ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-৩০
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
‘নিউ ইয়র্কে কবি’১ কাব্যের কবিকে নিয়ে নিউ ইয়র্ক শহরের অন্বেষণ ও উদযাপন শুরু করলাম আবার।
এ শহরে এসেছি অনেকবার, তবুও প্রতিবার একে মনে হয় নতুন। তবে এবার ঘুরব লোরকাকে নিয়ে, একশ’ বছর আগে তিনি কীভাবে এ শহরকে দেখেছেন, এ সময়ে কতটুকু তা বদলেছে। আর বোঝার চেষ্টা করব তাঁর দেখার সাথে আমার দেখার মিল অমিল।
নিউ ইয়র্ক পৌঁছার পরপরই ২৮ জুন, ১৯২৯ তারিখে পরিবারের কাছে লেখা চিঠিতে নিউ ইয়র্ক নিয়ে উচ্ছ্বসিত ভাব প্রকাশ করেছিলেন লোরকা:
‘শহরটিতে পৌঁছোনোমাত্র এক বড়ো বিস্ময় লাগে, কিন্ত এ ভয় দেখায় না। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিদ মানুষের কাজ আমাকে প্রাণিত করেছে আর নিষ্কলঙ্ক প্রকৃতির সৌন্দর্য দেখে আমি অভিভূত বোধ করেছি। অবিশ্বাস্য। বন্দর আর আকাশচুম্বী বাড়ির আলো আর আকাশের তারা মিলেমিশে ধাঁধা লাগিয়ে দেয়, আর হাজার হাজার আলো, গাড়ির নদী পৃথিবীর মাটিতে এক অনন্য জাঁকজমক সৃষ্টি করেছে। এই চোখধাঁধানো উন্মত্ত উদ্দাম ব্যাবিলনের তুলনায় প্যারিস এবং লন্ডন বড়োজোর দুটো গঞ্জ।’২
নিউ ইয়র্কে কো?া থেকে শুরু করব তা ঠিক করাই এক কঠিন ব্যাপার। তবে এ ব্যাপারে একটি পুরনো প্রথাকে অনুসরণ করলাম। বলা হয়, সদ? দরজা দিয়ে ঢুকে যাও। পৃথিবীর রাজধানী ধরা হয় নিউ ইয়র্ককে, আর নিউ ইয়র্কের রাজধানী বলা যায় ম্যানহাটানকে। আবার তারও কেন্দ্রস্থল আছে, আমার কাছে তা হলো টাইমস স্কোয়ার। তা দিয়েই শুরু করি।
পৃথিবীর একমাত্র স্থান যাকে প্রতিবছর একটি বিশেষ সময়ে দেখে থাকি তা হলো টাইমস স্কোয়ার। টিভি পর্দায় এ চত্বরের ওয়ান টাইমস স্কোয়ার ভবন থেকে নববর্ষের কাউন্ট ডাউন আর বল ড্রপ দেখতে দেখতে, এ চত্বরটি আপন না হোক, পরিচিত হয়ে উঠেছে। ইচ্ছে ছিল নববর্ষ সূচনার মুহূর্তটি টাইমস স্কোয়ারে হাজারো মানুষের মাঝে দাঁড়িয়ে উৎযাপন করব। সে স্বপ্ন পূরণের সুযোগ হয়নি। তবে নিউ ইয়র্কে আসলেই টাইমস স্কোয়ারে আসি, এবারও আসলাম।
এখানে বরাবরের মতো স্বাগত জানালো ডিজিটাল বিলবোর্ড; যা হয়ে উঠেছে টাইমস স্কোয়ারের আইকন। বিশাল, উজ্জ্বল, নাটকীয়, মনোরম এ বিলবোর্ডগুলি যেন নিউ ইয়র্কের প্রতিচ্ছবি। এদের পাদদেশে বিচিত্র এক জমায়েত অগণন মানুষের- কত দেশের, কত বর্ণের, কত ধর্মের। আর কি না করছে এরা- নাচানাচি, লাফালাফি, গান-বাজনা, আরো কত কী। খাবার ও পণ্য বিক্রি হচ্ছে শত রকমের। এ চত্বরের একই ছবি, একই শব্দ- ঊষালগ্নে, ভর দুপুরে, পড়ন্ত বিকেলে, গোধূলিবেলায়, নিশিরাতে। একশ’ বছর আগে লোরকা দেখেছেন এ ছবি, শুনেছেন সে শব্দ, আর তার কি দারুণ বর্ণনা করেছেন, এক কবির দেখার চোখ, বলার স্বরই আলাদা:
‘অতিকায় আকাশচুম্বী বহুতলগুলোর পা থেকে মাথা রঙিন আলোয় সাজানো ঝাঁ-ঝাঁ বিজ্ঞাপন, বদলে যাচ্ছে আলোর রং, সেটা চোখের পলকে ঘটে যাচ্ছে, কী দারুণ, নীল, লাল, সবুজ, হলুদ আলোর ফোয়ারা, লাফিয়ে আকাশ ছুঁয়ে ফেলছে। চাঁদের চেয়েও লম্বা, নিভছে আর জ্বলে উঠছে। ব্যাঙ্ক, হোটেল, গাড়ি, সিনেমা হলের নাম, কত রংবাহারি ঝলমলে পোশাক, কত রকমের রুমাল, সাহসী সাজসজ্জার ভিড় ওপরে উঠছে আর নামছে, পাঁচ কি ছ’টা ভিন্ন ভিন্ন নদীর দৃশ্য, গাড়ির হর্ন আর চিৎকার, রেডিওর গান, আলোর সাজে উড়োজাহাজ ???চার চালাচ্ছে। হ্যাট, সুট, দাঁতের মাজন, অক্ষর বদলে যাচ্ছে। ড্রাম আর ঘণ্টা বাজছে। পৃথিবীর সবচেয়ে আধুনিক, সবচেয়ে বেপরোয়া নগরের অহংকারী মনভোলানো চমকলাগা জমকালো দৃশ্য।’২
একশ’ বছর আগের এ চিত্র, শব্দ কি বদলেছে? একটুও নয়।
টাইমস স্কোয়ারে ঘড়ি যেন থেমে আছে। আর এখানে তো টুয়েন্টি ফোর সেভেন- আমেরিকার অতি পরিচিত শব্দ- দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৭ দিন- অর্থাৎ বিরতিহীন চলছে বিচিত্র আনন্দধারা। তাই সময় ভুলে গিয়েছিলাম। নাতাশা ঠিকই মনে করিয়ে দিল রাত ৮টায় ব্রডওয়ে শো হ্যামিলটন দেখতে যেতে হবে, বেশি সময় নেই হাতে। আমাদের টিকিট সে আগেই কেটে রেখেছিল।
টাইমস স্কোয়ারে স্ট্রিট শো-এর সাথে স্ট্রিট ফুডও অফুরন্ত। পাশের এক ভ্যান থেকে সবাই শরমা ও কোক কিনে খেয়ে নিলাম। বললাম, ‘এবার চল ব্রডওয়ে স্ট্রিটের থিয়েটার ডিস্ট্রিকে, সেখানে পৌঁছতে সময় লাগবে।’ নাবিল বলল, ‘আমরা থিয়েটার ডিস্ট্রিকেই আছি। এর অংশ টাইমস স্কোয়ার। আমাদের শো হবে রিচার্ড রজার্স থিয়েটার-এ, ওয়েস্ট ফোরটি সিক্সথ স্ট্রিটে, এখান থেকে হেঁটে যেতে লাগবে ২ মিনিট। এখানেই সব থিয়েটার হল, ৪-৫টি আছে ব্রডওয়ে স্ট্রিটে।’ ভালই, নাবিল গুগলে সব সার্চ করে রেখেছে। আমার ধারণা ছিল ব্রডওয়ে স্ট্রিটেই সব থিয়েটার হল। সময় যখন আছে হেঁটে হেঁটে থিয়েটার ডিস্ট্রিক দেখতে লাগলাম। নাবিল জানাল, ‘৫০০-এর উপর সিট থাকলেই শুধু কোনো হলকে ব্রডওয়ে থিয়েটার হিসেবে গণ্য করা হয়। এ থিয়েটার ডিস্ট্রিকে এরকম ৪০টির মতো হল আছে। আমরা যে হলটিতে শো দেখব সেখানে সিট আছে ১৩০০টি। সেটি অনেক পুরনো একটি হল, চালু হয়েছে ১৯২৪ সালে।’
থিয়েটার ডিস্ট্রিক জায়গাটি লোরকার খুব প্রিয় ছিল। নিউ ইয়র্কে থাকাকালীন তিনি এখানে প্রায়ই আসতেন।লোরকার খুব আশা ছিল নিউ ইয়র্কে তাঁর একটি নাটকের শো হবে। ১৯৩০ সালের দিকে লোরকা লিখেছিলেন একটি নাটক- এল পাবলিকো, তাঁরসবচেয়ে জটিল ও গভীর নাটক। নাটকটির মাধ্যমে স্পেনীয় নাটকে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। এ সময়টিতে লোরকা লিখেছিলেন আরো একটি পরাবাস্তববাদী নাটক- কোয়ানদো লাস সিঙ্কো আনিওস পাসন।৩
থিয়েটারপাড়া ঘুরে সময়মতো ঢুকলাম রিচার্ড রজার্স থিয়েটারে। সুদৃশ্য, বনেদী হল- সব দিকে নান্দনিকতা। তিন ঘণ্টার শো, মাঝখানে ছিল ১৫ মিনিটের বিরতি। মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখলাম, শুনলাম এই মিউজিক্যাল হ্যামিলটন। কী সুনিপুণ অভিনয় দক্ষতা! কী চমৎকার আলো ও শব্দের ব্যবস্থাপনা! সবকিছুতেই সর্বোচ্চ মানের পেশাদারিত্ব। ব্রডওয়েতে শো দেখার আবহই আলাদা।
নাতাশা বলল, ব্যাটারি পার্কে যাবে, সেখান থেকে হাডসন নদীর পাড়ে রাতের আলোতে লেডি লিবার্টি ও হারবার দেখবে। নাবিল বলল, রাতের ফ্রিডম টাওয়ার ও ব্রুকলিন ব্রিজ দেখবে। বললাম, ‘এখন রাত এগারোটা। সব বন্ধ হয়ে গেছে।’ তারা দুজনে গুগলে দেখল, ব্যাটারি পার্ক বন্ধ হবে রাত ১টায়। বাকিগুলি খোলা বা বন্ধ কিছু আসে যায় না, কারণ দেখা হবে বাইরে থেকে।
ট্যাক্সি করে নামলাম হাডসন রিভার গ্রিনওয়ে-তে। নাবিল, নাতাশা ও ফারজানার সাথে আমিও বলে উঠলাম, ‘ওয়াও!’। কী স্বপ্নিল দৃশ্য চারিদিকে- এত ম্যাজিক, এত চলচ্চিত্র- জাদু ও বাস্তবের মাঝে এই তাহলে ম্যাজিক রিয়েলিজম!
