ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-২৯
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
অনেকদিন পর শহর ছেড়ে গ্রামের পথে চললাম। ধীরে ধীরে মাদ্রিদের স্কাইলাইন অস্পষ্ট হয়ে আসছে। দেখা যাচ্ছে দুপাশে খোলা প্রান্তর, মাঝে মাঝে জলপাই ও কাঠবাদামের কুঞ্জ। এরপর পাইন ও ওক গাছের সারি, মাঝে শুকনো ঘাসের সোনালি চত্বর। মেসেতা সেন্ত্রাল নামের এক মালভূমির ওপর দিয়ে আমরা যাচ্ছি।
গাইড সবাইকে বুয়েনস দিয়াস বলে স্বাগত জানাতেই তার দিকে তাকালাম, বাসের জানালা দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখায় বিরতি ঘটল। তার নাম বেলা পর্তিও, মাদ্রিদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। বলল, তোমরা এখন ছবি তুলতে পার, অসুবিধে নেই, তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই বাস পৌঁছে যাবে মিরাদার দে ভাইয়ে- এক ভিউ পয়েন্ট, যেখান থেকে সবকিছু খুব ভালো দেখা যায়।’
এত তাড়াতাড়ি যে গন্তব্যে পৌঁছে যাব ভাবতে পারিনি। মাদ্রিদ থেকে মাত্র ৪০ মিনিট আগে বাস ছেড়েছিল। একটু পরেই বেলা বলল, ‘মিরাদার দে ভাইয়ে আসলাম। এটি একটি ভিউ পয়েন্ট, এখানে আমরা ২০ মিনিট থাকব। এখান থেকে মাত্র ৩ কিলোমিটার দুরেই তোলেদো শহর। তোমরা হেঁটে ঘুরে দেখতে পার আশেপাশে, তবে বেশি দূরে যাবে না। পরে শহর কেন্দ্রে আমরা যাব, ৩ ঘণ্টার মতো ঘুরব।’
বাস থেকে নেমেই সামনের দৃশ্য দেখে নাবিল ও নাতাশা দুজনেই বলে উঠল, ‘ওয়াও! অ-সা-ম! সবসময় শুনি, পোস্টকার্ড পিকচার, এটি ঠিক তাই।’
টাহো নদীটি কি নাটকীয়ভাবে বেঁকে গেছে আমাদের সামনেই, আর পেঁচিয়ে ধরেছে তোলেদোকে। এর খর¯্রােতা নদীর জল ছলাৎ ছলাৎ করে ধাক্কা দিচ্ছে ঐতিহাসিক শহরের সুরক্ষিত পাথরের দেয়ালে। নদীর জলধারা হঠাৎ করে উঁচু থেকে নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ে সৃষ্টি করেছে জলপ্রপাতের আবহ। টিলার মাথায় দাঁড়িয়ে আছে অনন্য সুন্দর শহর তোলেদো, তার তিনদিকে টাহো নদী। তার সর্বোচ্চ বিন্দুতে আছে আলকাসার- যেন পাহারা দিচ্ছে পুরো শহরকে এখনো অতীতের মতো। ঠিক এ ছবিটিই একেছেন এল গ্রেকো১ তাঁর ভিসতা দে তোলেদো চিত্রকর্মে, তাঁর ছবির শহরটি এখন সামনে, বাস্তবে তাই দেখছি।
এ দৃশ্যটি নাবিল ও নাতাশা এত পছন্দ করেছে যে, তারা এখানেই থাকতে চায়, শহরে যাবে না, আলকাসার ও ক্যাথেড্রাল দেখবে না। বললাম, ‘দেখ, আমরা ডে ট্যুরে এসেছি, টিমের সাথেই থাকতে হবে। তাছাড়া এরা আলকাসার ও ক্যাথেড্রালের ভেতরে নিয়ে যাবে না, সময় নেই, শুধু বাইরে থেকে দেখাবে। তবে দুইটি মজার জায়গায় নিয়ে যাবে।’ ওরা হৈ হৈ করে উঠে বলল, ‘কোথায়?’। বললাম, ‘গেলেই দেখতে পারবে।’
বেলা সবাইকে জড়ো করে বলল, ‘তোমাদের এখন দেখার সময়, তাই বেশি কিছু বলব না। সামনেই তোলেদোর ঐতিহাসিক কেন্দ্র।’ তারপর আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে বলল, ‘এ হলো বিখ্যাত আলকাসার। তার বাঁ দিকে আরেকটি স্থাপত্য দেখিয়ে বলল, ‘এ হচ্ছে তোলেদোক্যাথিদ্রাল। শহরের দুইটি আইকন। ভিসিগথ শাসকরাই প্রথম এ শহরটিকে রাজধানী হিসেবে বেছে নেয় ২। তোলেদো-কে বলা হয় সিয়োদাদ দে লাস থ্রেস কুলথুরাস- তিন সংস্কৃতির শহর। কারণ খ্রিস্টান, মুসলিম ও ইহুদিদের সহাবস্থানের এ এক বড় দৃষ্টান্ত।’ বেলা এরপর নিচের নদীর দিকে তাকিয়ে বলল, ‘এ হলো টাহো নদী, আইবেরীয় পেনিনসুলারে৪ দীর্ঘতম নদী- পূর্ব স্পেন থেকে ঠিক ১০০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পতুগালের লিসবনে আটলান্টিকে গিয়ে পড়েছে।’
এত সুন্দর দৃশ্য দেখার জন্যই লোরকা ও তাঁর তিন বন্ধু প্রায়ই মাদ্রিদের রেসিদেনসিয়া দে এসতুদিয়ানতেস থেকে এখানে চলে আসতেন। লোরকা, দালি, বুনুয়েল- এ তিনজনের বন্ধুত্বের কথা আমরা জানি। এঁদের সাথে যোগ দিল পেপিন বেয়ো। বুনুয়েল এঁদের সবাইকে নিয়ে প্রতিষ্ঠা করলেন অরদেন দে তোলেদো।৩
কিছু সময় আমরা দেখলাম নিসর্গ ও ইতিহাসের এ মেলবন্ধন। এরপর বাসে গিয়ে উঠলাম। সবার চোখ তখনো বাইরেই- দেখার তৃপ্তি মেটেনি।
একটু চলার পর বাস থামল পুরনো, সুন্দর এক ভবনের সামনে, বড় করে লেখা- ফেব্রিকা দে এসপাদাস মারিয়ানো ছামোরেনো। বাস থেকে নেমে সবাই জড়ো হতেই বেলা বলল, ‘নাম শুনে বা ভেতরে ঢুকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। এসপাদাস মানে হলো তরবারি। তোলেদো-র হাতে তৈরি তরবারি পুরো পৃথিবীতে বিখ্যাত। এটি মারিয়ানো ছামোরেনো পরিবারের মালিকানায় চালিত তরবারি তৈরি করার এক ওয়ার্কশপ, সাথে আছে বিক্রয়কেন্দ্র। এদের তৈরি তরবারি অনেক ছায়াছবি ও টিভি সিরিয়ালে ব্যবহার করা হয়েছে। স্পেনের বীর এল সিড-কে নিয়ে তৈরি সিরিয়ালে মারিয়ানো ছামোরেনো-র তরবারিই প্রদর্শিত হচ্ছে। স্পেনের বুল ফাইটাররা তোলেদো ছাড়া অন্য কোথায়ও তরবারি কিনতে যায় না। তোমরা এখান থেকে পছন্দমতো কিছু কিনতে পারো- সবাই ১০% ডিসকাউন্ট পাবে। একটি জিনিস মনে রাখতে হবে- সত্যিকারের তরবারি কেনার পরে শিপমেন্ট করে পাঠাবে, সাথে দেবে না। তবে প্রদর্শনীর জন্য নকশা করা অনেক তরবারি আছে, যা কিনে সাথে নেয়া যাবে। আমরা এখানে ২০ মিনিট থাকব।’
ভেতরে ঢুকতেই আমাদের স্বাগত জানালো জারটুচি ছামোরেনো-মারিয়ানো ছামোরেনো পরিবারের একজন সদস্য। সে ঘুরে ঘুরে আমাদেরকে সব দেখাল। মনে পড়ে গেল বহু বছর আগে টাওয়ার অফ লন্ডন দেখার স্মৃতি। আজকের তরবারির সমাহার সেদিন টাওয়ারে দেখা অস্ত্রসম্ভারকে মনে করিয়ে দিল। তরবারির শত রকমের আকার, প্রকার, নকশা- সব আয়োজন শুধুমাত্র মানুষ হত্যার জন্য। সৌভাগ্য যে, আমাদের সামনের তরবারিগুলি এখনো মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয়নি।
আমার ভাবনায় ছেদ পড়ল, যখন পাশের কক্ষে যেতেই নাকে আসল এক পোড়া গন্ধ, আর হাতুড়ি পেটার শব্দ। বুঝলাম এটি একটি কামারশালা।
মনে পড়ে গেল ছোটবেলায় দেশে দেখা কামারশালার এক স্মৃতি। স্কুলে যাওয়ার সময় পড়ত এক কামারশালা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম আমার বয়সী এক ছেলে তার চেয়ে বড় এক হাপরের রশি ধরে টানছে। তার টানে হাপরটি ফুসফুসের মতো নিশ্বাস নিচ্ছে, ছাড়ছে- তার পেট বাড়ছে, কমছে। পাশে এক বুড়ো হাতুড়ি দিয়ে পেটাচ্ছে লাল হয়ে যাওয়া লোহা। আগুনের তাপে, কয়লার ধোঁয়ায় তাদের দুজনের চোখ হয়ে উঠেছিল লাল। পরে জেনেছিলাম তারা ছিল এক কামার সম্প্রদায়ের বাবা ও ছেলে।
আজকেরটিও কামারশালা, তবে তা অনেক মানবিক। হাপরটি চালাচ্ছে এক মেশিন, শুধু লোহা পিটিয়ে তরবারি তৈরি করা হচ্ছে হাতে। এরপর আছে মসৃণ করা, ধার দেয়া, নকশা কাটা। সবই হাতে করা- এটিই এ তরবারির বৈশিষ্ট্য। কোনো কোনো তরবারির ওপর দেয়া হয় সোনার প্রলেপ। সোনার কথা শুনতেই দলের অনেকের চোখের পাতা লাফিয়ে উঠল। তবে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না তাদের।
শো রুম দিয়ে যাওয়ার সময় নাবিল বলল, ‘দেখ, তরবারিগুলির ওপর মার্ক করা আছে Made in Toledo। বললাম, ‘ইন্টারেস্টিং! এখানে দেখি Made in Spain-এর চেয়ে Made in Toledo বেশি মূল্যবান।’
একটু হেঁটে সবাই আসলাম একটি চমৎকার ভবনের সামনে, নাম লেখা আরথেসেনিয়া মরালেস। ভেতরে ঢুকে অনেকে বেশ উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে নাতাশা ও ফারজানাও আছে। এর কারণ এটি একটি জুয়েলারি শপ, সাথে আছে তা বানানোর ওয়ার্কশপ। আরো আছে তরবারি তৈরি ও বিক্রির ওয়ার্কশপ।
বেলা সবাইকে বলল, ‘আমরা সম্মানিত যে, এখানকার পরিচালক সিনর একুনাস মাসারিয়েগো আমাদের সামনে উপস্থিত আছেন। তাঁর সাথে দলের সবাইকে পরিচয় করিয়ে দিতে চাই। উনিই সব দেখাবেন, বলবেন।’ আমাদেরকে ‘ওলা’ বলে স্বাগত জানালেন একুনাস মাসারিয়েগো- একজন সুঠাম ও সুদর্শন মধ্যবয়সী ভদ্রলোক, আমরাও প্রত্যুত্তর দিলাম। বললেন, ‘আমি এ পেশায় আছি আজ ২৫ বছর। এটি শিখতে এর ওপর আমাকে হাতে-কলমে কাজ করতে হয়েছে ১০ বছর। কাজেই বুঝতে পারো এটি কী রকম সূক্ষ্ম ও কঠিন এক কারুকাজ। এর নাম হচ্ছে দামাসকিনাদো ৫-এ কারুশিল্পটি এসেছে সিরিয়া-র দামেস্ক থেকে। এর ইতিহাস আছে, তবে সেখানে আমি যাব না।’ এ শুনে নাবিল ও নাতাশা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
পাশের ওয়ার্কশপে সবাইকে নিয়ে একুনাস আবার শুরু করলেন- ‘আমি এখন একটি জুয়েলারির কাজ করে দেখাব।’ হাতে ইস্পাতের ছোট এক টুকরো নিয়ে দেখালেন, ‘এটি নেকলেসে পড়ার এক লকেট। এখানে একটি ফুলের নকশার খাঁজ কাটা আছে। আমি এখানে বসাব ২৪ ক্যারেট সোনার একটি তার।’ ইস্পাতের টুকরাটি একটি ছোট টুলে আটকে নিয়ে সুতোটি খুবই আস্তে আস্তে হাতের এক পিন ও ছোট হাতুড়ি দিয়ে তিনি বসাতে লাগলেন ভেতরের খাঁজে। অনেকক্ষণ লাগল সুতাটি বসাতে। পুরো বসানো হয়ে গেলে ওপর থেকে আবার ফিনিশিং করলেন। এরপর একটি রাসায়নিক দ্রবণ দিয়ে তা ধুয়েমুছে নিলেন। এতে ইস্পাতের টুকরাটি কালো হয়ে সোনার কাজের সাথে এক কন্ট্রাস্ট তৈরি করল- এতে ফুলের কাজটি আরো ফুটে উঠল।
এখান থেকে বের হওয়ার আগে এর বিক্রয় কেন্দ্র থেকে অনেকে কেনাকাটা করল। ফারজানা নিল একটি লকেট, নাতাশা নিল একটি ব্রেসলেট। আমার ও নাবিলের নেয়ার জন্য ছিল শুধু তরবারি ও ছুরি- আমরা কেউ তা পছন্দ করলাম না।
টিলার মাথায় এখন আমাদের যেতে হবে, কারণ তোলেদোর ঐতিহাসিক কেন্দ্র সেখানেই। বাস এসে দাঁড়াল এক বড় পার্কিং লটে। আমরা নামার পর বেলা বলল, ‘আমরা সবাই একসাথে এসকালেটর দিয়ে ওপরে উঠব শহরের কেন্দ্রে যেতে। বাসের নাম্বার তোমরা মনে রাখবে। কেউ হারিয়ে গেলে বা বিশ্রাম নিতে চাইলে সরাসরি বাসে চলে আসবে। মাদ্রিদের পথে বাস ছাড়বে ঠিক ৫টায়। গুড লাক!’
