কালপুরুষের ঘুম
রিপন বর্মন
সমকালীন বাংলা কবিতার ভিড়ে কিছু কাব্যগ্রন্থ নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে থাকে। তারা উচ্চৈঃস্বরে নিজেদের ঘোষণা দেয় না; বরং ধীরে ধীরে পাঠকের অন্তরে প্রবেশ করে, সেখানে এক দীর্ঘস্থায়ী প্রতিধ্বনি রেখে যায়। কবি সঞ্জয় দেওয়ানের দ্বিতীয় কাব্যগ্রন্থ ‘কালপুরুষের ঘুম’ ঠিক তেমনই এক নিঃশব্দ, গভীর ও ভাবনামগ্ন কাব্যিক পাঠানুভব। তাঁর প্রথম গ্রন্থ ‘জলের ক্যালিগ্রাফি’তে যে প্রতীকী, ইঙ্গিতময় ও সংবেদনশীল কাব্যভাষার সূচনা হয়েছিল, কালপুরুষের ঘুম সেই ভাষার আরও সংযত, গভীর ও তীক্ষœ পরিণতি।
গ্রন্থের ৫৫টি কবিতা মূলত সময়ের আত্মকথা। এখানে ব্যক্তি, প্রেম, সমাজ, রাষ্ট্র ও ইতিহাস একে অপরের সঙ্গে মিশে গিয়ে একটি বিষণœ অথচ তীক্ষœ সময়মানচিত্র নির্মাণ করেছে। কবিতাগুলো যেন অন্তহীন পথে হাঁটা এক ক্লান্ত মানুষের স্বগতোক্তি: ‘উদ্দেশ্যহীন মেঘ খুঁজে প্রেয়সীর নরম স্পর্শ’,
যেখানে ভালোবাসাও আর নিশ্চিত আশ্রয় নয়, বরং হারিয়ে যাওয়ার আরেক নাম।
এ গ্রন্থে ‘ঘুম’ কেবল বিশ্রামের প্রতীক নয়; এটি ক্লান্তির, আত্মসমর্পণের, বিস্মৃতির এবং সময়ের কাছে নীরবে হার মেনে নেওয়ার বহুমাত্রিক রূপক। কালপুরুষ এই গ্রন্থের কেন্দ্রীয় উপস্থিতি- এক ইতিহাস সচেতন মানুষ, যিনি যুদ্ধ, লাঞ্ছনা, বিশ্বাসভঙ্গ ও নগরসভ্যতার নিষ্ঠুরতার ভেতর দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে ঘুমিয়ে পড়েছেন। তার ঘুম আসলে আমাদের সময়েরই ঘুম; যে সময়ে মানুষ নিজের স্বপ্ন, দায়িত্ব ও মানবিক বোধ হারিয়ে ফেলেছে।এই সময়বোধ প্রকৃতির মধ্যেও প্রতিফলিত হয়- ‘নোনাজলের ঘ্রাণে মায়াহরিণ আত্মহারা’,
যেখানে মায়া, আকাক্সক্ষা ও বিভ্রম মিলেমিশে এক অনির্দিষ্ট অস্তিত্বের সংকেত দেয়।
গ্রন্থের একাধিক কবিতায় আগুন, রক্ত ও ইতিহাস এক ভয়াবহ চিত্রকল্পে মিলিত হয়েছে। ‘আগুনের বৃষ্টি’ কবিতায়-
‘বুকে তপ্ত রোদের আঁচড় ছিল’,
‘বুক চিতিয়ে দেয় অকুতোভয় বায়ান্ন’,
‘ফাগুনের নদী লাল হয়ে যায়’
এবং শেষে রক্তপলাশের বনে আগুনের বৃষ্টি নামা, কেবল একটি রাজনৈতিক মুহূর্ত নয়, বরং একটি জাতির স্মৃতিতে দগদগে হয়ে থাকা ইতিহাসের প্রতিরূপ।
পৌরাণিক অনুষঙ্গ এখানে অলংকার নয়; বরং সমকালীন নৈতিক ও সামাজিক সংকটের ভাষ্য। ‘দ্রৌপদী শাপ’ কবিতায় নারীদেহ, লাঞ্ছনা ও যুদ্ধ এক ভয়াবহ চিত্রকল্পে মিলিত হয়-
‘সন্তর্পণে উড়ে যায় বুকের শেমিজ মুঠোবন্দি হয় স্তনফুল দ্রৌপদীর শাপে চন্দ্রগ্রহণ কুরুক্ষেত্রে’।
এখানে দ্রৌপদী কেবল মিথের চরিত্র নন; তিনি সমকালের প্রতিটি নির্যাতিত নারীর প্রতীক।
প্রেম ও বিরহের কবিতাগুলোতেও গভীর বিষণœতা ও অপেক্ষার সুর-
‘মিথুনের অপেক্ষায় বিরহী রাত’ (কোজাগরি পূর্ণিমা),
বা
‘অবচেতন মনে পড়ে থাকি অনিদ্রার পালঙ্কে মরা গাঙে ভেসে চলে
একজোড়া রক্তপলাশ চোখ’
যেখানে প্রেম স্মৃতি হয়ে অনিদ্রার সঙ্গে বসবাস করে।
নগরসভ্যতা কবির কাছে আশ্রয় নয়; বরং এক শূন্য, নির্দয় পরিসর। ‘বিহঙ্গ পুরাণ’ কবিতায় উচ্চারিত হয়
‘এ নগরে কোনো পাখি নেই নৃত্য নেই, ভোরের শিশির নেই রাঙা সকাল নেই’।
এই নগর মানে মানুষের ভেতরের শূন্যতা, যেখানে
প্রাণের স্বাভাবিক প্রবাহ থেমে গেছে।তবু কোথাও কোথাও ক্ষীণ স্বপ্নের ইশারা: ‘জোনাকির মনে জাগে স্বপ্নের বীজ’ (বসন্তের ভায়োলিন),বা ‘প্রথম দেখার ছাপ মনে গেঁথে রয়’ (শহুরে বৃষ্টি)
যেন অন্ধকারের ভেতরেও আলো খোঁজার এক নীরব চেষ্টা। বিচ্ছেদ, ভ্রাম্যমাণতা ও বাউ-ুলে জীবনবোধও কবিতায় ধরা পড়ে- ‘দৌলতপুরের বিরহী বাতাস বিচ্ছেদের কেচ্ছা শোনায়’, এবং চৈত্রের নিষ্ঠুরতায়- ‘আকাশে নিকষ আঁধার মৃত মানুষের শোকে নিশ্চল পৃথিবী’।
এ গ্রন্থে নদীও আর মুক্ত নয়- ‘পোষা নদী নারী হয়ে জন্মায় নতুন কোনো দ্বীপে’, যেখানে প্রকৃতিও নিয়ন্ত্রিত, বশীকৃত, মানুষের মতোই ক্লান্ত।
এই স্বপ্নবাজ কবির কবিতাসমূহ পাঠককে শান্ত, শীতল সৌন্দর্যে মুগ্ধ করলেও গ্রন্থজুড়ে প্রতীক ও বিমূর্ততার ঘনত্ব কখনো কখনো দুর্বোধ্য হয়ে ওঠে। এতে সাধারণ পাঠকের পাঠপ্রবাহে ছন্দপতন ঘটতে পারে এবং কিছু কবিতায় শব্দের অতিরিক্ত ব্যবহারের অনুভূতি জাগে। আবেগের অতিরিক্ত সংযম কয়েকটি কবিতায় সংবেদনগত সংযোগ দুর্বল করে দেয়, আর বিষণœতা, ঘুম ও ক্লান্তির পুনরাবৃত্ত চিত্রকল্প দীর্ঘ পাঠে একঘেয়েমি সৃষ্টি করতে পারে। সব কবিতার কাব্যিক শক্তি সমান নয় এবং সমকালীন বাস্তবতা প্রধানত ইঙ্গিতের আড়ালে থাকায় কিছু কবিতা সরাসরি সময়চিহ্ন প্রত্যাশী পাঠকের কাছে দূরবর্তী মনে হতে পারে। তবে এসব সীমাবদ্ধতাই কবির কাব্যভাষার সচেতন ঝুঁকির অংশ; তবু প্রতীক ব্যবহারে সংযম ও বৈচিত্র্য বাড়লে ‘কালপুরুষের ঘুম’ আরও বিস্তৃত পাঠকগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাতে পারত।
সব মিলিয়ে ‘কালপুরুষের ঘুম’ কোনো সহজ পাঠের গ্রন্থ নয়। এটি মনোযোগ, পুনঃপাঠ ও ধৈর্য দাবি করে। কিন্তু যে পাঠক এই বইয়ের সঙ্গে হাঁটতে রাজি, তিনি ফিরে আসেন গভীরতর মানবিক প্রশ্ন, সময়চেতনা ও কাব্যিক উপলব্ধির এক সমৃদ্ধ পরিসরে।
‘জলের ক্যালিগ্রাফি’ থেকে ‘কালপুরুষের ঘুম’- এই উত্তরণে স্পষ্ট, কবি সঞ্জয় দেওয়ান তাঁর কাব্যভাষা, প্রতীকচেতনা ও সমকালীন মানুষের ক্ষয়িষ্ণু মানসিকতার প্রতি দৃষ্টি আরও সংহত ও দৃঢ় করেছেন। সমকালীন বাংলা কবিতায় ‘কালপুরুষের ঘুম’ নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন- যা পাঠক ও সমালোচক উভয়ের কাছেই দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে বলে বিশ্বাস। গ্রন্থটির প্রচ্ছদ করেছেন ধ্রুব এষ। প্রকাশক: সময় প্রকাশন। প্রথম প্রকাশ: ফেব্রুয়ারি ২০২৬। মূল্য ২০০ টাকা।
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির