অখ- থাক মানবজমিন
খায়রুল আলম সবুজ
সবুজ শ্যামল মানবজমিন
অখ- থাক, খ- ক’রো না
হিংসায় দ্বেষে
অকারণ কোনও অবিশ্বাসে;
খ- ক’রো না বিত্ত বলে
খ- ক’রো না স্বার্থ ছলে
শূন্যগর্ভ কথার জালে জড়িয়ে তারে
ছিন্ন ক’রো না ভিন্ন ক’রো না
একটু যদি জানতে কোথায়
অখ-তার শক্তি আছে
দেখতে পেতে বিপুল বিশাল
ধুলায় লুটায় পায়ের কাছে
বলছি শোনো,
অখ- থাক খ- ক’রো না
হিংসায় দ্বেষে
অকারণ কোনও অবিশ্বাসে
সবুজ শ্যামল মানবজমিন।
১৯৯৬
অচেনা ঈশ্বর
রবীন্দ্র গোপ
বসন্ত হাওয়া চুপি চুপি গাছের পাতার কানে
কী যে কথা বলে কান পেতে শুনে রঙিলা কোকিল
হাওয়ায় দোলা দেয় নদীর কঙ্কালে ভাটা লাগা মন
শিউলি সকাল শীতের সাথেই চলে গেছে দূরে।
হলুদ কুটুম পাখি বসন্ত বাগানে ডাকে একা
বন্ধু তার প্রস্ফুটিত বাগানে একাকী নির্জনে
পাতাদের বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয় কেউই যাবে না
অকাল মৃত্যুতে কেউ ডাকে না অবেলায় ভালোবাসা।
বুকের ভেতর কেউ অন্তর্গত অচেনা ঈশ্বর
কথা বলে অবিরত ঘনঘোর বসন্ত হাওয়া
বনে বনে আজ রক্তিম মান্দারে লেগেছে আগুন
আবছায়ায় চাঁদের চরকা কাটে চন্দ্রমল্লিকা।
ভুলিনি তোমার ভাষা
সোহরাব পাশা
তোমার নির্জন স্নিগ্ধ চোখে নিহিত আমার ভাষা
কারও সাধ্য নেই ভুলিয়ে দেয় প্রীতির অক্ষর
নিবিড় স্পর্শের মুখর বসন্ত- বিষাদের গান
নিঃশ্বাসে নরম রোদেরবৃষ্টি, ফুল ঝরে পড়ার
মতো চোখের উজ্জ্বল শব্দ;
তুমি আজ অন্য তুমি
এই পাঁজরে বাসা বেঁধেছে রুগ্ণ সময়,
কোথাও যাবো না আর
তুমি পাশে না থাকলেও তোমার আকাশ
আছে মাথার ওপর,
খুব সহজেই তোমার মতোন? রং বদলাতে দেখি আজ
ভাঙা চাঁদ দেখে দেখে হাসি- মেধাবী আকাশটা
বিক্রি হয়ে যাচ্ছে, খুব সস্তায় জলের দামে,
কতোবার তো বলেছি-
‘প্রিয়তমা ছোট্ট একটা আকাশ কিনে রেখো’ -তোমার যা
ভুলো মন সে আর কী কেনা হলো- ফুল দেখতে দেখতে
বাগানটাই বিক্রি হয়ে গেলো, শুনেছি ওখানে এখন
আলু চাষ হবে- কিছু কিবুঝলে? -গোল আলু!
তবুও ফিরে যাবো না কোথাও
যেখানে তোমার আমার আকাশ নেই,
পাখিদের ওড়াউড়ি, আলো নেই, ছায়া নেই,
ছোট ছোট মেঘ নেই, বৃষ্টি নেই হাওয়ার ডানায় খোলা জানালায়।
যে আকাশে তোমার চোখের পাঠ নেই, সেখানে কীভাবে যাবো।
তার চে’ মরণ ভালো- এই আকাশের নিচে মৃত্তিকার ঘ্রাণে ঘুমিয়ে পড়বো একা।
মৃতের স্রোতেই জীবন
শামস হক
রতিশক্তি বাষ্পীভূত করে
ক’জনে পারে মস্তিষ্কে চালান করতে
বার্ধক্য জ্বরা মৃত্যু রুখতে
সবাই তো প্রদীপ উপুড় করে দেয়
আর তা দেয় বলেই
সৃষ্টির প্রবাহ বজায় থাকে
ওই সন্ন্যাস ওই অমরত্ব
ও আমার নয়
আমি আমার একাকিত্বের পূজারী নই
আমি থাকবো প্রবাহে বহমান হয়ে।
পিপাসার শাড়ি
রকিবুল হাসান
প্রিয়তমা রমণীকে বললাম, একদিন এসো
কলাপাতা রঙে লাউডগা শরীর জড়িয়ে
তাঁতের শাড়িতে নগরে আমার।
সে বললো, কী বিপদ!
কতো ভাঁজ কতো ঢেউ!
পারি না যে ঠিকমতো ওসব পরতে!
বললাম তাকে, ওভাবেই পরে এসো
সাদাসিধে সরল বালিকা,
কবিতা আঁকবো তোমাকেই।
রাজি হলো না সে কিছুতেই,
বললো, অভ্যাস নেই- পারবো না,
সময় আসুক- একদিন নয় প্রতিদিন।
অথচ কী আশ্চর্য দূরের অন্য বৃন্দাবনে
কতো দুপুর বিকেল সন্ধ্যা
সে তো শাড়িতেই কবিতার রাধা!
শীতে শাস্ত্রবিদ
সোহেল মাজহার
একজন মনোবিশারদ বলেন : শীত হলো রসায়ন
উচাটন মন
ধোঁয়া ওঠা চায়ের কাঁপ।
হুইশেল কাঁপিয়ে যখন চলে যায় শেষ রাত্রির ট্রেন
কেবল জেগে থাকে নৈঃশব্দ্যের বাদ্য ধ্বনি
আঙুলের স্পর্শে ক্রমশ চাপাস্বরের শিহরন তন্ত্রী
এসব কথা লেখা নেই অর্থ- গণিত কিংবা হিসাব শাস্ত্রে।
শীতে আগুনকু-লী ঘিরে জমে ওঠে প্রেম
বিলীয়মান দুপুরে ক্লাস রুমে বিষণœতা- হেম।
শাস্ত্রবিদ কী জানে এই শীতে
প্রেমিকের ঠোঁট, হাত মানেই চকমকি পাথর
আগুন-সঞ্চারি
ইন্টারমিডিয়েটের শিক্ষক দেয়নি কোনো দীক্ষা
ব্যবস্থাপনার উদাহরণ গণিত ও রসায়নের পরস্পর
শীতে উড়ছে হিম হাওয়া, অধ্যাপিকার নীল শাড়ি।
গড়াই-সুতা
মতিন রায়হান
তোমার কথা মনে পড়তেই
বুকের কোণে বেজে ওঠে
লালন সাঁইয়ের
মন-উচাটন গীত
আমি দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি
তুমি ঝুঁকে আছো গড়াই সেতুর রেলিং ধরে
জলশূন্য গড়াই নদী
তড়পায় যেন ধু-ধু বালির ফাঁদে!
অদূরেই কবিস্মৃতির কুঠিবাড়ি
স্মৃতিভারে কেমন যেন বিষণœ আজ!
কেমন আছেন গগন বাবু?
‘আমি কোথায় পাব তারে, আমার মনের মানুষ যে রে’
গগনের মনের মানুষ
নিতুই খুঁজি আমিও গো!
তুমি আমার মনের মানুষ
শীতের ভোরে কমলারঙা রোদের কণা
তোমাকে চাই, তোমাকে পাই
একতারারও গহন সুরে...
ঝিলের ধারে তোমার নিবাস
কাছেই বাজে রেলের বাঁশি
ও ধনি গো, কেমন কাটে নগরজীবন?
দুঃখধোয়া জাদুর জল আছে তোমার ঘটে?
মিলনমুখর সন্ধ্যা যদি এসেই পড়ে
রাতের বাসর এঁকে নিয়ো
মনের কোণে!
এই সন্দেশ প্রকাশ হলে গ্রামবার্ত্তা প্রকাশিকায়
মৃদু হেসে কাঙাল হরি
নেবে তোমার হাস্যমাখা দান
ভালোবাসি, ভালোবাসি...
ভালোবাসার এটাই সংবিধান!
আদ্যন্ত জানা নেই
ওমর ফারুক জীবন
আমি আর তুমি,
আমাদের মাঝখানে একটা মৌসুমি বায়ু খেলা করে,
তুমি বারবার বিভ্রান্ত হও, আমি উদ্ভ্রান্ত!
তুমি ঋতু থেকে ঋতুতে আবর্তিত হও,
তুমি সাক্ষাৎ এক একটা মৌসুম,
তোমার ভিতর ডেকে ওঠে অসংখ্য অসংখ্য পাখি,
অগুনতি নদীর কলস্বর,
বাগানের পর বাগান ফুলে ফলে ভরে ওঠে
আর তুমি মৌসুমি বায়ুর ভিতর সুঘ্রাণ ছড়াতে ছড়াতে
ডেকে আনো অন্য মৌসুম,
তোমার ভিতর রোদ ওঠে,
উড়ে আসে মেঘের পর মেঘ, মৌসুমি ঝড়!
রোদ বৃষ্টি শেষে আলোড়নের পর
আমার ছিন্নভিন্ন আত্মা মৌসুমি ঝড়ের কবলে পড়ে
সমুদ্র দ্বিখ-িত হয়ে গেলে বিষুবরেখারও দূরে
আজীবন ডুবন্ত জাহাজ!
অথচ আমি আর তুমি অভিন্ন দুটি পথ
ভিন্ন ভিন্ন দিকে চলে গেছি,আদ্যন্ত জানা নেই
কোথায় শুরু কোথায় শেষ!
এক তুমিতেই বোধন হবো
আনাস
এক তুমিতেই সাধন হলো চতুষ্পার্শ্ব,
বোধিত প্রেম।
উত্তেজনার প্রজাপতি ঊর্ধ্বে ওঠে।
ইতস্তত গোপন হর্ষ জমতে থাকে মৌন ঘরে,
নিংড়ে দেওয়া কুসুমকাব্য ব্যথার পিঠে বিদ্ধ করে-
ব্যাপ্ত সুধা,
হঠাৎ জীবন, তোমার খেয়াল-
এক তুমিতেই ঘর তুলেছি সমুদ্রতে
আকাশ দেয়াল- কেউ দেখেনি বীর্যপাতে,
অন্য ক্ষুধা,
দু’ঠোঁট বেয়ে নুইয়ে পড়ে এক তুমিতে।
এক তুমিতেই ঝরবো, ঝরাপাতার মতো
পণ করেছি
নিষিদ্ধ ফল ক্রমশ ডুববে জলের নিচে,
উষ্ণ নয়তো শীতল সুতোয় বন্দী করে,
আমার শঙ্খ বুনতে থেকো বস্ত্রাদিতে,
যেমন করে আবিষ্কৃত বনলতার বাবুই চোখে,
জীবনানন্দ!
জীবন ভুলে জপতে থাকি ‘এক তুমিতেই বোধন হবো’-
সে আনন্দ!
মৌনতা
লুৎফুন নাহার লোপা
তখন সকাল দেখবার কথা ছিলো,
অথচ আমরা অপেক্ষা করলাম রোদের।
ভাববার কথা ছিলো আসন্ন বছর-
আমাদেরকে নিয়ে যাবে কতদূরে বা কাছে।
অথচ আমরা খুঁজে পেলাম সীমাবদ্ধতা,
আমাদের দায়িত্ব কিংবা যে পরাধীনতা
নিয়ে গেছে ভেঙে পড়বার সময়ে।
আমরা বারংবার
এতো এতো বিরোধী চোখগুলো দেখে
ভুলে গেলাম প্রাক্তন আতিথেয়তা।
কবে কোনকালে দেখেছিলাম প্রেম সেখানে-
কিংবা যে দ্বন্দ্ব টিকিয়ে রেখেছি সযতেœ
পড়ে আছে একই রকম পথ ভিন্নতায়।
তারপর অদ্ভুত সারাদিন
বয়স বাড়িয়ে দিচ্ছে মৌনতা মুহূর্তে
যুক্তির বৈষম্য- ব্যবধান,
যতটুকু ব্যবধানে আমরা অতিক্রম করতে পারি
নিজেকে।
জাতীয়: রাত পোহালেই শঙ্কার ভোট উৎসব