কুসুম তাহেরা
নীলের বয়স সবে চব্বিশ। এই বয়সে চারপাশে লোভনীয় আকর্ষণের ছড়াছড়ি। অল্প সান্নিধ্যেই মস্তিষ্কে চুঁইয়ে পড়ে ডোপামিন; মনে হয় যেন স্বর্গ হাতের মুঠোয়।
নীল তার অফিসে প্রেমিকা অরণীকে চাকরি দিয়েছে, আর তাদের বাসাও খুব কাছাকাছি। কিন্তু স্বর্গে পৌঁছানোর পরের ধাপ হলো- স্বর্গ থেকে বিদায়। আনন্দের পরবর্তী ধাপ, অবসাদ।
গতকাল গভীর রাত পর্যন্ত নীল অরণীর সঙ্গে মদ্যপান করে শরীর ঝিমিয়ে পড়েছিল। অ্যাপ ক্যাবে অরণীকে নামিয়ে বাড়ি ফেরার পর খাওয়া-দাওয়া না করে শুয়ে পড়ল। স্বপ্নে দেখেছিল, তার মুখ ঢেকে যাচ্ছে অরণীর সিগারেটের ধোঁয়ায়।
‘এই গুড্ডুঙ গুড্ডু বয়, দু’টান দে না! তোকে আজকে খারাপ করেই ছাড়ব রে!’
অরণীর খিলখিল করে হাসি, হাত বাড়িয়ে সিগারেট ঠেলে দিচ্ছে। তার সেই হাসি নীলের বুকের ভেতরে ঝড় তুলছে।
হঠাৎ নীলের ঘুম ভেঙে যায় অস্বস্তিতে। কান ঝাঁঝাঁ করছে, মনে হচ্ছে ফেটে যাবে। গায়ে ঘাম ছুটছে। ভাবতেই আতঙ্কিত- সে কি মরে যাচ্ছে!
মশারি ছিঁড়ে নীল ছুটে ওয়াশরুমে গিয়ে বমি করে। বমি করার পর একটু হালকা লাগে। আবার বিছানায় শুয়ে পড়ে।
ফোন বেজে ওঠে। তাকিয়ে দেখল, মশারির মধ্যে বাজছে স্ক্রিন। নাম ফুটেছে- ‘অরণী।’
নীল ও অরণীর প্রথম দেখা হয়েছিল সন্ধ্যাবেলায়, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির মধ্যে। রোদ-মেঘের খেলা শেষে শহরের ধুলো-ঝরা ফুটপাতে নরম আলো পড়ে। ধুলোমাখা ফুটপাতে এক ছোট ক্যাফে, জানালার ধারে বসে অরণী। হাতে ধরা সিগারেট, টেবিলে বই। তন্ময় হয়ে যেন শব্দের ভেতরেই জীবন যাপন করছে সে। নীল অবাক হলো- সাহসী নারী।
ক্যাফেতে ঢুকল নীল, ছাতা হাতে। চোখে যেন কারো খোঁজ। দু’জনের চোখের মিলনই যথেষ্ট ছিল- অদ্ভুত এক ভালো লাগা কাজ করল। সাধারণ দেখা নয়, যেন এক নতুন সূচনা।
সেই দেখা থেকেই কফির কাপে কাপে প্রেম জেগে উঠল। কফির কাপ পেরিয়ে, পার্কের বেঞ্চে, গোধূলির আলোয়, অনুভবের গভীরে।
নীল জানালো সে একজন চিত্রশিল্পী। মানুষের মুখ আঁকে, কিন্তু মুখের ভেতরের সত্য খুঁজে বের করে রঙ-রেখায়। অরণী ছিল এক রহস্যময় নারী, যাকে নীল ভালোবাসার রঙ দিয়ে আঁকতে চেয়েছিল। কিন্তু অরণীর শান্ত মুখে, গভীর চোখে দুঃখ দেখতে পেয়ে, নীল বুঝেছিল- সমীকরণ সহজ নয়। হয়তো সেই রহস্য খুঁজে বের করার চেষ্টা থেকেই তাদের সম্পর্কের গভীরতা বাড়ছিল।
একদিন অরণী ফোনে রাগ করল,
‘ভুলে গিয়েছিস? আজকে তোকে বাসায় আসতে হবে। কাল থেকে কোনো যোগাযোগ নেই। ফোন নট রিচেবল বলছিল। এখন ফোন রাখো আর তাড়াতাড়ি বাসায় আয়। বাসায় আজকে কেউ নেই।’
নীল বলল, ‘ওকে, আসছি।’
আধা ঘণ্টা বাদে লক্ষ্মী ছেলের মতো এসে পৌঁছাল। দুটো সিগারেট শেষ, তৃতীয়টা ধরাবে কি না ভাবছিল। হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে। অরণী দ্রুত গায়ের জামা বদলিয়ে স্লিভলেস টপ পরল। চিরুণী দিয়ে চুল আঁচড়ে পিঠে ফেলল। এসি এক পয়েন্ট কমিয়ে দিল।
দরজা খুলে নীলকে দেখে অরণীর মন সতেজ হলো। কিন্তু অস্বস্তি বজায় ছিল। নীল ঘরে ঢুকতেই অরণী ফিরে এলো। নীল অরণীকে জড়িয়ে ধরল।
‘খুব মিষ্টি গন্ধ, অরণী। তুমি বললে...’ অরণী কেঁপে উঠল। মন ভুললেও শরীর ঠিক মনে রাখে। কোটি কোটি কোষ দিয়ে গড়া শরীর, কোষ মরে গেলেও ডিএনএ কোড নতুন কোষে স্থান দেয়।
অরণীর মাথা গরম হয়ে গেল। নীল আচমকা গাল চেপে মুখ কাছে টেনে নিল। দু’জনের নিঃশ্বাস গাঢ় হলো। অরণী বলল, ‘আস্ত একটা জন্ম তোকে জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে মেরে শোধ তুলব। আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে? পাশে থাকবে আমৃত্যু।’
হঠাৎ চোখের জ্যোতি আস্তে আস্তে নিভে এল। শরীর শিথিল হয়ে আবার রক্ত-মাংসে ফিরে এলো। নীল অরণীর দিকে তাকিয়ে রইল।
গল্পে আসে নতুন চরিত্র- শিশির, অরণীর অতীত প্রেমিক।
তাদের প্রেম নিখুঁত ছিল, ঠিক বইয়ের পাতার মতো। কিন্তু হঠাৎ এক বিশ্বাসঘাতকায় শেষ হয়। অরণী বলত, ‘শেষটা ঠিক হয়নি।’
নীল ধীরে ধীরে এই ভালোবাসার জালে আটকে গেল। সে অরণীর অতীত ভুলে গিয়ে ভবিষ্যতের ছবি আঁকতে শুরু করল। কিন্তু অরণী ভিতরে এখনও রেখে গিয়েছিল এক টান- এক অসমাপ্ত পৃষ্ঠা, যা সে বন্ধ করতে পারেনি।
একদিন হঠাৎ অরণী তার সুগন্ধ নিয়ে হারিয়ে গেল। ফোন বন্ধ, ক্যাফে বন্ধ, অফিসও বন্ধ। নিখোঁজ!
নীল খুঁজতে থাকে সর্বত্র, কিন্তু কিছুই পাওয়া যায় না। কেউ স্বেচ্ছায় হারিয়ে গেলে, তাকে খুঁজে পাওয়া যায় না। একদিন বন্ধু জানালো, অরণী শিশিরের কাছে ফিরে গেছে। শিশির বলেছে, সে বদলে গেছে, অরণীর সঙ্গে সংসার করবে। অরণী সেই সংসারে বিশ্বাস করে।
নীল উদাস হয়ে ভাবল- বিশ্বাস আর অভিমান এই দুইয়ের দোলাচলে প্রেম অনেক সময় ভাসে, আবার ডুবে যায়। হয়তো অরণী তাকে কখনোই ভালোবাসেনি। কেবল আশ্রয় খুঁজেছিল, শিশিরের ফাঁকা জায়গা পূরণ করতে। চিঠি ছিল শুধু শরীর বা হৃদয়ের নয়- বিশ্বাসের। অরণী বিশ্বাস করিয়েছিল নীলের সঙ্গে নতুন গল্প লিখবে। কিন্তু সে শুধু একটি ‘বিরতি’ নিয়েছিল তার পুরনো গল্পে।
নীল এখন আঁকে। তবে মুখ নয়, আঁকে ছায়া। মায়াহীন ছায়া। সে শিখেছে- সব প্রেম আলো হয় না। কিছু প্রেম শুধু ছায়া হয়ে থাকে। কিছু মানুষ আয়নার মতো; ভাঙলে কেবল নিজেকেই কেটে ফেলা যায়।
কেউ কেউ ফিরে আসে, আবার হারিয়ে যায়
কেউ কেউ থেকে যায়, হারিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায়...
সারাদেশ: সরাইলে কর্মরত পোলিং অফিসারের মৃত্যু
সারাদেশ: যশোরে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ
সারাদেশ: বোরো ধান চাষাবাদে ব্যস্ত কৃষকরা