বেলাকে অনুসরণ করে আমরা এসকালেটরে উঠে গেলাম। এটি কয়েক ধাপে- চলছে তো চলছেই, আর শেষ হচ্ছে না। অবশেষে পৌঁছলাম শেষ মাথায়। নাবিল জানতে চাইল আমরা কত ফুট উপরে উঠলাম। বেলা বলল, ‘৪০০ ফিটের কম হবে না। অনেকে ঘুর পথে নুড়ি পাথরের সর্পিল রাস্তা ধরে হেঁটে ওপরে উঠে। সে ভীষণ কষ্টকর। আজ আবার একটু বৃষ্টি, রাস্তার অবস্থা হবে খুবই খারাপ।’
এক বিরাট চত্বরে এসে বেলা বলল, ‘এর নাম প্লাসা দে সকোদোবের- তোলেদোর সবচেয়ে বড় প্লাসা। মাদ্রিদের প্লাসা থেকে এর পার্থক্য কেউ কি খেয়াল করেছ?’ নাবিল বলল, ‘এ প্লাজাটি ত্রিভুজ আকারের, মাদ্রিদেরগুলি আয়তাকার ও বেশ বড়।’ বেলা খুশি হয়ে থামস আপ করলো।
বেলা এরপর ইতিহাসের কয়েকটি পাতা উল্টাল, ‘এ প্লাসার নাম এসেছে আরবি শব্দ সুক আদ-দায়াব থেকে, এর অর্থ, গবাদিপশুর বাজার। মুর আমলে এ রকম একটি বাজার ছিল এখানে। এরপর এটি হলো ষাঁড় লড়াইয়ের প্রাঙ্গণ। স্পেনের কালো অধ্যায়ের ছোবল থেকে এ প্লাজাও রেহাই পায়নি। ইনকিসিছিয়ন শুরু হলে এ প্রাঙ্গণে খুঁটিতে বেঁধে পুড়িয়ে ধর্মদ্রোহীদের মৃত্যুদ- প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয়েছে।’
এসব দুঃখের আখ্যান থেকে হয়তো বের হয়ে আসতে বেলা এরপর সবাইকে নিয়ে গেল সামনের টালিযুক্ত বেঞ্চগুলিতে, যেখানে রয়েছে সার্ভেন্তেসের ডন কিহোতে উপন্যাসের কিছু কাহিনির রঙিন ছবি। মজার ব্যাপার হলো, সার্ভেন্তেসের স্ত্রীর জন্ম তোলেদোর কাছাকাছি এক এলাকায়।
ইতিহাসের এ প্রান্ত হয়তো বিপরীত যাত্রা শুরু করেছে- পাশেই দেখি ম্যাকডোনাল্ডস, বার্গার কিং, স্টার বাকস- সেখানে উপচে পড়া ভিড়।
প্লাসার ডাইনে ওপরে থাকাতে দেখি, সুবিশাল আলকাসার সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে। চার কোনায় চারটি টাওয়ার যেন পুরো শহরকে পর্যবেক্ষণ করছে। বেলা আবার শুরু করল, ‘স্পেনের ইতিহাসের সাথে আলকাসার-এর ইতিহাস মিশে আছে। ৩য় শতাব্দীতে এটি ছিল রোমানদের রাজপ্রাসাদ। ১০ম শতাব্দীতে কর্দোবার খলিফা তৃতীয় আবদুর রহমানের আমলে এটি পরিণত হয় এক দুর্গে। আলকাসার আরবি শব্দ, মানে দুর্গ। রাজা পঞ্চম কার্লোস ও তাঁর পুত্র প্রথম ফিলিপের আমলে ১৫৪০ এর দিকে এর সংস্কার করা হয়। আজটেক জয়ের পর হার্মেন কর্তেজ-কে ১৫২১ সালে এ প্রাসাদে অভিনন্দিত করেন রাজা পঞ্চম কার্লোস। এরপরের অধ্যায় দুঃখের, ধ্বংসের। গৃহযুদ্ধের সময় এখানে প্রজাতন্ত্রী ও জাতীয়তাবাদীদের মধ্যে ভয়াবহ যুদ্ধ সংঘটিত হয়। ফলে আলকাসার ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যুদ্ধের পর তা পুনঃনির্মাণ করা হয়।’
এরপর একটু হেঁটে কাছের ক্যাথেড্রাল দেখিয়ে বেলা বলল, ‘আলকাসার এর মতো এরও আছে ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাস। প্রথমে এটি ছিল ভিসিগথদের এক গির্জা। ৭১১ সালে মুসলিমরা তোলেদো অধিকার করার পর গির্জাটি ভেঙ্গে এখানে এক মসজিদ নির্মাণ করে। ১০৮৫ সালে খ্রিস্টানরা শহরটি অধিকার করার পর মসজিদটিকে গির্জা হিসেবে ব্যবহার করতে থাকে। এরপর ১২২৬ সালে সেটি ভেঙ্গে বর্তমানের বিশাল গির্জা নির্মাণ করে। তোলেদোর ক্যাথেড্রাল গত ১৫০০ বছরের অধিক সময় ধরে স্পেনের আধ্যাত্মিক কেন্দ্র হিসেবে পরিগণিত হয়ে আসছে।’
