আসমা চৌধুরী
কবি জীবনানন্দ দাশ সাহিত্যকে এমন এক ঠিকানা বানিয়েছেন যাতে প্রবহমান জীবনধারা ঢেউসহ প্রবেশ করেছে। লেখক হিসেবে তিনি চেয়েছিলেন নতুন কিছু, তাই নির্মাণেও সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। প্রতিটি কবিতাকে বারবার কেটেছেটে নতুনত্ব দিয়েছেন। যতক্ষণ মনে হয়েছে আরো ভালো করা যায়- সেভাবেই ঘষা,মাজা করেছেন।
অনেকের মনে প্রশ্ন জাগে তাঁর বেশিরভাগ উপন্যাস ১৯৩১ থেকে ১৯৩৩ এর মধ্যে লেখা হয়ে যায়। বাকিগুলোও ১৯৪৮-এর ভিতরেই লেখা হয়ে গেছে। তবু তিনি পা-ুলিপিগুলো ট্রাঙ্কবন্দি করে রেখেছিলেন কেন? তিনি নিশ্চয়ই এত লেখা প্রকাশ না করার চিন্তা নিয়ে লেখাগুলো সংরক্ষণ করেন নাই।আসলে তিনি হয়তো উপন্যাসগুলো আরো ঘষামাজার প্রয়োজন বোধ করেছিলেন। তাই সময় ও পরিস্থিতির অপেক্ষা করেছিলেন।কবির বেশিরভাগ উপন্যাস ও ছোটগল্প আত্মজৈবনিক। বাস্তব জীবন থেকে উপকরণ নিয়েছেন। সাহিত্য চর্চাকে তিনি অন্যসব কাজের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ভেবেছেন।দুই বিশ্বযুদ্ধ, কল্লোল যুগ,মার্ক্সীয় যুদ্ধস্পৃষ্ট পরিবেশে থেকেও জীবনানন্দ কোনটিতেই পুরোপুরি অবগাহন করেননি।তিনি ইতিহাস জ্ঞানের আলোকে জীবন, জগৎ,সমাজ, সময় ও সভ্যতাকে গভীর কৌতূহলের সাথে অবলোকন করেছেন।তিনি দেখেছেন মানব সভ্যতা ব্যক্তিভিত্তিক,ব্যক্তিই তৈরি করে সভ্যতার নিবিড় পটভূমি। জীবনানন্দের ব্যক্তিগত জীবন উপন্যাসের কাহিনি, চরিত্রে প্রচ-ভাবে উপস্থিত।
‘মেসবাড়ি’ও তারই ধারাবাহিক সংযোজন। সেই সময়ে শিক্ষার্থী, চাকরি খুঁজে বেড়ানো শিক্ষিত বেকার, মধ্যবিত্ত সমাজের অল্প আয়ের থাকা, খাওয়ার একটি প্রধান অনুষঙ্গ মেসবাড়ি থাকায় জীবনানন্দের সাহিত্যে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে।জীবনানন্দের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতাও ছিলো মেসবাড়ি সম্পর্কে। জীবনানন্দ যা কিছু লিখতেন, লেখার উপকরণ বিষয়ে সবসময় সতর্ক ছিলেন, পাঠের ও অভিজ্ঞতার মিশেলে ভরিয়ে দিতেন কবিতার শরীর।এত এত নক্ষত্র ছড়িয়ে আছে তার কবিতায়, সে সবের ব্যাখ্যা তিনি পেয়েছিলেন সহকর্মী অঙ্কের অধ্যাপক কামিনীকুমার দে’র কাছ থেকে।যখন নরেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক, ‘ঘাই হরিণী’ বলে খ্যাপাতেন তখন চাটগাঁর ভাষায় কথা বলা, চাটগাঁর মানুষ এই প-িত ব্যক্তিকে জীবনানন্দের ভালো লাগতো।অবসরের সময় তাঁর সাথে জ্যোতির্বিজ্ঞান নিয়ে আলাপ করে নক্ষত্রলোকের বিচিত্র নাম খাতায় তুলে রাখতেন। তাই নির্ভুল নামসহ নক্ষত্রের পরিচয় আমরা তাঁর কবিতায় পাই।
জীবনানন্দের জীবনের অনেকটা সময় কেটেছে বিভিন্ন ছাত্রাবাসে।কখনো ছাত্র হিসেবে কখনো শিক্ষক হিসেবে।তিনি এম.এ.এবং ল পড়বার সময় বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন হার্ডিঞ্জ ছাত্রাবাসে থাকতেন। এ সময় ‘ব্যাসিলারি ডিসেন্ট্রি’ রোগে অসুস্থ ছিলেন বলে পরীক্ষায় আশানুরূপ ভালো ফল করতে পারেননি। ১৯২১ সালে এম.এ পাস করে ১৯২২ সালে কলকাতা সিটি কলেজে ইংরেজি সাহিত্য বিভাগে ‘টিউটর’ পদে কর্মজীবন শুরু করেন। সে সময় হ্যারিসন রোডের প্রেসিডেন্সি বোর্ডিং-এ থেকেছেন।আবার কিছুদিনের জন্য ১৮/২/এ বেচু চ্যাটার্জি স্ট্রিটে ঘর ভাড়া নিয়ে ছিলেন।বরিশাল থেকে ছোট ভাই অশোকানন্দ গণিতে এমএসসি পড়বার জন্য কলকাতায় এলে দু’ভাই একসঙ্গে থাকতেন। ১৯২৯ সালে খুলনা বাগেরহাট প্রফুল্লচন্দ্র কলেজে মাত্র দু মাস বিশদিন চাকরি করে কলকাতায় ফিরে এসে প্রেসিডেন্সি বোর্ডিংয়ে বাস করেন।দিল্লির রামযশ কলেজে শিক্ষকদের জন্য পৃথক আবাসনের ব্যবস্থা অর্থাৎ বোর্ডিং হাউস ছিলো।দিল্লির রামযশ কলেজের বোর্ডিং বা শিক্ষক আবাসনের ঘরটা তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিলো একটা আন্ডারগ্রাউন্ড সেলার।কবিতা লেখার জন্য সহকর্মীদের কেউ কেউ ব্যঙ্গ করতেন, পেছনে লাগতেন।ছাত্রদের আচরণও ছাত্রসুলভ ছিলো না।১৯৫১ সালে খড়গপুরে অধ্যাপনা করতে গিয়েও জীবনানন্দকে ছাত্রাবাসে থাকতে হয়েছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিভিন্ন ছাত্রাবাস, মেস-এ থাকতে গিয়ে জীবনানন্দের মেসবাড়ি সম্পর্কে ব্যাপক অভিজ্ঞতা হয়েছে। এছাড়াও কলকাতা শহরের আনাচে কানাচে প্রচুর মেসবাড়ি থাকায় এবং পরিচিত জনদের মেসবাড়ির অভিজ্ঞতা তাকে লেখায় আগ্রহী করে তুলেছে। মেসবাড়ি জীবনানন্দের বিভিন্ন উপন্যাসে তাই সহজেই ছায়া ফেলেছে।
জীবন প্রণালী উপন্যাসধর্মী বড় গল্প।এখানে নায়ক শচীন এক সময় সাংবাদিক ছিলো,বর্তমানে চাকরিহীন। সে একসময় মেসে ছিলো বলে মেস জীবনের অভিজ্ঞতা আছে তার।শচীন ও তার স্ত্রী অঞ্জলির পারিবারিক ও দাম্পত্যের আলাপচারিতার এক পর্যায়ে আমরা জানতে পারি শচীন একসময় মেসবাড়িতে থাকতেন।শচীন এখন বেকার, পিতার চাকরির আয়ের উপর নির্ভরশীল,রাতে স্ত্রী অঞ্জলির জন্য পানের জর্দা কিনে আনার ব্যর্থতা নিয়ে পিতার মুখোমুখি হওয়ার বিড়ম্বনার এক পর্যায়ে অঞ্জলি খুঁজে পায় রুপোর দোয়ানি। সেখান থেকে চার পয়সার পরে দু’আনার জর্দা কিনে আনতে বলে কারণ একটা পান মুখে দিয়ে ঘুমাবে সে। এগিয়ে যাওয়া আলাপচারিতায় অঞ্জলির কথায় জানা যায়;
-তোমার খাট আবার বাইরের ঘরে গেল?
-হ্যাঁ।
-কেন, বাবার ঘরে পাশে তো বেশ ছিলে-
-সেখানে ইন্দিরা থাকবে।
-বিছানা পেতেছ তোমার?
-মশারি টানিয়েছ?
-টানানো যাবে।
-দেখো,ভুল করে আবার মশারি না খাটিয়ে শুয়ো না।
আমি-এই চৌত্রিশ বছর ধরে মেসে- বোর্ডিঙে থাকা আমাদের অভ্যাস- আমাদের ভুল হয় না।
অঞ্জলি-‘খুকি হবার পর এই আড়াই বছর কেটে গেল। এই আড়াইটা বছর কোনোদিন কোথায় শোও, বিছানা কে পাতে না পাতে, তোমার কাপড়চোপড় জামা-জুতো কোনো কিছুরই খোঁজখবর রাখতে পারিনা আমি। আচ্ছা, দু’আনার জর্দাই এনো-
এখানে শচীন অঞ্জলিকে কথা প্রসঙ্গে মেসে থাকার কর্মতৎপরতা অর্থাৎ পরিবারহীন জীবনকে উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করছে।
জীবন প্রণালী উপন্যাসে শচীন স্ত্রী অঞ্জলির বায়স্কোপ দেখার সাধ মেটাতে সিঁদুরের কৌটা থেকে পয়সা খরচ করতে বাধ্য হয়।হঠাৎ রজনীকান্ত খাসনবীশের কাছ থেকে পত্র ও ইনসিওরেন্স আসে। আট বছর আগে শচীনের কাছ থেকে ধার নেয়া একশত টাকা সুদসহ একশত ছত্রিশ টাকার একশত বর্তমানে পাঠালেন,বাকি ছত্রিশ টাকা পরে পাঠাবেন।
টাকা পেয়ে শচীন বুঝতে পারে মেস জীবনে সে এমন কাউকে দশ টাকাও ধার দেয়নি। রজনীকান্ত বাবু লাক্ষা চা- তিসি অনেককিছুর ব্যবসা করতেন, টাকাও জমিয়েছেন প্রচুর। মেস জীবনে শচীনের পাশের ঘরেই কিছুদিন বাস করেছিলেন। অনেক রকম চিন্তা করে শচীন ষাট টাকার মতো খরচ করে ফেলে। তখন দ্বিতীয়বার রজনীকান্ত বাবু চিঠি লিখে বলে, তার ভুল হয়ে গেছে, টাকাটা অন্য একজনের, সুতরাং টাকাটা যেন ফেরত পাঠানো হয়।রজনীকান্ত বাবু আইন ও পুলিশের ভয় দেখায়।অন্যদিকে শচীনের পিতা ও শচীন টাকা ফেরত দেয়ার জন্য ধার করার নানা উপায় খোঁজে। ‘জীবন প্রণালী’ উপন্যাসের এই অংশে আমরা দেখতে পাই, মেসবাড়ি অনেকের আশ্রয় যেমন ছিলো তেমনি নানা রকম মানুষের সাথে ওঠা-বসায় মিষ্টি, তেতো নানারকম সময় পার করতে হয়েছে। একজন রজনীকান্ত বাবু ভুল করে টাকা পাঠিয়ে বেকার শচীনের জীবনকে কেমন ল-ভ- করে দিয়েছে।
‘মাল্যবান’ উপন্যাসে মেসবাড়ি একটা গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। উৎপলার মেজদার পরিবার পৌষ মাসের শেষাশেষি এলে মাল্যবান একটা মেসে গিয়ে উঠলো। মেসের লোকজনের সাথে আলাপ করার বিশেষ আগ্রহ ছিলো না তার।অফিস থেকে ফিরে এসে সে নিজের জীবনের বিপর্যয়ের কথাই ভাবতো। মেসে এসে মাল্যবান সমস্যায় পড়ে গেলো। সেখানে দু’শ্রেণির লোকজন থাকে। এক শ্রেণি হচ্ছে, ছোকরা, অন্য শ্রেণি মধ্যবয়স্ক। কেউ কেউ আছে সারাটা জীবন মেসে কাটিয়ে দেয় কারণ সংসার করবার যোগ্যতা তাদের নেই।
মেসে যারা থাকে তারা নারীসঙ্গ থেকে বঞ্চিত, তাই বিশেষ এক শারীরিক সুখের জন্য রাতের বেলা বেরিয়ে যায় তারা। কোনোদিন শেষ রাতে ফিরে আসে, কোনোদিন আসে না। রেলিঙের উপরে বসে থাকে দাঁড়কাক। সুযোগ পেলে খাবার নিয়ে উড়ে যায়।
সরস্বতী পূজার দিন মাল্যবান দেখে কয়েকজনে মিলে মদ খেয়ে নাচানাচি করে। মেসের ঝি কোনো সঙ্কোচ ছাড়াই তাদের পাশে বসে নাচ,গান দেখে। আগামীকাল আবার বাসন মাজলেও আজ রাতে একে দিয়েই আসর জমাবে। একে না পেলে কয়েকটি বাবুর অন্তত আজ রাতের অনেকখানি ফূর্তি মাটি হয়ে যেত। গয়মতি নামের মেয়েটি খুব সিগারেট টানে, কাশে। চার-পাঁচজন বাবু মিলে ঝিকে আলাদা একটা কামরায় নিয়ে গেল। মাল্যবান নিজের ঘরে চলে যাচ্ছিল, তাকিয়ে দেখল ঝিকে সবাই মিলে মদ খাওয়াচ্ছে।
মেসের ঠাকুর বামদেব আর পূর্ণ কুর্মিও ঝিকে খুশি করছে,নিজেরাও নিজেদের প্রয়োজন মিটিয়ে নিচ্ছে। মেসের খাওয়া-দাওয়া ভালো লাগছিলো না মাল্যবানের।ম্যানেজার গোটা তিনেক পাঠা এনে গুদামে বেঁধে রাখলে ওদের কান্না আর কষ্ট সহ্য করতে পারছিলো না মাল্যবান, আবার খাওয়ার সময় মাংসের বদলে পলতার তরকারি, ট্যাংরা মাছের ঝোল আর কলাইয়ের ডাল দেখে মনটা বিরস হয়ে উঠলো।
আবার যেদিন পাঠার মাংস রান্না হলো প্রাণি হত্যার মায়ায় সেদিন মাংস না খেয়ে ফিরিয়ে দিতে বেশ সময় লাগলো তার। মেসে নতুন সদস্য এলো স্ত্রীর মৃত্যুর পর বিষাদ আক্রান্ত বয়স্ক একজন। লোকটির সন্তানও নেই, মাল্যবানকে বলে যায় পরিবারের কাহিনি।
আসলে মেসবাড়ি হচ্ছে নিরুপায়দের আশ্রয়স্থল।নানা মতের, পথের মানুষ এখানে থাকে।কুরুচির নানা চিত্র তাদের সাথে জড়িয়ে আছে,কারণ একটা গোছানো সংসার পাওয়ার যোগ্যতা তাদের নাই। আকাক্সক্ষার সাথে বাস্তবের এতটাই ফারাক যে তাদের যৌন চাহিদাও পূরণ হয় না।তারা বামুন থেকে বাবু সকলেই তখন বেপরোয়া। বেশকিছু পরাজিত মানুষ লড়াই চালিয়ে যায় সবকিছুকে জয় করে নেবার জন্য।
‘জীবন প্রণালী’ উপন্যাসের উপসংহারে জীবনানন্দ লিখেছেন, ‘ধীরে ধীরে জ্যোৎস্নার পথের মধ্যে বেরিয়ে গেলাম। এ-রকম চিরকাল চলতে পারা যায় না কি? মাঠ প্রান্তর ভেঙে, জানা-অজানার ওপারে, জ্যোৎস্নার আকাশে- বাতাসে বুনো হাঁসের মতন, যে পর্যন্ত, যে পর্যন্ত শেষগুলি এসে বুকের ভিতর না লাগে!
আসলে বহু বিচিত্র এই পথ হাঁটা, জীবন বৈচিত্র্য, জীবনানন্দের তীব্র অনুভূতি মেসবাড়ির দরজায় এসে দাগ রেখে গেছে। মানব সন্তান শেষ গুলিটি এসে পড়বার আগ পর্যন্ত খুঁজতে থাকে জীবনের স্বাদ,তার অপার দেনা, না পাওয়ার সিলমোহর। মেসবাড়িও জীবনানন্দের সেই ধারাবাহিকতায় অনন্য সংযোজন।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির