image
রফিক আজাদ

রফিক আজাদের কবিতায় মৃত্যু

জীবনেরই এক ভিন্ন পাঠ

গোলাম রাব্বানী

বাংলা সাহিত্যে ষাটের দশক ছিল এক উত্তাল ও রূপান্তরের সময়। এই সময়ের কবিরা- যেমন শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, বিনয় মজুমদার, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রফিক আজাদ- প্রকৃতিকে পূর্ববর্তী দশকের কবিদের মতো কেবল রোমান্টিক চোখে দেখেননি; তাঁদের কবিতায় প্রকৃতি এসেছে নতুন আঙ্গিকে, যেখানে নাগরিক জীবনের জটিলতা এবং গ্রামীণ ঐতিহ্যের সংঘাত স্পষ্ট।

রফিক আজাদের মরণ ভাবনা কোনো বিচ্ছিন্ন আবেগ নয়, বরং তা তাঁর জীবনদর্শনেরই এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। তিনি মৃত্যুকে বরণ করেছেন জীবনেরই এক অনিবার্য বিস্তার হিসেবে- যেখানে কোনো কৃত্রিমতা নেই, আছে কেবল এক সুগভীর ও নিটোল নিস্তব্ধতা।তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে মানুষের জীবন অত্যন্ত নশ্বর, কিন্তু মহাকাল অবিনাশী। এই নশ্বরতার বোধই তাঁকে জীবনকে নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে শিখিয়েছিল। তাই তাঁর মরণ ভাবনায় হাহাকার অপেক্ষা জীবনের প্রতি এক প্রকার গূঢ় নির্মোহতা বেশি প্রকট। রফিক আজাদের পরিণত বয়সের কবিতায় এক প্রকার মেদহীন বিষণœতা দেখা যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের অবক্ষয় তাঁকে জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলেছিল। এই অভিমানী কবিসত্তা মৃত্যুকে এক প্রকার ‘প্রতিবাদ’ হিসেবেও কল্পনা করেছে। জীবনের কলরব থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে এক নিভৃত ও নিস্তব্ধ আঁধারে নিমজ্জিত হওয়ার বাসনা তাঁর পঙ্ক্তিতে মূর্ত হয়েছে। বাংলা কবিতার ইতিহাসে রফিক আজাদ কেবল দ্রোহ বা প্রেমের কবি নন, বরং তাঁর কবিতায় ‘মৃত্যুচেতনা’ বা ‘মরণ ভাবনা’ এক গভীর ও দার্শনিক মাত্রা পেয়েছে। তাঁর কবিতায় মৃত্যু কখনো যুদ্ধের অনুষঙ্গ হিসেবে এসেছে, কখনো ব্যক্তিগত একাকীত্বের চরম পরিণতি হিসেবে, আবার কখনো এসেছে এক অনিবার্য ও সুন্দর পরিসমাপ্তি হিসেবে। রফিক আজাদ মৃত্যুকে বীভৎস কোনো বিষয় হিসেবে দেখেননি, বরং জীবনের এক অমোঘ পরিণতি হিসেবে গ্রহণ করেছেন। তাঁর কাছে মৃত্যু মানেই শেষ নয়, বরং এক ধরনের রূপান্তর। তিনি মৃত্যুকে জীবনেরই পরিপূরক হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বিখ্যাত কিছু পঙ্ক্তিতে মৃত্যুকে এক প্রকার শান্তির আশ্রয় হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে।

মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার কারণে রফিক আজাদ মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সহযোদ্ধাদের মৃত্যু এবং যুদ্ধের ময়দানের লাশের মিছিল তাঁর কবিসত্তায় এক গভীর ছাপ ফেলেছিল। তাই তাঁর কবিতায় মৃত্যু কেবল বিমূর্ত কোনো ধারণা নয়, বরং তা রক্ত-মাংসের বাস্তব। যুদ্ধের স্মৃতি তাঁর কবিতায় মৃত্যুকে ত্বরান্বিত করেছে এক ধরনের ‘অস্তিত্ববাদী সংকট’ হিসেবে। জীবনের একটা পর্যায়ে কবির মধ্যে তীব্র একাকীত্ব ও ক্লান্তি ভর করেছিল। নাগরিক জীবনের যান্ত্রিকতা এবং চারপাশের মানুষের কপটতা তাঁকে বারবার মৃত্যুর কথা ভাবিয়েছে। এই পর্যায়ে তাঁর কবিতায় মৃত্যু এসেছে ‘মুক্তি’র প্রতীক হিসেবে। তিনি মনে করতেন, এই জীর্ণ পৃথিবী থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র পথ হলো প্রকৃতির চিরন্তন কোলে বা মরণোত্তর স্তব্ধতায় ফিরে যাওয়া।

তাঁর জনপ্রিয় কবিতা ‘বিবাহ বাতাস’কবিতায় তিনি এক শান্তিময় ও আদিম পৃথিবীর স্বপ্ন দেখিয়েছেন। যেখানে লোভ-লালসা বা সংঘাত নেই। এই প্রেক্ষাপটে মৃত্যু হলো সেই শান্তির জনপদে প্রবেশের একটি মাধ্যম। তিনি মৃত্যুকে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মের অংশ হিসেবে মেনে নিতে চেয়েছেন। এ কবিতায় প্রেম এবং মৃত্যু অনেক সময় সমান্তরালে চলে। তিনি যেমন গভীর আবেগে প্রেমিকার সান্নিধ্য চেয়েছেন, তেমনি প্রেমের ব্যর্থতা বা বিচ্ছেদের মুহূর্তে মৃত্যুকে পরম বন্ধু হিসেবে কল্পনা করেছেন। তাঁর কাছে প্রেম ও মৃত্যু- উভয়ই মানুষকে এক ধরনের চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ- রফিক আজাদ এক জায়গায় লিখেছিলেন- আমাকে জড়ালে, একটি সুতো পুঁতিগুলোকে যেমন?

শাশ্বত সুখের সঙ্গে ভাগ করে আমার বিছানা

শান্ত-স্নিগ্ধ ভোরাবধি, আজীবন, পারবো ঘুমুতে?

সক্ষম হবে কি মৃত্যু শুকিয়ে ফেলতে এই নব

আনন্দের হ্রদ আমাদের, বন্ধ করে দিতে পারে

অমৃতোৎস, পিপাসায় নতজানু আমরা যখন?

এখানে কোনো হাহাকার নেই, বরং আছে এক প্রকার ঋজু ও শান্ত ঘোষণা। তিনি মৃত্যুকে দেখেছেন একজন পরিব্রাজকের মতো, যিনি তাঁর যাত্রা শেষ করে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত। রফিক আজাদের কবিতায় মৃত্যু কেবল জৈবিক পরিসমাপ্তি নয়, বরং তা এক অস্তিত্ববাদী প্রজ্ঞা এবং দার্শনিক গহনতা নিয়ে উপস্থিত। তাঁর মরণ ভাবনার পরতে পরতে জড়িয়ে আছে দ্রোহ, ক্লান্তি এবং এক ধরনের অবিনাশী নির্লিপ্ততা। মৃত্যুকে প্রথাগত ত্রাস বা বিভীষিকা হিসেবে দেখেননি বরং তাঁর কবিতায় মৃত্যু এসেছে ‘অস্তিত্বের এক চরম সত্য’ হিসেবে। কিয়ের্কেগার্ড বা কামুর অস্তিত্ববাদী দর্শনের মতো তিনিও জীবনের অন্তঃসারশূন্যতা ও যান্ত্রিকতাকে উপলব্ধি করেছেন। যখন নাগরিক জীবনের জটিলতা তাঁকে পিষ্ট করেছে, তখন মৃত্যু তাঁর কাছে কোনো অন্ধকার গহ্বর নয়, বরং এক শান্তিময় ‘শূন্যতা’ বা ‘নির্ভানা’ (ঘরৎাধহধ) হিসেবে প্রতিভাত হয়েছে।প্রাসঙ্গিক কবিতানুসারে-

মৃত্যু কভু কেড়ে নিতে পারে না জীবন-

জীবন অপরিমেয়- মৃত্যু এক ধোঁকা;

মৃত্যুকে ডরায় দাসে– বীরেরা অজেয়

মৃত্যু তুচ্ছ করে তারা ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলে ॥

(জবিন অপরিমেয়)

সমালোচক বকুল অশরাফের মতে, “কবি বুঝে গিয়েছিলেন এ দেশের সঙ্কটের কথা। তিনি জানতেন এ দেশের সঙ্কট হচ্ছে সামাজিক ও রাজনৈতিক সঙ্কট। তিনি উনিশ শতকের ছয়-এর দশকে উত্তাল রাজনৈতিক সঙ্কটের মধ্য দিয়ে একটি বৈরী সঙ্কটের মধ্য দিয়ে পেরিয়ে এসেছেন। তাই সর্বদা কবিতায় শব্দ ব্যবহারে প্রতীকী ছিলেন। তাই কবিতায় আলাদা আমেজ ও সুর উচ্চারিত হয়েছিল। তিনি কিছুটা সুধীন্দ্রনাথ দত্তের দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। কবিতায় শব্দ ব্যবহারে হিসেবি ও আঁটসাঁট কবিতার গঠনের জন্য তাঁর প্রিয় কবি ছিলেন বাংলা ভাষায় সুধীন্দ্রনাথ দত্ত এবং বিদেশি ভাষায় টিএস ইলিয়ট।” মূলত,জীবনের দীর্ঘ পথে কবি ভালবাসা বিলিয়েছেন অকাতরে। তবে কতটুকু পেয়েছেন সেই প্রশ্ন আপেক্ষিক। ইহকাল ছেড়ে কবি রফিক আজাদ বিদায় নিয়েছেন এক দশক গত হলো। বিস্মৃতিপরায়ণ সময়ে কবি হয়তো ঘুমিয়ে আছেন কোনো বাক্যের বিরতিতে, কোনো শব্দের অন্তরে, কোনো এক প্রেমের আকুতিতে, কোনো এক ঘুমন্ত পাঠকের স্মৃতিতে, কোনো এক ভাবের মায়ায়। আজ বারবার মনে পড়ে বৈপরীত্য দুইটি শ্লোক:

ক.

স্বধর্মে বিশ্বাস নেই-পররূপে চির নিয়োজিত

এমন জনেরও আজ কেন যেন হাত রাখতে

ইচ্ছে করে আল্লাহ্ মিঁয়ার কাঁধে

খ.

তুমি না কাহহার অতি, তবে কেন এই এন্তেজার-

শেষ করে দাও প্রভু, অবসিত জীবন আমার।।

আলোচনা শেষ করেও যেন শেষ হতে চায়না। জীবন নিয়ে প্রচ- আশাবাদী কবি কেন বারবার মৃত্যু কামনা করছেন এ প্রশ্নই এখন আলোচ্য। এর পিছনে কি পারিবারিক কারণ না সমাজ না ব্যক্তিগত হতাশা তা নিয়ে আলোচনা চলতেই থাকবে ।

সম্প্রতি