image
আবদুর রাজ্জাক

অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক

কিছু না লিখেই খ্যাতিমান যিনি

হোসেন আবদুল মান্নান

জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের প্রয়াণ দিবস ২৮ নভেম্বর, ১৯৯৯ খ্রি। সে হিসেবে সিকি শতাব্দী পেরিয়ে গেছে। তাঁর জন্ম ঢাকার কেরানিগঞ্জের কলাতিয়া গ্রামে ১৯১৪ খ্রি.। তিনি তিরিশের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষক ছিলেন। ১৯৩৬ সালে রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েছিলেন। এবং ১৯৭৪ সাল পর্যন্তপ্রায় একই পদে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ মার্চে তাঁকে জাতীয় অধ্যাপক পদে ভূষিত করা হয়। তবে এর আগে ১৯৭৩ সালে দেশের বাইরে দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাঁকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রি প্রধান করা হয়েছিল। জাতীয় অধ্যাপক হলেও শেষাবধি তিনি ছিলেন একজন সিনিয়র লেকচারার। পদোন্নতির জন্যে কখনো দরখাস্ত করেন নি। যদিও কয়েকবার তাঁকে পদোন্নতি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। সহকারী অধ্যাপক পর্যন্ত হয়েছিলেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে। এটাও এক অভূতপূর্ব নজিরবিহীন ঘটনা।

২.

একজন জ্ঞানতাপস, আমৃত্যু শিক্ষাব্রতী, অসাধারণ স্মৃতিধর এক দার্শনিক ছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিগত এক শতাব্দীর অধিক কালের অভিযাত্রায় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকই বোধকরি সবচেয়ে রসহ্যময় শিক্ষক এবং গুণমুগ্ধ ব্যক্তিত্ব ছিলেন যাঁকে ঘিরে কখনো আলোচনা শেষ হয়ে যায়নি। বরং প্রজন্ম পরম্পরায় নতুন মাত্রায় বিকশিত হয়ে চলেছে। এটা অবশ্যই বিস্ময়কর, যিনি গল্প, প্রবন্ধ, সাহিত্য বা ইতিহাসের বই-পুস্তক কিছু লিখেননি, এমনকি আত্মকথাও নয়। অথচ তাঁকে নিয়েই অনিঃশেষ গল্পের কিংবদন্তি নিবিড় পাঠাভ্যাস ও বিচিত্র বই সংগ্রহের একাগ্রতা মানুষকে কোন উচ্চতায় আসীন করতে পারে আবদুর রাজ্জাকই এর জ্বলন্ত নজির।

মূলত কয়েকটি স্মারক বক্তৃতা, তাঁর সময়ের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে দুর্দান্ত ইংরেজিতে লেখা কিছু চিঠিপত্র, চল্লিশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে লন্ডন স্কুল অব ইকনোমিকসে (এলএসই) উপস্থাপিত তাঁর আলোচিত পিএইচডি অভিসন্দর্ভ ছাড়া আর কোনো লেখালেখি নাই বললেই চলে। তাঁর ১৯৫০ সালে জমাকৃত (submitted) সেই বিখ্যাত সন্দর্ভের শিরোনাম ছিল Political Parties in India; যা তিনি প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক হ্যারল্ড জে. লাস্কির আকস্মিক জীবনাবসানের পরে পরবর্তী সুপারভাইজার অধ্যাপক ডব্লিউ. এইচ. মরিস বরাবর থিসিস জমা দিয়ে পিএইচডি ডিগ্রি অসমাপ্ত রেখেই দেশে ফিরে আসেন। উল্লেখ্য, হ্যারল্ড লাস্কিই তাঁর পিএইচডি’র মূল সুপারভাইজার ছিলেন। কথিত আছে যে, তৎকালীন ভারতের ভূরাজনৈতিক মতাদর্শের প্রশ্নে হ্যারল্ড জে. লাস্কি কংগ্রেস এবং পণ্ডিত নেহরুর অনুরাগী ছিলেন। পক্ষান্তরে ছাত্রআবদুর রাজ্জাক ছিলেন মুসলিম লীগ এবং মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর অনুসারী।

৩.

জানা যায়, প্রায় সত্তর বছর পরে আবদুর রাজ্জাকের সেই অভিসন্দর্ভের কপি সংগ্রহ করে নিয়ে আসে এখানকার ‘জ্ঞানতাপস আবদুর রাজ্জাক ফাউন্ডেশন’। এবং ২০২২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ পূর্তি উপলক্ষ্যে এটি বই আকারে প্রকাশ করার দায়িত্ব পালন করে একই ফাউন্ডেশন। উৎসর্গ করা হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনকে মহিমান্বিত করে। এতে বলা হয়,

‘This book is dedicated to The University of Dhaka On its 100th anniversary

The institution that was Abdur Razzaq’s Alma Mater

To which He had devoted his entire life and work From which He had derived his identity, his purpose, his joy’-

এ কাজে মূলত তাঁর একসময়ের ছাত্রী ও সহকর্মী আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন রাষ্ট্র চিন্তাবিদ অধ্যাপক ড. রওনক জাহান এবং যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত ইমেরিটাস অধ্যাপক আহরার আহমদ। এঁদের উভয়ের একনিষ্ঠ সমর্থন ও সহযোগিতা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য এবং স্মরণীয় হয়ে থাকবে। অধ্যাপক রাজ্জাকের অভিসন্দর্ভ এখন ইংরেজি ও বাংলা ভাষায় প্রকাশিত প্রায় ১৮০ পৃষ্ঠার এক পূর্ণাঙ্গ অমূল্য বই। এর প্রকাশক স্বনামধন্য ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল)।

৪.

জীবনভর আটপৌরে ঢাকাইয়া বুলিতে কথা বলা অকৃতদার, নিরহংকারী, পণ্ডিত মানুষটি নিজে কোনো বই না লিখলেও তাঁর অসংখ্য গুণমুগ্ধ ছাত্র এবং শিষ্য লিখেছেন। তাঁর বলায় হয় নিজের স্টাইলে বাংলা অথবা বিশুদ্ধ ইংরেজি শব্দের ব্যবহার ছিল বেশি। তাঁর নামে বাজারে যে একটা বই পাওয়া যায় অর্থাৎ ‘Bangladesh : State of the Nation’ বাংলায় করা হয়েছে, ‘বাংলাদেশ : জাতির অবস্থা’। এটাও তাঁর বক্তৃতার অংশ। অন্যের লেখা বইগুলো মূলত তাঁর সাদামাটা বক্তব্য নির্ভর প্রশ্নোত্তর শ্রেণির বয়ান। সত্তর-আশির দশকের টেপরেকর্ডার আশ্রয়ী তাঁর স্বতঃপ্রণোদিত তথ্যপ্রবাহ। যে সকল বরেণ্য লেখক ও গবেষক এমন মহতি আয়োজন করে নিজেরাও আলোকিত হয়েছেন তাঁদের মধ্যে আহমদ ছফা, অধ্যাপক সরদার ফজলুল করিম, হুমায়ুন আজাদ, শিল্পী এসএম সুলতান, নাসির আলী মামুন, হুমায়ূন আহমেদ, ড. সলিমুল্লাহ খান প্রমুখ। সরদার ফজলুল করিমের বই ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও পূর্ববঙ্গীয় সমাজ’ একটি সংলাপধর্মী আলাপচারিতা তা তিনি নিজে স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, “রাজ্জাক স্যার তাঁর ইতিহাসভিত্তিক আলাপের ইতিকথা লিখিতভাবে উপস্থাপন করতে পারতেন- যা অধিকতর মূল্যবান হতো।কিন্তু তাঁর এক স্বভাব যে, তিনি কিছু লেখেন না। লিখতে তাঁর ভয়ানক অনিচ্ছা অথচ সুন্দর আকর্ষণীয় মানুষ তিনি।”

হুমায়ুন আজাদের বই ‘সাক্ষাৎকার’এভাবেই লেখা। এতে তিনি লিখেছেন, ‘আবদুর রাজ্জাক প্রাচীন ঋষিদের মতো, তিনি নিজের দীর্ঘ ও সমগ্র জীবন ব্যয় করেছেন জ্ঞান আহরণে এবং ঋষিদের মতোই তিনি অবলীলায় অবহেলা করে গেছেন পার্থিব সাফল্য। রচনা করেননি মোটা মোটা বই, অলংকৃত করেননি জ্যোতির্ময় বিভিন্ন আসন। শুধুই জ্ঞানের জন্য সব ত্যাগ করে তিনি নিজে হয়ে উঠেছেন সময়ের জ্ঞানতাপস’। একই সাক্ষাৎকারে আরও একটি অসাধারণ কথা বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে ছোট থেকে বড়ো হওয়ার, তুচ্ছ অবস্থা থেকে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ার যে সুযোগ রয়েছে,তা দুনিয়ার কোথাও নেই। অর্থাৎ কম গুরুত্বপূর্ণ মানুষদের বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা এখানে আছে।’

উল্লেখ করা যায়, লেখক আহমদ ছফার ‘যদ্যপি আমার গুরু’ প্রায়একই বৈশিষ্ট্যের পুস্তক।

৫.

প্রয়াত কথাসাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ লিখেছেন, ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ক্লাবে বসে দাবা খেলার ফাঁকে তাঁর কিছু কথা চমকে দেওয়ার মতো ছিল। পড়ার পরে দাবা ছিল তাঁর দ্বিতীয় নেশা। এক সন্ধ্যায় ক্লাবে প্রবেশ করে তিনি সবার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন, ‘দেখুন, এই ছেলে ইকনোমিকস ভালো জানে’। সেই ছেলেটা আর কেউ নন, পরবর্তীতে ভারতীয় বাঙালি নোবেল লরিয়েট অমর্ত্য সেন। বলাবাহুল্য, আশির দশক পর্যন্ত অমর্ত্য সেন ঢাকায় এলেই আবদুর রাজ্জাকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে যেতেন। অমর্ত্য সেনের বাবা আশুতোষ সেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক ছিলেন। তখন আবদুর রাজ্জাকের সহকর্মী ছিলেন।

৬.

রাজনীতি, অর্থনীতি, ইতিহাস, প্রাচ্যতত্ত্ব ও দর্শন, সাহিত্য, নৃতত্ত্ব, শিল্পকলাসহ বিচিত্র ধরনের বই সংগ্রহ ও পড়ার বাইরে অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাকের দাবা খেলার নেশা ছিল প্রবল। খেলায় হারতে চাইতেন না। নীলক্ষেত, পলাশী, নিউমার্কেট নিজে বাজার করা এবং রান্না-বান্নার শখ ছিল। গরুর মাংস রান্না করা এবং খেতে ও খাওয়াতে পছন্দ করতেন। এমনকি বিদেশে গিয়েও গোমাংস ক্রয় এবং স্বহস্ত রান্না খেয়েছেন। একবার শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীনসহ স্পেন ভ্রমণ এবং বাজারে গিয়ে শিল্পাচার্যকে দিয়ে গরুর স্কেচ আঁকিয়ে দেখানোর গল্প আছে। কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘গোমাংস শৌর্য ও শক্তির আধার। হিন্দুরা গোমাংস বাদ দেওয়ার পর থেকেই সকল বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছে’। বিদেশে কোথাও গেলে কাঁচা বাজারে আর বই পাড়ায় যেতে বলতেন। এতেই নাকি একটা দেশের সত্যিকারের চালচিত্র অনুধাবন করা যায়। বই পড়া নিয়ে তাঁর গল্পের শেষ নেই। ১৯৪৫-৫০ সাল অবধি বিলেতের ইন্ডিয়া অফিস লাইব্রেরিতে আবদুর রাজ্জাক নিয়মিত যেতেন। তখনও ভারতীয়রা সেখানে বিশেষ যেতো না। তাঁর বই পড়ার নেশা ও মগ্নতা দেখে বৃটিশ বুড়ো দুই পোর্টার তাঁর একার জন্যে ফায়ারপ্লেস জ্বেলে দিয়ে তারা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম করতেন। আর রাজ্জাক হারিয়ে যেতেন বইয়ের মহাসমুদ্রের হাজার বছরের কল্লোলে।বই পড়া নিয়ে তাঁর একটা মজার কথা, ‘বই পড়া ব্যাপারটি হলো এমন, আপনি একটি বই পড়েছেন তারপর নিজেকে প্রশ্ন করেন, আপনি একই বিষয়ে আবার আরেকটি বই আপনার ভাষায় লিখতে পারবেন কিনা? তবেই বইটি পড়া হলো’।

৭.

প্রথম দর্শন। ১৯৮২ সালের শেষ দিকের ঘটনা। সাদা ফতুয়া-লুঙ্গি পরিহিত ভিয়েতনামের হো চি মিন-এর মতো চেহারার এক বৃদ্ধকে দেখে সেদিন আমরা মোটেও ভাবিনি তিনি এক জীবন্ত কিংবদন্তি। শ্রেণি কক্ষের সতীর্থদের সবার দৃষ্টি পড়ে তখনই যখন প্রফেসর শামসুল হুদা হারুন বৃদ্ধকে সজোরে ‘স্যার’ সম্বোধন করে ওঠেন এবং কদমবুসি করতে থাকেন। বৃদ্ধ যথারীতি শ্রেণিকক্ষে প্রবেশ করলেন-

-হারুন, আপনে কী পড়াইতেছেন?

হারুন স্যার বললেন,

-স্যার, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি পড়াচ্ছি।

-খুব ভালা বিষয় লইছেন, তবে ইনারা কী এশিয়ার ম্যাপ চিনেন, জিজ্ঞাসা কইরেন, আগে ম্যাপটা চিনা দরকার।

বৃদ্ধ আর কিছু না বলে শ্রেণিকক্ষ ত্যাগ করলেন। প্রস্থানের পরে স্যারের কাছে আমরা কৌতূহলভরে জানতে চাই বৃদ্ধের পরিচয় কী?

প্রফেসর শামসুল হুদা হারুন বললেন,

- তিনিই আমাদের জ্ঞানতাপস জাতীয় অধ্যাপক আবদুর রাজ্জাক। আমাদের বিভাগের প্রায় সকল ছাত্র এবং শিক্ষকের শিক্ষক তিনি।

সম্প্রতি