image

ময়ুখ চৌধুরীর মু-হীন চরণেরা

অমিত মামুন

বাংলা ভাষায় কবিতা নির্মাণের এক নিখুঁত কারিগর ময়ুখ চৌধুরী। তিনি কর্মের মধ্য ?দিয়েই নিজের পরিচিতিকে প্রসারিত করেছেন, কিন্তু প্রচারের আলো থেকে দূরে থেকেছেন। সম্পদ ও খ্যাতির মোহ কখনোই তাঁকে আচ্ছন্ন করতে পারেনি। স্বভাবতই তিনি ভাবনার জগতে, আপন খেয়ালের স্রোতে বিচরণ করছেন। এই প্রেক্ষিতেই ড. মনিরুজ্জামান কবি সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন-

‘কবিমেলায় বা ভিড়ে নিরন্তর অনুপস্থিত থেকে ময়ুখ হয়ে উঠেছে নির্জনস্বভাবী এবং সেভাবেই নিজেকে গড়ে তুলেছেন স্বরাট অবয়বে...।’

কবি ময়ুখ চৌধুরী ত্রিশের দশকের কবিদের প্রধান উত্তরাধিকারী। সময়ের বিচারে তিনি গত শতকের সত্তরের দশকের কবি। প্রায় পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি নীরবে বাংলা সাহিত্যকে আলোর স্পর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। ময়ুখ চৌধুরী প্রধানত কবি হলেও শিশুদের জন্য সাহিত্য রচনা এবং সমালোচনাগ্রন্থে তাঁর বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর সুস্পষ্ট। তাঁর কাব্যে উপকরণ হিসেবে এসেছে- সমকালীন সমাজবাস্তবতা, ধর্ম ও রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা, মৃত্যুচেতনা এবং পরাবাস্তববাদ; যা তাঁর লেখাকে সময়োপযোগী ও তরুণ পাঠকের কাছে গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে।

২০২০ সালে প্রকাশিত ময়ুখ চৌধুরীর দশম কাব্যগ্রন্থ ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মু-ুহীন’। বাতিঘরের সহযোগী প্রতিষ্ঠান কবিতাভবন থেকে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। কবির প্রকাশনীতির মূল ভাবনা হলো- যত লেখা হবে, তার তুলনায় অল্পসংখ্যক ছাপা হবে। ফলে প্রথম কাব্যগ্রন্থ থেকে দশম কাব্যগ্রন্থ রচনা পর্যন্ত কবির সময় লেগেছে দীর্ঘ ৩১ বছর। কারণ তিনি যতটা না প্রকাশ করেছেন, তার চেয়েও বেশি সংযমে থেকেছেন- যা বিশুদ্ধ কবির পরিচয় বহন করে। এই কাব্যে কবি বিষয় হিসেবে এনেছেন- শুদ্ধ কবিদের পথচলা, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, রোহিঙ্গা সংকট, ইতিহাস ও ঐতিহ্যচেতনা, প্রেম এবং পরাবাস্তবতা প্রভৃতি।

‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মু-ুহীন’ শিরোনামটি পাঠকের মনে রহস্যের মায়াজাল সৃষ্টি করে; চোখের সামনে ভেসে ওঠে মাথাবিহীন কারও হেঁটে চলার কল্পচিত্র। তবে কাব্যের শুরুতেই কবি বিষয়টি পরিষ্কার করে দেন-

‘মাথা বিক্রি করে যারা মুকুট কিনেছে

এ চরণ তাদের চরণ নয়।’

অর্থাৎ কবি এখানে তাঁদের কথাই বলেছেন, যারা সম্পদ ও খ্যাতির মোহের কাছে মাথা নত না করে নীরবে শ্রম ও ঘামের মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করে চলেছেন।

বর্তমান বিশ্বেক্ষমতার দ্বন্দ্ব, ধর্ম ও বিশ্বরাজনীতি রূপ এই কাব্যে স্পষ্ট। মধ্যপ্রাচ্যসহ নানা দেশে বোমার আঘাতে প্রতিনিয়ত প্রাণ হারাচ্ছে শিশু, কিশোর ও বৃদ্ধ। তাইতো ‘হে ধর্ম, হে রাজনীতি’ কবিতায় কবির প্রশ্ন-

‘বিশ্ব মানচিত্র জুড়ে অনায়াসলভ্য কেন লাশ

প্রেমের সম্পর্কেকেন সুতানালী সাপের বিন্যাস?’

বাংলাদেশের ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ এক গৌরবময় অধ্যায়। এই যুদ্ধের মাধ্যমেই অর্জিত হয়েছে লাল-সবুজের স্বাধীন বাংলাদেশ। সদ্য স্বাধীন দেশের অবয়ব ফুটে উঠেছে তাঁর ‘কবিতা: ১৯৭১’ কবিতায়-

‘প্রচ- দহনদীপ্ত পশ্চিমের সূর্য ডুবে গেলে,

বঙ্গোপসাগর থেকে এইমাত্র স্নান সেরে উড়াল দিয়েছে এক পাখি-

সবুজে ও লালে মেশা বিজয় পতাকা।’

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে পুরান ঢাকায় বিশ্বজিৎ দাশ হত্যাকা- (৯ ডিসেম্বর ২০১২) এক মর্মান্তিক অধ্যায়। কবির ‘দর্জির ছেলের মৃত্যু’ ও ‘বাড়িফেরা’ কবিতায় এই ঘটনা মানবিক বেদনায় প্রকাশ পেয়েছে-

‘তুমি সেলাই করেছিলে আমাদের জামা,

আমরাও সেলাইয়ের ব্যবস্থা করে দিয়েছি ময়নাতদন্তে।

উপায় ছিল না বলে

অন্তিম পোশাকটুকু সেলাই করে দিতে পারিনি- এই যা।’

বাংলা সাহিত্যে ঐতিহ্যসচেতন কবিদের মধ্যে ময়ুখ চৌধুরী অন্যতম। ‘কার্পাসের ফল’ কবিতায় তাঁর ঐতিহ্যচেতনার পরিচয় মেলে-

‘সব দোষ তোমাদের পূর্বপুরুষের,

কার্পাসের ফল যারা নগ্ন করেছিল

বিবরে লুকিয়ে থাকা শাদা লজ্জাটুকু

টেনে টেনে বের করেছিল।’

আরাকান রাজ্য থেকে বিতারিত জনগোষ্ঠী রোহিঙ্গারা বেঁচে থাকার তাগিদে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। তাদের মানবেতর জীবনযাপন ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ রাজনীতি-সচেতন কবির দৃষ্টি এড়ায়নি। তাই ‘ভাতের থালার পাশে’ কবিতায় কবি বলেন-

‘পারি না সমুদ্র কিনতে

আমি তাই নুন কিনে আনি।

ভাতের পাশেই রাখি সমুদ্রের শাদা মৃতদেহ।’

কবি ময়ুখ চৌধুরী প্রেমিক কবি। প্রেমের অপ্রাপ্তিই তাঁর কাব্যচেতনাকে গভীরতা দিয়েছে। আশ্চর্যের বিষয়, ব্যক্তিজীবনে প্রেমের প্রাপ্তি না থাকলেও তাঁর প্রেম দেহাতীত রূপ লাভ করেছে। ‘প্রেমের কবিতা’য় তিনি লেখেন-

‘আমি তাই অন্ধকারে জোনাকির মতো

প্রেমিকাবিহীন প্রেম খুঁজি।’

পরাবাস্তববাদ তাঁর কাব্যের অন্যতম চালিকাশক্তি। ‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন’ নামকবিতায় তা আরও স্পষ্ট-

‘আমার খারাপ লাগে আমি রোদ পোহাই, অথচ আমার ছায়া তা পারে না।

আজ, জানলা দিয়ে স্পষ্টদেখলাম: আমার নিঃসঙ্গ ছায়াটা একা একা রোদ পোহাচ্ছে। এবং আমি নেই।’

মোম, কাঁচি, সুঁই, সুতো- এইসব শব্দ রূপক ও প্রতীকে রূপান্তরিত হয়ে কাব্যের নান্দনিকতাকে বহুগুণে বৃদ্ধি করেছে।

‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন’ মূলত গদ্যছন্দে রচিত কাব্যগ্রন্থ। কবি নিজেই বলেছেন-

‘চরণেরা হেঁটে যাচ্ছে মুণ্ডুহীন এটি গদ্য কবিতার বই।’

ময়ুখ চৌধুরী একটি আদর্শের নাম। তিনি মুকুটের জন্য লোভ করে কখনো নিজের মাথা বিক্রি করেননি। দীর্ঘ সাহিত্যযাত্রায় বড় ধরনের কোনো পদক না পেলেও তাঁর কাব্যের সততা, নান্দনিকতা ও গভীর বোধ তাঁকে সচেতন পাঠকের হৃদয়ে উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত করবে- এ বিষয়ে কোনো সংশয় নেই।

সম্প্রতি