image

ঐতিহ্যের ধারক লোকজ নকশা

নাজমুল হুসাইন বিদ্যুৎ

বংশানুক্রমিকভাবে মানুষ তার ঐতিহ্য ধারণ করে চলতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকে। যুগে যুগে ইতিহাস-ঐতিহ্য, জীবন-দর্শন, স্মৃতিচিহ্ন রক্ষাসহ সৌন্দর্য বর্ধনের তাড়নায় প্রতিনিয়তই যেমন বিভিন্ন সামগ্রী সংগ্রহে রেখে যাচ্ছে, জাদুঘর বানাচ্ছে তেমনি মানসপটে সচল রাখার জন্য ব্যবহার্য বিভিন্ন পণ্যসামগ্রীতেও সেগুলোর নকশা এঁকে রাখছে। মূলত অঞ্চলভিত্তিক লোকজ নকশার মাধ্যমে সেসব এলাকার মানুষের অভিরুচি, জীবনাচরণ এবং জীবনের গল্প খুঁজে পাওয়া যায়, এজন্য লোকজ নকশার মাধ্যমে ফুটে ওঠে ইতিহাস ঐতিহ্য। বর্তমানে অনেক লোকজ উপাদান হারিয়ে যাবার পথে। তাই লোকজ নকশার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতেই বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশ হয়েছে জহুরা খাতুনের গবেষণাধর্মী বই ‘নিত্যব্যবহার্য পন্যসামগ্রীতে লোকজ নকশা’। লেখক চারটি অধ্যায়ের মাধ্যমে বইয়ে লোকজ নকশার ব্যবহার সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, যেমন- বাংলাদেশের অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী নিত্যপণ্য, বাংলাদেশের লোকশিল্পে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য মোটিফের সংজ্ঞা ও পরিচয়, বাংলাদেশের নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীর পরিচয় এবং ব্যবহারিক পণ্যে লোকজ নকশায় মোটিফ ও নান্দনিকতা।

‘অঞ্চলভিত্তিক ঐতিহ্যবাহী নিত্যপণ্য’ অধ্যায়ে লেখক লিখেছেন, ‘ঐতিহ্যবাহী কাঁসা ও পিতলের সামগ্রী সবসময়ই খুব আকর্ষণীয়।... এই সামগ্রী শুধু আমাদের দেশেই নয়, বিদেশি ক্রেতাদের কাছেও ছিল বিশেষ চাহিদা।... হাঁড়ি-পাতিল, গ্লাস, মগ, থালা-বাটি, চামচ, কলস, জগ, সিঁদুর কৌটা, পানের বাটা, বদনা, গহনা, বিভিন্ন ধরনের শোপিস, দেব-দেবী ও জীবজন্তুর মূর্তি, খেলনা প্রভৃতি ধামরাইয়ের কাঁসা ও পিতলের সামগ্রীর মধ্যে অন্যতম।’ এই অধ্যায়ে বইটিতে ঢাকা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা, রাজশাহী এবং চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার লোকশিল্প সামগ্রী নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে।

‘লোকশিল্পে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য মোটিফের সংজ্ঞা ও পরিচয়’ অধ্যায়ে লোকজ মোটিফের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। প্রাণী সম্পর্কিত মোটিফ, ফুল লতাপাতা সম্পর্কিত মোটিফ, জ্যামিতিক মোটিফ ও অন্যান্য মোটিফসহ লোকজ নকশায় মোটিফের ব্যবহার উদাহরণসহ এই বইয়ে উল্লেখ রয়েছে। নিত্যব্যবহার্য পণসামগ্রীতে লোকজ নকশা বইয়ের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় লোকজ পণ্য এবং তার ব্যবহারসহ লোকজ নকশার বর্ণনা করা হয়েছে, এ কারণে বইটি সকল পাঠকের জন্য হয়ে উঠেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাকর্ম।

লেখক ‘নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীর পরিচয়’ অধ্যায়ে সাবলীলভাবে পণ্যসামগ্রীর বিবরণ ছবিসহ এর ঐতিহ্য তুলে ধরেছেন। বর্ণনামূলক তথ্য সংবলিত লেখায় তিনি নারীদের ব্যবহৃত পোশাক যথা-শাড়ি, সালোয়ার-কামিজ, ওড়না, ফতুয়া, পাঞ্জাবি, ঘাগরা, পালাজো-প্যান্ট এবং বোরকা-হিজাবের কথা যেমন বলেছেন তেমন পুরুষদের ব্যবহৃত পোশাক পাঞ্জাবি-পাজামা, শার্ট-প্যান্ট, টুপি ও পাগড়ি, ধুতি ও লুঙ্গিসহ গহনাশিল্প, মৃৎশিল্প, কাঁসা-পিতল শিল্পেরও সংক্ষিপ্ত বিবরণ দিয়েছেন।

‘লোকজ নকশায় মোটিফ ও নান্দনিকতা’ অধ্যায়ে ব্যবহার্য পণ্যে নকশার সৌন্দর্যের বিকাশে মোটিফের গুরুত্ব বোঝাতে সময়ে সময়ে এর ধারণাগত পরিবর্তন ও সময়পযোগী বিন্যাসের কথাও লেখক এই বইয়ে সুন্দরভাবে উপস্থাপন করা করেছেন, যেমন-খোঁপার কাঁটা বিষয়ে বর্ণনা করেছেন এভাবে, ‘‘মাথার চুল ও চুলের খোঁপায় অলংকার পরা নারীদের পুরোনো অভ্যাস। মাথার খোঁপায় এক ধরনের পিন বা কাঁটা ব্যবহার করা হয়। এই কাঁটা অনেক ভাবেই তৈরি করা যায়। এখানে যে খোঁপার কাঁটা নিয়ে আলোচনা করা হচ্ছে তা মূলত রূপার তৈরি। এই কাঁটার মোটিফটি ফুলের আদলে করা। বড় গোল আকৃতির এই খোঁপার কাঁটাটির মাঝে একটি বড় ফুল এবং চারদিকে চারটি ছোট ফুল দেওয়া আছে। নিচের দিকে ছোট-বড় কিছু চেইন ঝুলানো ও সঙ্গে ছোট ছোট বল সংযুক্ত আছে।”

পরিশেষে বলা যায়- বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত ‘নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীতে লোকজ নকশা’ বইটি গবেষকদের জন্য যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি সাধারণ পাঠকদের জন্যও লোকজ সামগ্রী সম্পর্কে জানা এবং লোকজ নকশায় মোটিফের ব্যবহার ও এর নান্দনিকতা বিষয়ে সহজ ও বোধগম্য একটি পাঠ্য হবে এই বই।

নিত্যব্যবহার্য পণ্যসামগ্রীতে লোকজ নকশা। লেখক : জহুরা খাতুন। প্রচ্ছদ : তারিক ফেরদৌস খান। প্রকাশক : বাংলা একাডেমি।

মূল্য : ৪৪০ টাকা, পৃষ্ঠা : ২৩২।

সম্প্রতি