ফজল হাসান
(পূর্ব প্রকাশের পর)
মির্জা গালিবের সাহিত্যকর্ম বহুমাত্রিক। যদিও মূলত তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা আধ্যাত্মিক কবি, তবে কবিতার পাশাপাশি তিনি অসংখ্য গজল ও শায়েরি রচনা করেছেন। তাঁর গদ্য সাহিত্যের পরিধি খুব বেশি বিস্তৃত নয়, শুধুমাত্র চিঠি এবং রোজনামচা বা দিনলিপিতে, অর্থাৎ ডায়েরি লেখায়, সীমাবদ্ধ। তবে কবিতা ও গজলের মতো তিনি গদ্য রচনায়ও পারঙ্গমতার স্বাক্ষর রেখেছেন।
কবিতা ও গজল
মির্জা গালিবকে বলা হয় আধুনিক উর্দু কবিতার পথিকৃৎ। কেননা তাঁর কবিতায় কাব্যিক শৃঙ্খলা এবং ভাবনার গভীরতা রয়েছে। তিনি তাঁর কবিতায় প্রেম-ভালোবাসা, দুঃখ-কষ্ট, জীবন ও মৃত্যুর মতো জটিল বিষয়গুলো অত্যন্ত সহজিয়া কথায় প্রকাশ করেছেন। এছাড়া তাঁর কাব্যে উঠে এসেছে মোগল সাম্রাজ্যের পতনের কথাও।
মির্জা গালিবের কবিতা অপূর্ব নান্দনিক, ছন্দোময় এবং সহজ ভাবসমৃদ্ধ। নিজের লেখা কবিতার শ্রেষ্ঠত্ব সম্পর্কে তিনি ছিলেন খুবই আত্মবিশ্বাসী এবং প্রচ- অহঙ্কারী। তাঁর ধারণা ছিল যে, খুব কম লোকই তাঁর কবিতা বিচার করতে, এমনকী রস আস্বাদন করতেও সক্ষম। নিজের কাব্যপ্রয়াস প্রসঙ্গে তিনি লিখেছেন, ‘আমার হৃদয়ের আগুন থেকেই আলো দিচ্ছে আমার কবিতা। আমি যা লিখছি, তাতে একটি আঙুল দেয়ার সাধ্য নেই কারো।’
মির্জা গালিবের কবিতা মূলত দু’টি প্রধান শাখায় বিভক্ত: ১. প্রেমের কবিতা এবং ২. আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক কবিতা।
প্রেমের কবিতা
মির্জা গালিবের কবিতায় প্রেম-ভালোবাসা একটি বিশেষ জায়গা অধিকার করে। তিনি প্রেমকে শুধুমাত্র শারীরিক সম্পর্ক হিসাবে দেখেননি, বরং আবেগ, আত্মবিশ্বাস এবং পরম্পরার দৃষ্টিতে উপস্থাপন করেছেন। তাঁর প্রেমের কবিতা গভীর আবেগপূর্ণ, যা জীবনযাত্রার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এছাড়া তাঁর প্রেমের কবিতা অত্যন্ত আবেগময়। তাঁর কবিতায় প্রেম কখনো তীব্র ভালোবাসা, কখনো বেদনা এবং কখনো বিরহের দুঃখ স্থান পেয়েছে। তিনি কবিতার মাধ্যমে প্রেমের আদর্শ এবং ব্যক্তি-জীবনের দুঃখ-কষ্টকে প্রকাশ করেছেন।
আধ্যাত্মিক ও দার্শনিক কবিতা
মির্জা গালিবের কবিতায় আধ্যাত্মিকতা এবং সুফিবাদের গভীর দর্শনের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়। কেননা সুফিদের মতো তিনিও সৃষ্টিকর্তাকে রহস্যময় এক প্রেমময় সত্তা হিসাবে কল্পনা করেছেন, কিন্তু নিজেকে কোনো নির্দিষ্ট তত্ত্ব বা ধারায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। তাঁর কবিতায় জীবনের সত্য, মানুষের দুর্বলতা, হতাশা এবং মানসিক অস্থিরতার প্রতিফলন রয়েছে। তিনি মানুষের অন্তর্গত যন্ত্রণা ও বেদনা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করেছেন এবং কবিতায় তিনি এসব বিষয়ের প্রতি খোলামেলা দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেছেন। তিনি আত্মার মুক্তি এবং মানবজীবনের অস্থিরতা ও মায়ার প্রতি বিরূপ দৃষ্টি রেখেছেন। গালিবের জন্য কবিতা ছিল এক ধরনের আধ্যাত্মিক অনুভূতি, যার মাধ্যমে তিনি নিজের জীবন এবং পৃথিবীর সঠিক উদ্দেশ্য অনুসন্ধান করেছিলেন। তাঁর কবিতায় শিষ্যত্ব, ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং ইসলামী আধ্যাত্মিকতা খুঁজে পাওয়া যায়। মনের গভীরে প্রার্থনা, বিচ্ছেদ এবং একমাত্র সৃষ্টিকর্তার প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির আবেগী শব্দ কবিতায় উঠে এসেছে।
মির্জা গালিবের কবিতায় ধর্মীয় শব্দাবলি উঠে এসেছে প্রতীকী অর্থে, যা অনিবার্যভাবে ধর্মের প্রতি তাঁর বিরূপ ধারণা বা বিশ্বাস নাও হতে পারে, যেমন তিনি লিখেছেন: ‘কাবা তওয়াফ করার প্রয়োজন নেই আমার। আমাকে জমজম কূপের কাছে থামতে হবে, কারণ আমার ইহরাম সুরায় ভিজে গেছে। গত রাতে আমি জমজমের পাশে বসে আকণ্ঠ সুরা পান করেছি। প্রথম আলো ফুটতেই ইহরাম থেকে সুরার দাগ ধুয়ে ফেলতে হবে।’
যাহোক, সমালোচকদের মতে, মির্জা গালিবের কবিতা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের মতোই দুর্বোধ্য ও সামঞ্জস্যহীন ছিল। তিনি মনে করতেন, তাঁর কবিতা যারা উপলব্ধি করতে অক্ষম, তারাই তাঁর কবিতাকে দুর্বোধ্য হিসাবে আখ্যায়িত করেন। তিনি আরও মনে করতেন যে, শুধু সাধারণ পাঠক নয়, বরং অন্য অনেক কবিরাও তাঁর কবিতা উপলব্ধি বা আত্মস্থ করতে পারবে না। কথিত আছে যে, তাঁর কবিতা কোনো এক পাঠকের বোধগম্য হয়নি। এ প্রসঙ্গে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘প্রভু, সে আমার কথা বোঝে নাই; হয় তাকে বোঝার ক্ষমতা দাও, অথবা আমাকে দাও নতুন ভাষা, যে ভাষায় কথা বললে সে বুঝিবে।’
এছাড়া মির্জা গালিবের কবিতায় অসঙ্গতিপূর্ণ বিষয়ের উপস্থিতি থাকার অভিযোগের জবাব তিনি লিখেছেন, ‘আমি প্রশংসার কাঙ্গাল নই, এমনকী পুরস্কারের জন্যেও লালায়িত নই। আমার কবিতার যদি কোনো অর্থও না থাকে, তা নিয়েও আমি চিন্তিত নই এবং তোয়াক্কা করি না।’
অন্য আরেকটি কবিতায় মির্জা গালিব ব্যঙ্গ করে লিখেছেন, ‘ও, আমার হৃদয়, এটা তো সত্য যে, আমার কবিতা খুবই কঠিন। খ্যাতিমান ও সফল কবিরা আমার কবিতা শুনে সেগুলো সহজ করতে বলে, কিন্তু কঠিন ছাড়া কোনো কবিতা লেখা আমার জন্য বড্ড কঠিন।’
জানা যায়, কবিতার উৎকর্ষতার ব্যাপারে মির্জা গালিব ছিলেন অত্যন্ত আস্থাশীল। তাই তো তিনি গর্ব করে বলেছিলেন, ‘আমার হৃদয়ের আগুন থেকেই আলো দিচ্ছে আমার কবিতা, আমি যা লিখছি তাতে একটি আঙ্গুল দেওয়ার সাধ্য নেই কারো।’
মির্জা গালিবের কবিতা কেবল তাঁর সময়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল না, বরং আজও তা সাহিত্যপ্রেমীদের কাছে অমর হয়ে আছে। ‘দেওয়ানে গালিব’ শিরোনামে তাঁর কবিতা সংকলন রয়েছে, যা জীবদ্দশয়াই প্রকাশিত হয়েছিল।
মির্জা গালিবের কবিতার একটি বড় অংশ হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর প্রশংসা করে লেখা নাত, যা প্রমাণ করে যে তিনি ছিলেন একজন ধার্মিক মুসলমান। তিনি কবিতা হিসাবে তাঁর ‘আব্র-ই-গুহর বার’ (অর্থাৎ মণি-বহনকারী মেঘ) নাত লিখেছিলেন। গালিব ১০১টি শ্লোকের একটি কাসিদাও লিখেছিলেন। এছাড়া তাঁর অসংখ্য উক্তি রয়েছে, যেগুলো জীবনের বাস্তবতা ও আবেগের এক নিখুঁত প্রতিচ্ছবি।
কবিতা ছাড়া মির্জা গালিবের সাহিত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘গজল’। তিনি মাত্র ২৩৪টি গজল লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে বিভিন্ন সঙ্গীতশিল্পী বিভিন্ন আঙ্গিকে গেয়েছেন।
মির্জা গালিবের আগে গজল ছিল প্রধানত যন্ত্রণাদায়ক প্রেমের প্রকাশ, কিন্তু গালিব তাঁর গজলে জীবন-দর্শন, দুঃখ-কষ্ট এবং রহস্য প্রকাশ করেছেন। এছাড়া সচেতনভাবে হোক কিংবা অচেতনভাবে হোক, তাঁর গজলগুলো সুফিবাদের দর্শনকে আড়ালে রাখেনি। তিনি অন্য অনেক বিষয়েও গজল লিখেছেন, যার জন্য গজলের পরিধি ব্যাপকভাবে প্রসারিত হয়েছে। তাঁর গজলে উঠে এসেছে দর্শন, গভীর জীবনবোধ, দার্শনিক চিন্তা ও রহস্যময়তা, আবার কোথাও কোথাও দেখা যায় বাস্তববাদ, ভোগবাদ ও প্রেম। তবে তাঁর গজল কালোত্তীর্ণ হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে, যেমন শব্দের নিবিড়তা আর বর্ণনাভঙ্গির সাবলীলতা, তাঁর আধুনিক মনের কল্পনা, সৃজনশীল প্রশ্ন, মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান, ক্ষণস্থায়ী রহস্যময়তা, উদ্ভাবনী যুক্তি এবং গতানুগতিক ভাষাকে লঙ্ঘন অবজ্ঞা করার সামর্থ্য।
মির্জা গালিবের গজলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে একটি হলো প্রেমকে অস্বাভাবিকভাবে উপস্থাপন করা। তাঁর বহু গজলে ইশক-এ-মাজাজি (জাগতিক প্রেম) ও ইশক-এ-হাকিকি (আধ্যাত্মিক প্রেম)-এর মধ্যে মিশ্রণ দেখা যায়। তিনি কেবল শব্দ নিয়ে খেলেননি, বরং জীবনের হাহাকারকে গজলের মাধ্যমে অমরত্ব দিয়েছেন। সম্প্রতি এক লেখায় যাকিয়া সুমি সেতু উল্লেখ করেছেন যে, ‘মির্জা গালিবের গজল কেবল পৃথক কবিতার সমষ্টি নয়, বরং এটি একটি প্রবাহমান শিল্পরূপ।’
জানা যায়, তৎকালীন পাকিস্তান আমলে (বিশেষ করে ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ পর্যন্ত) মির্জা গালিবের গজল ছিল শিক্ষিত বাঙালির বৈঠকখানার অবিচ্ছেদ্য অংশ। বলাবাহুল্য, আজও তাঁর রচিত গজল শ্রোতা এবং পাঠকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
মির্জা গালিব গজলের পাশাপাশি অসংখ্য শের রচনা করেছেন। সেগুলোর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো যে, শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কোনো সময় কিংবা স্থানকে প্রকাশ করে না, বরং চিরকালীন মানবিক অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার প্রতিনিধিত্ব করে। তাঁর শেরগুলোর মধ্যে প্রেম-ভালোবাসা, দুঃখ, বিচ্ছেদ, আধ্যাত্মিকতা এবং জীবন যাপনের বিভিন্ন রূপ একই সঙ্গে মিশে আছে।
মির্জা গালিবের গদ্য সাহিত্য
মির্জা গালিব যে শুধু উর্দু সাহিত্যের অন্যতম আধ্যাত্মিক কবি কিংবা গজল রচয়িতা ছিলেন, তাই নয়। তাঁর গদ্য রচনাও, বিশেষ করে চিঠি লেখার শৈলী এবং শব্দের প্রয়োগ, উর্দু সাহিত্যের এক অনন্য দলিল হিসাবে সুনাম অর্জন করেছে। এছাড়া তিনি ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময়কালীন বিষয় নিয়ে দিনলিপি বা রোজনামচা (ডায়েরি) লিখেছিলেন, যা পরবর্তীতে দাস্তাম্বু (সুগন্ধি পুষ্পস্তবক) শিরোনামে প্রকাশিত হয়েছে।
মির্জা গালিব বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে অনেক চিঠিপত্র লিখেছিলেন। তাঁর কাব্যিক চিন্তা-ভাবনা প্রধানত সেসব চিঠির মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। সেসব চিঠি একদিকে যেমন পাঠককে তাঁর কবিতা সম্পর্কে ধারণা দেয় এবং অন্যদিকে সেগুলো তাঁর সময়ের সামাজিক-রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে জীবন্তভাবে তুলেছে। তিনি চিঠির সনাতন ধারার লেখাকে (মুরাসলা) সংলাপে (মুকালমা) পরিণত করেছেন। আর তা ছিল উর্দু গদ্যের ক্লাসিক্যাল ও আনুষ্ঠানিক শৈলী থেকে আলাদা, যা সাধারণত আরও আনুষ্ঠানিক ও অলঙ্কৃত প্রকাশ করার কৌশলকে প্রাধান্য দিয়েছে। তিনি নিজেই একবার এক বন্ধুকে তাঁর চিঠি লেখার নতুন ধরন (স্টাইল) সম্পর্কে বলেছিলেন: ‘আমি একটি নতুন ধরন আবিষ্কার করেছি, যার মাধ্যমে পত্র লেখা কথোপকথনে পরিণত হয়েছে। হাজার মাইল দূরত্ব থেকেও, তুমি তোমার কলমের মাধ্যমে কথা বলতে পারো এবং আলাদা থাকা সত্ত্বেও সংস্পর্শ উপভোগ করতে পারো।’
সম্প্রতি একজন লেখিকা মির্জা গালিবের চিঠিপত্র সম্পর্কে লিখেছেন যে, ‘তাঁর চিঠিপত্র উর্দু গদ্যের ইতিহাসে একটি স্বতন্ত্র জলবিভাজিকা, যেখানে প্রথাগত অলঙ্কারময় ভাষা ভেঙে জন্ম নেয় কথোপকথনধর্মী স্বচ্ছ এক নতুন প্রবাহ।’ আসলে তিনি এমন শব্দ এবং বাক্য ব্যবহার করে তাঁর চিঠিগুলোকে ‘কথা’ বানিয়েছিলেন, যেন তিনি পাঠকের সঙ্গে কথা বলছেন। মির্জা গালিবের ভাষায়:
‘হাজার মাইল দূর থেকেও কলমের ভাষায় কথা বলো, বিচ্ছেদের মাঝেও মিলনের আনন্দ উপভোগ করো।’
মির্জা গালিবের কোনো চিঠিতে কোনো ধরনের আনুষ্ঠানিকতা নেই, আটপৌরে। তিনি মাঝেমধ্যে শুধু প্রাপকের নাম লিখতেন এবং চিঠি শুরু করতেন। তিনি খুবই আকর্ষণীয় চিঠি লিখতেন। এক চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন: ‘আমি এমন কথা লেখার চেষ্টা করি, যা যে কেউ পড়বে এবং আনন্দিত হবে।’
মির্জা গালিবের আরেকটা চিঠির কথা উল্লেখ না করলেই নয়। কারাভোগের পর ফার্সি ভাষায় লেখা এক চিঠিতে তিনি পৃথিবীতে আর না থাকার ইচ্ছা ব্যক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘যদি বাঁচতেই হয় তাহলে হিন্দুস্থানে নয়, বরং রোম, মিশর, ইরান, বাগদাদে, এমনকী মক্কায় গিয়ে থাকতে হলেও থাকব। তার আগে সকল বন্ধন থেকে মুক্ত হতে চাই।’
বিগত দেড় শ’ বছরেরও বেশি সময়ে মির্জা গালিবের বিশালসংখ্যক চিঠি সংগ্রহ করে বিভিন্ন গ্রন্থে বা সংকলনে সন্নিবেশিত করা হয়েছে। এগুলোর মধ্যে দু’টি সংকলন ও’ওদ-ই-হিন্দি (হিন্দুস্থানের খুশবো বা সুগন্ধি) ও উর্দু-ই-মু’আল্লাহ (রাজকীয় উর্দু) পাঠক এবং গবেষকদের কাছে খুবই জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। মির্জা গালিবের পাঁচ খ-ে প্রকাশিত সমস্ত উর্দু চিঠির সম্পূর্ণ সংকলন ‘খতুত-ই-গালিব’ (১৯৮৪-২০০০)। উল্লেখ্য, সেই পাঁচ খ-ে মধ্যে পঞ্চম খ-ের চিঠি সময়কাল অনুসারে সাজানো হয়েছে, অন্যদিকে প্রথম চার খ-ের চিঠি প্রাপকের নাম অনুযায়ী সাজানো হয়েছে।
যাহোক, কিছু প-িত এবং সমালোচক মনে করেন যে, কেবল চিঠির ভিত্তিতেই উর্দু সাহিত্যে মির্জা গালিবের স্থান কবি পরিচিতির সঙ্গে একই জায়গায়, অর্থাৎ উচ্চ স্থানে থাকবে।
মির্জা গালিবের গদ্য রচনার আরেক উজ্জ্বল উদাহরণ হলো ‘দাস্তাম্বু’, যা ১৮৫৭ সালের সিপাহী বিদ্রোহের সময়কালে তাঁর লেখা দিনলিপি। এই গ্রন্থে তিনি সিপাহি বিদ্রোহ, রক্তপাত, মৃত্যু আর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আখ্যান বর্ণনা করেছেন। যদিও আকৃতির দিক থেকে ‘দাস্তাম্বু’ খুবই ক্ষুদ্র আকারের বই, কিন্তু এ বইয়ের দালিলিক মূল্য অপরিসীম।
এছাড়া মির্জা গালিবের উল্লেখযোগ্য গদ্য রচনা নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ‘গালিব লাতিফ গায়েবি’ সংকলন, যেখানে তিনি তাঁর সমকালীন সমাজের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরেছেন।
মির্জা গালিবের প্রভাব এবং জনপ্রিয়তা
মির্জা গালিবকে মুঘল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ কবি ও দক্ষিণ এশিয়ায় উর্দু ভাষার সবচেয়ে প্রভাবশালী কবি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। অসংখ্য গজল, শায়েরিতে বিহ্বল হয়েছে সদ্য প্রেমে পড়া তরুণ থেকে পরিণত বয়সী বুড়া-বুড়ি পর্যন্ত। উপমহাদেশের স্বনামধন্য সঙ্গীত শিল্পীরা, যেমন জগজিৎ সিং, মেহদি হাসান, মোহাম্মদ রফি, গুলাম আলী, গুলজার কিংবা রাহাত ফতেহ আলী খান, বিভিন্ন আসরে গেয়েছেন তাঁর বিখ্যাত সব গজল। তারচেয়ে বড় কথা, তিনি হলেন একটি যুগ সন্ধিক্ষণের সচেতন সাক্ষী। আর তাই হয়তো তাঁর কবিতা ও গজল আজও পাঠকদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে।
এ কথা সত্যি যে, সাহিত্যিক (বিশেষ করে আধ্যাত্মিক কবি) হিসাবে মির্জা গালিবের খ্যাতি আসে মৃত্যুর পর। সেই সময় থেকে তাঁর জনপ্রিয়তা তৎকালীন ভারতবর্ষের সীমানা ছাড়িয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বময়। তিনি জীবদ্দশায় নিজের সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, তিনি বেঁচে থাকতে তাঁর সাহিত্য কর্ম এবং আলাদা গুণকে কেউ স্বীকৃতি না দিলেও পরবর্তী প্রজন্ম তাঁকে স্বীকৃতি দিবে।
বর্তমানে মির্জা গালিবের সাহিত্যকর্ম, বিশেষ করে প্রেম ও আধ্যাত্মিক কবিতা ও গজল, শুধু ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ভক্ত ও পাঠকদের কাছে পরিচিত নয়, বরং সারা বিশ্বের পাঠক ও শ্রোতার কাছে ব্যাপক জনপ্রিয়তা রয়েছে। তাঁর শায়েরি এবং গজল প্রভাবিত করে চলছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম। কেননা তাঁর লেখায় মানবিক আবেগের গভীরতা এবং জীবনের জটিলতা চিত্রিত হয়েছে।
শেষ কথা
মির্জা গালিব ছিলেন সমসাময়িক অন্য কবিদের থেকে অনেকটাই আলাদা। তাঁর কবিতায়ই প্রথম ফুটে উঠেছে জীবনের সুর, বাস্তবতার আঘাত, নিয়তি এবং চাওয়া-পাওয়ার জটিল সমীকরণ। তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং তাঁর জীবন-দর্শন আজও পাঠকের ভাবনার জগতে এক অনন্য আলো জ্বেলে দেয়। তাঁর কবিতা ও অন্যান্য সাহিত্যকর্ম মানব জীবনের বিভিন্ন দিককে স্পর্শ করে এবং চিন্তাভাবনাকে প্রভাবিত করে। মির্জা গালিবের সাহিত্য পাঠকের জন্য একটি অনন্ত উৎস, যা তাদের অনুভূতির গভীরতা উপলব্ধি করতে সাহায্য করে। পারিবারিক অশান্তি, আর্থিক অনটন, ইংরেজের অপমান- সবকিছু ভুলে সাহিত্যেই তিনি মানসিক শান্তি খুঁজে পেয়েছিলেন।
এ কথা স্বীকার করতে হবে যে, মির্জা গালিবের অনন্য সাহিত্যকর্মের কঠোর নিন্দুক কিংবা প্রশংসাকারী- যেই হোক না কেন, তাঁর প্রেম ও আধ্যাত্মিক এবং দার্শনিক ও জীবন-বাস্তব কবিতা, শায়েরি, গজল, উক্তি বা বাণী কোনোভাবেই খাটো করে দেখতে পারবে না, বরং তাদের রয়েছে তারিফ করার মতো অসংখ্য কারণ।
যদিও তাঁর পারিবারিক জীবনে শান্তি ছিল না, বরং ছিল আর্থিক অভাব-অনটন, দুঃখ-কষ্ট, অকালে সন্তান হারানোর ব্যথাবেদনা, মদ্যপানে আসক্তি, জুয়া খেলার প্রতি খেলার তীব্র নেশা এবং ইংরেজ শাসকের অপমান। আর এসব দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক টানাপোড়েন- কোনো কিছুই তাঁর সাহিত্যকর্মকে থামাতে পারেনি, বরং তিনি সাহিত্যের মাঝেই খুঁজে পেয়েছিলেন সান্ত¡না ও মানসিক শান্তি।
মির্জা গালিব আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তাঁর সাহিত্যকর্ম রয়ে গেছে, যা আগামি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের কাছে স্থানান্তরিত হবে এবং তারা জানতে পারবে, বুঝতে পারবে মহান এই কবির জীবন-দর্শন ও আধ্যাত্মিকতা।
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: মির্জা গালিবের জীবন ও সাহিত্য কর্ম সম্পর্কে বর্তমান প্রবন্ধ লেখার জন্য আমি অসংখ্য গবেষণা পত্র ও রচনা, খবরের কাগজে প্রকাশিত প্রবন্ধ ও নিবন্ধ এবং অনলাইন ম্যাগাজিনের বিভিন্ন তথ্য ব্যবহার করেছি। এছাড়া একাধিক অনুবাদকের বাংলায় তরজমা করা তাঁর বিভিন্ন কবিতার অংশ, শায়েরি, পংক্তি, উক্তি এবং বাণী উদ্ধৃতি দিয়েছি। আমি সমস্ত লেখকদের এবং অনুবাদকদের কাছে বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ।
(সমাপ্ত)
অর্থ-বাণিজ্য: বিশ্ববাজারে তেলের দাম সাত মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ
অর্থ-বাণিজ্য: বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে ৩৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়ালো
সারাদেশ: বাঁচার আকুতি গৃহবধূ মুন্নির