image
মামুন হুসাইন

‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ ভয়ার্ত জবানবন্দি

মাটিচাপা ইউনিফর্মের দীর্ঘশ্বাস

অনুপম হাসান

আশির দশকে বাংলা কথাসাহিত্যে যে ক’জন গল্পকার বা কথাসাহিত্যিক কলম ধরেছিলেন, তাঁদের মধ্যে নিঃসন্দেহে মামুন হুসাইন অন্যতম প্রধান ও সিরিয়াসধর্মী লেখক। তাঁর লেখার ভাষা অন্যদের চেয়ে যেমন আলাদা, তেমনি তাঁর গল্প বলার ধরনও সম্পূর্ণ ভিন্ন। ফলে নব্বইয়ের দশকের মাঝামঝি মামুন হুসাইনের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘শান্ত সন্ত্রাসের চাঁদমারি’ [১৯৯৫] প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই তিনি সাহিত্যমহলে মনযোগ আকর্ষণে সমর্থ হয়েছিলেন। মামুন হুসাইনের ভাষাভঙ্গি প্রচলিত আখ্যানের মতো নয়; বরং একটি দীর্ঘ স্বগতোক্তি বা প্রলাপের মতো, যেখানে ইতিহাস, অতীত-বর্তমান, স্বপ্ন এবং দুঃস্বপ্ন, দুঃখ-আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্না মিলেমিশে একাকার হয়ে যায়। মামুন হুসাইনের গল্পের গদ্যশৈলী জাদুকরী; তিনি সরলরেখায় ভাষা নির্মাণ করেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাঁর বাক্য অসমাপ্ত, বক্তব্য অপরিপূর্ণ। অনেক ক্ষেত্রেই তিনি ভাঙা ভাঙা বাক্যে বিশাল গল্পের ক্যানভাস তুলে ধরেন। যারা মামুনের লেখা পড়েছেন, তাদের এ অভিজ্ঞতা আছে! ফলে এ নিয়ে বিস্তারিত কথা না বলাই শ্রেয়।

‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ [একটি ভয়ার্ত মিথ্যার গুণকথন] উপন্যাসিকা নিঃসন্দেহে সমকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতায় অত্যন্ত শক্তিশালী এবং রূপকধর্মী রচনা। এটি প্রকাশিত হয়েছে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে। সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজনীতিতে যে পট-পরিবর্তনকারী ঘটনা সংঘটিত হয়েছে, সেই আখ্যানই এ নভেলার মূল উপজীব্য। দুই হাজার চব্বিশ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, পরবর্তী সময়ের অস্থিরতা ও ভয়ের প্রেক্ষাপট নিয়ে কাহিনীর বহুমাত্রিক বিশ্লেষণ ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ উপন্যাসিকায় মামুন উপস্থাপন করেছেন। মূলত রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্পেষণ, শাসন-নির্যাতনের ইতিবৃত্ত এ উপন্যাসিকায় উপস্থাপিত হয়েছে। নভেলার শুরুতেই এক ভয়াবহ দৃশ্যপট- চব্বিশের জুলাই-আগস্টের দিনগুলোতে যখন হেলিকপ্টার থেকে গুলির বৃষ্টি নামছে, তখন নিরাপত্তা বাহিনী কেবল কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশ পালন করেছে। লেখক দেখাচ্ছেন, কীভাবে একটি রাষ্ট্র তার পেটোয়া (রক্ষী) বাহিনীকে ব্যবহার করে এবং দিনশেষে তাদের ছুঁড়ে ফেলে দেয়। যখন জনরোষ ধেয়ে আসে, তখন এই প্রতাপশালী পুলিশ বা রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত সদস্যরা শিশুর মতো অসহায় হয়ে পড়ে। তাদের হাতে থাকে দামী রাইফেল, কিন্তু তারা মোজা খুলতে ভুলে গিয়ে কম্পমান পায়ে দাঁড়িয়ে থাকে। লেখক লিখছেন : ‘সে বছর সত্য-ন্যায় থেকে পালিয়ে, আমরা সবাই কন্ট্রোল টাওয়ারের নির্দেশে হত্যা করতে শুরু করি।’ এই স্বীকারোক্তিই ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ উপন্যাসিকার মেরুদ-।

রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী মূলত জনগণের সেবক হওয়ার কথা; কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা বাহিনী ঔপনিবেশিকোত্তর সময়ে অদ্যাবধি তারা জনগণের রক্ষায় সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারেনি অথবা তাদেরকে সেভাবে গড়ে তোলার কোনো ব্যবস্থাই রাষ্ট্র গ্রহণ করেনি। জুলাই-আগস্টে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বাহিনী শাসকগোষ্ঠীর নির্দেশেই নির্বিচারে সাধারণ মানুষের উপর আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে, সাধারণ মানুষকে গুলি করে হত্যার নৃশংস অপরাধ করেছে। একসময় রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী উপলব্ধি করতে পারে তাদের পরাজয় নিশ্চিত, তখন তারা পিছু হটতে থাকে; মামুন হুসাইন তখন এই পিছুহটা রাষ্ট্রীয় বাহিনীর অন্তর্জগৎ, মানসিক চাপ, সামাজিক-রাজনৈতিক, ব্যক্তিগত জীবন, সাংসারিক বাস্তবতা ইত্যাদি কনস্টেবল ৪৪৩ চাঁন মিয়া কিংবা ২১৬ আব্দুল হাদি, ১২৭৬ হারেচ উদ্দিনের কথায় তুলে ধরেন। নিরাপত্তা বাহিনীর জীবনবাস্তবতায় পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর সহিংস সন্ত্রাসের চিত্র ফুটে ওঠে। কনস্টেবল চাঁন মিয়া কিংবা হাদি তাদের পরনের ইউনিফর্ম লুকিয়ে সাধারণ মানুষের বেশে পালানোর চেষ্টা এবং আয়নাঘর বা ডিটেনশন সেন্টারের ভয়াবহ নির্যাতনের স্মৃতিময় কথকতা- নিরাপত্তা বাহিনী পুলিশের চেতনালোকের ভাঙাচোরা পথ বেয়ে পরাবাস্তব ভাষায় মামুন তুলে ধরেছেন। এখানে মূলত কনস্টেবল ৪৪৩ চাঁন মিয়া, কনস্টেবল ২১৬ আব্দুল হাদি এবং কনস্টেবল ১২৭৬ হারেচ উদ্দিনের মতো নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের জবানিতে তাদের মানসিক অবস্থার ভেতর দিয়ে ক্ষমতার দাপট থেকে পলায়নপর মনোবৃত্তি, অপরাধবোধ এবং ভয় চিত্রিত হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী বনাম সাধারণ জনগণের যুদ্ধের ভয়াবহতাকে তুলে ধরতে গিয়ে মামুন হুসাইন নিছক তথ্যের ওপর নির্ভর করেন নি; সংঘটিত বাস্তবতাকেও তিনি বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণনায় উঠে এসেছে- রাস্তায় ছড়িয়ে থাকা মগজ, ছিঁড়ে যাওয়া ধড় এবং হাসপাতালের মর্গে স্তূপ করা লাশ। তিনি লিখেছেন : ‘মৃত মানুষের স্তূপের নিচে কেউ হয়তো বেঁচে আছে, তুমি তাকেই খুঁজতে বেরিয়েছ।’ বইটিতে বারবার উঠে এসেছে হ্যালুসিনেশন বা বিভ্রম। পুলিশরা যখন গুলি চালায়, তখন তাদের মনে হয় হেলিকপ্টার থেকে বৃষ্টির মতো টাকা ঝরছে। কখনো বা মনে হয়, মৃত মানুষেরা কথা বলছে। এই পরাবাস্তবতা আসলে তাদের অপরাধবোধের বহিঃপ্রকাশ। কনস্টেবল চাঁন মিয়া যখন দেখে, তার গুলিতে নিহত লোকটির বুকের ওপর লেখা : ‘আমি এখনো জীবিত’- তখন সে অস্তিত্বের সংকটে পড়ে।

জুলাই-আগস্টের উত্তাল দিনগুলোতে আমরা রাজপথ দেখেছি- মিছিল দেখেছি, এবং দেখেছি ক্ষমতার দম্ভ কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে ধুলোয় মিশে যায়। কিন্তু আমরা যা দেখি নি, বা দেখার সুযোগ পাই নি, তা হলো সেই ‘হেলমেট’ আর ‘বুলেটপ্রুফ ভেস্ট’-এর আড়ালে থাকা রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত মানুষের কম্পমান হৃৎপি-। ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ সেই অদেখা অন্ধকারের এক দহনলিপি। এটি কোনো প্রথাগত গল্প নয়; বরং এটি একটি দীর্ঘশ্বাস, দুঃস্বপ্ন তথা রাষ্ট্রীয় আদেশে মানুষ মারতে বাধ্য হওয়া বা উৎসাহিত হওয়া কিছু ‘রক্ষী’র নিরাপত্তা বাহিনীর অস্তিত্বহীন হয়ে পড়ার আখ্যান। জানুয়ারি ২০২৬ সালে প্রকাশিত ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ নভেলায় চব্বিশের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যে একটি উল্লেখযোগ্য নভেলা হিসেবে গণ্য; যা শাসক-শোষকের মনস্তত্ত্বকে ব্যবচ্ছেদ করেছে এক পরাবাস্তব ক্যানভাসে। গ্রন্থের সাবটাইটেল ‘একটি ভয়ার্ত-মিথ্যার ক্ষমতা সম্পর্কিত গুণকথন’ শুরুতেই পাঠককে জানিয়ে দেয় যে, এ আখ্যান সত্য ও সরলরেখায় হাঁটে না। এটি সেই সময়ের গল্প, যখন রাষ্ট্রযন্ত্র নিজেই সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে বিরাট এক মিথ্যার ওপর দাঁড়িয়ে ছিল। মামুন হুসাইন এখানে কোনো নির্দিষ্ট নায়কের গল্প বলেন নি; এজন্যই উপন্যাসিকায় চরিত্ররা কোনো একক ব্যক্তি নয়, বরং একটি ‘সিস্টেম’ বা রাষ্ট্র-ব্যবস্থার প্রতিনিধি হয়ে উঠেছে।

‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ নভেলার সবচেয়ে শক্তিশালী ও আইকনিক দৃশ্যকল্প হলো নিরাপত্তা বাহিনী বা পুলিশের ইউনিফর্ম লুকিয়ে ফেলার আপ্রাণ চেষ্টা। যে পোশাক একসময় ছিল তাদের ক্ষমতার প্রতীক, গণঅভ্যুত্থানের মুখে সেই পোশাকই হয়ে দাঁড়ায় তাদের মৃত্যুর ভয়ানক ফাঁদ। কনস্টেবল চাঁন মিয়াকে আমরা দেখি- গায়ের ইউনিফর্ম মাটির গর্তে পুঁতে ফেলতে। এই ‘মাটিচাপা দেওয়া’ কেবল কাপড়ের টুকরো লুকানো নয়; এর মধ্য দিয়ে তার নিজের পরিচয়, পাপ-সহিংসতা এবং অতীতকে মুছে ফেলার এক ব্যর্থ প্রয়াস। রাষ্ট্রীয় রক্ষী সদস্যরা যখন ইউনিফর্ম খুলে সাধারণ লুঙ্গি কিংবা কুড়িয়ে পাওয়া কাপড় পরে পালানোর চেষ্টা করে, তখন তাদের ভেতরের ‘রক্ষী’ সত্তাটি মরে যায়, কিন্তু তারপরও ‘মানুষ’ সত্তাটি জেগে ওঠে না; বরং জন্ম নেয় এক ভীতু, পলাতক মানুষের ছায়া! তারা কীভাবে ভাঙা স্যুটকেসের ন্যাপথলিন ও তেলাপোকার গন্ধমাখা লুঙ্গি জড়িয়ে জনস্রোতে মিশে যাওয়ার চেষ্টা করে, তা লেখক তুলে ধরেছেন। এই পলায়নপর মনোবৃত্তি কেবল শারীরিক নয়, মানসিকও বটে! তারা আয়না দেখতে ভয় পায়, এমনকি নিজেদের ছায়াকেও ভয় পায়। তখন তাদের কেবলই মনে হয়, মৃত মানুষেরা দেওয়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে প্রশ্ন করবে- তাদেরকেই, সেই ভয়ে তারা কুঁকড়ে যায়, ভীত হতে থাকে। অথচ রাষ্ট্রের নির্দেশ পালন করতে গিয়ে কনস্টেবল, চাঁন মিয়া, আব্দুল হাদি কিংবা হারেচ উদ্দিনরা নিজেরা অপরাধী হয়েছে।

মামুন হুসাইন অসাধারণ দক্ষতায় ইতিহাসের আশ্রয় নিয়েছেন। তিনি বর্তমানের এই পুলিশি ব্যবস্থাকে তুলনা করেছেন ব্রিটিশ আমলের দারোগা, নীলকর সাহেব এবং ঠগীদের সঙ্গে। ব্রিটিশ শাসনামলের দারোগার ক্ষমতার গল্প যেমন মামুন বলেছেন; তেমনি সেকালের চোর-ডাকাত-ধর্ষক এবং খুনিদেরও ভাঙা ভাঙা গল্প উপন্যাসিকায় স্থান করে নিয়েছে। সেকালের দুর্ধর্ষ অপরাধী ঠগীরা যেমন রুমালে ফাঁস দিয়ে পথিক হত্যা করতো, আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্র তেমনি গুম, খুন আর আয়নাঘরের মাধ্যমে ভিন্নমত দমন করেছে- একুশ শতকের সভ্য পৃথিবীতেও। ঐতিহাসিক এই যোগসূত্র স্থাপন গ্রন্থটিকে সমসাময়িক ঘটনার ঊর্ধ্বে এক দার্শনিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে।

‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’-এর শেষের দিকে মামুন আমাদের নিয়ে যান সেই কুখ্যাত ডিটেনশন সেন্টার বা আয়নাঘরের ভেতরে। এখানে ভিক্টিম এবং ভিক্টিমাইজারের সীমানা ঝাপসা হয়ে যায়। কখনো মনে হয়, যারা নির্যাতন করছে, তারাও আসলে কোনো এক অদৃশ্য সুতোর টানে পুতুলের মতো নাচছে। বন্দিদের বিবস্ত্র করা, তাদের ওপর অমানুষিক নির্যাতন, নখ উপড়ে ফেলা, ড্রিল মেশিন দিয়ে ছিদ্র করা- এসব বর্ণনায় পাঠকের গা শিউরে ওঠে। বন্দিদের জবানিতে উঠে আসে : ‘আমরা অকাল মৃত্যু চাই কি না! আমরা আটক হই এবং ইন্টেরোগেটেড হই। পুরো বিবস্ত্র করে... আমার শরীরে কাদা, মাটি ও মলমূত্রের গন্ধ।’ এই অধ্যায়গুলো পড়ার সময় পাঠক হিসেবে দমবন্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়। লেখক দেখিয়েছেন, কীভাবে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের ‘মানুষ’ থেকে ‘তথ্যভা-ারে’ পরিণত করে এবং তারপর অপ্রয়োজনীয় আবর্জনার মতো ছুঁড়ে ফেলে।

এত রক্তপাত ও হিংস্রতার মাঝেও ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’-এ এক ক্ষীণ মানবিকতার ফল্গুধারা প্রবাহিত হয়েছে। আর তা কোনো জীবিত মানুষের জন্য নয়, বরং হারিয়ে যাওয়া প্রেম বা স্মৃতির জন্য। কনস্টেবলদের পকেটে বা স্মৃতিতে থেকে যাওয়া একটি চিরকুট বারবার ফিরে আসে : ‘না পারলে শেখায়ে নেবেন।’ এই একটি লাইন যেন পুরো গল্পে প্রণয়ের দীর্ঘশ্বাস। এই লেখাটি জনৈক কনস্টেবলকে লেখা যুবতীর এক লাইনের চিঠি, সে কী প্রেমিকা। তার সরল কোনো ব্যাখ্যা উপন্যাসিকায় মামুন হুসাইন দেন নি। নারীর আকুতি অথবা প্রেম-সংসার সবকিছুই নভেলার গল্পে বারুদের গন্ধে ভরে গেছে। পুলিশরা যখন পালিয়ে বেড়াচ্ছে, তখন তাদের মনে পড়ছে ফেলে আসা গ্রাম, মায়ের মুখ কিংবা প্রেমিকার অভিমান। কিন্তু সেই স্মৃতি এখন তাদের জন্য বিলাসিতা। লেখক প্রশ্ন তুলেছেন, ‘জীবন রক্ষার জন্য গুলি করা, অথবা বেতনের জন্য গুলি করা কিংবা নিছক গুলি করার চাকুরি!’ এই চাকুরির বেড়াজালে তারা কীভাবে নিজেদের মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়েছে, তার এক করুণ আখ্যান ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’।

‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ কোনো সহজপাঠ্য বই নয়; মামুন হুসাইন এখানে প্রচলিত উপন্যাসের বা গল্পের কাঠামো ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। নেই কোনো শুরু, নেই কোনো শেষ- আছে কেবল এক নিরবচ্ছিন্ন দহনকালের ইতিবৃত্ত। বইটি শেষ হয় এক অদ্ভুত শূন্যতার ভেতর দিয়ে। ইউনিফর্ম পুঁতে ফেলে সাধারণ মানুষের ভিড়ে নিরাপত্তা রক্ষীরা মিশে গিয়েই কী তারা সত্যিকারের মুক্তি পায়? নাকি আজীবন তাদের তাড়িয়ে বেড়াবে সেই মৃত চোখগুলো? লেখক কোনো উত্তর দেন নি, কেবল এক আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন পাঠককে। চব্বিশের জুলাই-আগস্ট এই রক্তাক্ত অধ্যায়টিকে যারা ইতিহাসের ঘটনা বা কেবল রাজনৈতিক দৃষ্টিতে না দেখে, মানবীয় ও মনস্তাত্ত্বিক লেন্স দিয়ে দেখতে চান, তাদের জন্য মামুন হুসাইনের এই উপন্যাসিকাটি অবশ্য পাঠ্য। এর আখ্যান আমাদের মনে করিয়ে দেয়, ক্ষমতা চিরস্থায়ী নয়, কিন্তু ক্ষমতার অপব্যবহারের ফলে সৃষ্ট ক্ষতচিহ্নগুলো মুছে ফেলা যায় না, বরং তা প্রায় অসম্ভব। নিরাপত্তা বাহিনী হয়তো ইউনিফর্ম বদলাতে পারে, কিন্তু তাদের হাতের রক্তের দাগ আর বিবেকের দংশন মাটির নিচে চাপা দেওয়া যায় না। ইতিহাস যখন সাহিত্যের ক্যানভাসে জীবন্ত হয়ে ওঠে, তখন তা কেবল পাঠ্য থাকে না, হয়ে ওঠে অভিজ্ঞতার অংশ। ‘রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ’ তেমনই এক অভিজ্ঞতা।

রক্ষী-পুরুষ বিসম্বাদ (উপন্যাসিকা)। মামুন হুসাইন। প্রকাশক : কথাপ্রকাশ, ঢাকা। প্রকাশকাল : জানুয়ারি ২০২৬। প্রচ্ছদ : মোস্তাফিজ কারিগর

সম্প্রতি