কোনটি ছেড়ে কোনটি দেখব। দূরেরটি হাতছানি দিয়ে ডাকছে কাছে, তাকে দিয়ে শুরু করি।
এক হাতে বই ও অন্য হাতে মশাল নিয়ে গ্রীবা উঁচু করে গর্বিত ভঙ্গিতে স্বাগত জানাচ্ছে লেডি লিবার্টি। লিবার্টি আইল্যান্ডের রাতের স্বপ্নিল আলোয় লেডি লিবার্টিকে মনে হচ্ছে গ্রিক দেবী এথেনা- রোমান দেবী লিবার্টাস নয়। তার চারপাশের এক স্বর্গীয় দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে হাডসন নদীর জলে। সাথে যোগ হয়েছে পাশের এলিস আইল্যান্ডের সুদুশ্য। হারবারের নিরাপদ বুকে ঘুমানো ফেরি, জাহাজ ও নৌকাগুলিতে এখনো জ্বলছে আলো। দু’একটি জাহাজ এখনো চলছে, তবে খুব ধীরে, মনে হচ্ছে তাদের ঘুমানোর সময় হয়ে গেছে। হাডসন নদীর ওপারের নিউ জার্সির স্কাইলাইনের ম্লান আলো এপারের ম্যানহাটানের জ্বলমলে স্কাইলাইনের বিপরীতে মিইয়ে গেছে। তবে দুটি শহরের আলোর ঝর্নাই এসে মিশেছে হাডসনের ঢেউ তোলা জলে- তৈরি করেছে এক মিলিত বর্ণিল ছন্দ।
ম্যানহাটানের পশ্চিম দিকে বয়ে গেছে হাডসন নদী, পূর্ব দিকে ইস্ট রিভার, এ দুটি নদী এসে মিলিত হয়েছে ব্যাটারি পার্কের দক্ষিণে- সে পথ ধরে আমরা এগোতে লাগলাম হাডসন রিভার গ্রিনওয়ের ধার দিয়ে। দূরে এখনো লেডি লিবার্টিকে দেখা যাচ্ছে। নাবিল ও নাতাশা গুড নাইট বলে তাকে বিদায় দিল।
এত রাত হয়ে গেছে, কারো কোনো তাড়া নেই। চিন্তা হলো তারা আবার ভোরে সাইনরাইজ দেখে হোটেলে ফিরতে চায় কিনা। তাহলেও অসুবিধা কী? আমাদের অফিস নেই, স্কুল নেই, এখানে এসেছি বেড়াতে, বেড়ানোর তো রাত আর দিন নেই।
কিছু সময় হেঁটে পেলাম সিটি হল- চমৎকার স্থাপত্যের মনোরম এক ভবন। অনেক রাত, তাই ভেতরে যাবার সুযোগ হলো না। পাশেই নিউ ইয়র্কের ফিনান্সিয়াল ডিস্ট্রিক। সিটি হল পার্কিং-এর পাশ দিয়ে সেন্টার স্ট্রিট ধরে উঠলাম প্রবেশ পথে, সামনেই ব্রুকলিন ব্রিজ।
ইস্ট রিভারের বুকে ব্রুকলিন ব্রিজে দাঁড়িয়ে তার দু’পাশে একই সাথে দেখছি নিউ ইয়র্ক নগরীর দুই জনপদ- ব্রুকলিন, সামনে যেখানে যাচ্ছি, আর ম্যানহাটান, যা আগেই আমরা দেখে এসেছি। গথিক স্থাপত্যের টাওয়ার, সাথে দুপাশে ঝোলানো বিশাল তারে লাগানো বাতি মনে হচ্ছে এক নক্ষত্রপুঞ্জ। এর প্রতিবিম্ব পড়েছে নিচের ইস্ট রিভারের কালো জ্বলে, তা সৃষ্টি করেছে আরেক ছায়াপথ।
পেছনে এখনো দেখা যাচ্ছে ম্যানহাটানের আলো ঝলমলে স্কাইলাইন। দীপ্তিময় হয়ে আছে একটু আগে যেখানে ছিলাম- সিটি হল। একটু পরেই আপন গৌরবে দাঁড়িয়ে আছে আলোয় দীপ্তমান ফ্রিডম টাওয়ার- ১৭৭৬ ফিট উচ্চতায় দাঁড়িয়ে আমেরিকার ১৭৭৬ সালের স্বাধীনতা বর্ষকে স্মরণ করছে। ডাইনে এখনো দেখা যাচ্ছে স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, যাকে নাবিল ও নাতাশা গুড নাইট বলে এসেছিল।
ব্রুকলিন ব্রিজের বাঁয়েই দেখি শুয়ে আছে তার এক সাথী- ম্যানহাটান ব্রিজ। মনে হচ্ছে মানিকজোড়। তবে ব্রুকলিন ব্রিজকে মনে হয় ধ্রুপদি স্থাপত্যের, আর ম্যানহাটান ব্রিজকে মনে হয় আধুনিক স্থাপত্যের। ধ্রুপদি ও আধুনিক- এই দুইয়ে মিলেই নিউ ইয়র্ক।
ব্রুকলিন ব্রিজের ওপর হাঁটছি, আর দেখছি সামনের, ডানের, বাঁয়ের দৃশ্য, মাঝেমধ্যে পেছনের দৃশ্য। ধীরে ধীরে ব্রুকলিন ডাউনটাউন কাছে আসছে, আর ম্যানহাটান মিলিয়ে যাচ্ছে।
মনে পড়ল লোরকার কথা। এ রকম মাঝে মধ্যেই লোরকা আসতেন এ ব্রিজে হাঁটতে, আর চারদিকের পরাবাস্তব দৃশ্য দেখতে। জানতে ইচ্ছে করে আন্দালুসিয়ার কবি লোরকা ব্রুকলিন ব্রিজের কবি হার্ট ক্রেনের সাথে এ ব্রিজের ঠিক কোথায় দেখা করেছিলেন? মনে পড়ে গেল কিছু ইতিহাস, কিছু কাহিনি।
হার্ট ক্রেনকে বলা হয় ব্রুকলিন ব্রিজের কবি। ১৯২৯ সালে তিনি লিখছিলেন তাঁর একমাত্র দীর্ঘ কবিতা ‘দি ব্রিজ’৪, যার প্রথম কবিতা টু ব্রুকলিন ব্রিজ। ব্রুকলিন-এ সে সময়ের দুজন বড় কবির সাক্ষাৎ ঘটে, তাদের একজন স্পেনীয়- ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা, আরেকজন মার্কিন- হার্ট ক্রেন। অনেকে আমেরিকার বিংশ শতাব্দীর বায়রন বলেন হার্ট ক্রেইনকে। এ দু’জন কবির সাক্ষাৎ এক উল্লেখযোগ্য ঘটনা বলে বিবেচিত। তাদের এ সাক্ষাৎ নিয়ে সমসাময়িক কবি ফিলিপ লেভাইন রচনা করেন কবিতা On the Meeting of Garcia Lorca and Hart Crane’ ৫। তিনি এ কবিতায় উল্লেখ করেন যে, কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষা বিজ্ঞানের ছাত্র তার কাজিন আর্থার লিবারম্যান ১৯২৯-এর কোনো একসময় লোরকাকে নিয়ে ব্রুকলিন যান, এবং হার্ট ক্রেনের সাথে তাঁর পরিচয় করিয়ে দেন। আর্থার ইংরেজি ও স্পেনীয় দুটি ভাষাই জানতেন এবং সে জন্য এ দুই কবির মাঝে দোভাষীর কাজ করেন। তবে তাঁদের মধ্যে কি আলোচনা হয়েছিল তা নিয়ে কিছু বলেননি। তবে কবিতায় একটি বর্ণনা দেয়া আছে: আর্থার লিবারম্যান নিচে ইস্ট রিভার নদীর জলে তাকিয়ে আছেন। সে সময় তার দৃষ্টির সামনে কিছু একটা পলকের জন্য ভেসে উঠল- ভয়াবহ এক দ্বৈত দৃষ্টি- চিৎকার করা থেকে বিরত থাকতে তাকে দুই হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরতে হয়েছিল। সে রাতে কি দেখেছিলেন আর্থার লিবারম্যান?
সমকালীন দু’ভাষার দু’জন মহৎ কবির কী ট্র্যাজিক মিল! প্রায় তিন বছর পরে ১৯৩২ সালের ২৭ এপ্রিলে ‘টু ব্রুকলিন ব্রিজ’-এর কবি হার্ট ক্রেন জাহাজ ভ্রমণ কালে গালফ অফ মেক্সিকোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন। এর প্রায় চার বছর পরে ১৯ আগস্ট ১৯৩৬ তারিখে ফ্রানকোর সৈন্যদের হাতে নির্মমভাবে প্রাণ হারান ‘পোয়েটা এন নুয়েবা ইয়র্ক’-এর কবি লোরকা। ব্রুকলিন ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে ১৯২৯ সালের এক বিকেলে যখন এ দুজন তাকাচ্ছিলেন বিশাল কিস্তু দুঃখময় এ ব্রিজের দিকে, তাঁরা কি ভাবতে পেরেছিলেন এর ট্র্যাজেডি ৬ তাঁদেরকেও রেহাই দেবে না?
এসব ভাবতে ভাবতে দেখি রাত তিনটা বেজে গেছে। নাবিল ও নাতাশা তখনো নদী-নগর-নিসর্গ দেখছে। বললাম, ‘তোমাদের ঘুম পায়নি?’ দুজনেই একসাথে বলে উঠল, ‘না। আজ ঘুমাব না।’ তাদের চোখে ঘুম নেই। এ রকম ঘুম নেই হাজারো মানুষের, যারা ব্রুকলিন ব্রিজ ও আশেপাশে ঘুরছে। সে রকম ঘুম নেই ব্রুকলিন ব্রিজের, ঘুম নেই নিউ ইয়র্কের। একশ’ বছর আগে এ কথাটিই বলেছিলেন লোরকা তাঁর কবিতা নিদ্রাহীন শহর (ব্রুকলিন ব্রিজে রাত্রি) তে:
আকাশে তাকাও সকলেই, কেউ যেন ঘুমোতে না পারে
ঘুম নয়, ঘুম নয়, কেউ যেন ঘুমোতে না পারে।
চাঁদের বাসিন্দারা ঘ্রাণে বুঝে নেয় কোন কোন বৃত্তে ঘর বাঁধা যাবে।
জ্যান্ত ইগুয়ানার দল মাংস খুবলে খাবে মানুষের
রাতচরা যারা স্বপ্ন দেখতে ভুলে গেছে, আর
ভাঙা মন পলাতক মানুষের দল মোড়ে মোড়ে জটলা বসাবে
তারাদের ভর্ৎসনা তুচ্ছ করে এক অনুপম কুমির, কিঞ্চিৎ জিরিয়ে নিচ্ছে আজ।
ঘুম নয়। এখানে ঘুমাবে না কেউ
ঘুমহীন চোখ এলায়িত এই পুথিবীতে।
দূরের গোরস্থান থেকে একটা শব
অনুযোগ করে আসছে তিন বছর ধরে
কেন-না পতিত নিসর্গে তার হাঁটু ডুবে যাচ্ছে ক্রমাগত; তদুপরি
আজ সকালেই মাটিচাপা পড়বার আগে একটি বালক কাঁদছিল
প্রবল ত্রন্দন সেটা চাপা দিতে অবশেষে কুকুর লেলাতে হয়েছিল।
জীবন স্বপ্ন নয় তত। দ্যাখো, দেখতে থাকো, আমাদের অবরোহণ দেখ
দ্যাখো নামতে নামতে আমরা কাদা ও মাটির পথ্যে নৈশাহার সেরে নিচ্ছি
অথবা হয়তো উঠছি, মরা ডালিয়ার অর্কেস্ট্রা শুনতে শুনতে আরোহণ আমাদের
বরফ স্তূপের কিনারায়। কিন্তু এখানে কোনো অবলুপ্তি নেই, স্বপ্ন নেই;
কাঁচা মাংস শুধু। আছে আশ্লেষ চুম্বন, ঠোঁটের ভিতরে থাকা ঠোঁটে
শিরা আর ধমনির জট।
এবং তারাও আছে যারা নিজেরা আহত বলে সতত আঘাত করে থাকে
এবং তারাও, যারা মরে যেতে পারে ভেবে মৃত্যুকে কাঁধে বয়ে জীবন কাটায়।
... ... ... ৭
নিউ ইয়র্ক শহরের নিদ্রাহীনতার সাথে এর স্বপ্নহীনতাও এ কবিতায় তুলে ধরেছেন লোরকা। সাথে উঠে এসেছে জমকালো জীবনের অন্তরালে এখানে মানুষের নিঃসঙ্গতা ও বিচ্ছিন্নতা, আর অমানবিকতা।
Ref:
১. নিউ ইয়র্কে কবি: Poeta en Nueva York পোয়েটা এন নুয়েবা ইয়র্ক ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার কাব্য যা ১৯৩৬ সালে তাঁর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর ১৯৪০ সালে প্রকাশিত হয়।
২. লোরকার চিঠি: নিউ ইয়র্ক, শুক্রবার, ২৮ জুন, ১৯২৯ সালে মা-বাবা ও ভাইবোনেদের কাছে লেখা: অনুবাদ: তরুণ কুমার ঘটক। গ্রন্থ: লোরকার চিঠি, প্রকাশক: অনুষ্টুপ প্রকাশনী, কলকাতা।
৩. El Publico : (The Public): এল পাবলিকো লোরকার সবচেয়ে বেশি জটিল ও গভীর নাটক, যা তিনি ১৯৩০ সালের দিকে লিখেছিলেন। স্পেনীয় নাটকে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনা ছিল লোরকার উদ্দেশ্য। এ নাটকটিতে আছে এক ঝলমলে কাব্যিকতা। Cuando las cinco anos pason (When Five Years Pass): কোয়ানদো লাস সিঙ্কো আনিওস পাসন লোরকার আরেকটি পরাবাস্তববাদী নাটক, যা তাঁর নিউ ইয়র্ক ভ্রমণের ফসল। এর থিম হচ্ছে ভালবাসা ও সময়
৪. কবিতা The Bridge লিখছিলেন (যার প্রথম কবিতা: ‘টু ব্রুকলিন ব্রিজ’The Brooklyn Bridge)
৫. কবি ফিলিপ লেভাইন এর নীচের কবিতাটি ছাপা হয়েছিল The New Yorker এ ছাপা হয়েছিল ১৯ অক্টোবর ১৯৯২, মুদ্রণ সংস্করণে:
On the Meeting of Garcia Lorca and Hart Crane
Brooklyn, 1929. Of course Crane’s
been drinking and has no idea who
this curious Andalusian is, unable
even to speak the language of poetry.
The young man who brought them
together knows both Spanish and English,
but he has a headache from jumping
back and forth from one language
to another. For a moment’s relief
he goes to the window to look
down on the East River, darkening
below as the early night comes on.
Something flashes across his sight,
a double vision of such horror
he has to slap both his hands across
his mouth to keep from screaming.
Let’s not be frivolous, let’s
not pretend the two poets gave
each other wisdom or love or
even a good time, let’s not
invent a dialogue of such eloquence
that even the ants in your own
house won’t forget it. The two
greatest poetic geniuses alive
meet, and what happens? A vision
comes to an ordinary man staring
at a filthy river. Have you ever
had a vision? Have you ever shaken
your head to pieces and jerked back
at the image of your young son
falling through open space, not
from the stern of a ship bound
from Vera Cruz to New York but from
the roof of the building he works on?
Have you risen from bed to pace
until dawn to beg a merciless God
to take these pictures away? Oh, yes,
let’s bless the imagination. It gives
us the myths we live by. Let’s bless
the visionary power of the human—
the only animal that’s got it—,
bless the exact image of your father
dead and mine dead, bless the images
that stalk the corners of our sights
and will not let go. The young man
was my cousin, Arthur Lierberman,
then a language student at Columbia,
who told me all this before he died
quietly in his sleep in 1983
in a hotel in Perugia. A good man,
Arthur, he survived graduate school,
later came home to Detroit and sold
pianos right through the Depression.
He loaned my brother a used one
to compose hideous songs on,
which Arthur thought were genius.
What an imagination Arthur had!
৬. ব্রুকলিন ব্রিজের দুঃখবহ স্মৃতি: ১৮৬৬ সালে জন রয়েবলিং পরিকল্পিত ব্রুকলিন ব্রিজের প্রধান প্রকৌশলী ও ডিজাইনার হিসেবে দায়িত্বভার প্রহণ করেন। তখনো ব্রুকলিন ব্রিজের মূল নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি। ১৮ই জুন, ১৮৬৯ সালে ব্রিজের টাওয়ারের স্থান নির্ধারণের জরিপ কাজে এক দুর্ঘটনায় জন রয়েবলিং ডান পায়ে আঘাত পান। মাস খানেকের মধ্যেই তিনি টিটেনাসে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। এরপর ব্রুকলিন ব্রিজের নির্মাণ তদারকির ভার নেন জন রয়েবলিং-এর ৩২-বছর বয়স্ক পুত্র ওয়াশিংটন রয়েবলিং ও তাঁর স্ত্রী এমিলি রয়েবলিং। নির্মাণ কাজের এক পর্যায়ে ওয়াশিংটন রয়েবলিং এক রহস্যজনক অসুস্থতায় শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন। তারপরও তিনি বিছানায় শুয়ে টেলিস্কোপের মাধ্যমে কাজের তদারকি করে স্ত্রীর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিতেন। ব্রিজের নির্মাণ কাজে ন্যুনতম ২০ জন শ্রমিক বিভিন্ন দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান। এখানেই দুঃখের শেষ নয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর নির্মাণ কাজ শেষে ২৪শে মে, ১৮৮৩ সালে ব্রুকলিন ব্রিজ আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্বোধন করা হয়। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় হেঁটে ব্রিজ পাড়ি দেন আড়াই লক্ষ মানুষ। মাত্র ৬ দিন পরে, ৩০ মে, ১৮৮৩ সালে কয়েক সহ¯্র মানুষ ব্রিজ পাড়ি দেয়ার কালে এক আকস্মিক দুর্ঘটনায় সৃষ্টি হয় ভীতিকর পরিস্থিতির, যাতে পদপিষ্ট হয়ে ১২ জন মানুষ প্রাণ হারান। এ ব্রিজের সাথে যেন ট্র্যাজেডি জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে। মার্কিন কবি হার্ট ক্রেন লিখেছেন বিখ্যাত কবিতা ‘টু ব্রুকলিন ব্রিজ’। ১৯৩২ সালের ২৭শে এপ্রিলে জাহাজ ভ্রমণ কালে গালফ অফ মেক্সিকোতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেন হার্ট ক্রেন।
৭. Ciudad sin sueno (Nocturno del Brooklyn Bridge): নিদ্রাহীন শহর (ব্রুকলিন ব্রিজে রাত্রি): অনুবাদ: স্বপন ভট্টাচার্য।
সারাদেশ: সরাইলে কর্মরত পোলিং অফিসারের মৃত্যু
সারাদেশ: যশোরে উৎসবমুখর পরিবেশে ভোটগ্রহণ
সারাদেশ: বোরো ধান চাষাবাদে ব্যস্ত কৃষকরা