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বেলা বলল, ‘হাতে আর সময় নাই। এখানে মার্কেটে এখন যাব, সেখানে থাকব ৪০ মিনিট। সেখানে রয়েছে অনেক বুটিক শপ, স্যুভেনির শপ ও ক্যাফে-রেস্তোরাঁ। তোমরা যেভাবে খুশি সময় কাটাতে পার। আর এই কর্নারে সবাই সময়মতো চলে আসবে।’
ঘুরে ঘুরে দেখলাম। সারি সারি দোকান সাজিয়ে রেখেছে সুন্দর নকশা করা সব তরবারি ও ছুরি। আরো আছে জুয়েলারির বহু দোকান। এসবই এখানকার হস্তশিল্পের সৃষ্ট পণ্য। আগেই কিছু কেনা হয়েছে, এবার শুধু ছবি তুললাম। এরপর এক রেস্তোরাঁয় যেয়ে হালকা কিছু খেয়ে ভাবলাম লোরকার স্মৃতি বিজড়িত কিছু জায়গা দেখে আসি।
এক লেখায় পড়েছিলাম লোরকাসহ অরদেন দে তোলেদো-এর সবাই পোসাদা দে লা সাঙ্গরে নামের এক ঐতিহাসিক রেস্তোরাঁয় প্রায় মিলিত হতেন। ভাবলাম তা একটু দেখে আসি। পরে খোঁজ নিয়ে জানলাম এটি আর নাই, গৃহযুদ্ধে তা ধ্বংস হয়ে গেছে। পাশে এক স্যুভেনির শপে এর একটি নামকরা এচিংয়ের এক প্রিন্ট নিলাম। পোসাদা দে লা সাঙ্গরে নামের এ এচিংটি ১৯২৬ সালে করেছিলেন ব্রিটিশ শিল্পী স্যার লিওনেল লিন্ডসে।
পাসেও ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা ৭, তোলেদো ঠিকানাটি লোরকার নাম বহন করছে দেখে যাওয়ার খুব ইচ্ছে ছিল। উবারে দেখলাম প্লাসা দে সকোদোবের থেকে সেখানে যেতে লাগবে ২০ মিনিট। হাতে যথেষ্ট সময় নেই, তাই যাওয়া হলো না। আশা করি ভবিষ্যতে কোনো সময় যাওয়া হবে।
সময়মতো চলে আসলাম মিলিত হবার স্থানে। সেখানে দেখি বেলা সবার জন্য অপেক্ষা করছে। সহাস্যে সে বলল, ‘আর কিছু দেখা হবে না। এখন আমাদের আবার সেই একই এসকালেটর ধরে নামতে হবে।’
একসাথে সবাই নিচে নামলাম। বাসে যেয়ে সবাই বসতেই তা ছেড়ে দিল।
নাবিল ও নাতাশা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে আছে কখন মিরাদার দে ভাইয়ে আসবে, সেখান থেকে আবার টাহো নদী দেখবে, আবার তোলেদো শহরকে দেখবে, এবার বলবে ‘বিদায়’। সেটি আর আসে না। বেলাকে জিজ্ঞেস করতে বলল, ‘ফেরার পথটি আলাদা। আমরা এখন অন্য পথ দিয়ে যাচ্ছি। সেই ভিউ পয়েন্ট এ পথে আসবে না।’
দুঃখ হলো, টাহো নদীর পাড়ে ‘আদিগন্ত টিলার মাথায়’ অপূর্ব দৃশ্যটি আবার দেখা হলো না, আর দেখা হলো না লোরকার কিছু টুকরো স্মৃতি। পৃথিবীতে অনেক কিছুই এরকম অপূর্ণ থাকে।
তোলেদোকে বিদায়ের বেলায় আমাদের অনুভূতির কথাই যেন বলেছেন লোরকা তাঁর কবিতায়:
আদিগন্ত টিলার মাথায়
-আদিগন্ত আলোর আধার-
সেখানে হারিয়ে গেছি পথে
আকাশ নেই, পথ মুছে গেছে।
উত্তর সীমান্তে মৃত্যু দাঁড়িয়েছে এসে
সেখানে তারার আলো নিভে গেল
অর্ধনিমজ্জিত আকাশের দল অতি ধীরে
ঢেউয়ের শিখরে যেমন ভাঙা জলযান ওঠে, পড়ে
আলোয় আলোয় বোনা এই যে সাগরপথে আমি
কোথায় চলেছি যেন? চলেছি কিসের খোঁজে?
এখানে ক্রন্দসী এক প্রতিবিম্ব সঙ্গী আমার
আসলে প্রতিচ্ছবি ওড়নায় ঢাকা মুখ চাঁদ
যেন আমাকে আবার নিয়ে ফিরে যেতে পারে
আমার মুঠোতে ধরা নিবিড় শীতল বনভূমি
আমার ঘরে, আমার একান্ত বারান্দায়
যেখানে কয়েকটা পাখি হয়তো এখনও বেঁচে আছে।
তাহলে বাগান চলে আসবে পিছু পিছু
এসে যাবে বাগানের সবুজ সীমাও
এসে যাবে মাটিতে লুটিয়ে পড়া নৈঃশব্দ্যের
রুখোশুখো অমসৃণ পিঠ আর কাঁধের উপর।৬
Ref:
১. এল গ্রেকো: এল গ্রেকো ছিলেন স্পেনীয় রেনেসাঁর একজন চিত্রশিল্পী, স্থপতি ও ভাস্কর। এল গ্রেকো শব্দটির অর্থ গ্রিসবাসী। তিনি যেহেতু গ্রিস থেকে স্পেনে এসেছেন সেজন্য শিল্পীকে এ নামে ডাকা হতো। তাঁর আসল গ্রিক নাম ছিল Domenikos Theotokopoulos। এল গ্রেকো ১৫৪১ সালে গ্রিসের ক্রেটে জন্মগ্রহণ করেন।সেখানে বাইজান্টাইন-উত্তর শিল্প মাধ্যমে দক্ষতা অর্জনের পর ২৬ বছর বয়সে ভেনিস চলে যান। ১৫৭০ সালে তিনি রোমে গমন করেন। সেখানে তিনি ভেনেসিয়ান রেনেসাঁ বিষয়ে শিল্পচর্চা করেন। এ সময় এল গ্রেকো বিখ্যাত কয়েকজন শিল্পীর সাহচর্যে আসেন, তার মধ্যে অন্যতম হলেন তিতিয়ান ও তিনতোরেত্তো। ১৫৭৭ সালে তিনি তোলেদো গমন করেন এবং ১৬১৪ সালে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত সেখানে ছিলেন।
এল গ্রেকো-র অনেক বিখ্যাত ছবির মধ্যে দুইটি ল্যান্ডস্কেপ পেইন্টিং হচ্ছে: (১): Vista de Toledo( View of Toledo): ১৫৯৬ থেকে ১৬০০ সালের মধ্যে আঁকা ছবিটি নিউ ইয়র্ক এর মেট্রোপলিটান মিউজিয়ম অফ আর্ট (The Met) এ সংরক্ষিত আছে। (২): Vista y plano de Toledo (View and Plan of Toledo): ১৬০৮ সালে আঁকা ছবিটি তোলেদো-র এল গ্রেকো মিউজিয়মে সংরক্ষিত আছে।
২. রোমানরা খ্রিস্টপূর্ব ১৯৩ সালে আইবেরীয় কার্পেটিিন গোষ্ঠির কাছ থেকে তোলেদো দখল করে। তারা এখানে তৈরি করে সার্কাস, থিয়েটার, এম্ফিথিয়েটার ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। রোমান সা¤্রাজ্যের পতনের পর ভিসিগথ শাসকরা ৫ম শতাব্দীর শেষ থেকে ৭১১ সাল পর্যন্ত এখানে শাসন করে। তোলেদোকে রাজধানী করে তারা এর ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় উন্নয়ন সাধন করে। ৭১১ সালে মুসলিমরা আইবেরীয় পেনিনসুলা দখল করার পর তোলেদো তাদের অধীনে চলে আসে। তাদের ৩৭৫ বছরের শাসনকালের শেষ শতাব্দীটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠে। তখন জ্ঞান-বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষতা ঘটে এবং ধর্মীয় সহনশীলতার একটি বড় দৃষ্টান্ত স্থাপিত হয়। ১০৮৫ সালে কাস্তিয়ার রাজা ষষ্ঠ আলফনসো তোলেদো দখল করেন। এটি ছিল আইবেরীয় উপদ্বীপে মুসলিমদের কোন বড় শহরের প্রথম পতন। তখন থেকে কাস্তিয়ার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শহর হয়ে উঠে তোলেদো। ইউরোপের সে সময়ের সবচেয়ে শক্তিশালী শাসক, Holy Roman Emperor, রাজা পঞ্চম কার্লোস (Charles I of Spain) ১৫১৯ সালের দিকে তোলেদোকে রাজধানী করেন এবং এর ব্যাপক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। সমকালীন রেনেসাঁর স্থাপত্য অনুসরণ করে তিনি তোলেদোতে অনেক ভবন তৈরি করেন। সে সময় এল গ্রেকো এ শহরে স্থায়ীভাবে বাস করে চিত্রকর্মে নিয়োজিত থাকেন। এটি ছিল তোলেদো-র স্বর্ণযুগ। পঞ্চম কার্লোস এর সন্তান দি¦তীয় ফিলিপ ১৫৬১ সালে রাজধানী মাদ্রিদে সরিয়ে নিলে তোলেদো শহরের চলমান বিকাশ ও উন্নয়ন থেমে যায়।
৩. অরদেন দে তোলেদো: Order of Toledo: ১৯২০ সালে লুই বুনুয়েল শিল্পী-সাহিত্যিকদের এ সংগঠনটির প্রতিষ্ঠা করেন, যার অংশ ছিলেন ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, সালভাদোর দালি ও পেপিন বেয়ো। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল তোলেদো শহরের অন্বেষণ ও উদযাপন, আর মাঝে মাঝে তার আরাধনা।
৪. আইবেরীয় পেনিনসুলা: পেনিনসুলা বা উপদ্বীপ হলো এক ভূখ- যা তিন দিক থেকে জল দ্বারা বেষ্টিত এবং একদিক মূল ভূখ-ের সাথে যুক্ত। আইবেরীয় উপদ্বীপ, সংক্ষেপে আইবেরীয়া নামে পরিাচত। এটি ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত, যাকে বাকি ইউরোপ থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে পিরেনিজ পর্বতমালা। এখানে অন্তর্ভুক্ত আছে পর্তুগাল, স্পেন, এন্ডোরা ও ব্রিটিশ অঞ্চল জিব্রাল্টার। এর তিনদিক ঘিরে আছে আটলান্টিক মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগর।
৫. দামাসকিনাদো: এটি হচ্ছে এক প্রাচীন ধাতব শিল্পকর্ম, যার উৎপত্তি সিরিয়ার দামেস্কে। তোলেদো অধিকার করার পরে মুসলিমরা এ শিল্পকে ৮শ শতাব্দীর পরে এখানে নিয়ে আসে। স্থানীয় ইস্পাত শিল্পের সাথে মিলে এটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। প্রথমে ইস্পাতের টুকরার ওপর নকশার খাঁজ কাটা হয়। সেই খাঁজে সোনার তার বসিয়ে হাতুড়ি দিয়ে শক্ত করা হয়। তারপর রাসায়নিক দ্রবণে ইস্পাতকে কালো করা হয়। এতে সোনার নকশার উজ্জল্য ফুটে ওঠে।
৬. Duna: টিলা: অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য।
সারাদেশ: দুপচাঁচিয়ায় সড়ক দুর্ঘটনায় যুবক নিহত