গৌতম রায়
শংকর সোজাসাপটা দেখেন। শংকর সোজাসাপটা লেখেন। শংকর দাঁতভাঙ্গা বাংলা শব্দে তাঁর লেখাকে ভরে দেন না। শংকরের লেখা পড়তে গেলে অভিধান খুলতে হয় না, বা ভাষাবিদদের সাহায্য নিতে হয় না। তাই অনেক সাহিত্য সমালোচকদের কাছে শংকর আদৌ কোনও সিরিয়াস লেখকই নন। তাঁরা শংকর সম্পর্কে মনে করেন: শংকর একজন বিনোদন প্রদায়ক ব্যক্তি। চলতি কথায় যাকে ইংরেজিতে এন্টারটেইনের বলে। অথচ এই শংকরেরই লেখা ‘জন অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’র মতো উপন্যাস পড়ে সত্যজিৎ রায়ের মতো ব্যক্তিত্ব মুগ্ধ হচ্ছেন। উপন্যাস দুটি পর্যায়ক্রমে তিনি ফিল্ম করছেন।ফিল্মে শংকরের উপন্যাস ব্যবহারের জন্যে যে সাম্মানিক, সাতের দশকের শুরুতে সত্যজিৎ লেখককে দিচ্ছেন, তা লেখকের ভাষায় , কল্পনাতীত।
সত্যজিৎ পরিচালিত সেই ফিল্ম ও অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করছে। তারও আগে অবশ্য শংকরের লেখা ‘চৌরঙ্গী’ ফিল্ম হিসেবে বক্স অফিস হিট করেছে। তবুও তখন কিছু মানুষ বলেছেন- উত্তমকুমারের অভিনয় শুভেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয়, অঞ্জনা ভৌমিকের অভিনয়, মান্না দের গান, হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান- এইসবই নাকি ফিল্মটি উতরে যাওয়ার কারণ।
দীর্ঘায়ু শংকরের জীবনের অভিজ্ঞতা ছিল বহুধা বিস্তৃত। সেই অভিজ্ঞতার নির্যাসই তাঁর সৃষ্টি। তবে শংকরের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে একদম নি¤œ মধ্যবিত্ত প্রায় ছিল না। বলতে পারা যায়। সেই কারণে নি¤œ মধ্যবিত্তের যাপনচিত্র কখনো আরোপিতভাবে দেখাবার চেষ্টা শংকর করেননি। এই অভিজ্ঞতার বাইরের না যাওয়াই সংস্কারের লেখার ইউনিকনেস তাই শংকরের লেখার মধ্যে আমরা কখনো কোনও রকম অচেনা, অজানা বিষয়,তা দেখতে পাই না। সেই কারণে শংকরের লেখা প্রতিটি চরিত্রই আমাদের কাছে হয়ে ওঠে একান্ত আপনার। আর সেখানেই লুকিয়ে থাকে শংকরের জনপ্রিয়তার চাবিকাঠি।
শংকরের ‘চৌরঙ্গী’ উপন্যাস যখন বাঙালির সামনে প্রথম আসে,তখন সদ্য দেশভাগ হয়েছে। দুই বাংলাতেই একটা নতুন করে শহুরে চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত সমাজ গড়ে উঠছে।অতীতের সামন্ততান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থার ফসল হিসেবে যে উচ্চবিত্ত এবং মধ্যবিত্তের অবস্থান ছিল, দেশভাগ-স্বাধীনতা সেই সমস্ত বেড়াজালগুলোকে ওলটপালট করে দিচ্ছে।হঠাৎ করে উচ্চ মধ্যবিত্ত হয়ে পড়ছে সহায় সম্বলহীন গরিব মানুষ। আবার কখনো কখনো দেখতে পাওয়া যাচ্ছে,একেবারে পরশুরামের পরশপাথর পেয়ে যেন কেউ কেউ হয়ে উঠছে, ভোটবাজির মত উচ্চবিত্ত বা মধ্যবিত্ত।
সেই সময়,মধ্যবিত্তের সংজ্ঞাটাও এই একুশ শতকের দ্বিতীয় দশকের নিরিখে বেশ অন্যরকম ছিল। মধ্যবিত্তের ধ্যান ধারণার সঙ্গে প্রথাগত শিক্ষা এবং কিছু উনিশ শতকের ক্ষয়িষ্ণু মূল্যবোধ,আর বিশ শতকের নতুন চিন্তা চেতনার ধারা।এগুলির একটা অদ্ভুত মিশেল তৈরি হচ্ছিল।আর সেই মিশেলকে কেন্দ্র করে বাঙালি জনজীবনে আসতে শুরু করেছিল এক বড় ধরনের পরিবর্তন। সেই পরিবর্তনের নিরিখে বাঙালির অন্দরমহলেও ধীরে ধীরে একটা নতুন ধরনের আধুনিকতার আমদানি ঘটতে শুরু করেছিল। যে আমদানির কথা সমরেশ বসু, তাঁর কিছু কিছু উপন্যাসে লিখতে শুরু করলেন। বিশেষ করে ‘প্রজাপতি’, ‘বিবর’, ‘পাতক’ ইত্যাদি উপন্যাসেমধ্যবিত্তের মূল্যবোধের অদলবদলের ধারাগুলি চিত্রিত হতে থাকলো।
আর এই ‘মূল্যবোধ’ শব্দটির প্রকারভেদে বাঙালির মধ্যে আসতে থাকল এক ধরনের শুচিতা। যাকে পরবর্তীকালে কেউ কেউ শুচিবায়ুগ্রস্ততাও বলেছেন। এই পর্বে বাঙালির জীবন জীবিকা,সামাজিক মূল্যবোধ, পারিবারিক জীবন, বৃহৎ পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন,- এই সমস্ত কিছুর অদল বদলের ছবি সমরেশের একটু আগেও আমরা দেখতে পেয়েছিলাম, বুদ্ধদেব বসুর ‘রাত ভরে বৃষ্টি’তে। এই উপন্যাসগুলিকে একটা সময় বাঙালি সমালোচক অশ্লীল বলে দাগিয়ে দিতে শুরু করেছিল।
সেই উ™£ান্ত সময়ের ধারাবাহিকতায় শংকর যখন লিখলেন চৌরঙ্গী উপন্যাস, তখন কিন্তু বাঙালির জীবন জীবিকার সঙ্গে হোটেল, এয়ার হোস্টেস- এই সমস্ত বিষয়, পেশাগুলির আদৌ কোনও পরিচয় ছিল না। এই সমস্ত পেশা এবং পেশা ঘিরে জীবনযাত্রার বারোমাস্যা সীমাবদ্ধতা ছিল এমন মানুষজনদের মধ্যে, যাদের সঙ্গে সাধারণ আর দশটা হিন্দু- মুসলমান নির্বিশেষে বাঙালির জীবন জীবিকার খুব একটা সম্পর্ক ছিল না। হোটেল, তাও আবার গ্র্যান্ড হোটেল- এ সমস্তই ছিল তখন বাঙালির কাছে একটা স্বপ্নীল বিষয়। বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির মা-বোনেদের নিয়ে কোনও রেস্টুরেন্টে খেতে যাচ্ছে- এটাই তখন কল্পনা করা যেত না, যে সময় শংকর, হোটেল জীবনকে কেন্দ্র করে মধ্যবিত্তের জীবন সংগ্রামের ওলট-পালটের একটা সংকেত চৌরঙ্গী উপন্যাসের মধ্যে দিয়ে বাঙালি সমাজের সামনে তুলে ধরলেন।
বাঙালির কাছে একটা নতুন দিগন্তের উন্মোচন করলেন শংকর। যে দিগন্তের মধ্যে আন্তর্জাতিকতার একটা ছাপ রয়েছে। সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতের একটা ছাপ রয়েছে। শংকরের লেখায় সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতের ছাপের ক্ষেত্রে ‘চৌরঙ্গী’র সঙ্গেই আলোচনা করতে হয়, তার প্রথমদিকের লেখা আরো একটি উপন্যাস, ‘নিবেদিতা রিসার্চ ল্যাবরেটরি’র। বাঙালি আন্তর্জাতিক প্রেক্ষিতে উপন্যাস, অন্নদাশঙ্করের‘সত্যাসত্য’, ‘রত্ন ও শ্রীমতি’ ইত্যাদিতে পেয়েছে। তাঁর পরবর্তী ক্ষেত্রে অন্নদাশঙ্করেরই ‘ক্রান্তদর্শী’ পেয়েছে। কিন্তু এই উপন্যাসগুলি ধ্রুপদী ভঙ্গিমায় রচিত। যে ভঙ্গিমার সঙ্গে আম