ঝরাপাতা ওগো
খাতা খুলে বসে আছে বনবৃক্ষের তলে দীর্ঘশ্বাস
পাতারা উড়ছে, চারপাশে নিরানন্দ সময়
এর মাঝে আমি নেই কোনোখানে, না আনন্দে না বেদনায়
আমাকে ফেলে রেখে চলে যায় সকল প্রহর
অপেক্ষার শেষে দেখি মন্থর স্টেশনে শুধু নীরবতা।
উৎসবে এসে মানুষের বোবা মুখ আজ আর খোঁজে না সুবাস
নাগরদোলায় চক্রাকারে ঘোরে কিছু দুঃসময়
আজ এই চৈত্রতাড়িত দিনে এই মুখরতায়
শুধু মনে পড়ে, আমি ফেলে এসেছি ঝরাপাতার বাসরে ধুলোর সঙ্গীত
কলাপাতায় নবান্নের সুখ
একপেঁচে তাঁতের শাড়িতে আহা কোমল শান্তি!
আমাকে ডাকে না কোকিলের গান
এই উৎসব এই কোলাহল থেমেছে আনুষ্ঠানিকতায়
মুখোশের আড়ালে পেঁচার নিঃশব্দ চাহনিতে
মিশে আছে জীবনানন্দের কবিতার হিম
ঝরাপাতা ওগো, নব রৌদ্রে এ জীবনকে তুমি করো হে অসীম।
শীত এবং বাবা
শীত আবারও আসবে, বাবা আর আসবেন না
বানর-টুপিতে লেগে আছে বাবার চুলের ঘ্রাণ,
টুপিটা খুলতেই ঠা-া শীত বেরিয়ে পড়বে পথে পথে
বাবার গরম কাপড় আর লেপের মধ্যে আমি সব শীত জড়ো করে রাখি
সহ¯্র বছর পর যদি কোনো শীতে আবার বাবার
ঘ্রাণের মাঝে বাবাকে খুঁঁজে পাই;
মাঝে-মধ্যে ঘন ঘোর ঘুম এলে, চোখ বন্ধ করেই দেখতে পাই
পড়ন্ত দিনের ছায়া, এরি মাঝে কত শত কাহিনির ছবি
টুপটাপ জলে লেগে থাকে এক ধরনের মায়া,
আর তাতে ছেড়ে যাবার অসম্ভব বেদনা।
বাবা জানাতেন, বেঁচে থাকলে স্বপ্নও থাকে
স্বপ্নে তাই দেখি, বাবা দৌড়ে পার হচ্ছেন খোলা মাঠ,
আর সাঁতার কাটছেন সাগরে
বাবার কণ্ঠস্বরে কখনো বাজেনি হাহাকার
মনে হতো নক্ষত্র খসে পড়বে আকাশ থেকে বাবার চিৎকারে
আবার শীত আসবার আগে যদি বাবা থাকে,
সবুজ সব্জিতে তাকে ঢেকে দিতে চাই,
মুছে দিতে চাই বাবার কুঁচকানো ত্বক থেকে বয়সের শিশির,
রোদে শুকাতে দিবো তার অনারোগ্য অসুখ
এভাবে কতদিন?
ঘুড়ে দাঁড়ান তো বাবা
শুধু শুধু কেন ফ্রেমের মধ্যে বন্দি হয়ে আছেন?
জল ফেরি
বিবর্ণ বৈশাখ বিশুদ্ধ পাতা
জলের রথে করে কবে মেয়ে এসেছিল বাড়ি?
আজ সেই পথে মরা বাঘ,
যতটুকু সবুজ আঁচল ছিল কোমল মেঘবতীর শরীরে
সবটুকু নিয়ে গেছে রোদের অসহ্য দাহন।
বাড়ি আর ফিরব না, যদি পারো আমার অভিমান সাথে নিয়ে
উড়ে যেয়ো শতাব্দীর শেষ ঘূর্ণিঝড়,
চঞ্চুতে তৃষ্ণা থাকে থাক,
খননের পর ক্লান্তি জুড়ে শুধু এক মমতার ঘাম, এক নতুন মৃত নগরীর
ঘুম থেকে জেগে ওঠার তীব্র আকুলতা,
আমি সেই নগরীর ঠা-া জল ফেরি করি পথে পথে,
এই পথ কোথায় শেষ হয় আমার প্রজন্ম তা জানবে না কোনোদিন।
এখন গলিত চোখ, তবে একদিন স্বপ্ন ছিল
বাতাসে মেলার গন্ধ ছিল আর ছিল অসংখ্য সার্কাসের বাঘ আর
আমার শিরার মতন চিকন দড়িতে সুন্দরী রমণীর নৃত্য,
সেই দগদগে মাঠে শুধু রৌদ্রজ¦লা এক বাতাসের ছায়া
প্রেতের কঙ্কাল। সবকিছু সাথে নিয়ে তবু উদ্বাস্তু,
কেউ গেলে পথের দিকে তাকিয়ে থাকা পুরনো অভ্যাস,
একদিন ভুলে যাই গতানুগতিক ধারায়।
তুব কিছু কিছু তৃষ্ণা জেগে থাকে যেমন জল
যেমন সবুজ অথবা যেমন তুমি।
শীত শেষে শীতের গল্প
শীত শেষ হলেও শীতের গল্প থেকে যাবে; আমাদের গরম পোশাকে, লেপের উষ্ণতায় কিংবা মায়ের সেলাই করা নকশি চাদরে। গল্প থেকে যাবে গভীর কুয়াশায়, আচ্ছন্ন গ্রামে, স্থির শান্ত জলে, ঝিম ধরা পুরনো নৌকোর জং-ধরা চালে; শাদা ফুলকপি, সজীব শিম, সতেজ সব্জি আর পুকুরের লাফানো কৈ মাছের লাল কানকোয়, এমনকি মানুষের তৃপ্ত রসনায়। গল্প থেকে যায় শরীরের ত্বক থেকে মননের কোষে কোষে, বিবর্ণ পাতায়, ধুলোর প্রচ্ছদে।
জাতীয়: রাত পোহালেই শঙ্কার ভোট উৎসব