image
হুয়ান কার্লোস ওনেত্তি

‘কুয়ো’ কেন গল্প নয়, উপন্যাস

উপন্যাস ও ছোটগল্প: আকারের প্রশ্ন নয়, অস্তিত্বের প্রশ্ন

আনিসুজ জামান

উপন্যাস আর ছোটগল্পের পার্থক্য নিয়ে কথা বলতে গেলে আমি প্রথমেই একটি গতানুগতিক বা প্রচলিত ধারণা থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখতে চাই। সেই ধারণাটি হলো- আখ্যানসাহিত্যের এই দুই ফর্মকে পৃষ্ঠাসংখ্যা দিয়ে মাপতে যাওয়া। অনেকেই ভাবেন, ছোট আখ্যান মানেই ছোটগল্প, আবার বিপরীতে বড় আখ্যান মানেই উপন্যাস। আমার অভিজ্ঞতায়, এবং আমার পাঠে, এই ধারণার মধ্যে সমস্যা আছে।

পার্থক্যটা আসলে আকারে নয়, প্রকৃতিতে।

ছোটগল্প এবং উপন্যাস মানুষের অভিজ্ঞতাকে ধরার জন্য ভিন্ন ভিন্ন পথ বেছে নেয়।

ছোটগল্প মূলত একটি সুনির্দিষ্ট মুহূর্তকে ঘিরে জন্ম নেয়। সেখানে একটি ঘটনা থাকে বা অন্তত একটি কেন্দ্রীয় টান- যা গল্পটিকে সামনে ঠেলে নিয়ে যায় এবং শেষ পর্যন্ত কোনো না কোনোভাবে সেই কেন্দ্রের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। শেষটা খোলা হতে পারে, কিন্তু কাঠামোটি বন্ধ। ছোটগল্প জীবনের ভেতরে ঢোকে একটি দরজা দিয়ে, আর বেরিয়ে আসে আরেকটি দরজা দিয়ে। কিছু চরিত্র সেখানে থাকে, সেটা গল্পের প্রয়োজনেই।

উপন্যাসের ক্ষেত্রে বিষয়টি উল্টো। উপন্যাস কোনো একক ঘটনার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না; এটি দাঁড়িয়ে থাকে একটি দীর্ঘস্থায়ী প্রেক্ষাপটের ওপর। এখানে ঘটনা ঘটতে পারে, কিন্তু ঘটনাই মূল কথা নয়। মূল কথা হলো- একজন মানুষ কীভাবে সময়ের ভেতর বাস করে, কীভাবে স্মৃতি, চিন্তা, অভ্যাস, ব্যর্থতা আর আকাক্সক্ষা তাকে ঘিরে ধরে। উপন্যাস শেষ হতেই হবে- এমন কোনো শর্ত নেই। এটি থেমে যেতে পারে, ক্লান্ত হতে পারে, এমনকি ক্ষয়ে যেতে পারে।

এখানেই আমার কাছে পার্থক্যটি সবচেয়ে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

ছোটগল্প একটি বজ্রপাত- এক ঝলক আলো, যা অন্ধকারকে এক মুহূর্তের জন্য চিরে দেয়। কিন্তু দীর্ঘক্ষণ আলো জ্বালিয়ে রাখে না।

অন্যদিকে উপন্যাস হচ্ছে আবহাওয়া, যার ভেতরে আমরা দীর্ঘ সময় বসবাস করি।

একটি চোখ ধাঁধায়, অন্যটি ধীরে ধীরে আমাদের শরীর ও চেতনাকে ঘিরে ফেলে।

এই কারণেই আমি বলি- ছোটগল্প মুহূর্তের তীব্রতা ধারণ করার শিল্প, আর উপন্যাস হচ্ছে স্থায়িত্ব ধরে মানুষের জীবন উন্মোচনের শিল্প। ছোটগল্প আলো জ্বালায়, উপন্যাস সেই আলোয় আমাদের বসিয়ে রাখে।

এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, উরুগুয়ের লেখক হুয়ান কার্লোস El pozo (কুয়ো)-কে ছোটগল্প বলা আমার কাছে সম্ভব নয়, যদিও আকারের কারণে অনেকে ছোটগল্প ভেবে থাকতে পারেন। কিন্তু এর ভেতরের যুক্তি ছোটগল্পের নয়। এখানে কোনো সিদ্ধান্তমূলক ঘটনা নেই, কোনো নাটকীয় মোড় নেই, কোনো সমাধান নেই। এখানে আছে একটি কণ্ঠস্বর- একজন মানুষের সচেতনতা- যে কী ঘটেছে সেটা বলার চেয়ে দেখাতে চায়, সে কীভাবে বেঁচে আছে।

এলাদিও লিনাসেরো কোনো কাহিনি ঘটানোর জন্য উপস্থিত নয়। গল্পটি তার চিন্তার মধ্য দিয়েই অস্তিত্ব পায়। লেখাটি ঘটনার মাধ্যমে এগোয় না, এগোয় পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে- স্মৃতির পুনরাবৃত্তি, অপূর্ণ আকাক্সক্ষার পুনরাবৃত্তি, মিথ্যার আশ্রয়ে টিকে থাকার পুনরাবৃত্তি। সময় এখানে বাহ্যিক বিষয় নয়, ঘড়ির কোনো অস্তিত্ব নেই ‘কুয়ো’তে। এটি একটি মানসিক সময়, যা ভেঙে পড়ে, ফিরে আসে, নিজেকেই অস্বীকার করে। এই ধরনের সময়বোধ ছোটগল্পের শৃঙ্খলার ভেতরে ধরা যায় না; এটি উপন্যাসের সময়।

আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হলো- El pozo একটি সম্পূর্ণ মনোজাগতিক বা অভ্যন্তরীণ জগত নির্মাণ করে। যৌনতা, বন্ধুত্ব, সমাজ, সাহিত্য- সবকিছুর প্রতি একটি নির্দিষ্ট দৃষ্টিভঙ্গি ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়। এটি কোনো এক মুহূর্তের প্রতিকৃতি নয়, বরং একটি চিন্তার কাঠামো। যতই তা ভঙ্গুর হোক, যতই তা ক্লান্ত হোক- এটি একটি জগত।

শেষ অংশটি এই কথাই প্রমাণ করে। El pozo শেষ হয় না। এটি থেমে যায়। সেখানে কোনো উপদেশ নেই, কোনো রূপান্তর নেই। লিনাসেরো শুরুতে যেমন ছিল, শেষেও তেমনই থাকে। এটি কোনো ব্যর্থতা নয়। এটি একটি নান্দনিক অবস্থান। আধুনিক উপন্যাস মুক্তির প্রতিশ্রুতি দেয় না; এটি সংঘাতের স্থায়িত্বকে মেনে নেয়।

কারণ El pozo এমন কোনো বই নয়, যা ওনেত্তি পৃষ্ঠা ধরে ধরে লিখেছিলেন আমাকে কয়েকদিন ধরে পড়িয়ে রাখার জন্য, তারপর একটি উপন্যাস বানিয়ে শেষ করার জন্য। তিনি এটি লেখেননি পাঠের সময়টুকু দখল করে নিয়ে পরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার জন্য। ঠিক তার উল্টোটা ঘটেছে। El pozo আমার জীবনের ভেতরে, গভীরে গেঁথে গেছে। আমি বইটি থেকে বেরিয়ে আসিনি; বইটিই আমাকে বেরোতে দেয়নি।

চরিত্রটি এখনো সেখানে আছে। আমিও সেখানে আছি। আমি এখনো পড়ছি- এমনকি যখন বইটি হাতে নেই, তখনও। উপন্যাসটি শেষ হয় না শেষ পাতায়, কারণ এর সময় কাগজের সময় নয়; এটি চেতনার সময়। El pozo বন্ধ হয় না। এটি স্থায়ী হয়। এটি কোনো সমাধানে পৌঁছায় না; খোলা থাকে- একটি ক্ষতের মতো, অথবা এমন একটি প্রশ্নের মতো, যা কোনো উত্তর চায় না।

এটাই উপন্যাসের কাজ। কিছুক্ষণ আনন্দ দেওয়া নয়, একটি পরিপূর্ণ বৃত্ত এঁকে বন্ধ করে দেওয়া নয়; বরং বেঁচে থাকার একটি রূপকে ধরে রাখা। ছোটগল্প মনে থাকে; উপন্যাসে বাস করতে হয়। আর El pozo একটি উপন্যাস ঠিক এই কারণেই- কারণ আমি এখনো তার ভেতরে আছি, কারণ আমি এখনো বেরোতে পারিনি, এবং কারণ আমি জানি, আমি কখনো পুরোপুরি বেরোতে পারব না। আর সেটাই ছোটগল্প নয়।

সম্প্রতি