বাঙালির সার্বিক সংযোগ খুব বেশি ছিল না। উচ্চশিক্ষিত বাঙালির কাছে এই উপন্যাসগুলি ছিল বিশেষ রকমের প্রণম্য। কিন্তু সাধারণ আটপৌরে বাঙালির কাছে সেগুলি খুব একটা পৌঁছয়নি। একই কথা বলতে পারা যায় যাযাবরের ‘দৃষ্টিপাত’ ঘিরেও। বাঙালিকে বাংলার প্রেক্ষিত অতিক্রম করে, সর্বভারতীয় প্রেক্ষিতে উপস্থাপিত করবার ক্ষেত্রে যাযাবরের এই দৃষ্টিপাত একটি ব্যতিক্রমী উপস্থাপন। তবু বলতে হয় এই উপন্যাসের পাঠকপ্রিয়তা ছিল একটি সীমাবদ্ধ অংশের মানুষদের মধ্যে। তার কারণ ও উপন্যাসটির ধ্রুপদীয়ানা।
কিন্তু শংকরের চৌরঙ্গী উপন্যাসের ভাষার উপস্থাপনা, তার মধ্যে ধ্রুপদীয়ানার ক্ষেত্রে এক নতুন ধরনের পথ চলার ইঙ্গিত দিল বাঙালি পাঠকদের কাছে।
বাঙালির পেশা জীবনের নতুন দিগন্ত যে উন্মোচিত হচ্ছে এবং সেই পেশাগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যে কী ধরনের নতুনত্ব ধরা দিচ্ছে- এগুলি বাঙালিকে জানানোর ক্ষেত্রে একটা নতুন ধরনের উদ্ভাবনী শক্তির পরিচয় দিল শংকরের এই উপন্যাস চৌরঙ্গী। অভিজাত হোটেলের কর্মী এবং অতিথি, আবার কর্মীদের বিভিন্ন শ্রেণিবিন্যাস, সেখানকার নানা ধরনের সাংগঠনিক বৈশিষ্ট্য, আর্থিক মানদ- অনুযায়ী কর্মী এবং অতিথিদের মধ্যে নানা ধরনের শ্রেণিবিন্যাস- এই সমস্ত বিষয়গুলি চৌরঙ্গী উপন্যাসে যেভাবে শংকর ফুটিয়ে তুলেছিলেন,তা ছিল বাঙালি পাঠকের কাছে এক অজানা দিগন্তের উন্মোচন।
অতীতে উপন্যাসটির সার্থক চলচ্চিত্রায়ন উত্তমকুমারের অভিনয় এবং সহশিল্পীদের অভিনয়,গান সবমিলিয়ে উপন্যাসটির জনপ্রিয়তাকে আজও এক অত্যুঙ্গ সীমায়, যাকে বলা যায় পাহাড় চূড়ার মধ্যে উৎকীর্ণ করে রেখেছে।
সত্যজিৎ রায়,শংকরের যে দুটি উপন্যাস নিয়ে ফিল্ম তৈরি করেছিলেন, তার মধ্যে ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসটি সমকালীন সময়ের মধ্যবিত্তের সংকটের এক অসামান্য দলিল। আমাদের আজকের সময় দাঁড়িয়ে সেদিনের মধ্যবিত্তের সংকট ঘিরে ভাবনাচিন্তার দুনিয়া প্রায় সংকীর্ণই বলা যেতে পারে। কিন্তু ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসে উপন্যাসের মুখ্য চরিত্র সোমনাথের কলমে শংকর লিখছেন: ‘এও এক আদিম অরণ্য শহর কলকাতা/ অগণিত জীব পোশাকে-আশাকে মানুষের দাবিদার/ প্রকৃতি তালিকায় জন্তু মাত্র”। কবিতাকারে লিখিত এটির নাম সোমনাথ দিয়েছিল, ‘জন-অরণ্য’।
সোমনাথ চরিত্রটির মধ্যে দিয়ে ছয়,সাতের দশকের মধ্যবিত্তের সংকট যেভাবে শংকর ফুটিয়ে তুলেছেন, তার সঙ্গে তুলনা চলে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের, ‘অর্জুন’, ‘আত্মপ্রকাশ’ ইত্যাদি উপন্যাসের। শিক্ষিত বেকারের যন্ত্রণা, পারিবারিক পরিম-লে, সেই শিক্ষিত বেকারকে কী ধরনের সংকটের মধ্যে জীবন কাটাতে হচ্ছে, সেই সংকটের মোকাবিলায় পরিবারের মধ্যে কীধরনের সহযোগিতা সে পাচ্ছে এবং কী ধরনের অসহযোগিতাও সে পাচ্ছে। তার পাশাপাশি পারিপাশির্^কতা তাকে কী ধরনের যন্ত্রণার সাম্রাজ্যে নিমজ্জিত করছে- এগুলি আজকের প্রজন্ম সেভাবে বুঝতে পারবে না। কারণ,আজকের প্রজন্মের বেকারত্বের প্রেক্ষিতগুলি রাজনীতির নিরিখে অনেকখানি বদল ঘটেছে, এবং সেটা চরিত্রগত।
কিন্তু একটা সময় ছিল, যে সময়ের প্রেক্ষিত ঘিরে শংকর ‘জন-অরণ্য’, ‘সীমাবদ্ধ’-এর মতন উপন্যাস রচনা করেছেন, সেই সময়ের শিক্ষিত বেকার প্রজন্ম কিন্তু শাসক শিবিরের এমএলএ-র কাছে চাকরির তদ্বির করতো, মন্ত্রী সিএর কাছে চাকরির জন্য আবেদন নিবেদন করত। কিন্তু তা বলে শাসকের বৃত্তের মধ্যে ঢুকে পড়ে আজকের মতো, করেকম্মে খাওয়ার মানসিকতাতে নিজেকে নিমজ্জিত করে,আত্ম বিক্রয় করত না।
শংকরের ‘জন অরণ্য’ উপন্যাসের সোমনাথ চরিত্র, তার যাপনচিত্রের মধ্য দিয়েই মধ্যবিত্তের সংকটকে যেভাবে মোকাবিলা করেছে, সেই মোকাবিলার সার্বিক ছবিটা আজকে বাঙালির কাছে ইতিহাস বলে মনে হলেও, সেই ইতিহাসের মধ্যে বাঙালির মেরুদ-ের যে ছবি শংকর এঁকেছেন, তা বাঙালির সামাজিক ইতিহাসের এক অনবদ্য দলিল।
আবার সেই দলিল প্রস্তুত করতে গিয়ে সোমনাথের বন্ধু সুকুমারের চরিত্রের বর্ণনার মধ্যে দিয়ে শংকর দেখিয়েছেন: বেকারত্বের জ্বালা, ছিন্নমূল মানুষের যন্ত্রণা, অনেক ভাইবোনের পরিবার,বাবার চাকরি চলে যাওয়া, এইসবের মধ্যে দিয়ে একটা মানুষের হতাশা কীভাবে জীবনযুদ্ধে হেরে যাওয়ার যন্ত্রণা- তার সামগ্রিক রূপটাকে।
হেরে যাওয়ার যন্ত্রণা একটা সুরে বাজে। যে সুর বহুকাল পরেও যেন পাঠকের কানে বেহাগ বা দরবারিক কানাডার মতো একটা যন্ত্রণা নিবিড় ছায়া, মনকে উদাস করে দেয়। জনঅরণ্য উপন্যাসে এই সুকুমার চরিত্রটিকে আজও আমরা হয়তো চারপাশে খুঁজে পাই।কিন্তু সেই চরিত্রটির চরিত্র হয়ে ওঠার মধ্যে সুকুমারের সময়কাল আর আজকের সময়কালের মধ্যে ফারাকের দরুন,কলেজ পড়ুয়া সুকুমারের গড়িয়াহাটের মোড়ে দাঁড়িয়ে জেনারেল নলেজের নানা প্রশ্ন জানতে চাওয়ার জন্য পথিকের কাছে আকুতি। এই বদলে যাওয়া পরিবেশের প্রেক্ষিতটাকে কেমন যেন অন্য রকম করে দেয়।
আজকের দিনে সুকুমারেরা রাজনীতি নয়, রাজনীতির নামে খাওয়া গৌরীশঙ্কর বসুদের মতো মানুষদের পাল্লায় পড়ে হয়ে যায়। শান্তনু, মেধাবী তরুণ। শান্তনু, গৌরীশংকরের আদর্শের নামে কামুক চোখের যোগানদার হয়ে ওঠে। কার্যত উন্মাদ শান্তনু হয়ে যায় সে ধীরে ধীরে। সেই উন্মাদ অবস্থার সঙ্গে শংকরের জন অরণ্য চরিত্রের সুকুমারের উন্মাদ হয়ে ওঠার কোনও ফারাক থাকে না। মেধাবী তরুণ শান্তনু, যৌবন উপান্তে রোল চাওমিনের দোকান তৈরি করে ক্ষুধার অন্ন যোগাড় করে।
বদল শুধু এইটুকুই। কিন্তু সুকুমারের, শান্তনু হয়ে ওঠা সেই গত শতকের নয়ের দশকের বা শূন্য দশকের উদ্ভিন্ন যৌবন আর তারও আগে ছয়-সাতের দশকের অস্থির চিত্ততা, কোথায় এসে যেন মিলেমিশে যায়।আর সেখানেই রচিত হয় শংকরের সৃষ্টির সাফল্য।
শংকর মধ্যবিত্তের সংকটের যে ছবি উপস্থাপিত করেছেন সেই ছবির মধ্যে কিন্তু আমরা যৌথ পরিবারের এক অনবদ্য মেলবন্ধন খুঁজে পাই।তখনও কিন্তু মাতৃহারা সোমনাথের পরম সহায় হিসেবে তার বড় বৌদি পাশে দাঁড়ান। আড়াইশো টাকা সে সময়ের কম টাকা নয়। সেই টাকা দিলে সোমনাথ চাকরি পাবে। এক ঠকবাজের পাল্লায় পড়ে সে। সোমনাথ চাকরি পাবে এই আশায় সংসার খরচ বাঁচিয়ে তিল তিল করে জমিয়ে রাখা টাকা থেকে গোপনে সেই টাকা সোমনাথের হাতে তুলে দেয় তার বড় বৌদি। বাড়ি ফিরে এসেই সোমনাথ বুঝতে পারে কী ভুল সে করেছে। মাতৃসমা বড় বৌদি বলেন: এ কথা যেন তুমি আর আমি ছাড়া আর কেউ না জানতে পারে।
সংসারে নারীর সেই শীতল ছায়া আজকের দিনে কেমন যেন রূপকথা বলে মনে হয়। কিন্তু সেই ছায়ায় বড় হওয়া প্রজন্ম, তাদের খুব নিবিড়ভাবে দেখবার সুযোগ পেয়েছিলেন শংকর।নিজের জীবনে নানান উত্থান পতনের মধ্যে দিয়ে তাকে চলতে হয়েছে।কিন্তু সেই চলার পথে বন্ধু শংকরীপ্রসাদ বসু,একদিন তাঁকে চিনিয়েছিলেন জীবনের পরম আশ্রয় শ্রীরামকৃষ্ণকে। তারপর থেকে শ্রীরামকৃষ্ণের শীতল ছায়া শংকরের জীবনকে এক পবিত্র আশ্রয় করে তুলেছিল। শংকর, তাঁর বন্ধু শংকরীপ্রসাদের মতো তন্বিষ্ঠ শ্রীরামকৃষ্ণ, বিবেকানন্দ গবেষক ছিলেন না। কিন্তু বন্ধুর গবেষণালব্ধ বিষয়গুলিকেই সাধারণের উপযোগী, সুখপাঠ্য করে উপস্থাপিত করে গেছেন।পরিবেশন করে গেছেন।
শ্রীরামকৃষ্ণ সাহিত্যকে, তাঁর ভাবাদর্শকে মানুষের কাছে তুলে ধরবার ক্ষেত্রে একদা অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের যে জনপ্রিয়তা এবং ঐতিহাসিক অবদান, তার সঙ্গে তুলনা করা চলে শংকরকে। শ্রীরামকৃষ্ণ, মা সারদা, স্বামী বিবেকানন্দকে ঘিরে শংকরের অনবদ্য সৃষ্টিগুলিকে শংকর তাঁর জাদুকলম দিয়ে ফুটিয়েছিলেন।তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ ভাব আন্দোলনকে যেভাবে এক নতুন মূর্ছনায় উপস্থাপিত করেছেন তা আজকের গোটা বিশ্বে প্রেমের সঞ্চালনার এক নতুন সংজ্ঞা হিসেবে পরিগণিত হচ্ছে। শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবাদর্শের মূল নির্যাস; মানুষকে ভালোবাসা। কোনও ধরনের সংকীর্ণতার মধ্যে নিজেকে নিমজ্জিত না করা। ধর্ম-জাতপাত,এই সমস্ত কিছুর বেড়াজালকে অতিক্রম করে, মানুষকে তার সমুচিত মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করা। এই বিষয়গুলিকে তথ্যনিষ্ঠভাবে তাঁর সুললিত কলমের মধ্যে দিয়ে শংকর যেভাবে উপস্থাপিত করে গিয়েছেন। হিংসায় উন্মত্ত পৃথ্বীর কাছে, নিত্য নিঠুর দ্বন্দ্ব হয়েও এক পরম প্রেমের বাণীকে নতুনভাবে মানুষের দরবারে হাজির করেছেন শংকর।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির