image
তাকাকো আরাই

জাপানি কবিতার একাল

তাকাকো আরাই-এর কবিতা

অনুবাদ: মালেক মুস্তাকিম

ছায়া

হঠাৎ ওলটপালট হয়ে যাওয়া এই চরাচরে

আর আলাদা করে চেনার উপায় নেই-

কোনটা আবর্জনা, আর কোনটা এখনো কাজের।

এত মাটি, বালি আর ধুলো উড়ে এসে জমেছে যে,

চারপাশে আজ আমি যা-ই দেখি-

সবই যেন এক বিশাল ভাগাড়।

জামার হাতায় মোছা শ্লেষ্মাগুলো কুচকুচে কালো,

ক্ষয়ে গেছে ফুসকুস আর কণ্ঠনালি।

থাক, যেমন আছে তেমনই পড়ে থাক...

নিস্পৃহ অবসাদে আমি হাতার কাপড় গুটিয়ে নিই,

আর ভেতর থেকে কুড়িয়ে আনি সামান্য উচ্ছ্বাস।

আমি এই জায়গাটাকে

স্রেফ একটা পরিত্যক্ত জমি হতে দিতে পারি না;

অন্তত ততক্ষণ পর্যন্ত নয়,

যতক্ষণ না সেই মার্বেলটা খুঁজে পাই-

যা আমি হারিয়েছিলাম এই ধ্বংসলীলার আগে।

যতক্ষণ না আমি এই জঞ্জাল ঘেঁটে

অন্তত একসুটকেস খাঁটি স্মৃতি উদ্ধার করতে পারছি।

সবকিছু পুরোপুরি মুছে ফেলা হবে,

সব বিলীন হয়ে যাবে।

আমাকে হাত বাড়িয়ে দিতেই হবে,

শক্ত করে আঁকড়ে ধরতে হবে-

এই মাটির মায়া আর ছায়াগুলোকে

তুলে রাখব এক সুটকেসে, যা কোনোদিন-

হয়তো কোনোদিনই আর খোলা হবে না।

আত্মার নাচ

মধ্যরাতের ধবংসস্তূপ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে উঠে এলো

লিকলিকে এক লম্বা লেজ-

আত্মার নাড়িভুঁড়ি- জ্বলজ্বলে সবুজ;

ঘোলাটে মাথায় খরগোশের দাঁত, চোখের মণি নেই-

তবু একটানা চেয়ে থাকে

কু-লি পাকায়

এরপর লাফ দেয়-

লাফিয়ে ওঠে

মানুষের ঘাড়ের মাংস বড় বেশি শক্ত

ওসব কীভাবে খেতে হয়- না জেনেও

বোকার মতো বারবার মাথা নোয়ায় মানুষ;

ভিনেগার দিয়ে চাইলেই আমি ওগুলোকে

নরম করে নিতে পারতাম-

তার শরীরের ভাঁজগুলো থেকে

নিচের রাস্তায় চুইয়ে পড়ে নর্দমার জল

প্রেত্মারা সেসব নখ দিয়ে খামচায়

আর আমাদের চোখের সামনেই পেরিয়ে যায়

বিদ্যুতের তার ও খুটি

খুটির পৃষ্ঠজুড়ে নাড়ি উল্টিয়ে করে কম্পন নৃত্য-

আমি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়ি-

আবর্জনা আর অখাদ্যে ভরে গেছে পৃথিবী

এসব খেতে খেতে আমি ক্লান্ত;

ফিরিয়ে নাও তোমাদের এ অসার নৈবেদ্য

যা পেটের ভেতরে চিৎকার ও ওলটপালট করে দেয় সব-

পশ্চাদ্দেশ থেকে ঝরায় আগুনের বৃষ্টি,

বাঘবেড়ালটি তার থুতনি উঁচিয়ে ডাক ছাড়ে, মিউ, বন্ধু-

আত্মা কু-লি পাকায়

লাফাতে লাফাতে আইল্যাশ কার্লারে বাঁকানো

কৃত্রিম পাপড়িতে উঠে পড়ে

এরপর সেই বিপুল অক্ষম কিশোরের কণ্ঠাস্থিতে ঝরে পড়ে

লাফিয়ে নামে ঝুলেপড়া বিকর্ষিত স্তনের খাঁজে

দ্রুত পেরিয়ে যায় ক্ষমতালোভী জ্ঞানপাপীদের-

লাফাতে লাফাতে কু-লি পাকায়

কু-লি পাকাতে পাকাতে লাফিয়ে চলে

অদ্ভুত সুন্দর নাড়িভুঁড়ির সে সবুজ পাখি মেলে আছে খাঁড়া দাঁত।

দিনের যাবতীয় আবর্জনা আর নেশাতুর প্রলাপ

সবই সেই আত্মার খোরাক

তোমার যেটুকু সময় বাকি আছে, তা কি খুঁটে খাব?

আঁকড়ে ধরব? নখ দিয়ে গর্ত করব?

কিন্তু ধ্যাত, শরীর ও মাথা এত শক্ত

এমনকি ঘাড়ও ঘোরে না কোন্দিকে-

মিউমিউ করে আত্মা যেই টোকা মারে শরীরে

আগুনের স্ফুলিঙ্গ ছিটিয়ে নাচতে শুরু করে

যেন সাইকেল চালাচ্ছে ঘুরে ঘুরে

আমি ক্ষুধার্ত হয়ে পড়েছি

আমি এমনই এক জীবন্ত, কামজ স্বর্গীয় সত্তা

যেখানে শরীর থেমে যায়, সেখানেই সেরে নিই

জাগরণ, খনন ও ব্যায়াম-

যা কিছু ধরে রাখে সময় তা কেবলি আমার জন্য।

শোনো, হে অহংকারী অপদার্থের দল, শোনো,

তোমাদের এই ডুরিয়ান ফলের নৈবেদ্য

আমি কখনোই নেবো না।

একপাটি জুতো

রক্তিম পপি ফুটেছে আজ-

একপাটি চামড়ার জুতো- মাত্র একপাটি-

সৈকতের বালুচরে ভেসে উঠেছে,

ফিতেগুলো এখনো বাঁধা-

ঝুঁকেপড়া পপি থেকে ঝরে পড়ে পাপড়ি

জুতোটি মৃদু দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে-

পপিফুল নিজেকে ঝাড়া দিয়ে ওঠে

আর নোংরা জুতাটা চোখ মেলে তাকায়

পৃথিবীর পানে

পুরানো কুয়োর মতো গভীর ওই চোখে

স্মৃতিরা ভিজে চুঁইয়ে পড়ছে।

পপিটি জানে কীভাবে ভালোবাসতে হয়

খাঁজকাটা বুকের দিকে বাড়িয়ে দেয় পাতা-

আমাকে ভাঙতে পারবে না তোমরা,

ঢেউয়েরা ভেসে নিতে পারবে না

আমার ক্ষয়ে যাওয়া গোড়ালির ভাঁজ।

জুতোহীন ছেলেটার দৃষ্টির চারপাশে তারা ঘোরে

ঘুরে ঘুরে জলের কিনারে গিয়ে থামে

সে চোখের গভীরে যদি একবার উঁকি দিত পপিফুল

পুরানো কুয়োর তলে

পোনার ঝাঁকের মতো দেখত সে আগুনের ফুলকি

সাগর পারে না কভু নেভাতে এ শিখা,    

অস্তিত্বের মূলে জ্বলে যে পা-ুর আলো;

এই সাগরও তো এক বিশাল চোখ- 

গিলে নিতে চায় সমস্ত সাদা-কালো।’

কেমন আলো সেই ঢেউ দিয়েছিল ছড়িয়ে? সেই ক্ষণে-

যখন সে প্রবল ক্রোধে, সিক্ত চরণে আছড়ে পড়ল কূলে-

আর অতল সাগরে হারিয়ে গেল অন্য জুতোটি।

সার্ডিন মাছের ঝাঁক কি দেখেছিল নীল আগুনের সে বৃত্ত

আমার চোখের গভীরে আঁকা?

পপিটি আবার কাঁপে থরথরে, না, ওটা দমকা হাওয়া-

যার সমুখে ফুলটি দাঁড়িয়ে আছে নগ্ন দেহে-

ঝরিয়ে পাপড়ি- কুয়ার অতলে;

যেন এক নাড়ির বন্ধন- ওই জুতোর ফিতে-

চোখের গভীরে সে ক্রমাগত নেমে যায়;

যখন সেই বালকটি আঁকড়ে ধরতে চায় কিছু-

হামাগুড়ি দিতে দিতে আরও গভীরে হারিয়ে যায় ফিতেটি...

***

মুল জাপানি থেকে ইংরজি অনুবাদ: জেফরি এঙ্গেলস

কবি পরিচিতি: তাকাকো আরাই-এর জন্ম ১৯৬৬ সালে, জাপানের গুনমা অঞ্চলের কিরিউ শহরে। পড়ালেখা করেছেন টোকিওর কেইও বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ পর্যন্ত তার দ্য এম্পাররস আনফরচুনেট লাভার, সোল ড্যান্স, বেডস অ্যান্ড লুমস- তিনটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। তিনি “মি’তে” নামক একটি সাহিত্য সাময়িকী সম্পাদনা করে যাচ্ছেন। বর্তমানে তিনি ইয়োকোহামাতে বসবাস করেন এবং সাইতামা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক ছাত্রদের জাপানি ভাষা পড়ান।

আরাইয়ের কাছে চারপাশের সবকিছুই কবিতা। তাঁর কবিতাগুলো একই সাথে চঞ্চল, আধুনিক এবং প্রাণবন্ত। তিনি শব্দের উৎস খুঁজে বেড়ান এবং শরীরের ভেতরে কীভাবে সেই শব্দগুলো তৈরি হয়, তা প্রকাশ করে তাদের নতুন নাম দেন। আরাইয়ের কাজগুলো পরীক্ষামূলক এবং আধুনিক। তিনি কবিতায় স্থানীয় উপভাষা, খ-িত বাক্য এবং বৈচিত্র্যময় চিত্রকল্প ব্যবহার করতে সিদ্ধহস্ত।

তাঁর কবিতা শুধু শিল্পের জন্য নয়, বরং তা সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ। তিনি কবিতায় কারখানার খেটে খাওয়া শ্রমিক আর প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের নিখুঁত মানচিত্র আঁকতে পারেন। তাকাকো আরাই জাপানের বর্তমান প্রজন্মের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একজন কবি হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবেও সমান আদৃত।

সম্প্রতি