভূমেন্দ্র গুহ আবিষ্কার করবেন। কালো, ধূসর, শব্দে ভরা।

- দাদা, - খুন্টি কণ্ঠ চেপে বলল-

- আপনি কি কখনও ভেবেছেন, আপনার মৃত্যু?

জীবনানন্দ হেসে বললেন-

- তুমি জানো না। তুমি শুধু আমার স্থানাংক।

বাইরে ট্রামের ঝংকার। হঠাৎ, ট্রাম আচমকা ভাঙে। ধাতব চাকা ঘরে ঢুকে পড়ে। জীবনানন্দ, অক্ষরের কম্পনে মোড়া কলম হাতে, হঠাৎ মাটিতে পড়লেন। চোখ বন্ধ, নিঃশ্বাস থেমে যায়। খুন্টি ছুটে গেল, লাবণ্য চুপচাপ।

কিছুক্ষণের মধ্যে জীবনানন্দ দাশ পৃথিবী থেকে বিলীন। কলম হাতে মৃত, ঘর শান্ত, ধূসর ট্রাঙ্কের ভিতর সব লেখা, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, ডায়েরি- অপ্রকাশিত, কিন্তু জীবন্ত।

তিন বছর পরে, ভূমেন্দ্র গুহ সেই ট্রাঙ্ক খোলেন। ধূসর পাণ্ডুলিপি, ভাঙা অক্ষর, রঙ-ছাপহীন কবিতা। জীবনানন্দের সমস্ত ভাঙা, সমস্ত Divide and Recombine, সমস্ত বেদনা- সব একসাথে, এক স্থানে।

কলকাতার রাস্তায় মানুষ নির্বিকার জীবন যাপন করছে। ট্রামের ধাতব চাকা, দূরের ঝংকার- সবই তাদের কানে বাজছে, কিন্তু তারা কিছু বুঝে উঠতে পারছে না। জীবনানন্দের বিশ্ব শেষ হয়েছে, কিন্তু তার লেখা, তার সৃষ্টি, তার ভাঙা অক্ষ- এখনও ট্রাঙ্কে, শব্দের কারুকাজে, খুন্টির মনে।

খুন্টি, লাবণ্য, বেবি- সবাই স্থির। স্থিরতা নয়, বরং সময়ের ঝরে মলিন। জীবনানন্দের বাইপোলার ডিজঅর্ডার, ভাঙা অনুভূতি, প্রেম, লালন, নীরবতা- সব মিলিয়ে ধূসর ট্রাঙ্কের ভিতরে জীবিত।

পেশষ লাইন, জীবনানন্দ নিজে লিখেছেন ডায়েরিতে:

“Recombine the ruins, if only to stay alive. Divide and Recombine. Divide and Recombine. Life, death, words—the only constants.”

ঘর শান্ত। দূর থেকে ট্রামের ধাতব দীর্ঘশ্বাস ভেসে আসছে। খুন্টি জানল- কবি মৃত।

সম্প্রতি