ধারাবাহিক ভ্রমণ কাহিনী-৩২
চৌধুরী সালাহউদ্দীন মাহমুদ
(পূর্ব প্রকাশের পর)
নিউ ইয়র্ক মানে শুধু ম্যানহাটান নয়। এ মহানগরীর ৫টি বরোর মধ্যে এ একটি- এর রয়েছে আরো ৪টি বরো।
ম্যানহাটান থেকে ইস্ট রিভার পার হলেই আরেকটি বরো কুইনস, তার একটি এলাকা এস্টোরিয়া। এটি নিজেই যেন এক ক্ষুদ্র পৃথিবী- কারণ পৃথিবীর একশ’র বেশি জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের মানুষ এখানে আস্তানা গেড়ে স্থায়ীভাবে বসবাস করছে। বলা হয়ে থাকে- নিউ ইয়র্কে ডাবলিনের চেয়েও বেশি আইরিশ, তেল আবিবের চেয়েও বেশি ইহুদি, নাপোলির চেয়েও বেশি ইতালীয় এবং সান হুয়ানের চেয়েও বেশি পুয়ের্তোরিকান মানুষ বাস করেন।
এস্টোরিয়ার স্টেইনওয়ে স্ট্রিট আর থার্টিয়েথ এভিন্যুর মোড়ে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেললাম এর দৃশ্য। আমেরিকার বহুজাতিক চেহারা ফুটে উঠেছে এখানে চোখের সামনেই। মোড়ে মোড়ে দেখা যাচ্ছে নানা জাতির নানা রঙের মানুষের সব জটলা, তাদের রেস্তোরাঁ, কফিশপ, উপাসনালয়, আর্ট গ্যালারি আরো অনেক কিছু।
স্টেইনওয়ে রাস্তাটি বিখ্যাত হয়ে আছে তার চেয়েও বিখ্যাত এক পিয়ানোর নামে- স্টেইনওয়ে পিয়ানো। জার্মান ইমিগ্রান্ট হেনরি ইনগেলহার্ট স্টেইনওয়ে ১৮৫৩ সালে ম্যানহাটানের এক চিলেকোঠায় শুরু করেছিলেন তাঁর পিয়ানো নির্মাণ। খ্যাতি ও বিক্রি বাড়ার পর তিনি বর্তমান ঠিকানা ১ স্টেইনওয়ে প্লাজা, এস্টোরিয়াতে কারখানা চালু করেন। ১৭০ বছর ধরে কোম্পানিটি বিখ্যাত স্টেইনওয়ে পিয়ানো তৈরি করে আসছে। নাতাশা বলল, ‘স্টেইনওয়ে পিয়ানো কারখানাটির ভেতরে দেখব।’ বেশ ভালোই হবে, কারণ সে নিজেও পিয়ানো বাজায়। তবে তা দেখা আর হলো না। কারণ ফ্যাক্টরি ট্যুর তারা বন্ধ করে দিয়েছে, অনলাইনে যেয়ে শুধু ভার্চুয়াল ট্যুর নেয়া যাবে। এস্টোরিয়ায় আসার মূল উদ্দেশ্য ছিল স্টেইনওয়ে ফ্যাক্টরির ভেতরে দেখা- তা আর হলো না। যাক, এবার যাচ্ছি এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে- এক বরো কুইনসের উত্তর দিক থেকে আরেক বরো ব্রুকলিনের দক্ষিণ বিন্দুতে- কনি আইল্যান্ডে। নাবিল ও নাতাশা কোনো একটি বিচে যেতে চেয়েছে। আর এ বিচ বেছে নেয়ার কারণ হলো এখানে লোরকা এসেছিলেন কোনো এক রোববার। মজার ব্যাপার হলো আজকেও রোববার।
কনি আইল্যান্ড পৌঁছে ও কিছুটা ঘুরে মনে হলো লোরকা যা দেখেছেন, বলেছেন তার একটুও পরিবর্তন হয়নি একশ’ বছরেও। ছায়াছবির মতো এক নিখুঁত ও জীবন্ত বিবরণ তাঁর। ফোর্থ অফ জুলাই এর দিনে লোরকা বেড়াতে এসেছিলেন এখানে, তাই সেদিন ছিল বিপুল জনসমাগম। ৬ই জুলাই, ১৯২৯ তারিখে পরিবারের কাছে লেখা চিঠিতে’১ কনি আইল্যান্ড ঘুরে দেখার কথা বলছেন লোরকা:
‘...গত রোববার হাডসন নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপ কনি আইল্যান্ডে বেড়াতে যাই। এটি একটি চিত্তবিনোদন পার্ক, যাতে রয়েছে তোরণ-শোভিত পথ ও চমৎকার আরো অনেক কিছু। এখানকার সব কিছুর মতো এটিও বিস্ময়করভাবে বড়। পত্রিকার সংবাদে জানা যায় সেদিন এ পার্কে দশ লক্ষ লোক বেড়াতে গিয়েছিলেন। সেদিনের সৈকতের চেহারা ও মানুষের চলাচলের দৃশ্য আমি বর্ণনা করতে পারব না- এক এক গাদায় ছিল বিশ থেকে ত্রিশ হাজার লোক। পার্কটি সত্যিকার অর্থে শিশুদের জন্য এক স্বপ্নের জায়গা। সেখানে রয়েছে অসাধারণ সব রোলার কোস্টার, ফ্রিক শো, সঙ্গীত, নাচ-হল, ফেরিস হুইল ও বিভিন্ন ধরনের রাইড, বন্য জীব-জন্তু, পৃথিবীর সবচেয়ে স্থূলকায় নারী, চার-চক্ষুবিশিষ্ট মানুষ ইত্যাদি, ইত্যাদি। আরো রয়েছে হাজারো স্টল যা বিক্রি করছে বিভিন্ন ধরনের আইসক্রিম, হট ডগ, ফ্রেঞ্চ ফ্রাই, বান এবং ক্যান্ডি। এ দ্বীপে সমুদ্রের আর্দ্র ও লবণাক্ত আবহাওয়ার গুঞ্জনে ঘুরছিল জনতার দল: ইহুদি, কালো, জাপানি, চীনা, বর্ণসঙ্কর ব্যক্তি, এবং স্বর্ণকেশী ইয়াংকি।’
কনি আইল্যান্ডে দেখা জনতার দৃশ্য লোরকার স্মৃতিতে গেঁথে গিয়েছিলো, যা নিয়ে তিনি স্মৃতিচারণ করেন:২
‘জনতা! কেউ কল্পনাও করতে পারবে না নিউ ইয়র্কের জনতা কী রকম- শুধুমাত্র বলতে পারবেন ওয়ল্ট হুইটম্যান, যিনি এ থেকে বাঁচতে নির্জনতা খুঁজে নিয়েছিলেন এবং টি. এস. এলিয়ট, যিনি তাঁর কবিতায় জনতাকে লেবুর মতো কচলিয়ে বের করে আনেন ক্ষত, কবিকুল, ভিজে হ্যাট ও নদীর ছায়া-প্রচ্ছায়া।’
জনতার বিশাল জমায়েত আর কোলাহলে কনি আইল্যান্ডকে লোরকার মনে হলো ‘বমনেচ্ছুক জনতার এক ভূখ-’- আর এ নামে লেখেন নিচের কবিতাটি। সহ¯্র মানুষের ¯্রােতে তিনি হারিয়ে ফেলেন নিজেকে আর তাঁর প্রিয় নিসগর্কে- শুধু দেখতে পান কোলাহল: ‘আমি ঢাল তলোয়ারহীন এক কবি, গিয়েছি হারিয়ে/বিবমিষাময় বিশাল এক জনতার ভিড়ে, / আমার ললাটের ঘন শৈবাল উপড়ে ফেলে’:
... ... ...
কে আমার বিষণœতার কথা ভাবতে পারে?
আমার মুখটি দেখতে ছিল আমারই মতো, কিন্তু এখন আমি সে মানুষ নই।
আমার মুখের উলঙ্গ অবয়ব, কাঁপছে মদের আঁধারে
আর অবিশ্বাস্য জাহাজেরা ভিড়ছে ঘাটের পটাতনে
আমি এই দৃষ্টি নিয়ে নিজেকে সামলে রাখি
যে দৃষ্টি আসে অবিনাশী ভোরের তরঙ্গরাশি বেয়ে,
আমি ঢাল তলোয়ারহীন এক কবি, গিয়েছি হারিয়ে
বিবমিষাময় বিশাল এক জনতার ভিড়ে,
আমার ললাটের ঘন শৈবাল উপড়ে ফেলে
এমন কোন কোন টগবগে ঘোড়া তো নেই।
অথচ সেই স্থুলকায়া নারী সবার আগে গেল
আর মানুষের ¯্রােতে খুঁজে ফিরেছিল ফার্মেসির ঠিকানা
যেখানে হয়তো মিলে যেত কটুস্বাদ কর্কটের সন্ধান
যেইমাত্র একটি পতাকা ঊর্ধ্বমুখী হলো আর প্রথম কুকুরটি এসেছিল
তখন সারা শহর ছুটে গেল সাগরের
তীর ঘেঁষা পথের রেলিংগুলোর দিকে।৩
কনি আইল্যান্ডের আনন্দমেলায় অনেক রাত পর্যন্ত ছিলাম। পরদিন ভোরে আবার আসতে হলো ম্যানহাটানে, তা ছাড়া উপায় নেই। বিখ্যাত সব কিছু এখানেই। নাবিল বলল, ‘এখনো অনেক কিছু দেখার বাকি রয়ে গেছে।’ বললাম, ‘কয়েকটির নাম বলো।’ সে বলল, ‘এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিং, রকফেলার সেন্টার, ইউনিয়ন স্কোয়ার, গ্র্যান্ড সেন্ট্রাল টার্মিনাল...’। নাতাশা বলল, ‘ফিফথ এ্যাভেনিউ, সেন্ট্রাল পার্ক, মেট, মোমা...।’ বললাম, ‘এ শহরে এত কিছু দেখার আছে, সব কিছু দেখা এক সফরে সম্ভব নয়। আবার সব কিছু সবার শখেরও নয়। যেমন, এখন আমি যেতে চাই ইস্ট ভিলেজ, তোমরা যেতে চাও ফিফথ অ্যাভেনিউ...। দুইটিই দেখার জায়গা, তবে সময় কম, তাই করতে হবে প্রায়োরিটি। তোমরা যাও ফিফথ অ্যাভেনিউ, পাশেই সেন্ট্রাল পার্ক- এ দুইটিতে ঘুরতেই দিনের অর্ধেক চলে যাবে। আমি যাই ইস্ট ভিলেজ, এরপর গ্রিনউইচ ভিলেজ ও হার্লেমে। সবাই আবার মিলিত হবো বড় বার্নস এ্যান্ড নোবলস এর স্টারবাকসে- পাশেই ইউনিয়ন স্কোয়ার- সেটিও দেখা হয়ে যাবে।’ সবাই একমত হলো।
নাবিল বলল, ‘আমরা একসাথে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় দেখতে যাই। তারপর যার যার পথে যাব!’
সেখানে যাবার পথে কলম্বাস অ্যাভিনিউ ও ওয়েস্ট ৬০তম স্ট্রিটের কোনায় এক ক্যাথলিক চার্চে থামলাম। চার্চ অফ সেন্ট পল দি এপস্টল নামের এ চার্চটিতে লোরকা মাঝে মধ্যেই বন্ধুদের নিয়ে আসতেন। ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত গির্জাটি পলিস্ট ফাদার্স ধর্মীয় গোষ্ঠীর প্রধান কেন্দ্র। এর প্রধান প্রবেশ পথে রয়েছে ধূসর ও গোলাপি রঙের গ্রানাইট খিলান, তার ওপর লাগানো সেন্ট পলের ধর্মান্তরের কাহিনি নিয়ে এক সুন্দর বেস-রিলিফ৪-এর কাজ। ওপরে রয়েছে ৫টি রঙিন কারুকাজ করা জানালা। গির্জাটির দক্ষিণ ভাগ আংশিক ঢাকা পড়ে গেছে পাশের সুউচ্চ ভবনে।
এরপর সবাই পৌঁছলাম কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে- ২৫ মে ১৭৫৪ সালে করহম’ King’s College হিসেবে যার প্রতিষ্ঠা, আমেরিকার অভিজাত আইভি লিগের একটি বিশ্ববিদ্যালয়। পুরনো কিন্তু সুন্দর এক ক্যাম্পাস, নাবিল ও নাতাশা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখল। নাতাশা বলল, ‘আলমা মাতার’ দেখব। বললাম, ‘এ আবার কী?’ সে বলল, ‘এটি কলম্বিয়া ভার্সিটিতে এক নারীর নামকরা ভাস্কর্য। আলমা মাতার- এ ল্যাটিন শব্দটির অর্থ হচ্ছে সেবাদানকারী মা। এ শব্দ দিয়ে একজনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে বোঝায়, যেখানে সে লেখাপড়া করেছে।’ একটু ঘুরে ক্যাম্পাসের মাঝামাঝি লো মেমোরিয়াল লাইব্রেরির সামনে এ শৈল্পিক ভাস্কর্যটি দেখলাম। এর স্থপতি ডেভিড চেস্টার ফ্রেন্স ১৯০১ সালে এ স্থাপত্য তৈরি করেন। নাতাশা বলল, ‘দেখি, কে তোমরা আলমা মাতার এর পেঁচা বের করতে পার।’ পরে সে নিজেই দেখাল এ পেঁচা- আলমা মাতার-এর বাম পায়ের নিচে তা লুকোনো আছে। এটি হলো গ্রিক দেবী এথেনার পেঁচা, যাকে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
কোন বিশেষ স্থাপত্য নয়, আমার আগ্রহ ছাত্রদের দুইটি আবাসিক হল-ফার্নেল্ড হল ও জন লে হল। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় লোরকা প্রথমে ছিলেন ফার্নেল্ড হল-এর ৬১৭ নম্বর কক্ষে, এরপর থাকেন জন লে হল-এর ১২৩১ নম্বর কক্ষে। বেশি সময় লাগল না, হল দুইটি সহজেই পেয়ে গেলাম। লোরকার স্মৃতি হিসেবে এ হলগুলির ছবি নিয়ে আগের পরিকল্পনা মতো আমরা এগোলাম। তারা চলল ফিফথ অ্যাভেনিউ এর পথে, আমি ইস্ট ভিলেজে।
ইস্ট ভিলেজ নিউ ইয়র্কের কাউন্টার কালচারের কেন্দ্র। চিত্রশিল্পী, লেখক, কণ্ঠ-শিল্পী ও বিভিন্ন সঙ্গীত দলের শিল্প-চর্চা ও শিল্প-আন্দোলনের এ এক অতি পরিচিত স্থান। স্বাভাবিকভাবেই এখানে গড়ে উঠেছে অনেক গ্যালারি, ক্যাফে, বার, রেঁস্তোরা, পাঠাগার, পার্ক- সব কিছুতেই পাওয়া যায় শিল্পের ছোঁয়া। আসলাম এখানকার বিখ্যাত এক ক্যাফে দেখতে, যা বিখ্যাত হয়ে আছে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ ও নাট্য শিল্পীদের মিলন কেন্দ্র হিসেবে। নুয়োরিকান পয়েটস ক্যাফে মূলত শুরু হয়েছিল পুয়ের্তো রিকান বুদ্ধিজীবীদের এক সমাবেশস্থল হিসেবে। ইস্ট ভিলেজ-এর এ জায়গাটিকে অ্যালফাবেট সিটি বলা হয়, কারণ এর রাস্তাগুলির নাম- Avenues A, B, C, D।
ঠিক এরকম আরেকটি শিল্পী-অধ্যুষিত পাড়া রয়েছে একদম পাশেই- তা হলো গ্রীনউইচ ভিলেজ- অনেকে বলে শুধু ভিলেজ। ভিন্নধারার বিষয়-আশয় এখানকার মূল চালিকাশক্তি। ষাটের দশকে এটি খ্যাতি লাভ করেছিল বিট জেনারেশান ও কাউন্টার কালচারের জন্মস্থান হিসেবে। একটু অন্যরকম মনে হলো এ জায়গাটি- ঘরবাড়ি একটু পুরনো, রাস্তাঘাট সরু ও আঁকাবাঁকা, লোকজনের চলাচলে এক ধরনের খামখেয়ালীপনা- সব মিলিয়ে এক বোহেমিয়ান ভাব। ভিলেজের কেন্দ্র ওয়াশিংটন স্কোয়ার পার্কে যেয়ে বসলাম। সবুজের কোলে শিশু তরুণ তরুণীদের কোলাহলে পার্কটি প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠেছে। সামনেই সগর্বে দাঁড়িয়ে আছে মার্বেলের তৈরি তোরণ ওয়াশিংটন আর্চ। এখানেই শেষ হয়েছে ফিফথ অ্যাভিনিউ এর দক্ষিণ অংশ।
সন্ধ্যে নেমে আসতেই চারিদিকে জ্বলে উঠেছে আলো, আর জমে উঠছে ক্লাবে ক্লাবে পার্টি। এতে যোগ দেয়ার সময় হলো না। আমাকে যেতে হবে বিশেষ এক ক্লাবে- টেক্সি নিয়ে সেখানেই ছুটলাম।
লোরকা হার্লেমে এসেছিলেন ১০০ বছর আগে। আমি এসেছিলাম ২৫ বছর আগে। এর মধ্যে পৃথিবী অনেক বদলে গেছে। হার্লেমও তার ব্যতিক্রম নয়।
গতবার যখন এসেছিলাম তখন মনে এক ভয় ও উত্তেজনা ছিল। বন্ধুরা বলেছিল, হার্লেম যাবে না। সেখান থেকে ফিরতে পারবে, এ গ্যারান্টি দিতে পারি না। এ কথাটিই মনে ঢুকিয়ে দিয়েছিল ভয়। তার সাথে ছিল আগের প্রেজুডিস। এ দুইয়ে মিলে বাস্তবকে করে দিয়েছিল ধোঁয়াশে। তারপরও কৌতূহলের বশে এগিয়ে গেলাম। যেয়ে দেখি না কী হয়। তবে যখন সত্যিই হার্লেমে গেলাম, তাকে মনে হয়েছিল বাকি নিউ ইয়র্ক থেকে পুরো আলাদা। ঘন হয়ে থাকা পুরনো ঘর বাড়ি, রাস্তার মোড়ে মোড়ে মানুষের জটলা, হকারদের ভিড়, হঠাৎ করে লাফিয়ে উঠে গান গাওয়া ছেলে মেয়ে ও অনেক ভবঘুরের আড্ডা। কালো মানুষ ছাড়া অন্য বর্ণের মানুষ দেখাই গেল না। কাঁধে ব্যাগ নিয়ে স্কুলের পথে ছেলে মেয়েদের কলকাকলি, কাজের পথে তাদের বাবা মায়েদের ছুটে চলা, বুড়ো-বুড়িদের হাতে হাত রেখে চার্চের পথে চলা জীবন সংগ্রামের এসব ছবিও দেখেছিলাম, যা মনে গেঁথে আছে।
এত বছর পরে হার্লেমকে দেখে বিস্মিত হলেও হতাশ হই নি। বিস্মিত হওয়ার কারণ হলো, হার্লেমকে আর আলাদা করে দেখার উপায় নেই। নিউ ইয়র্কের বাকি জনপদের মতোই এটি একটি। হতাশ না হওয়ার কারণ- হার্লেমের উন্নয়ন- পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন নতুন ঘরবাড়ি, সুউচ্চ আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবন এবং নতুন বর্ণ বিন্যাস। আমেরিকার বাকি এলাকার মতোই সারি সারি দোকান ও রেস্টুরেন্ট- ম্যাকডোনাল্ডস, বার্গার কিং, স্টারবাকস, ওয়ালগ্রিন, কেএফসি। পাড়ার ঐতিহ্যবাহী দোকান ও রেস্তোরাঁ অনেক কমে গেছে।
হার্লেমে জরিপ করা নয়, তার একটি বিশেষ ক্লাব দেখাই ছিল আমার মূল উদ্দেশ্য। কটন ক্লাব- হার্লেমের এক সময়ের নামকরা জ্যাজ ক্লাবে লোরকা প্রায়ই আসতেন। ১২৫তম ওয়েস্ট স্ট্রিট ও ব্রডওয়ের কোনায় সুন্দর এ ক্লাবটি সহজেই চোখে পড়ল। সামনের ছোট এক সাইন বোর্ডে লেখা আছে রাত ৮ টায় খুলবে। এখনো অনেক সময় আছে। আর একটু ঘোরাঘুরি করা যায়।
কটন ক্লাব ঐতিহ্যবাহী নামকরা এক ক্লাব। নিশ্চয়ই অনেক জনসমাগম হবে। কাছে যেয়ে একজনকেও পেলাম না। আরো কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে সাইন বোর্ডে লেখা ফোন নাম্বারে ফোন করলাম- কেউ ধরল না, কল ব্যাকও করল না। লোরকার স্মৃতির চিহ্ন হিসেবে কটন ক্লাব এর কয়েকটি ছবি তুলে রাস্তার বিপরীত দিকের এক রেস্তোরাঁয় গেলাম। তার ম্যানেজার ডেভিড এনসিজো খুব আমুদে একজন লোক। প্রথমে এক চোট হাসলেন শুনে যে আমি ঘন্টাখানেকের মতো সময় অপেক্ষা করছি কটন ক্লাবের জন্য। বললেন, ‘বেশ কিছুদিন হলো ক্লাবটি কোনো কারণে বন্ধ হয়ে গেছে। এটি কটন ক্লাবের তৃতীয় স্থান। লোরকা ১৯২৯ সালে যে ক্লাবে গিয়েছিলেন সেটি অন্য জায়গায় ছিল। সামনের ক্লাবটি চালু হয় ১৯৭৮ সালে। কটন ক্লাব একটি ঐতিহাসিক ক্লাব, নামটি বেশ জনপ্রিয়। তোমার মতো এ রকম অনেকে আসে এর টানে। যা হোক, এই হার্লেমে আরো অনেক জ্যাজ ও ব্লুজ-এর ক্লাব আছে। ভালো কয়েকটির ঠিকানা দেব, তুমি একটিতে যেতে পার।’
লোরকার কটন ক্লাব-টিকে পেলাম না, তাই অন্য কোনো ব্লুজ ও জ্যাজ ক্লাবে যাবার ইচ্ছে হলো না।
নিউ ইয়র্কের নাগরিক যন্ত্রণার মাঝে একমাত্র কালোদের সাথে মিশেই সত্যিকার আনন্দ ও প্রশান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন লোরকা। লোরকার বর্ণনায়২ তাঁর কিছুটা পরিচয় মেলে: ‘হার্লেমে রয়েছে মানবিক উষ্ণতা ও শিশুদের কোলাহল, রয়েছে আবাস ও ঘাস; দুঃখের জন্য রয়েছে সান্ত¡না, এবং ক্ষতের জন্য সুগন্ধী ব্যান্ডেজ।’
নেলা লারসেন৫ হলেন হার্লেমে লোরকার প্রবেশদ্বার। নিউ ইয়র্ক আসার মাত্র দু’সপ্তাহ পরে পরিবারের কাছে এক চিঠিতে লোরকা বলেছেন: ‘এক বিখ্যাত কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা লেখক নেলা লারসেন-র সাথে আমার পরিচয় হয়েছে- তিনি হলেন এক অগ্রগামী লেখক। তাঁর সাথে আমি কালোদের পাড়ায় বেড়াতে গিয়েছিলাম, সেখানে দেখলাম চমৎকার অনেক কিছু; তিনি অপরূপ সুন্দরী এক মহিলা ও অত্যন্ত সজ্জন- তার মাঝেও দেখলাম কালোদের সেই গভীর ও মর্মস্পর্শী বিষাদময়তা।’
হার্লেমের সাথে গভীরতর হতে থাকে লোরকার যোগাযোগ- কালোদের জীবনযাত্রা, আবেগ, সঙ্গীত, চিত্রকলা তাঁকে বিমুগ্ধ করে। তিনি স্পেনের জিপসিদের জীবন ও সংস্কৃতির সাথে তাদের মিল খুঁজে পান। ক্রমে লোরকা কালোদের সাথে একাত্ম হয়ে গিয়েছিলেন, তাদের অবহেলিত ও বৈষম্য-পীড়িত জীবন দেখে হয়েছিলেন ব্যথিত, আর কালোদের প্রতি অবিচার ও অসাম্যের প্রতিবাদ করেছেন- যার প্রকাশ তাঁর কবিতা ‘হারলেমের রাজা’।৬
... ... ...
হা হার্লেম! হা হার্লেম! হা হার্লেম!
কোনো যন্ত্রণাই নয় তোমার ওই দলিত লাল, তার মতো,
তোমার ওই কালো রাহুগ্রাসের ভেতরে আর্ত
শিউরানো রুধির, তার মতো,
বোবা-কালা পরছায়ায় তোমার ওই যে ডালিম-
পাথরের ক্রোধ, তার মতো,
ফটক-রক্ষীর উর্দি-বন্দী ওই তোমার যে মহামান্য
রাজা, তার মতো।
আষ্টেপৃষ্ঠে ফাট-ধরা রাত, সারা ঠাঁই যেন গজদন্তে গড়া
নিশ্চল গোসাপ। আমেরিকান মেয়েরা
পেটে বয়ে আনছিল বাচ্চা আর রেজগি টাকাকড়ি,
ছেলেরা অচেতন দেহ এলিয়ে দিচ্ছিল ক্রুশকাঠে।
ওরাই তো তারা।
রুপোলি হুইস্কি গেলে আগুন পাহাড়ের কাছেপিঠে,
ভালুকের তুষার সানুতে বসে খেতে থাকে কলজের টুকরো।
... ... ...
নিগ্রো! আর নিগ্রো! আর নিগ্রো! নিগ্রোদল!
ঊর্ধ্বমুখী তোমার রাতের মধ্যে রক্তের বেরোবার দোর নেই।
মুখেও রক্তিমা নেই। ত্বকের তলায় কোপোন্মাদ রক্ত শুধু
জীয়ে আছে কিরীচের কাঁটামুখে, দৃশ্যের বুক ভ’রে,
দিব্য এক কর্কট-চাঁদের আঁকড়ি-দাঁড়া আর ঝাড়–র তলায়।
রক্ত, শত পথ বেয়ে মৃত্যুকে যে খোঁজে, মৃত্যু যেন
ময়দা, ফুলভস্ম মাখা, খোঁজে ঢাল, কঠিন আকাশ, গ্রহপুঞ্জ যেখানে
পাক খায় বেলাতটে ত্যক্ত জঞ্জালের একসাথে।
... ... ...
সর্বজ্ঞ স্তব্ধতার মাঝ দিয়ে
ওয়েটার, রাঁধিয়েরা, যারা জিভে
চেটে সাফ করে কোটিপতিদের ক্ষত,
রাজাকে খুঁজছে সব রাস্তায় রাস্তায়, শোরাবারুদের বাঁকে।
... ... ...
হা মুখোশ-চড়ানো হার্লেম!
হা হার্লেম, নির্মু-ী স্যুটের ভিড়ে ভীত!
তোমার জনরব কানে আসে।
তোমার জনরব এল গাছ-গুঁড়ি, লিফ্টের হাতল,
ধূসর স্টীল-পাত পার হয়ে
দন্তুর গাড়ির ¯্রােত তোমার যেখানে ভেসে চলে
মরা ঘোড়া, ছোটো ছোটো দুষ্কৃতি পার হয়ে,
নিরাশার মূর্তি সেই তোমাদের মহান রাজাকেও পার হয়ে,
সমুদ্র ছুঁয়েছে দাড়ি যার।
নিউ ইয়র্ক নিয়ে লেখা লোরকার কবিতাগুলি বোঝা বেশ কঠিন, ‘হারলেমের রাজা’ কবিতাটিও তার ব্যতিক্রম নয়। আন্দালুসিয়ার নিসর্গের গীতলতা থেকে তিনি এসেছেন বিপরীত এক বিশ্বে, যা গতিময় ও যান্ত্রিক। এর ছাপ পড়েছে তাঁর কবিতায়। লোরকার ভাষায়: ‘নিউ ইয়র্ক নিয়ে যে কবিতা লিখছি তা হবে ‘চিত্রময়’, শব্দ আর ছবি নিয়ে এক গভীর ভাবনার প্রকাশ, এমন গভীর যে পাঠক বুঝবে না, আলোচনা করবে আর পরে নিন্দে।’৭
Ref:
1. `The Poet in New York’: Federico Garcia Lorca, translated from the Spanish by Greg Simon and Steven F, White: The poet writes to his family from New York and Havana, translated by Christopher Maurer.
Published by: Farrar, Straus and Giroux, New York
2. From interviews in 1931, 1932, and 1933, reprinted in Garcia Lorca, Obras completas, Vol II, (Barcelona: Galaxia Gutenberg, 1997)
3, Paisaje de la multitud que vomita (Anochecer de Coney Island): বমনেচ্ছুক জনতার এক ভূখ- (কনি আইল্যান্ডে রাত্রি), অনুবাদ: জুলফিকার হায়দার
৪. বেস-রিলিফ: একটি ভাস্কর্য কৌশল যেখানে চিত্র বা নকশাগুলি পটভূমির পৃষ্ঠ থেকে সামান্য উপরে তোলা হয়। এই ধরনের ভাস্কর্য একটি সূক্ষ্ম গভীরতা তৈরি করে।
৫. নেলা লারসেন: শেষ পর্যায়ে তখন ‘হার্লেম রেনেসাঁ’ (১৯১০-১৯৩০)- আমেরিকার কালোদের সাহিত্য ও শিল্প বিপ্লবের স্বর্ণযুগ। এ রেনেসাঁ কালের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ মহিলা ঔপন্যাসিক নেলা লারসেন, যার প্রকাশিত দুইটি উপন্যাস Quicksand (1928) Passing (1929) তাঁকে নিউ ইয়র্কের সাহিত্যিক মহলে বিশেষ পরিচিতি দিয়েছিল।
তিনি ‘হার্লেম রেনেসাঁ’-র অনেক লেখক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পীর সাথে লোরকার পরিচয় করিয়ে দেন। নেলা লারসেন এর সাথে হার্লেমের অনেক পার্টিতে গেছেন লোরকা- তখন ঘরভর্তি লোকের মাঝে তিনি ছিলেন একমাত্র শ্বেতাঙ্গ ব্যক্তি। এখানেই সর্বপ্রথম তিনি জ্যাজ সঙ্গীতের সাথে পরিচিত হন। লোরকা নিজেও খুব ভালো পিয়ানো বাজাতেন এবং তার বাজনায় দর্শক-শ্রোতাদের মুগ্ধ করে দিতেন। এরকম একটি পার্টিতে উপস্থিত ছিলেন বিখ্যাত স্পেনীয় গিটারিস্ট আন্দ্রে সেগেভিয়া।
6.El rey de Harlem: হারলেমের রাজা, অনুবাদ: দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়
৭. লোরকার চিঠি: নিউ ইয়র্ক, ২২ জানুয়ারি, ১৯৩০ সালে মা-বাবা ও ভাইবোনদের কাছে লেখা: অনুবাদ: তরুণ কুমার ঘটক, গ্রন্থ: লোরকার চিঠি, প্রকাশক: অনুষ্টুপ, কলকাতা।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির