image
শিল্পী : সঞ্জয় দে রিপন

পৃথিবী মানুষের- যুদ্ধবাজদের নয়!

মৌলি আজাদ

মুহুর্মুহু গুলির শব্দে কান চেপে ধরে আমিরা। ছেঁড়া পর্দার ফাঁক গলে দেখা যায় আগুন আকাশ। এ আকাশ পুরো পৃথিবীর মানুষের আকাশ নয়। এ আগুন আকাশ আমিরার দেশের, যেখানে জাতিগত নিধনের জন্য চলছে হত্যা। হঠাৎ কান ফাটার উপক্রম হয় আমিরার, আমিরার প্রায়ভগ্ন বাড়িটি কাঁপতে থাকে। আমিরা বোঝে- পাশেই হয়তো কোথাও পড়েছে মানুষ মারার বোমা। অস্থির লাগে আমিরার। তার ঘর দুলছে। তার মাথা ঘুরছে। আমিরা পালাতে চায় এখান থেকে। কিন্তু সে তো পথ পায়না পালানোর। সমানে চলছে গোলাবারুদ নিক্ষেপের খেলা। দুপক্ষ হত্যার নেশায় মাতোয়ারা। ওদিকে আমিরার মতো শান্তিপ্রিয় দলকানামুক্ত মানুষগুলো যে পড়েছে বিপদে। সাধারণ মানুষ জাহান্নামে যাক। কিন্তু যুদ্ধরত দুই দলের মানুষের সাধারণের লাশেরওপর হলেও জিততে হবে। দখল নিতে হবেতাদের সকল চাওয়াপাওয়া। তারা মত্ত রক্তের হলিখেলায়।

আমিরা জানে, তার মৃত্যু ঘুরছে পায়ে পায়ে। যে কেনো সময় সে নাই হয়ে যেতে পারে। তারপরও যাকে বলে বেঁচে থাকার শেষ চেষ্টা- সেটাই করছে সে। আমিরার প্রচ- পানির তেষ্টা পায়। কাঁচের বোতলে এখনও আছে আধা গ্লাসের মত পানি। তা থেকে একফোঁটা পানি চুমুক দেয় সে। এ বোতল শেষ হয়ে গেলে আর যে পানির ছিটেফোঁটাও সে পাবে না। ক্ষুধার্ত বাঘের মতো খিদে তার পেটে। আর হবেই না কেন? তার পেটে রয়েছে নয় মাসের এক আস্ত মানব শিশু। আমিরার সেই মানুষটির প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। কী হবে এই দুনিয়ায় তার এসে? আমিরার এ পৃথিবীতে কাছের বলতে আর তো কেউ নেই। মা বাবা ভাই বোন সবাই বোমের আঘাতে ছিন্নবিছিন্ন হয়ে পৃথিবী ছেড়েছে। স্বামীকে যুদ্ধরত এক গ্রুপ মেরে ফেলার জন্য তাড়া করতে করতে ঘর- তারপর এলাকা- তারপর দেশ ছাড়া করেছে। শুধু দেশ ছাড়তে পারেনি, পৃথিবী ছাড়তে পারেনি- আমিরা। মাঝেমাঝে আমিরার কাছে এই বেঁচে থাকা মৃত্যুর চেয়েও বেশি ভয়াবহ মনে হয়। একে কি আদৌ বেঁচে থাকা বলে? সে জানে সে শুধু প্রাণে বেঁচে আছে। আর তার অবহেলার ভেতর বেঁচে আছে আরেকটা প্রাণ। আমিরা জানে তার পেটে কেউ একজন কেবলই বেড়ে চলছে। হয়তো সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় সে বাড়ছে। সে সুস্থ না অসুস্থভাবে পেটের ভেতর মাসের পর মাস বাড়ছে আমিরার তা কখনো জানা সম্ভব হয়নি।

আমিরার দেশে চলছে যুদ্ধ। চলছে বোমাবর্ষণ।হাসপাতালগুলো মিশে গেছে সব মাটির সাথে। পেটের বেড়ে ওঠা মানুষটাকে একবেলাও ভাল কিছু দিতে পারেনি সে। ভাল খাবার তো দূর- খাবারের রূপ গন্ধ কেমন তা কয়েক বছরে তার দেশের মানুষেরা হয়তো ভুলেই গেছে। ত্রাণসামগ্রী কিছু পেয়েছে আমিরা। তাই দিয়ে চলছে সে।

বাইরে বোমার আওয়াজ নেই অনেকক্ষণ। আমিরা বসা অবস্থায় চেয়ারের হাতল ধরে কষ্ট করে উঠে দাঁড়ায়। এত বড় পেট নিয়ে নড়াচড়া, কী যে কষ্ট! আমিরা বিরক্তি-ভরা চোখে পেটের দিকে তাকায়। পেটের ভেতরে বেড়ে-ওঠা মানুষের কথা ভাবার সময় নেই এখন তার। বোমার শব্দ যেহেতু নেই, এটাই ঘর থেকে বের হওয়ার মোক্ষম সময় তার। সে শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে রাস্তার অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে চায়। ঘুটঘুটে অন্ধকার ছাড়া কিছু দেখা যায় না। ঘর থেকে বের হলে যুদ্ধবাজদের হাতে সে পড়তে পারে। পড়লে মৃত্যু হওয়াই স্বাভাবিক। তাই বলে তো আর এই ভুতুড়ে এলাকায় সে থাকতে পারবে না। যেভাবেই হোক আমিরাকে বর্ডার পার হয়ে পাশের দেশে পৌঁছতে হবে।

ভাবার সময়ও কম আমিরার। হাতের কাছে থাকা ছেঁড়া কিছু কাপড়ে নিজেকে জড়িয়ে, পানির বোতল হাতে নিয়ে আমিরা নড়বড়ে দরজা ঠেলে বেরিয়ে পড়ে। মনে মনে নিজেকে সাহস দেয়- সে পারবে। সে পারবে বর্ডার পার হতে। আমিরা জানে বাড়ির সামনের রাস্তা পেরোলেই আসে বর্ডারে পৌঁছে দেওয়ার গাড়ি। গাড়ি এ সময়ই আসে সাধারণত। তাই তো তাকে জানের ঝুঁকি নিতে হবে। ঘর থেকে বের হয়ে কলিজায় পানি থাকে না আমিরার। চারপাশে অন্ধকার। নিচে শুধু ধংসস্তূপ। বড় বড় ইট পাথর এদিক ওদিক পড়া। এ সব ডিঙ্গিয়ে পেটে নয়মাসের বাচ্চা নিয়ে সামনে এগোনো চাট্টিখানি কথা নয়। নিজের অজান্তেই পেটের ভেতরে থাকা মানুষটাকে একটা বাজে গালি দেয় সে। আমিরার মনে হয়, এই বোঝাটার জন্যই সে তাড়াতাড়ি না হাঁটতে পারায় গাড়ি ধরতে পারবে না। পেটে যেন মানুষ নয় একটা বোঝা আছে- আমিরার মাথায় এটাই ঘোরে। ভাঙাচোড়ার মধ্যে দিয়ে আস্তে আস্তে পা ফেলে হাঁটে আমিরা। অন্ধকার, যে কয়েকটা ঘরবাড়ি এখনো ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়নি- সেসব বাড়ি থেকে আসা টিমটিমে আলোয় পথ হাঁটে আমিরা। দূর থেকে ভেসে আসে কুকুরের কান্নার শব্দ। বুক কেঁপে ওঠে আমিরার।

হাঁটার গতি বাড়ায় সে।রাস্তার শেষে গাড়ির হেডলাইটের আলো ভেসে আসে,যা আমিরার মনে আশার আলো জাগায়। সে পায়ের গতি বাড়িয়ে বাসের দিকে এগোতে থাকে। বাসের চারপাশে মানুষের জটলা। তবে সবাই নিশ্চুপ,ভীত স্বন্ত্রস্ত। প্রত্যেকে নিঃশব্দে গাড়িতে উঠছে। তারা জানে মানুষরূপী পশুগুলো শব্দ শুনলেই ঠা ঠা করে ব্রাশফায়ার শুরু করবে। আমিরার বিশাল পেট নিয়ে গাড়ির সামনে পৌঁছাতে বেশ বেগ পেতে হয়। পোয়াতি শরীর দেখে বাসের হেলপার তাকে নিতে গাইগুই করে। হেলপারের এককথা -গাড়িতে বসারজায়গা নেই। এডভান্স স্টেজের পোয়াতি নারী কীভাবে এত পথ দাঁড়িয়ে যাবে? আমিরা সময় নষ্ট করতে চায় না। নুয়ে পড়ে হেলপারের পায়ে। সে দাঁড়িয়েই যাবে- এই কষ্ট তার কাছে কোনো কষ্টই নয়। বহু কষ্ট পেয়ে পেয়েই সে এখনো বেঁচে আছে। সে যুদ্ধবিধস্ত এই দেশ ছেড়ে নিজে প্রাণে বাঁচতে চায় কেবল। পেটের বাচ্চা নিয়ে তার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই। সে তার বিভীষিকাময় দেশ থেকে বেরিয়ে যেতে চায় কেবল। যুদ্ধ বোমা গুলি তার মাথার কলকব্জাকে শেষ করে ফেলেছে। তার চোখকে পুড়িয়ে ফেলেছে। তার হৃদয়কে করেছে পাথর। তাই সে শুধু পালাতে চায়। হেলপার আমিরার নাছোড়বান্দার মতো আকুতি দেখে বাসে তুলে নেয়। তার অবস্থা সে নিজে বুঝবে- হেলপার মনে মনে তাই ভাবে। বাসে উঠে আমিরার মনে হয় সে পালানোর পথে এক ধাপ এগিয়ে গেল। বাসের হাতল ধরে দাঁড়িয়ে একটু হাফ ছাড়ে সে। বাসে সবাই মাথা নিচের দিক করে তাকিয়ে বসে আছে। আমিরাসহ দুই একজন দাঁড়িয়ে। বাসের ড্রাইভার জোরসে গাড়ি চালাচ্ছে। রাস্তাও মসৃণ নয়। আঁকাবাঁকা এবড়োখেবড়ো রাস্তা। প্রচ- ঝাঁকুনি। আমিরার এদিক-ওদিক পড়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়। দম বেড়িয়ে আসতে চায়। পেটের নিচের দিকে কেমন অদ্ভুত কিছিমের ব্যথা হয়। এরকম ব্যথার অনুভূতি তার আগে কখনো হয়নি। তবে কি এটাই লেবার পেইন? এ অভিজ্ঞতা তো আমিরার নেই, তাই সে বুঝতে পারেনা। আমিরা মনে মনে দোয়া করে যেন তার কোনমতেই এসময়ে লেবার পেইন না ওঠে। ঠাণ্ডার রাতেও আমিরা ঘামতে থাকে। যে পরিমাণ ঝাঁকুনি হয়, আমিরার মনে হয় হয়তো ভেতরের মানুষটা এবার শেষ হয়ে যাবে। যা হয় হোক। আমিরার তারজন্য বিন্দুমাত্র মায়া নেই। বাস্তুহারা, স্বজনহারা মানুষের মনে কোনো মায়দয়া থাকে না। হঠাৎ ঘ্যাচ করে গাড়িটা থামে। আমিরার বুক ঢিপ ঢিপ করে। মিলিটারিরা গাড়ি থামাতে বলছে। আমিরা কাপড় দিয়ে মুখ ঢাকে, যেন কোনো মতেই তার সাথে মিলিটারিদের চোখাচোখি না হয়। গাড়ির ভেতর সবাই যেন নিচের দিকে ঝুঁকতে ঝুঁকতে মাটিতে মিশে যাচ্ছে। সবাই বলা যায় প্রার্থনায় ব্যস্ত। হয়তো এটাই হবে তাদের জীবনের শেষ মুহূর্ত। ব্রাশ ফায়ারে ঝাঁজরা হয়ে যাবে তারা। কিছুক্ষণের মধ্যে তারা হয়ে যাবে মহাকালের অংশ। ঘামে ভয়ে কাঁপতে থাকে আমিরা। আমিরার কানে আসে বাস সার্চ করতে চাচ্ছে মিলিটারিরা। আমিরা ভাবে হয়তো নারীদের তারা পাকড়াও করবে। তবে কি শেষ রক্ষা হবে না আমিরার?

আমিরা চোখ বন্ধ করে শ্বাস নিতে চায়। কিন্তু নিশ্বাসের শব্দের ভয়েও সে চিন্তা বাদ দেয়। হঠাৎ করে গাড়ি হ্যাঁচকা টান দেয়। মনে হয় গাড়ি আলোকবর্ষের আগে ছুটে যাচ্ছে। আমিরা বোঝে মিলিটারির হাত থেকে তারা ছাড়া পেয়েছে। উফ! বলে আমিরা। কিন্তু বাসের ঝাঁকুনিতে আমিরার দাঁড়িয়ে থাকা দায় হয়ে পড়ে। আমিরা বুঝতে পারে তার নিচের দিকে পানির মতো কিছু ঝরে পড়ছে। পেটের নিচ থেকে ওপরের দিকে কেটে যাওয়ার মতো ব্যথা উঠছে, নামছে। শরীর কাঁপছে আমিরার। একটু পানি পেলে ভাল লাগত হয়তো তার। আমিরার ব্যথা ক্রমশ বাড়তে থাকে। গাড়ি যেন সাড়া পৃথিবী ভেঙ্গেচুরে ছুটে চলে। আমিরা প্রচ- চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারায়। যখন সে চোখ মেলে- বুঝতে পারে সে আছে বর্ডারের কোনো ক্যাম্পে। তার পাশে শুয়ে আছে তার অনাকাক্সিক্ষত সন্তান। আমিরা বোঝে পৃথিবীতে হাজার প্রতিকূলতার মধ্যেও মানবজন্ম টিকে থাকবেই। যুদ্ধ মানুষকে ঘরছাড়া করবে।নিঃস্ব করবে। কিন্তু পৃথিবীতে মানুষের আগমন ঠেকাতে পারবে না।

আমিরার দেশের যুদ্ধবাজরা আদৌ কি বুঝবে যে- পৃথিবী মানুষের!

সম্প্রতি